• June 29, 2022

বানভাসি আসাম, বিপন্ন জনজীবন

 বানভাসি আসাম, বিপন্ন জনজীবন

আ,ফ,ম, ইকবাল

রাজ্যজুড়ে অবিরাম বৃষ্টির পরিণাম স্বরূপ আসামের বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। রাজ্যের ৩৩টি জেলার সবকটিই এখন বন্যাপ্লাবিত। জলের তলায় চলে যাচ্ছে বসতবাড়ি থেকে চাষের জমি। বন্যাবিধ্বস্ত প্রায় ৩১ লক্ষ মানুষ। ধস এবং বিধ্বংসী বানের জেরে এযাবৎ শতাধিক লোকের জীবন হানি ঘটে গেছে। যেসব জেলা থেকে বন্যায় মৃত্যু হওয়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো হলো ডিমা হাসাও, বজালি, বরপেটা, কাছাড়,কামরূপ, করিমগঞ্জ উদালগুড়ি জেলা। পাশাপাশি ১২৭টিরাজস্ব সার্কল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। জলে ফুলেফেঁপে উঠছে লঙ্গাই, কাটাখাল, বরাক, বাকি, মানস, পাগলাদিয়া,পুঠিমারি, কপিলি, সুবনসিড়ি, গঙ্গাধর, ব্রহ্মপুত্র নদ। শুধু তাই নয়, বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে প্রায় সবকটি নদীর জল।


এবারের বন্যা চলতি ইংরেজি বছরের পঞ্চম দফার বন্যা। তৃতীয় তথা গত ৬ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত বন্যা ও ধসের কবলে পড়ে শিশু মহিলা সহ মোট ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি সুত্রগুলো বলছে মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক। গত দুই দিনে কাছাড়, ডিমা হাসাও, গোয়ালপাড়া, হাইলাকান্দি, কামরূপ মেট্রো এবং করিমগঞ্জ জেলায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।
প্রসাশনের পক্ষ থেকে ৭৪৪ টির ও অধিক ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। এসব ত্রাণশিবিরে দেড়লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ভারতীয় সেনা, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ দলগুলি বন্যা কবলিত এলাকা থেকে অবিরাম উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। বর্ষার প্রথম ধাক্কাতেই বিপর্যস্ত উত্তর-পূর্বের একাধিক রাজ্য। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসম। উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত দল পাঠানো হয়েছে। বন্যার জেরে একাধিক এলাকায় আটকে পড়েছেন বহু সাধারণ মানুষ।
সরকারি সূত্রের খবর অনুসারে ৪২,২৮,১৫৭ জন মানুষ বন্যার কবলে পড়ে হাহাকার করছেন। এর মধ্যে ১,৮৬,৪২৫ জন বানভাসি মানুষ রাজ্যের ৭৪৪টি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। অসংখ্য মানুষের বাড়িঘর, কৃষিখেত নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। লক্ষাধিক হেক্টর কৃষিখেতের বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। হাজার হাজার ফিসারির মাছ হয়েছে বিস্তৃত সাগরের বাসিন্দা ! প্লাবনের প্রকোপে অসংখ্য পূর্ত ও জাতীয় সড়ক প্লাবিত হয়ে গেছে।


অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং ভূমিস্খলনের ফলে বরাক উপত্যকা সড়ক ও রেলপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও রেলওয়ে ট্র্যাকের উপর দিয়ে জল বইছে, তো কোথাও রেলওয়ে ট্র্যাকের নীচের মাটি ধুয়ে সাফ হয়ে গেছে। ফলে কয়েকটি জায়গায় রেলওয়ে ট্র্যাক শূন্যে ঝুলছে। পাহাড় লাইনে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে মাসাধিক কাল থেকে। দূরপাল্লার কয়েকটি যাত্রীবাহী ট্রেনের গতিপথ ও সময়সূচি পরিবর্তন করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল। যার ফল স্বরূপ দক্ষিণ আসামের বরাক উপত্যকা তথা ত্রিপুরা ও মিজোরামে খাদ্য সামগ্রীর সংকট তৈরি হয়েছে। প্রায় সব বন্যাকবলিত জেলায় এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, ফায়ার ও ইএস কর্মী, পুলিশ বাহিনী দিনরাত উদ্ধার কার্যে নিয়োজিত রয়েছে।
স্মরণাতীত কালের ভয়াবহতম বন্যার প্রকোপে রাজ্যের গ্রাম শহর সর্বত্র হাহাকার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শোনা যেতো ছত্রিশ বাংলার ‘আফাই’, অর্থাৎ বিগত শতাব্দীর ছেষট্টি সালের বন্যা ছিল সর্বকালের ভয়ঙ্কর বন্যা। সেই ফ্লাড লেভেল এতোটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে আমাদের দেখা একানব্বইয়ের ফ্লাড লেভেল থেকেও নাকি ছিল অনেক উপরে। ছাপ্পান্ন সাতান্ন বছর আগের সেই ভয়াবহ বন্যার প্রত্যক্ষদর্শীর খুব কম সংখ্যক মানুষ আজ বেঁচে আছেন। কিন্তু আমাদের চৈতন্য হবার পর থেকে এমন বিদ্ধংসী বন্যার প্রহার আর কখনও চোখে পড়ে নি।
অবশ্য আসাম সরকার সর্বোচ্চ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। বন্যাক্রান্তদের পাশে থাকতে প্রসাশনের সকল স্তরে জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গত সোমবার মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে সকল জেলাশাসকদের বানাক্রান্তদের ঘরে ঘরে রিলিফ সামগ্রী পৌঁছে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।


গত দুই দিন থেকে বৃষ্টির পরিমাণ খানিকটা কম হওয়ায় জলস্তর এখন স্থিতাবস্থায় রয়েছে যদিও, এখনও গ্রাম-শহর যেদিকে চোখ যায়, সে দিকেই প্লাবনের শুধু পতিত পাবনী রূদ্রমূর্তি ! অসংখ্য এলাকা ডুবু ডুবু অবস্থায় নিমজ্জিত।
দক্ষিণ আসামের প্রাণকেন্দ্র শিলচর আজ দ্বীপে পরিণত হয়েছে। শিলচরে এনডিআরএফ-এর বিশেষ দল পৌঁছে গিয়েছে। ভুবনেশ্বর থেকে চারটি বিমানে উড়িয়ে আনা হয়েছে এনডিআরএফ-এর চারটি ইউনিট। এতে মোট ১০৫ জন আধিকারিক ও জওয়ান রয়েছেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন উদ্ধার অভিযানের জন্য জরুরি বোট সহ অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। শিলচর ডিএসএতে তাঁদের অস্থায়ী শিবির করা হয়েছে। এখান থেকেই গোটা অভিযান পরিচালনা করবে এনডিআরএফ। জেলাশাসক কীর্তি জল্লি জানিয়েছেন, বায়ুসেনার বিশেষ বিমানে এক লক্ষ লিটার জ্বালানি এয়ারড্রপ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে করে উপত্যকায় জ্বালানি সংকট দেখা না দেয়।
এরমধ্যে দুটি আশাপ্রদ সংবাদ। বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য একটু স্বস্তির খবর। বদরপুর গুয়াহাটির মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। ইতিমধ্যে গুয়াহাটি থেকে দক্ষিণ আসামে পেট্রোলের ট্যাঙ্কার এসে পৌঁছেছে। বদরপুর-গুয়াহাটির মধ্যে যাতায়াত শুরু হওয়ায় উপত্যকাবাসী অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছেন। মাসাধিক কাল ধরে প্রথম বন্যায় রেল যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ে আছে। হাফলং রেলস্টেশন এক বিধ্বস্তু অবস্থায় পরিণত হয়। তবে তখনও জাতীয় সড়ক চালু ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বন্যা দেখা দিতেই মেঘালয়ে ধস পড়তে শুরু করে। গত ১৫ জুন রাতে মেঘালয়ের লুমসুলুমে ৬ নং জাতীয় সড়ক ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়। গর্তে পড়ে যায় একটি ট্রাক ও একটি অ্যাল্টো গাড়ি। ফলে জাতীয় সড়ক বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর ফের ১৭ জুন মেঘালয়ের রাতাছড়ায় ধস পড়ে রাস্তার বাকি অংশে যাতায়াত বন্ধ হয়ে পড়ে। পরপর ধস পড়ার ঘটনায় দক্ষিণ আসাম সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্যে পেট্রোল, শাক-সবজি সহ নানা ধরনের খাদ্য সামগ্রীর সংকট দেখা দেয়। মঙ্গলবার বেলা বারোটা নাগাদ করিমগঞ্জে যে পেট্রোল ট্যাঙ্কার এসে পৌঁছায়, তার চালক জানিয়েছেন, গত ১৫ জুন গুয়াহাটি থেকে পেট্রোল নিয়ে রওনা দেন। কিন্তু মেঘালয়ে পরপর ধস পড়ায় রাস্তা বন্ধ হয়ে পড়ে। দুই দিকেই শতশত গাড়ি লাইন দিয়ে থাকে। রাস্তা কিছু মেরামত করা হয়েছে বলে এখন যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। মেঘালয়ের লুমসুলুম এলাকায় যেখানে দুটি গাড়ি গর্তে পড়েছে সেই জায়গাটার জন্য বিকল্প রাস্তা বানানো হয়েছে। পেট্রোল গাড়ির পেছনে আরও অনেক মালবাহী লরি বরাক উপত্যকায় পৌঁছেছে। সড়ক পথের যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়ায় আশা করা যায় খাদ্য সামগ্রী সংকট অনেক দূর হবে।


