• December 4, 2021

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল

 ইন্দুবালা ভাতের হোটেল

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল

সুমনা রহমান :

“জ্যাঠামশাই, আমরা হিন্দুস্থান চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা।” — নিরুদ্দিষ্ট মণীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে সোনার অর্জুন গাছের গায়ে লিখে যাওয়া এই ঠিকানাখানা দেশভাগ সম্পর্কিত আমার যাবতীয় ধ্যানধারনা পাল্টে দিয়েছিলো এক লহমায়। গতবছরের মাঝামাঝি দিকে। তারআগে কখনো দেশভাগ, ছিন্নমূল এই শব্দগুলো উচ্চারিত হলে বুকের ভেতরে এমনতর ব্যাথার মোচড় টের পেতাম না। বিষয়টা উপমহাদেশের রাজনৈতিক তর্ক আলোচনা সমীক্ষা তথ্য যুক্তি এইসব কঠিন কঠিন বিচার বিশ্লেষনের মধ্যেই আটকে থাকতো। ছোটোবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠা যে পরিবেশে, খেলার মাঠ, বাড়ির উঠোন, পুকুর ঘাট, গৃহস্থালি – একলহমায় সেই সবকিছু ছেড়ে অন্য কোথাও জন্মান্তরের মতো পাড়ি দিতে হলে বুকের কোথায় রক্তক্ষরণ হয় সেটা হৃদয় দিয়ে অনুভব ই করতে পারতাম না এজীবনে যদি না সোনা, পাগলজ্যাঠা, ঈশম, ফতিমা, মালতীদের সাথে পরিচয় হতো। আর সে অনুভব এমনই যা একবার শুরু হলে তা শুধু মানুষকে তাড়িয়েই মারে।

সোনা, ঈশম, মণীন্দ্রনাথ, পলিন, ফতিমা, বিনু, ঝিনুক এদের জন্যে মনকেমনের মাঝেই যোগ হয়ে গেলেন ইন্দুবালা। তাঁর ছেনু মিত্তির লেনের হেঁশেল, কলাপোতা গ্রাম, কপোতাক্ষ নদী, বাড়ির উঠোন, বিউলির ডাল, কুমড়োর ছক্কা, নক্সী কাঁথার মাঠ, মণিরুল, অলক — সবকিছু নিয়ে।। কিছু কিছু বই হয় না, যা শুধু গল্প বলে না, পাঠককেও সেই গল্পের সাথে সারাজীবনের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেয়, ইন্দুবালা ভাতের হোটেল তেমনই এক বই। জলপাইয়ের চাটনি, আমতেলের গন্ধ, কচুবাটা সহ রান্নার প্রতিটি পদের সাথে মেশানো অনেক অনেক স্মৃতি। নিশির ডাকের মতো যা অবিরত বেজেই চলে সত্তর পেরোনো ইন্দুবালার বুকে, অথচ সেখানে যাওয়ার কোনো পথ আর তার নেই।

মাতাল দোজবরে বরের সাথে বিয়ে হয়ে কলকাতার ছেনুমিত্তির লেনে আসা ইন্দুবালার। তারপর জীবনের নানা চড়াই উৎরাইয়ের সাথে লড়তে লড়তে দাঁড় করান তাঁর ভাতের হোটেল। ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। কালো বোর্ডে খড়ির টানে যেখানে রোজ হাজির হয় একটুকরো কলাপোতা গ্রাম। ধনঞ্জয় আর লছমীর সহায়তায় দুপুরে খদ্দেরদের নাকে ভেসে আসে সেই কবেকার হারিয়ে যাওয়া সব খাবারের গন্ধ। কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া, কচুবাটা, চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল। আর তারসাথে ইন্দুবালা বুনে চলেন তাঁর স্মৃতির নক্সী কাঁথা। ঠাম্মার হাতের চন্দ্রপুলি, বিশালক্ষ্মী তলা, টিফিন কৌটাতে পড়ে থাকা আমলকি, তাল পাটালি, আর আরেকজন– মণিরুল..। যাকে কখনো ভালোবাসার কথা জানাতে পারেননি ইন্দুবালা। গোটা জীবন রুমালে তোলা নকশা, নক্সী কাঁথার মাঠ, আলমারিতে তুলে রাখা বাঁশী আর স্বাধীন বাংলা রেডিও স্টেশনে বেজে চলা বাঁশির সুরে খুঁজে গেছেন শুধু। আর মণিরুল! ভালোবাসাকে সঙ্গোপনে বয়ে বেড়িয়েছে সেও, গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার আগ মূহূর্ত অব্দি। বিয়েও করেনি। রূপাইরা তো চিরজীবন সাজুদের অপেক্ষায় ই কাটিয়ে দেয়! কিংবা কবরে মাথা রেখে মরে! ভালোবাসার দিব্যি নিয়ে তাই দেশের জন্যে মরেছিলো সে। একথা ইন্দুবালার স্মৃতিই জানিয়ে যায় আমাদের।

