• December 4, 2021

চিকিৎসকের গণপিটুনি এবং তৎপরবর্তী নাগরিক সমাজ

 চিকিৎসকের গণপিটুনি এবং তৎপরবর্তী নাগরিক সমাজ

অসমের হোজাইতে ডাক্তার সেউজ কুমার সেনাপতির উপর সংগঠিত হওয়া আক্রমণ  অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং অমানবিক। করোনাকালীন এই আবহে যখন ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের সাধ্যের অতীত কাজ করে যাচ্ছেন তখন এইধরনের আক্রমণ যথেষ্ট ভয় প্রদর্শনকারীও। এধরনের ভয়ের পরিবেশে কোনো ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীরই সুস্থ স্বাভাবিকভাবে কাজ করা সম্ভবপর হয়ে উঠবে না। এবং তাতে চিকিৎসা ব্যবস্থা যেটুকু এখনোবা আছে সেটাও ব্যহত হবে। তাই এধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে সেদিকে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামো উন্নতির সাথে সাথে হাসপাতালের সুরক্ষা ব্যবস্থার দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। 

এবারে হোজাইয়ের ঘটনার আরেকটা রিগ্রেসিভ দিক হলো ২রা জুন (বুধবার) দুপুরে যখন মাননীয় মূখ্যমন্ত্রী ডাক্তার পিটানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম তাঁর ফেসবুক দেওয়ালে প্রকাশ করেছেন, তারপর থেকেই অদ্ভুতভাবে একাংশ নাগরিক অভিযুক্তদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে গোটা বিষয়টাকে একটা সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্ঠা করে যাচ্ছেন। ডাক্তারদের উপর আক্রমণের মতো এটাও এই কোবিডকালীন অতিমারিকালে একটা ভয়ানক দিক। দুটো বিষয়ই তাই যথেষ্ঠ আলোচনার দাবী রাখে। 

প্রথমত, ডাক্তার পিটানোর মতো অমানবিক ঘটনার সাথে যারা সাম্প্রদায়িক বিষ উগরে বিষয়টাকে হিন্দু ডাক্তার বনাম মুসলমান রোগীর রূপ দিতে চাইছে, তারা ভুলে যাচ্ছেন এই গত বছরের করোনাকালীন সময়ে করিমগঞ্জ শহরের ডাক্তার আহমেদ আব্বাসের (Ahmed Abbas) উপর একই রকম আক্রমণ করেন এক রোগীর সঙ্গী ও তাঁর আত্মীয় পরিজনরা। ডাক্তার আহমেদ আব্বাসের অপরাধ এটুকুই ছিলো তাঁর প্রবীণ চিকিৎসক পিতা মোস্তাফা আহমেদের কাছে ওই রোগীকে দেখাতে নিয়ে এলে তিনি রোগীর সাথে থাকা ব্যক্তিকে মাস্ক পরে আসতে বলেছিলেন। সে ঘটনার এফআইআর দায়ের টায়ের সবই হয়। ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি এখনো হয়নি। বিচার প্রক্রিয়া চলছে। তখন কিন্তু বিষয়টা হিন্দু – মুসলমান বা ডাক্তারের জাত-রোগীর ধর্ম — এভাবে চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং সমস্ত নাগরিক সমাজ রুখে দাঁড়িয়েছিলো ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর এহেন অমানবিক আচরনে। তাহলে আজ কেন বিষয়টা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে ভাগ হয়ে যাচ্ছে? সেটা কি ডাক্তার সেনাপতি  এবং   অপরাধী রোগীদের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা বলে? 

