• December 4, 2021

করোনাকালে মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

 করোনাকালে মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

মিতালী ভট্টাচার্য :- শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই মানুষের মনেরও স্বাস্থ্য থাকে। বিভিন্ন কারণে যে ভাবে শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে, সেভাবেই বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে মানসিক স্বাস্থ্যের  ক্ষতিও হতে পারে। শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষার মতো মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থাও আছে। যে ভাবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে আমাদের শরীর সেরে ওঠে, একইভাবে ওষুধপত্র ও কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মনও ভালো হয়ে ওঠে।

মূলতঃ  মানুষের মানসিক ক্রিয়াকলাপকে আমরা  তিনটি ভাগে বিভক্ত করি। ⑴ চিন্তা (Cognation.) ⑵ বোধ (Affection ) ⑶ কর্মপ্রেরণা  (Conation)। এই তিনটি ভাগের সংগতিপূর্ণ বিকাশের দ্বারাই ব্যক্তির সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য গঠন করা সম্ভব হয়। একজন ব্যক্তি প্রতিদিনের কাজে যথার্থ অনুভূতি সৃষ্টিতে সক্ষম হলেই সেই কাজে কোনও জটিলতার সৃষ্টি হয় না এবং ব্যক্তি কর্মসম্পাদনে তৎপর হয়ে উঠে। কর্মের ফলাফল যাই হোক না কেন সহনশীলতা আর আঘাত সহ্য করতে পারার মানসিক অবস্থাই মানসিক দুরাবস্থা থেকে আমাদের রক্ষা করে আমাদের আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে পারবে।

মনঃ সমীক্ষক সকলের মতে ব্যক্তির অপসংগতির মূল কারক হল বিরোধ বা দুর্বিসহ অন্তঃদ্বন্দ্ব। আত্মবিকাশ, আত্মপ্রতিষ্ঠা, কৃতিত্বের গৌরব, ভালোবাসা, নিরাপত্তার চাহিদা আরও অনেক কিছুই আমাদের মনজগতে ক্রিয়া করতে থাকে। নিজের বিফলতার জন্য অন্য কোনও কারণকে দায়ি না করে, বিপরীতমুখী মনোভাবকে প্রশ্রয় না দিয়ে যোগাত্মক মানসিক প্রস্তুতির সাহায্যে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান করোনার সংকটকালে আমাদের মানসিক জগত ভয়, সংশয়, অনিশ্চয়তা, সংঘাত, উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।আমাদের কোনও আচরণই মনে পরিতৃপ্তি তৈরি করতে পারছে না। প্রত্যেকের মন এক অপরাধবোধ, এক উৎকণ্ঠার দ্বারা আবৃত্ত । প্রকৃতি অনুসারে মানুষের এই ধরনের অস্বাভাবিক আচরণগুলোকে শৃংখলাবদ্ধ ভাবে সাজিয়েছিলেন জার্মান মনোবিজ্ঞানী এমিল ক্রেপেলিন (Emil Kraepelin)। তিনি মানসিক অসুস্থতাকে জৈবিক গুনগত, পারিবারিক ইতিহাসগত আর জীবনের উপলব্ধিগত হিসেবে ভাগ করেছিলেন। বর্তমান সময়ে উপলব্ধি জনিত বা পরিস্থিতি জনিত মানসিক হীনবুদ্ধিতাতে আমরা এতটাই উৎকণ্ঠিত হয়ে পরেছি যে  আমাদের শুদ্ধ -অশুদ্ধের আর বোধ থাকছে না । পরিস্থিতির জন্য দুঃচিন্তা, উদ্বেগ সহ নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়ে অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা, যেমন- ঘুম না আসা, অল্প কথাতেই রেগে যাওয়া, খিটখিটে হয়ে যাওয়া এসবের মুখোমুখি হচ্ছি । তবে সেগুলোর কারণ না বুঝেই নিজেদের মধ্যেই লুকিয়ে রাখছি। তার ফলে সমস্যা আরও বেড়ে চলেছে। জীবনের সমস্যাগুলোকে নিয়েই নিজেদের মতো করে পথ প্রস্তুত করে চলছি আমরা । কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতি পালটে যাওয়ার কারণে আমরা হকচকিয়ে গেছি। কী করা উচিত বা কী অনুচিত আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। ২০১৭ সালে Public Health Foundation একটি সমীক্ষা করে বলেছে যে বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি লোক নানা ধরনের মানসিক সমস্যার মধ্যে জীবন কাটায়। তার মধ্যে আছে উদ্বেগ, আতঙ্ক, অবসাদ, মন খারাপ সহ একাধিক বিষয় রয়েছে । কিন্তু ২০২০ সাল থেকে এই অবসাদ আর উদ্বেগ খুব দ্রুত মানুষের মনকে প্রভাবিত করা শুরু করেছে । এই মানসিক অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে বিশিষ্ট মনোচিকিৎসক তথা অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা আমাদেরর অনেক ধরনের পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। তাদের মধ্যে মূল ৬টি পরামর্শ হল :

