• December 2, 2022

সোশ্যাল মিডিয়া- আশির্বাদ না অভিশাপ

 সোশ্যাল মিডিয়া- আশির্বাদ না অভিশাপ

আ,ফ,ম, ইকবাল

সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া বলতে আমরা যা বুঝি, তাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। বাংলায় একে বলা হয় সামাজিক মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যেসব ওয়েবসাইট বা এপ্লিকেশনে ব্যবহারকারী তাৎক্ষনিকভাবে বিভিন্ন কন্টেন্ট শেয়ার করতে পারে, অন্যদের সাথে যোগাযোগ কিংবা অনুভূতি আদান প্রদান করতে পারে, তাকে সোশ্যাল মিডিয়া বলা হয়। অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়া হল এমন কোন তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর মাধ্যম, যেখানে এর ব্যবহারকারীরা মিলে একটি ভার্চুয়াল কমিউনিটি বা কৃত্রিম সমাজ গড়ে তোলেন।
সোশ্যাল মিডিয়া মূলত অনলাইন বা ইন্টারনেট সংযোগ নির্ভর হয়ে থাকে। আর সোশ্যাল মিডিয়াগুলোও বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কোনটি ওয়েবসাইট নির্ভর, আবার কোনটি হয়তো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নির্ভর। কোনো সোশ্যাল মিডিয়া শুধু একে অপরের সাথে যোগাযোগ করার সুবিধা দিয়ে থাকে। আবার কোনোটি হয়তবা ভিডিও দেখার সুযোগ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ‘ফেসবুক’-এর ব্যবহারকারীদেরকে একে অপরের সাথে তাৎক্ষনিক যোগাযোগ এবং তাঁদের মুহূর্তগুলোকে একে অন্যকে দেখার সুযোগ করে দেয়। আবার, অন্যদিকে ‘ইউটিউব’ ভিডিও দেখার সুযোগ করে দেয়। যে ভিডিওগুলো অন্য কোনো ইউটিউব ব্যবহারকারীর আপলোড করা, অথবা হতে পারে ব্যবহারকারীর নিজের।
খুব সহজ বাংলায় সোশ্যাল মিডিয়াকে সংজ্ঞায়িত করলে সোশ্যাল মিডিয়াকে বলা যেতে পারে অনলাইন কমিউনিটি। অর্থাৎ, কোন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম হিসেবে তখনই গণ্য হবে, যখন এর কন্টেন্টগুলো তৈরি করবে এর ব্যবহারকারীরাই। যেমন ফেসবুকের প্রতিটা পোস্ট কোন না কোন ইউজার তৈরি করছে। আবার সেটি দেখছেও অন্য ইউজাররা। ইউটিউবে এর ব্যবহারকারীরাই ভিডিও আপলোড করছে এবং তাঁরাই আবার সেগুলো দেখছে। কিন্ত যদি এমন হতো, ইউটিউবে শুধুমাত্র ইউটিউব কর্তৃপক্ষরাই ভিডিও আপলোড করত এবং আমরা শুধু সেগুলো দেখতাম, তাহলে সেটাকে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম বলা যেতো না। অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়ার মূল কনসেপ্ট হল শেয়ারিং!
সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটি দিকই বিদ্যমান। পজিটিভিটি আর নিগেটিভিটি। তবে আমার কখনো মনে হয় সৃজনশীলতার চেয়ে সৃষ্টি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতাই এখানে বেশি। ধরুন একটি কবিতা ভালো লাগলো, শেয়ার করলাম। এখানেই শেষ। এর আবেদন বা গভীরতা নিয়ে আচার বিচারের তেমন অবকাশ নেই। ছোট পত্রিকগুলোর অবদান এক্ষেত্রে ছিল খুবই প্রাণিধানযোগ্য। সেখানে রচনাগুলো নিখুঁত ছিল। প্রতিটি লেখায় ছিল কিছু কাঙ্ক্ষিত নিবেদন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখিতে সেই ঘনিষ্ঠতা ও গভীরতা কোথায়? এখানে যার যেমন সই, সে তেমনি গাইছে। না আছে কোনও নিয়ন্ত্রণ, না কোনপ্রকার সম্পাদনা। যেমন তেমন করে কয়েক লাইন বা অনুচ্ছেদ লিখে নিলেই যে সাহিত্য তৈরি হয় না, সে জ্ঞানই বা কয়জন ইউজার রাখছে ?
অবশ্য একথাটি অনস্বীকার্য যে ব্লগের মাধ্যমে সাহিত্য লেখা হবে বা হচ্ছে। কারণ যে কেউ তো আর ব্লগ লিখছে না। সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত বহু বিজ্ঞ ব্যক্তিরা ব্লগ লিখছেন। যা সৃষ্টিশীল সাহিত্য হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য। তবে এখানেও কিছু ভূঁইফোড় ব্লগারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের সৃজনশীলতা আশা করা যায়না। যার জন্য সাহিত্যের সমঝদার পাঠকরা আজও ক্লাসিক খুঁজে বেড়ান। সামাজিক মাধ্যমে এতো এতো লেখা হচ্ছে, তবু ক্লাসিক গুলো তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে নি।
রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া এমন একটি নেশা পরিবেশন করে যে, যে কেউ তাতে আসক্ত হয়ে যায়। একজন লেখক, যিনি গুরুতর বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তা করার সামর্থ্য রাখেন, তিনিও যেন সংক্ষিপ্ত, হালকা বিষয় বা মন্তব্য করতে পেরে খুশি। কারণ তাৎক্ষণিক লাইক আর কমেন্ট যে আসছে ! এটি ইউজারদের মনে একটি বিভ্রম তৈরি করে।
সামাজিক মাধ্যম গুলোর মধ্যে ফেসবুক প্ল্যাটফর্মটি সহজেই অ্যাক্সেসযোগ্য। কিশোর বয়সী থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধ ইউজাররাও এখানে নিত্য ট্রল করছেন। তাই একথা বলা যায় না যে ফেসবুকে কেবল মেকি লেখক-সাহিত্যিকদের বন্যা। কেননা তাদের কেউ কেউ খুব ভালো স্রষ্টা হয়ে সাহিত্যে অবদান রাখার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু এটাও অনস্বীকার্য যে, ভালো সম্পাদক ও সমালোচক অবিহনে সম্পাদনার কাজ কে করবে? আর সম্পাদনা ছাড়া কোনো একটি লেখা উত্তম সাহিত্য কর্মের মর্যাদা লাভ করতে পারে না। সুতরাং একথা অত্যুক্তি হবেনা যে সাহিত্য চর্চার আসল প্লাটফর্ম ফেসবুক বা এধরনের সামাজিক মাধ্যম নয়। বরং তার জন্য আজও অপরিহার্য সাহিত্য পত্রিকা ও সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা। বলতে পারেন আমি পুরাতন পন্থী। তথাপি বলবো পুরাতন সব যেমন মন্দ নয়, তেমনি নতুন হলেই সবকিছু ভালো নয়।
এবার সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক সামাজিক যোগাযোম মাধ্যম ব্যবহারের সুবিধা এবং অসুবিধা সমূহ।
প্রথমত এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা দেশ নানা জাতি নানা ভাষাভাষী মানুষের সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য একটি দুর্দান্ত প্ল্যাটফর্ম।
নিজেদের কাছের এবং দূরের প্রিয়জনের সাথে কথোপকথন করার জনপ্রিয় একটি সহজলভ্য মাধ্যম।
ব্যক্তির মতামত প্রকাশ করার সুযোগ এবং অন্যের থেকে মতামত পাওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে এমন একটি মাধ্যম।
সোশ্যাল মিডিয়ার একটি উত্তম উপযোগিতা হলো সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন প্রবীণ নাগরিকদের নিঃসঙ্গতা হ্রাস করতে সহায়তা করে।
সামাজিক মিডিয়া সংকটজনিত সময় জনস্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা তথ্যের দ্রুত প্রচার এবং প্রসার করার সুবিধা করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
সামাজিক মাধ্যমের আরও একটি পজিটিভ অবদান হলো এর মাধ্যমে বিস্তৃত শ্রোতাদের জন্য একাডেমিক গবেষণা সরবরাহ করে থাকে, যা মানুষকে পরবর্তী দুর্গম শিক্ষাগ্রহণের অ্যাক্সেসের অনুমতি দেয়।
কিছু পেশাদার নেটওয়ার্কিং সাইট তথা সংস্থা চাকরি সন্ধানকারীদের কাজে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে থাকে।
করোনা মহামারি সংকটকাল থেকে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ এর মাধ্যমে ব্যাপক শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তার লাভ করছে। যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও ভালো মানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
তাছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও নিবন্ধন ইত্যাদি প্রকাশের মাধ্যমে ব্যবসায়ের প্রচার করা সুলভ হয়ে উঠেছে।
সর্বোপরি সোশ্যাল মিডিয়া সাংস্কৃতিক, জাতিগত এবং জাতীয় বাধা পেরিয়ে সারা বিশ্বকে একটি ভূবনগ্রামে পরিণত করে দিয়েছে। যার ফলে আজ যেকোনো দেশের নাগরিক হয়ে উঠেছেন বিশ্ব নাগরিক। ভূমণ্ডলের সর্বত্রই বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে বিস্তারিত।