হোজাইয়ের ডাক্তার পেটানোর বিষয়টা হিন্দু ডাক্তার বনাম মুসলমান রোগীর বিষয় নয়। বরং বিষয়টা সব (হিন্দু + মুসলমান + খ্রীষ্টান + বৌদ্ধ) ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল বনাম রোগী বা রোগীর পরিবারের। এবারে এখানে আরেকটা বিষয়ও আসে। গত কয়েকবছর ধরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বারে বারে কেন রোগী বা রোগীর পরিবার এহেন ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মীদের তথা হাসপাতালের    উপর আক্রমণে নেমে আসছেন? রোগীরা কী বুঝছেন না ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের প্রাণ বাঁচাতে ঈশ্বর বা আল্লাহ্’র থেকেও বেশী কাজ করে চলেছেন? তাদের জীবন বাঁচাতে ওষুধ দিচ্ছেন? মৃত্যু থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে গিয়ে নিজেরা কোবিড আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন?? 

উত্তরটা হলো, না। তারা ভাবতে চাইলেও ভাবতে পারছেন না। এবং আমাদের সাধারন নাগরিক সমাজের মূর্খতাও এটা। আমরা একজায়গার রাগ আরেক জায়গায় মেটাতে পছন্দ করি। সর্ষের তেলের লিটার ২০০ টাকা হলে আমরা চুপচাপ ধারে হলেও কিনে নিয়ে আসি, কিন্তু রিক্সাওয়ালা পাঁচটাকা বেশী ভাড়া চাইলে আমরা সেটা সহ্য করতে পারি না। মেরে ধরে নিজেদের সমস্ত বীরত্ব এবং নাগরিক প্রতিবাদ জারি রাখি। দুঃখজনক হলেও ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর আক্রমণের বিষয়টিও তাই। চিকিৎসা ব্যবস্থার অব্যবস্থার কারন একশ্রেণীর নাগরিকেরা ভাবছেন ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরা। হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের অভাব হোক, বা বেড সহ অন্যান্য চিকিৎসার পরিকাঠামোর অভাব, একাংশ নাগরিক ভাবছেন তার জন্যে দায়ী ডাক্তারেরা বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগী ঠিক সময়ে ওষুধ বা পরিচর্যা না পেলেও তারা ভাবছেন ডাক্তার নার্সরা ইচ্ছে করে এরকম করছে। ভ্যাক্সিন না পেলেও তাই। এবং এরই রোষ মেটাচ্ছেন ডাক্তার নার্সদের গণপিটুনি দিয়ে। 

এই বিষয়েই আরেকটা ঘটনা মনে পড়লো। কদিন আগে ফেসবুকেই সেটার লাইভ ভিডিও দেখেছিলাম। করিমগঞ্জ সিভিল হাসপাতালের কোবিড ওয়ার্ডের বেডে এক ভাইয়ের মৃত লাশ শোয়ানো। এবং তারই ছোটোভাই এবং বোন আকুলভাবে কেঁদে বয়ান করছেন কিভাবে হাসপাতালের চিকিৎসার গাফিলতিতে তাদের বড়ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছ। ডাক্তার নার্সদের বারবার ডাকা হলেও তারা আসেননি। সম্ভবত সেদিন না তারপরদিন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মূখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছিলেন। তারা হাতজোড় করে হিমন্তবিশ্ব শর্মা’র কাছে অনুরোধ করছিলেন আর কোনো ভাই যাতে তার দাদাকে এভাবে না হারায় তার ব্যবস্থা সুনিদির্ষ্ট করতে। ঘটনাচক্রে সেই রোগী এবং তার পরিবার ধর্মে হিন্দু। তাই হয়তোবা সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক রঙ লাগেনি। 