জসিমউদ্দিনের নক্সী কাঁথার মাঠ তো আগেও পড়েছি বহুবার। কিন্তু এর আগে মনটা কখনো এতোটা হু হু করে উঠেনি, এতোটা শূণ্য লাগেনি যতোটা এই বইতে পড়তে গিয়ে হয়েছে। ইন্দুবালার স্মৃতিতেই দেখা আসা যাক খানিক কলাপোতা গ্রামের ‘নক্সী কাঁথার মাঠে’র সন্ধ্যে —

“আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে,
নীরবে বসিয়া কোন্ কথা যেন কহিতেছে কানে কানে।
মধ্যে অথই শুনো মাঠখানি ফাটলে ফাটলে ফাটি,
ফাগুনের রোদে শুকাইছে যেন কি ব্যথারে মূক মাটি!
নিঠুর চাষীরা বুক হতে তার ধানের বসনখানি,
কোন্ সে বিরল পল্লীর ঘরে নিয়ে গেছে হায় টানি!

ইন্দুবালার বড়ো ভালো লাগতো মণিরুলের গলায় ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ শুনতে। চোখ ভিজে উঠতো সাজু রুপাইয়ের দুঃখে। ঠাম্মা চুপ করে সলতে পাকান। ভাই কবিতা শুনতে শুনতে হাঁ করে বসে থাকে সবে সন্ধ্যে নামা কলাপোতার মাটির বাড়ির দাওয়ায়। দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসে পাশের বাড়ির সন্ধ্যের শাঁখে। চেয়ে থাকেন ইন্দুবালা মনিরুলের দিকে। কবেকার মনিরুল তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে সহজ সরল টানাটানা চোখে তাকায়। আর এদিকের সত্তর পেরুনো ইন্দুবালা যেন একটুও নড়তে পারেন না বিছানা থেকে। চুপ করে শুয়ে থাকেন।”

এরকম নীরব নিষ্পাপ মায়াময় প্রেম সাহিত্যে শেষ কবে পড়েছি আমার মনে নেই। সারাদেশে যখন ভিন ধর্মী বিয়ে, প্রেম এসবের রাজনীতিকরণ চলছে, উন্মত্ততা চলছে, ঠিক সময়টাতেই জানলার ধারের খাটে শুয়ে আমি পড়ছি —

“সেবার ইন্দুবালা বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছিলো পুজোটা। ধুম জ্বরে দশমীর সকালে দেখেছিলো তার জানলার কাছে রাখা আছে এক মুঠো শিউলি ফুল। ছোট্ট চিরকুটে লেখা ছিলো, ‘মা দুগগা বললো যাকে ভালো লাগে তাকে দিও”। সেদিন মনিরুলের হাতের লেখা চিনতে একটুও দেরী হয়নি ইন্দুবালার। দুজনের ভালো লাগা কোনো এক শরতের সকালে চন্দ্রপুলি আর শিউলি ফুলে মিলে গিয়েছিলো।”

