• December 9, 2021

উচ্ছেদ, হত্যার প্রতিবাদ গুয়াহাটি প্রেসক্লাবে নাগরিক সভা

 উচ্ছেদ, হত্যার প্রতিবাদ গুয়াহাটি প্রেসক্লাবে নাগরিক সভা

রতীশ দেব

দরং জেলার ধলপুরে অমানবিক কৃষক উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৪ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটির ” গৌরী সদনে এক নাগরিক সভার আয়োজন করা হয়েছিল । প্রশাসন কোন কারণ না দেখিয়েই এই সভা অনুষ্ঠিত করতে বাধা দেয়। গৌরী সদনের সামনে ছিপাঝার থেকে আসা উচ্ছেদিত হওয়া কৃষক সহ অন্যান্য নাগরিক, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র-যুবক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা সমবেত হয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদী সভা পরে গুয়াহাটি প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। এই নাগরিক সভা অনুষ্ঠিত করতে বাধা দেওয়া নাগরিক অধিকার খর্ব করা হল বলে সবাই অভিমত ব্যক্ত করেন ।
২৩ সেপ্টেম্বর দরং জেলার ধলপুরে উচ্ছেদের নামে এক অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় । ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অসমে এই বিশেষ সম্প্রদায়ের উপর বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ নামিয়ে আনে। এন আর সি ইত্যাদি ছাড়া তার অন্যতম কর্মসূচী হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জমিচ্যুত করে ভিটেমাটি ছাড়া করে নিজের দেশেই গৃহহীন হয়ে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা।
সেই কর্মসূচীকে সামনে রেখে বিজেপি সরকারের দ্বিতীয় কর্মকালে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা র নেতৃত্বে মে মাস থেকে শুরু করে এযাবৎ ছয় বার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এদের বসত বাটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এই উচ্ছেদের একটাই উদ্দেশ্য হচ্ছে এইসব জমি কে দেশী বিদেশী কর্পোরেট পুঁজির কাছে সঁপে দেওয়া । যে কাজ ইতিমধ্যেই অসমে শুরু হয়ে গেছে ।


তারই ধারাবাহিকতায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর এই কভিড কালে, রাত বারোটায় ধলপুর গ্রামবাসীকে উচ্ছেদের নোটিশ ধরিয়ে দেয়। এবং পরদিনই ২৩ সেপ্টেম্বরে সকাল ৮ টা নাগাদ জেলার পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ১২০০’র ও বেশি সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ধলপুরে হাজির হয়। আট ঘণ্টা সময়ও গেল না। ইতিমধ্যে গ্রামবাসী (বেশির ভাগ) কৃষকরা এই উচ্ছেদ প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামের সীমানায় সমবেত হয় । হাতে তাদের কাঁচা বাঁশ। পুলিশ সুপারের উস্কানি মূলক বক্তব্যে উত্তেজিত না হয়ে, গ্রামবাসীরা একটু সময় চেয়েছিলেন। পুলিশকর্তা মানল না। আক্রমণাত্মক ভাষায় ধমকাতে শুরু করল। এই থেকেই অবস্থা অবনতির দিকে গতি করল। তখন আচমকা সশস্ত্র পুলিশের একটি দল এগিয়ে গিয়ে গ্রামবাসী দের ঘিরে ফেলে । এবং গ্রামবাসীদের ধাওয়া করে। দাঁড়িয়ে থাকা মইনুল নামের কৃষক তখন প্রতিরোধের জন্য হাতে ধরা কাঁচা বাঁশ নিয়ে পুলিশদের দিকে ধেয়ে আসে। সশস্ত্র পুলিশরা দৌড়ে পালাতে থাকে। মইনুলও ওদের পেছন পেছন ছুটতে থাকে । শেষ পর্যায়ে মইনুল চক্রব্যুহে আটকে যায় । মইনুলকে একা পেয়ে ঘেরাও করে ফেলে। এবং প্রায় শূন্য দূরত্ব থেকে তাঁর বুকে গুলি চালায় । এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল তার হাড় ঝিরঝিরে ছাতি। হটাৎই চারদিকে কাঁদুনে গ্যাস, শূণ্যে গুলি । আহত হলেন অনেক মানুষ । বিপক্ষ ছাড়া এক যুদ্ধক্ষেত্র। মইনুল পড়ে রইল মাটিতেই। শুধু শ্বাস বইছে। এরই মধ্যে এক ফটোগ্রাফার পৈশাচিক উল্লাসে মইনুলের নিথর দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। বুকের উপর অনবরত উলম্ব লম্ফন, লাথি , ঘুষি চালালো। জানা গেছে সে বিজয় শঙ্কর বনিয়া। ১২০০ পুলিশের ছত্রছায়ায় সে ফ্যাসিস্ট উল্লাসে নেচে গেলো মইনুলের দেহের উপর। মইনুল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। সশস্ত্র পুলিশও সেই মৃত দেহের হাতে বুকে পায়ে একনাগাড়ে লাঠি চালাতে লাগল। এ কি দৃশ্য! এই পৈশাচিক ফ্যাসিস্ট উল্লাস। এই পৈশাচিক কাণ্ড সমগ্র অসমের মানুষকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। এটাই তো ফ্যাসিস্ট আচরণ।সারা ভারত তথা বিশ্বের সর্বত্র মানবতাবাদী মানুষ এই অমানুষিক কাণ্ডের নিন্দা করলো। দ্বিতীয় মৃত জন হল শেখ ফারিদ। বয়স ১২। এই অশান্ত পরিস্থিতিতেও সে গেছিল পোষ্ট অফিসে। তার পরিচয় পত্র আধার কার্ড আনতে। ফিরে আসার পথে সেও গুলিবিদ্ধ হল। তারও বুকে ছুড়লে গুলি। বিনা অপরাধে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল তারই দেশে, ধলপুরে তার জন্মস্থানে জল্লাদ ফ্যাসিস্ট বাহিনীর গুলিতে । মারা যাওয়ার পর পকেটে পাওয়া গেল শেখ ফারিদের ঝকঝকে কাগজে তার নামের পরিচয় পত্র। আধার কার্ড ।
স্বভাবতই সারা অসমজুড়ে, বরাক ব্রহ্মপুত্র জুড়ে উচ্ছেদ কে কেন্দ্র করেএই বর্বর পাশবিক হত্যা কাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হল। গুয়াহাটির গৌরী সদনে প্রশাসন নাগরিক সভা করতে দিল না। সেখানে সমবেত প্রায় দুই শ নাগরিকরা পায়ে হেঁটে মিছিল করে গুয়াহাটি প্রেস ক্লাবে সমবেত হয়ে সভা করলেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন ডঃ দীনেশ বৈশ্য, প্রাক্তন অধ্যক্ষ বি বরুয়া মহাবিদ্যালয়, বিশিষ্ট সাংবাদিক হাইদর হুসেইন, আইনজীবী শান্তনু বরঠাকুর, অসম নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি পরেশ মালাকার, জেমসের আলি এবং আরও অনেক। সবাই একই সুরে ছিপাঝারের উচ্ছেদ কাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করেন। বিজেপি নেতৃত্বাধীন অসম সরকারের এই অমানবিক উচ্ছেদের তীব্র নিন্দা করেন। নিন্দা করেন বিনা প্ররোচনায় গুলি চালিয়ে দুই জন ভারতীয় নাগরিককে হত্যা করার । প্রশ্ন ওঠে প্রায় ১২০০ সশস্ত্র পুলিশ কি করে একা এক মইনুলকে পৈশাচিক উন্মাদনায় হত্যা করার পিছনের রহস্য নিয়ে। অসমের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ‛ডঃ হীরেন গোহাঁই সভায় উপস্থিত না থেকেও লিখিত ভাবে নাগরিক সভাকে সমর্থন জানান এবং অবিলম্বে কৃষক উচ্ছেদ বন্ধ করার দাবী জানান। কৃষক হত্যার বিরুদ্ধে তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন’। সভায় ছিপাঝারের উচ্ছেদের বলি মইনুল হক তাদের উপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার নেমে এসেছে সেকথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ।
সভায় অনেক গুলি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ধলপুরে নিরীহ লোকের উপর গুলি চালনা এবং হত্যার ন্যায়িক তদন্ত দাবি করা হয় এবং সরকারের এই জনবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয় ।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • ধিক্কার জানাই এই ন্যাক্কারজনক জঘন্য অমানবিক ঘটনার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post