এভাবে আরো বহু ভিডিও বা নিউজ আছে যেখানে দেখা যাচ্ছে হাসপাতালগুলোর কোবিড ওয়ার্ডে চিকিৎসার কিছু না কিছু গাফিলতি থেকে যাচ্ছে। কিন্তু এবারে সাধারন নাগরিকদের বুঝতে হবে সেগুলোর দায় শুধুমাত্র ডাক্তার, নার্স বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে নেই। সেটার দায় সর্বতোভাবে রাজ্যসরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রক এবং স্বাস্থ্যবিভাগের। জেলায় জেলায় পর্যাপ্ত হাসপাতালের ব্যবস্থা করা, হাসপাতালে বেড বৃদ্ধি, অক্সিজেন সিলিন্ডারের যোগান, স্বাস্থ্যকর্মী ডাক্তার নার্সদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা কিটের যোগান, ভ্যাক্সিনের পর্যাপ্ততা বৃদ্ধি, প্রয়োজনে আরো স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়োগ, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কমদামে ওষুধের যোগান দেওয়া, কোবিড রোগীর ওয়ার্ডের সমস্ত দায়িত্ব শুধুমাত্র কজন ডাক্তার নার্সের উপর না ফেলে দুই বা তিনশিফ্টের ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা  – এইসমস্ত কিছু করা সরকার এবং তার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দায়িত্ব। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরাও আমাদের ই মতো অসহায়। ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের থেকেও বেশী অসহায়। গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থার গাফিলতিতে সব থেকে বেশী খারাপ অবস্থায় তাঁরাই রয়েছেন। সেই গাফিলতির মাঝেই ডাক্তারের ধর্ম পালন করতে গিয়ে তাঁরাও সংক্রমিত হচ্ছেন। ব্যপকহারে  মৃত্যু হচ্ছে তাঁদেরও। তাই ক্ষোভটা চিকিৎসাকর্মীদের উপর না উগরে যেখানে উগরালে সবার সুস্থ স্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যোগান হয়, গোটা স্বাস্থ্য পরিষেবা মরমর অবস্থা থেকে বেঁচে উঠতে পারে, সেখানে দেখানো উচিত সাধারন নাগরিকদের। এবং তা প্রয়োজনও।  

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়ের দায়ও শুধু তাই অপরাধীদের নাম প্রকাশেই শেষ হয়ে যাবে না। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং হাসপাতালগুলোর খামতিগুলোও শোধরাতে হবে। হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামো সহ যেসব স্থানে হাসপাতাল বেশী নেই সেখানে অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরী করে আরো স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে হবে। ওষুধ থেকে শুরু করে অক্সিজেন সিলিন্ডারে যোগান পর্যাপ্ত রাখতে হবে। ভ্যাক্সিনের পর্যাপ্ত যোগান সহ ডাক্তার নার্সদের সুরক্ষা কিটের যোগান, কজন ডাক্তার নার্সের উপর সমস্ত চাপ না ফেলে হাসপাতালের কোবিড ওয়ার্ডগুলোতে শিফ্ট হিসেবে রোগীর সংখ্যার অনুপাতে ডাক্তার, নার্স নিয়োগ করার কথাও ভেবে দেখা প্রয়োজন। এইমূহূর্তে সব থেকে বেশী টাকাও চিকিৎসা ব্যবস্থা সংস্কার করতে নিয়োগ করা প্রয়োজন। জনগণের মধ্যে সচেতনা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার থেকে সমস্ত মিডিয়াগুলোকে আরো বেশী করে ব্যবহার করা প্রয়োজন। 

কোনো সভ্য সমাজ, দেশে এভাবে চিকিৎসকদের গণপিটুনি দেওয়া হয় না। এবং তারপর সেই নিতান্ত অমানবিক ঘৃণ্য কাজের সাম্প্রদায়িক রঙ খুঁজে বাদবাকি সম্প্রদায়গুলোকে গণশত্রু হিসেবে দেগে দেওয়াও হয় না। কোবিড কালীন পরিস্থিতিতে আমরা কেউ জানি না কবে, কখন, কোথায় কে মারা যাবো। কবর, চিতার দিকে আমরা সকলেই এক পা বাড়িয়ে আছি। মরার আগে শেষবারের মতো একবারের জন্যে হলেও যেন নিজেদের মুর্খতা আর পৈচাশিকতা বুঝার ক্ষমতা হয় আমাদের। আসল শত্রু সিস্টেম নাকি নিজেদের সহনাগরিকেরা সেটা চিহ্নিত করার মানসিক এবং বৌদ্ধিক শক্তিও যেন আমাদের হয়। এটুকুই বলার। 

  •  
  •  
  •  
  •  

Related post