এ তো গেলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপযোগিতা বা পজিটিভ দিক সমুহ। কিন্তু তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের কিছু নেতিবাচক দিকসমূহ।
যেমনঃ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ভুয়া বা ফেক আইডি ব্যবহারকারীর কারণে পর্ন ছবি এবং অশ্লীল মন্তব্য প্রকাশ করে নেওয়ার ক্রিয়াকলাপ অতি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্দেশ্যে প্রণোদিত কোনো অসত্য তথ্য প্রকাশ করে কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে উদ্বেগ সৃষ্টি করার জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে দেখা যায় যত্রতত্র।
সামাজিক মাধ্যম সমূহ আজকাল একধরণের আসক্তির সম্ভারে পরিণত হয়ে গেছে। বিশেষ করে তরুন প্রজন্মের মধ্যে এর নেতিবাচক ব্যবহারের ফলে তাদের সম্ভাব্য প্রাগ্রসর জীবন ধারায় ব্যাপক ক্ষতি সাধন হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহারের একটি অন্যতম নঞর্থক দিক হচ্ছে এসব ব্যবহারের ফলে আপনার ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য প্রকাশিত হবার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে।
কেবল যুব প্রজন্ম নয়, যে কোনো বয়সের ইউজার যদি অতিমাত্রায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছেন, তাহলে এক পর্যায়ে আপনি এসবের প্রতি এমন আসক্ত হয়ে উঠবেন, যার ব্যাপক নিগেটিভ প্রভাব পড়তে পারে আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক তথা সামাজিক জীবনে। একটা সময় এমন হয়ে উঠবে আপনি আপনার পিতামাতা, স্ত্রী সন্তান অথবা বন্ধুদের চাইতে মিডিয়াকে বেশি সময় দেওয়া শুরু করবেন। কিন্তু এর দুষ্পরিণাম কি হতে পারে, সে সম্বন্ধে আপনার কোনো খেয়ালই থাকবে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আরও একটি বিয়োগাত্মক দিক হলো অপরাধীরা অপরাধ করতে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া খবর প্রচার করার জন্য ও সামাজিক মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার করে থাকে।
মানসিক অবনমনের সাথে যুক্ত বিষয়টি হলো অতিরিক্ত সামাজিক মিডিয়া ব্যবহারের ফলে ইউজারদের কিছু মারাত্মক শারীরিক ব্যাধি বা অপঘাতের শিকার হবার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অতিরিক্ত সামাজিক মিডিয়া ব্যবহারের ফলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব এবং মস্তিষ্কের ব্যাধি, ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হ্রাস, স্বকেন্দ্রিক হয়ে উঠা ইত্যাদি নানা রকম রোগব্যাধির শিকার হতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে যুবসমাজের এক বৃহদাংশ।
তাছাড়াও ধরুন আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন কিছু শেখার জন্য। দিনশেষে নোট করে দেখুন আজ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আপনার কি কি শেখা হলো ? আর কি কি বিদ্বেষ বিভাজনের পাঠ পেলেন। যোগবিয়োগ করে দেখুন পাল্লা কোনদিকে ভারি। যদি উপলব্ধি করতে পারেন যে কাঙ্ক্ষিতভাবে তেমন কিছু শেখা হচ্ছে না, তাহলে নিশ্চিতভাবে এই মাধ্যমগুলো হয়ে গেছে আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করার অন্যতম কারণ।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ফলে অনেকের মধ্যে হতাশার পরিমান বাড়ছে। কেননা উদ্দীপনা যোগানের চাইতে হতাশা আর বঞ্চনা তুলে ধরার মানুষ অধিক।
আজকের লাগামহীন সমাজ ব্যবস্থায় একথা সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশিরভাগ সময়ই অনৈতিক এবং অসামাজিক কন্টেন্ট ভাইরাল হচ্ছে। যা সমাজকে বহুলাংশে বিপথগামী করে তুলছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের উপরোল্লিখিত ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক সমুহ আলোচনার পর আমরা যে দিকদর্শন পাই, তা হচ্ছে ইউজারদের দায়বদ্ধতা। ইউজার নিজেই বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন সামাজিক মাধ্যমে সমুহ তার জন্য আশির্বাদ না অভিশাপ। বাস্তবে আমরা যদি সামাজিক মাধ্যম সমুহের নেতিবাচক দিকগুলি এড়িয়ে চলতে পারি এবং ইতিবাচক কর্মকান্ড গ্রহণ করতে পারি, তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জন্য আশির্বাদ। অন্যথায় তা যথাসম্ভব পরিত্যাজ্য।

  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post