• December 9, 2021

“সন্দেহভাজন বিদেশি”-র অপবাদ নিয়ে প্রয়াত হলেন সুখদেব রী

 “সন্দেহভাজন বিদেশি”-র অপবাদ নিয়ে প্রয়াত হলেন সুখদেব রী

রিয়া রায়

আজ ১৯/১১/ ২১ “সন্দেহভাজন বিদেশি” সুখদেব রী-র হৃদযন্ত্র থেমে গেল সন্ধে বেলায় । হ্যাঁ, জীবিত অবস্থায় বিদেশি তকমা ঘোচাতে পারলেন না তিনি। শেষ পর্যন্ত সুখদের রী মারা গেলেন। অসমের বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলার বর্ণি ব্রিজ টি এস্টেটের শ্রমিক । নিরক্ষর দরিদ্র এই মানুষটির নামে ২০১২ সালে বর্ডার এস পি র কাছ থেকে সন্দেহভাজন বিদেশি হিসেবে নোটিশ এসেছিল ।সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আইনজীবী মারফত হাইলাকান্দি কোর্টে জমা দিয়েছিলেন ২০১৩ সালের ৭ মার্চ । কিন্তু, বারবার ফরেনার্স ট্রাইবুনালের শুনানিতে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না সুখদেবের । ছিল না লোভী আইনজীবীর বারবার আর্থিক চাহিদা মেটানোর মতো কোনো উপায় । তাই, হাজিরার নোটিশ পেয়েও আর যেতে পারেনি মানুষটি হাইলাকান্দি ফরেনার্স ট্রাইবুনালের শুনানিতে । ট্রাইব্যুনালের এক তরফা রায়ে বিদেশি ঘোষিত হয়ে গেল এই মানুষটি ।এর ফলাফল কী তখনও ভালো করে সুখদেব হয়তো বোঝেনি । হ্যাঁ, তার ফল হলো তিন বছরের ডিটেনশন ক্যাম্প ।যারা ২০১৪ সালে নির্বাচনে র আগে রামনগরের মাঠে হাজার হাজার ভোটারের ভিড়ে ডিটেনশন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেবে বলেছিলেন , তাঁদের সরকারই এই সুখদেবের মতো বাঙালির জীবন এমন বিভীষিকাময় করে তুলেছে। হ্যাঁ সুখদেবের ভোটার লিস্টে নাম আছে যথাক্রমে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালে ।বাবার নাম আছে । কিন্তু, নিরক্ষর চা বাগানের শ্রমিক ঘুম ীীমানুষেরা বাউড়ি থেকে রী হলে কী সর্বনাশ হয় জানেই না । আর সেটাই অপরাধ ।যত কেস তত টাকা তত বেশি প্রমোশন ।বর্ডার পুলিশের কাছে এই লোভের হাতছানি সুখদেবের মতো মানুষদের কী সীমাহীন সংকটে ফেলে তা কে বুঝবে ? তাই যে কোনো অজুহাতে “বিদেশি” ধরে আনো !

ডিটেনশন ক্যাম্পে যাদের তিন বছর হয়ে গেছে মানে ক্যাম্পের নরক দর্শনের “পুণ্য” যারা অর্জন করেছেন তাঁদের জন্য সুপ্রিম কোর্ট ঘরে ফেরার ব্যবস্থা করেছে , মানে, জামিনের ব্যবস্থা করেছে । কিন্তু শর্তাধীন । কী সেই শর্ত ? মাসে একবার করে যেতে হবে থানায় হাজিরা দিতে।

কিন্তু যাতায়াতের জন্য পয়সা লাগে বাস ভাড়া অটো ভাড়া দেওয়ার মতো উপার্জন কোথায় ? আর যে লোকটি তিন বছর বন্দিদশা কাটিয়েছে খুন ধর্ষণ চুরি ডাকাতি বা কোনো রকম সামাজিক অপরাধ ছাড়া তাদের বন্দিদশায় মানসিক অবস্থা কী হয় কেউ কি জানে ? কোনো মনস্তাত্ত্বিক যাচাই হয়েছে এদের ? জেল থেকে ফিরেই লোকগুলো কোন্ কাজে যোগ দেবে ? তাদের থাকে কি তাদের শারীরিক মানসিক সেই শক্তি ? তারপর কোভিডের সময়ে ? সুখদেব পারে নি । সন্তান,স্ত্রী সহ সবাইকে ফেলে যেতেই হবে ।সুখদেবের হৃদযন্ত্র কি থামবে না ? হ্যাঁ ,আজ থেমে গেছে চিরকালের জন্য । হাইলাকান্দি কোর্টের সহৃদয় আইনজীবীদের অনেকেই এগিয়ে এসেছেন সুখদেবের “স্বদেশ” প্রমাণে ।
আগামী ৩ ডিসেম্বর ছিল শুনানির দিন। কিন্তু তার আর দরকার হবে না ।সুখদেব দারিদ্রের সঙ্গে নিত্য স্বদেশ প্রমাণের ধকল সহ্য করতে পারে নি । সে চা বাগানের শ্রমিক । সবচেয়ে বড় কথা সে একজন “হিন্দু বাঙালি ।”
যারা গলা ফাটিয়ে হিন্দু হওয়ার গর্বে সোচ্চার হয় , তারা সুখদেবের জন্য গলা ফাটায় না কেন ? কেন এদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়ার সূত্রে তারা এদেশের বৈধ নাগরিকের মর্যাদা পাবে না ? কেন সুখদেবদের আদালতের মানে বোঝার মতো শিক্ষিত করতে যে রাষ্ট্র পারেনি তাকে বারবার আইন আদালত বোঝার জন্য পরীক্ষা দিতে হবে ?

রিয়া রায় : গবেষক, লেখক ও সমাজকর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post