দ্বিতীয় আশাপ্রদ সংবাদ হচ্ছে গতকাল মঙ্গলবার পাহাড় লাইনের হাফলং-বদরপুর সেকশনে রেল লাইন পরিস্কার হওয়ায় নতুন করে মেরামত করা লাইনের উপর দিয়ে পরীক্ষামূলক ইঞ্জিন চালানো সফল হয়েছে।
বন্যাক্রান্তদের সাহায্য এবং সহযোগিতার জন্য যেমন সরকারি বিভাগ সমূহ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তেমনি জাত ধর্ম বর্ণের উর্ধে উঠে নানা সংস্থা সংগঠন তথা ব্যাক্তিবর্গ বন্যা পীড়িতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটাই আজকের দিনের সবচাইতে আশার বাণী। ধর্ম নয়, এই বন্যায় মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, যার যার ধর্ম নিজ নিজ অবস্থানে, জমিনে শুধু জল আর জলে ডুবন্ত প্রায় মানুষ ! মানুষ উদ্ধার করছে মানুষ। এই ভয়াবহ পীড়াদায়ক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে যেন ধর্মেরও প্রান আছে, সময় এলে ধর্মও পালায় প্রাণ বাঁচাতে। মানুষ যখন দুর্গতিতে হাবুডুবু খায়, দুর্গত মানুষগুলোর ধর্মের উপরে- মানুষের পরিচয় পায়। মানুষ পরিচিত হচ্ছে ত্রাণ নিয়ে আসা মনুষ্যত্বের সাথে, ধর্মীয় ভেদাভেদ এখন জলে ভাসছে, তার কোন দাম নেই, বাজারদরও এখন শূন্যতে নেমেছে। মানবতাহীন ধর্মগুলো ছিল এতদিন, মানবতা ফিরে পেলো মানুষের আর্তনাদে আকুতিতে।”মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”… !

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post