১৩৩ নং পাতাতে বই বন্ধ করে হু হু করে কেঁদে ফেলেছিলাম সেদিন। এর আগে কখনোই মাঝপথে কোনো বই বন্ধ রাখিনি। কিন্তু ইন্দুবালা ভাতের হোটেল গোটা টা একদিনে পড়া সম্ভব হয় নি আমার। বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো। ইন্দুবালা, মণিরুল, অমল, স্বর্ণলতা, মৈত্রী এক্সপ্রেস, কলাপোতা গ্রাম–সবকিছুর জন্যে মনকেমনের মেঘে ছেয়ে গেছিলো এই বই পড়ার সময়কার দিনগুলো। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের উপর কালজয়ী গল্প, উপন্যাস অনেক আছে। কিন্তু ইন্দুবালার মতো মায়াময়তা, স্নিগ্ধতা আর মনকেমনের রসদ খুব কম বইয়েই আছে। প্রতিটি অধ্যায় একেকটি মন ব্যাকুল করা স্মৃতিকথন যার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া সব রান্নার জাদুকাঠি।

ইন্দুবালার আর কলাপোতা গ্রামে যাওয়া হয়নি। ভারত – বাংলাদেশ মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হওয়ার পর ছেলেরা বলেছিলো পাসপোর্ট বানিয়ে দেশের বাড়িতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ইন্দুবালা যাননি। এক সকালে ধনঞ্জয়কে নিয়ে স্টেশনে গিয়ে ট্রেন দেখে তার মনে হয়েছে এই ট্রেন দেশে ফেরার ট্রেন নয়। এর থেকে ভেসে আসছে না তার দেশের গন্ধ। কাছের মানুষগুলোকে দেখতে চাওয়ার উন্মুখ অপেক্ষা অবসানের ট্রেন এ নয়। বেড়াতে যাওয়ার। আর ইন্দুবালা তো কলাপোতায় ফিরতে চান। কপোতাক্ষের ঘাটে একবেলা বেড়াতে যাওয়ার জন্যে তো আর বুকের ভেতরে কপোতাক্ষকে বয়ে আনেননি তিনি ছেনু মিত্তির লেন অব্দি!! আর যদি যানও বা সেখানে, তারপর? — “যদি গিয়ে গ্রামটাকেই খুঁজে না পান? যদি বোস পুকুরটাই না থাকে? কপোতাক্ষের ঘাট? মণিরুলের বাড়ির উঠোন? বড়মাঠের ফলসা গাছ? তাহলে কার কাছে ফিরে যাবেন ইন্দুবালা? কার আঁচলে মুখ লুকোতে? যারা ছিল অথচ আজ নেই? নাকি যারা মরেও বেঁচে আছেন ইন্দুবালার মধ্যে? নীরবে কাঁদেন ইন্দুবালা। কোনো সদুত্তর পান না অন্তর থেকে। শুধু এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া মানুষের ভীড় বাড়ে। পাসপোর্টে ছাপ পড়ে। বাক্স প্যাটরা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার করে মানুষ। একসময়ে যে দেশটা নিজের ছিল সেটারই বেড়া টপকায়। প্রত্যেক বছর বৃষ্টি আসে নিয়ম করে দু দেশেই। তবু সীমান্তের দাগ মুছে যায় না সেই জলে। ওটা ইন্দুবালার দাদুর স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়।” দেশভাগের যন্ত্রনা, হাহাকার নিয়ে বইটি শেষ করতে করতে মনে পড়ে মাষ্টার শশীভূষনের কথা– “দেশ মানেই হচ্ছে দেশের মানুষ। তাদের প্রকাশ ই হচ্ছে দেশের প্রকাশ।” কথাটা এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা কবে বুঝবেন বা আদৌ কখনো বুঝবেন কি না জানি না! তবু, মানুষ তো আশায় ই বাঁচে!

বই: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল
লেখক: কল্লোল লাহিড়ী
প্রকাশক : সুপ্রকাশ

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *