• December 8, 2022

আমাদের পরিবেশ, আমাদের ভাবনা

 আমাদের পরিবেশ, আমাদের ভাবনা

আ,ফ,ম, ইকবাল

পোশাকী ভাষায় কোনাে একটি স্থানে নগর সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে বা জনসংখ্যাগত দিক থেকে শহরের আয়তন বৃদ্ধিজনিত প্রক্রিয়াকে নগরায়ণ বা Urbanisation বলা হয়। গ্রাম বসতি কিংবা অনুন্নত শহর থেকে মানুষ যখন জীবিকার সন্ধানে বা বিলাসিতার কারণে, শিক্ষা কিংবা আর্থসামাজিক কারণে কোনাে বড় শহরে গিয়ে বসবাস করে, সেখানকার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষ যখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত হয়, তখন তাকে নগরায়ণ বলা হয়।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের চারপাশ থেকে গাছপালা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীবজন্তুর জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে
বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রিন হাউস ইফেক্ট, ওজোন স্তরের ক্ষয়, মেরু অঞ্চলের বরফ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মরুকরণ, খরা ও বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস সহ বিভিন্ন কারণে আজ আমরা মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশ। সাম্প্রতিককালে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, প্রতি বছর সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যার প্রকোপ- এসব আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণামের কথা। এজন্য এসব বিষয় নিয়ে খুব দ্রুত ভাবার আবশ্যকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা যাক।
বৈশ্বিক অনাকাঙ্ক্ষিত উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বরফ দ্রুত গলছে। যার পরিণামে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। এই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ গ্রিন হাউস ইফেক্ট, যা ওজোন স্তরের ক্ষতি করছে। আর এসব কিছুর পেছনে মূলত দায়ী আমরা মানবজাতি। আমরা নিজেরাই নিজেদের কি পরিমাণ ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছি, তা আমরা নিজেরাই বলতে পারি না। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই চাই আমাদের, কিন্তু সেই প্রযুক্তি হতে হবে সর্বদা পরিবেশবান্ধব।
আমরা উন্নয়নের নামে জন্য গাছপালা কেটে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছি। কিন্তু একটি গাছের পরিবর্তে আরেকটি নতুন গাছ লাগানোর নেই কোনো উদ্যোগ। এই একতরফা ধ্বংসাত্মক মনোবৃত্তির জন্য আমরা প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধ্বংস করছি, তা কি আমরা জানি? গাছই আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং প্রকৃতির কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিক অবস্থায় রাখে। এখন আমরা প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করছি, কিন্তু অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষেত্র ধ্বংস করে চলেছি। ভেবে দেখেছি, এর পরিণাম কি হতে পারে?
এই যে নগরায়ণ এবং শহরায়ণের নামে আমরা বনাঞ্চল কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছি, ফলে বিচিত্র ধরনের পশুপাখির অভয়ারণ্য ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। যার পরিণাম ভেবে দেখার অবকাশ নেই আমাদের। মানুষের এই দূরাচরণের জন্য জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। প্রতিনিয়তই বিলুপ্ত হচ্ছে কোনো না কোনো প্রাণী-প্রজাতি।
দেশের যত্রতত্র নদীনালা, খালবিল দখল ও বনভূমি উজাড় করে, পাহাড় কেটে নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার ফলে পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধসের দুঃসহ পরিণতি আজ দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, যা সত্যিকার হৃদয় বিদারক ! বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ২০৫০ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হতে পারে প্রাউ ৯৬০ কোটি। তখন মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য তিনটি পৃথিবীর সমান সম্পদ এবং আবাস স্থলের দরকার হবে। জনসংখ্যার চাপ আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
পার্থিব জগতের প্রতিটি বস্তু মানবজাতির কল্যাণের জন্য সৃজন করা হয়েছে। বিশ্বস্রষ্টা পৃথিবীকে সাজিয়েছেন হরেকরকম অত্যাবশ্যকীয় সৃষ্টি দিয়ে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বৃক্ষ। গাছগাছালি জীবজন্তুকে পরিশোধিত বায়ু দ্বারা জীবনধারণে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। গাছপালা পরিবেশ রক্ষা, ওষুধপত্র তৈরি, গৃহ নির্মাণ, আসবাবপত্র ও জ্বালানি ব্যবহার- ইত্যাদি ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক।
কিন্তু নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশ ও জীবজন্তুর জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। মরুকরণ, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রকোপ ভয়াবহতা, সবকিছুর পেছনে ওই একই কারণ- সবুজ বনানী ধ্বংস। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা- কোনো দেশের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। পরিবেশ সুরক্ষার সেই আবশ্যক অনুপাত বহাল রাখা তো দূরের কথা, উল্টো নির্বিচারে গাছ কাটা, যত্রতত্র বৃক্ষকে অবহেলাভরে পদদলিত করা, বিকল্প থাকা সত্ত্বেও সুশোভিত বনভূমি উজাড় করে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের উন্নসিকতা প্রতিনিয়ত আমাদের আদতে পরিণত হয়ে গেছে যত্রতত্র, সর্বত্র। এমনি করে কত সুন্দর চিরসবুজ বৃক্ষময় এলাকা বৃক্ষশূন্য রূপ নিচ্ছে,তা চোখ কান খোলা সকলেরই দৃষ্টির সম্মুখে ভাসমান !
সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ নগরায়ণের কবলে পড়ায় বর্তমানে আমরা এমন একটি যুগে বসবাস করছি যেখানে নগরায়ণের হাত ধরে বহু সমস্যাও তৈরি হচ্ছে, যা আমাদের সমাজকে জর্জরিত করে তুলছে। নতুন নতুন এমন অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, যেগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে আমরা সমস্যাই মনে করছি না।
আলোচনার প্রাসঙ্গিকতায় আসুন এবার এমনতর কিছু সমস্যার চর্চা করে দেখি।
দ্রুত নগরায়ণের ফলে নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফাঁক পরিবৃদ্ধি হচ্ছে দিনকে দিন। ফলে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সামাজিক ও আর্থিক ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নগরের পরিসীমা বৃদ্ধি মানেই পরিবহন সমস্যার সংকট বৃদ্ধি। নগর মহানগরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য পরিবহণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। পরিবহন ব্যবস্থার নামে যেভাবে যানবাহন বাড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বালানি জনিত ধোঁয়া। এই ধোঁয়ার নঞর্থক প্রভাব পড়ছে একেবারে ওজোন স্তর পর্যন্ত।
নগরায়নের বিস্তারের ফলে দুই স্তরের সমাজ তৈরি হচ্ছে। এক শ্রেণী বহুমুখী প্রগতির সুযোগ গ্রহণ করে ক্রমশ তাদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে বহুগুণ। অপরদিকে আনুপাতিক হারে বাড়ছে বেকারত্ব। নগরায়ণের ফলে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশসমূহে বেকারত্ব এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ধনিক শ্রেণী যেমন ক্রমশ তাদের ধনসম্পদ বৃদ্ধি করেই চলেছে, দরিদ্র মানুষগুলো হচ্ছে দরিদ্রতর।
শহরাঞ্চলে অত্যধিক শিল্পের বিকাশ হচ্ছে সত্যি, কিন্তু সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো না থাকায় ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে পরিবেশ দূষণ। একদিকে কলকারখানার ধোঁয়া বাতাস করছে বিষাক্ত, অপরদিকে এসব কারখানার দুষিত বর্জ্য পদার্থ সমুহ পার্শ্ববর্তী নদী নালার জলে পড়ে জলাধার গুলোকে বিষিয়ে তুলেছে ক্রমান্বয়ে। যার দুষ্প্রভাব জলজীবি স্থলজীবি উভয় শ্রেণীর প্রাণীকুলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবছর আমরা ঘটা করে পালন করে থাকি বিশ্ব পরিবেশ দিবস, নদী দিবস, পানীয় জল দিবস- ইত্যাদি কত রকমের দিবস। কিন্তু একদিনের এসব দিবস পালন না আমাদের জীবনে না আমাদের পরিবেশের উপর বিস্তার করতে পারছে কোনো প্রভাব। কেননা দিবস পালনের পরদিনই আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের বিনাশকারী সকল উদ্দামতার, আত্মধ্বংশের পথে।
আজ যখন দেশের নানা প্রান্তে বন্যা ভূমিধসের ফলে লাখো মানুষ হাহাকার করছে। আকণ্ঠ জলে নিমজ্জিত হয়ে নিরাশ্রয় লাখো মানুষ। এক বোতল পানীয় জলের জন্য ছোট বড় সবাই হাঁসফাঁস করছে। পথঘাট বিনষ্ট হয়ে ক্লান্ত অভুক্ত দূর্গম গিরি কন্দরে আটকা পড়ে আছে অগনণ মানুষ, তখন আমাদের খুব মনে হয় যে প্রকৃতি আমাদের উপর বিরাগভাজন হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে শিক্ষা গ্রহণের আবশ্যকতা ছিল এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে, তার প্রতি রয়ে যাই উদাস, নিরুদ্বেগ। প্রকৃতির এই তাণ্ডব হয়তো শীঘ্রই বিদূরিত হবে, কিন্তু এর থেকে সবক নিয়ে নিজেদের সংশোধনের পথে যদি আমরা যদি চলতে না শিখি, তাহলে প্রস্তুত থাকতে হবে- গণিতের ভাষায়, পুনঃপৌনিক প্রাকৃতিক ত্রাসের মুখোমুখি হবার জন্য।
তাই আসুন, আজকের এই সংকটকালে আমরা গ্রহণ করি কিছু প্রতিজ্ঞাঃ
এক: অত্যাবশ্যক ক্ষেত্র ব্যতিরেকে আমরা আর বৃক্ষনিধন করবো না। নিয়মিত করে রোপণ এবং পর্যবেক্ষণ করবো ফলদার ছায়াদার গাছপালা।
দুই: যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক ইত্যাদি ফেলে পরিবেশকে বিষাক্ত ও পুঁতি দুর্গন্ধময় করবো না। নিজেদের বর্জ্য সমুহ বিজ্ঞান ভিত্তিক পরিকাঠামোর মধ্যে নিজেরাই নিঃশেষিত করে ফেলবো।
তিন: ধূমপান করে নিজেদের ক্ষতি করবো না। সঙ্গে অন্যের জীবনের বিপর্যয়ের কারণ ও হয়ে উঠবো না।
চার: পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে নিজে যত্নশীল হবো, অন্যকেও উৎসাহী করে তুলবো।
পাঁচ: প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করবো।
ছয়: জল ও বনভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় নিজে সম্পৃক্ত হবো। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করতে উদ্দোগী হবো।
সাত: নদী, বন ও জলাশয়কে বিশেষভাবে, মাতৃসম গুরুত্ব দিতে সতত সযত্ন থাকবো।
আট: যেকোনো নির্মাণ পরিকল্পনা কার্যকর করার আগে অবশ্যই জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করবো।
মোটকথা, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণের আগে আমরা সতর্কতা অবলম্বন করে চলবো যাতে এই পরিকল্পনার কোনো প্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমাদের পরিবেশের উপর না পড়ে।

আ,ফ,ম, ইকবাল : আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার বাসিন্দা।শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post