১) মিডিয়া থেকে দুরে থাকা বা টিভি-মোবাইলে করোনা সংক্রান্ত খবর না শোনা, এতে আমাদের দুঃচিন্তা কিছুটা হলেও  কমবে।
২) করোনা সম্পর্কিত কোনো সংবাদ কানে এলে তার সত্যতা যাচাই করে তবে বিশ্বাস করা।
৩) প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দের সময় কাটানো।
৪) নিজেদের শরীরকে সুস্থ রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম, প্রাণায়াম করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমোনো।
৫) নিজের পছন্দের কাজ যেমন বাগান করা, রান্না করা, ঘর গোছানো, বই পড়া, নাচ গান বা নিজের যা কিছু ভালো লাগে তাই করা।
৬) সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো সবার প্রতি সদয় হওয়া। এই দুর্দিনে পাড়া- প্রতিবেশীর খবর নেওয়া, লকডাউনে থাকাকালীন অবস্থায় কোনও একা থাকা প্রবীণ ব্যক্তির ঔষুধ পত্র, খাদ্য সামগ্রীর প্রয়োজন হলে, দরিদ্র কোন পরিবারের কিছু সাহায্যের দরকার হলে তা সাধ্যমতো দেওয়া ইত্যাদি।
এই ধরনের কাজগুলো করলে আমরা মানসিকভাবে পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারব।

আমাদের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত। সুন্দর এক ভবিষ্যৎ। রোগমুক্ত, দুশ্চিন্তামুক্ত এই ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য আমাদের নিজেদেরই নিজেদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। জীবনে যখনই কোনও খারাপ সময় আসবে ভালো সময়টুকুর কথা মনে  করে আনন্দ পেতে শিখতে হবে। আমাদের ভাবতে শিখতে হবে যে, সেই দিন যে সফলতা পেয়েছিলাম যে সুন্দর দিনগুলো কাটিয়েছিলাম,  সেটা আমিই ছিলাম।  নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, স্বামী বিবেকানন্দের কথা মনে করতে হবে। তিনি বলেছিলেন -“Take risk in your life, if you win, you can lead, if you loose you can guide”. জীবনে পাওয়া ছোট ছোট আনন্দ, সুখ,  যেমন -জন্মদিনে মায়ের হাতে বানানো পছন্দের খাবার, বাবার দেওয়া প্রথম সাইকেল, সরস্বতী পূজোয় মার শাড়ী পরা, চুরি করে আচার খাওয়া, একটু বড় হলে জীবনে প্রথম মিথ্যে কথা বলে বন্ধুদের সাথে  সিনেমা দেখা ইত্যাদি। আমরা যতোই বড় হই না কেন আমাদের ছোটবেলার নিষ্পাপ মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

যদি কোনও কারণে না চাইতেও বিপদ আসে তাহলে রাগ না করে, তার কারণ জানার চেষ্টা না করে, সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করাটা আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন, “one without anger is the one who is happiest. ” অর্থাৎ রাগ ছাড়া একজন ব্যক্তি সবসময়ই আনন্দিত থাকতে পারে।
কোনওভাবে আমরা অধৈর্য্য হয়ে পড়লেই বিরক্তি, উপেক্ষা, চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা, উত্তেজনা এসব কাজ করে । এগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের সুদৃঢ় মনোভাব তৈরি করে ঠান্ডা মাথায় বিপদের সমাধান করতে হবে । যদি কোনও সমস্যার সমাধানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে নিজের সঙ্গে কথা বলা উচিত, ভালোমতো বোঝাপড়া করা উচিত। কারণ নিজের থেকে বড় বন্ধু কেউ হয় না।

আমাদের আবেগ, যেমন- রাগ, হতাশা, চিন্তা, ক্ষোভ, বিরক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে দেয়।  করোনাকালে এই দিকগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে আমাদের তিনটি কৌশল অবলম্বন করা উচিত। এই কৌশল গুলোকে ABC কৌশল বলে অভিহিত করা হয়ⒶAwarness বা সজাগতা Ⓑ Balance বা সমতা,
⒞ Control বা নিয়ন্ত্রণ।

করোনাকালে বিভিন্ন সমস্যা থেকে তৈরি হওয়া ক্ষতিকারক আবেগগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার মূল মন্ত্রই হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখা। আমারা এই পদ্ধতিটেকে HERO নাম দিয়ে বুঝতে পারবো। Ⓗ Hopeবা আশা এক শক্তি যেটার দ্বারা সহজেই লক্ষ্যে উপনীত হতে পারা যায়, Ⓔ Efficacy বা কার্যকারিতা। লক্ষ্যগুলোকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজে পরিণত করার উপরে বিশ্বাস রাখা।
Ⓡ Resilience বা স্থিতিস্থাপকতা। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সাহসী হয়ে মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত হওয়া। Ⓞ Optimism বা আশাবাদী হওয়া। যে কোনও পরিস্থিতিতে আশা না হারানো ।

সৃষ্টিশীল চিন্তা, ভালো কাজ, সুন্দর লক্ষ্য, সঠিক পদ্ধতি, সাহসী হয়ে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়ানো, তার সাথে মানবিকতা, নৈতিক দৃঢ়তা, অনুশাসন, সামাজিক দায়বদ্ধতার দ্বারা আমরা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারি। নিজে ভালো ও সুস্থ থাকলে তবেই তো বাড়ীর লোকদের ভালো রাখতে পারব। এই কঠিন সময়ে শারীরিকভাবে সুস্থতা বজায় রাখার জন্য, যেমন -ভালো খাবার, ব্যায়াম, প্রাণায়াম আমাদের করা উচিত ঠিক  সেভাবেই মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য ভালো চিন্তা করা ও পজিটিভ থাকা প্রয়োজন। সরকারী নীতি নির্দেশনা মেনে অহেতুক চিন্তিত না হয়ে যতদুর পারা যায় স্বাভাবিক ছন্দে নিজের এবং নিজের পরিবারকে নিয়ে সমাজের গতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করাই বর্তমানে আমাদের দায়িত্ব আর এটাই এই সময়ের দাবী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post