• December 9, 2021

মন্দির-মসজিদ বিসম্বাদ

 মন্দির-মসজিদ বিসম্বাদ

পুস্তক পর্যালোচনা

রাধাপদ দাস

অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ চলছে সুপ্রিমকোর্টের আদেশ বলে। কিন্তু সেই মসজিদ-মন্দিরের ভাঙাগড়ার প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে “মন্দির-মসজিদ বিসম্বাদ” শীর্ষক এই বইটি।২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশ হলেও সুপ্রিমকোর্টের রায়ের ফলে বাবরি মসজিদ ভেঙে নতুন করে রামমন্দির তৈরি হওয়ার কারণে এই বইটি পড়ার জন্য নানা দিক থেকে চাহিদা দেখা দেয়, সেই কারণে ‘বহুবচন’ প্রকাশনীর পক্ষ থেকে ২০২০ সালে নতুন করে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হয়।বিশিষ্ট সমাজ আন্দোলনের কর্মী ও মার্কসবাদী প্রাবন্ধিক অশোক মুখ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণ তুলে ধরে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পাঠকের কাছে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে যে কোন স্তরের গবেষকের কাছে এই বিষয়ের প্রেক্ষাপটে এই বইটি অবশ্য পাঠ্য। এই বই না পড়ে যদি এই বিষয়ের উপর কেউ নতুন কিছু ভাবতে যান তাহলে তাঁর পাঠ বা ভাবনা সম্পূর্ণ হবে না বলে আমি মনে করি।
আবার লেখকের রচনাশৈলীর গুণে অজস্র পরিমাণ তথ্য উদ্ধৃতি থাকা সত্ত্বেও বইটি পড়তে কখনও ক্লান্তি জন্মায় না। যিনি একবার এটি পড়তে শুরু করবেন, শেষ করার আগে সহজে হাত থেকে নামাতে পারবেন বলে মনে হয় না।
একেবারে বাবরি মসজিদের প্রাথমিক ইতিহাস থেকে গত ৯ই নভেম্বর সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে রাম মন্দির নির্মাণ পর্যন্ত পুরো ইতিহাস নিয়ে আলোচনার জন্য লেখক সমগ্র বইটিকে মোট তেরোটি অংশে ভাগ করেছেন। ১২৬ পাতার এই বইতে নতুন ইতিহাস নির্মাণের সাথে সাথে মসজিদ ও মন্দিরের পক্ষে যত রকমের যুক্তি তোলা হয়েছে তা ধরে ধরে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন বই ও পত্র-পত্রিকার রেফারেন্স তুলে ধরেছেন। যাতে পাঠকদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা না হয়।
বইয়ের শুরুতে লেখক একটি স্বরচিত কবিতার মাধ্যমে ধর্মের নামে মৌলবাদী আগ্রাসনের থেকে সাধারন মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান ও সুস্থ জীবন যাপনের সমস্যা দেশের এখন এক বড় সমস্যা, এটাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। দেশের মালিক লুটেরা শাসকশ্রেণীর লুটের কারবারকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ধর্মের নামে এক মিথ্যার প্রচার করে যাচ্ছেন।
এই মূল্যবান বইটির বিষয়বস্তুর সঙ্গে পাঠকদের পরিচিতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে আমি এর বিভিন্ন অধ্যায় ধরে ধরে সংক্ষেপে কিছু কথা তুলে ধরতে চাই।
১।‘প্রমাণের নামে রূপকথার আসর’
লেখক প্রথমেই দেখিয়েছেন যে দেশের ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি নিজেদের রাজনৈতিক ভিতকে শক্তিশালী করার জন্য বাবরি মসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়কে বেছে নিয়েছেন, সেখানে মসজিদের জায়গায় প্রমাণের নামে বাস্তবে রূপকথার আসর বসিয়ে তারা মিথ্যা যুক্তিকে পাথেয় করেছেন। সেই জন্য বি বি লাল, এস পি গুপ্ত, কে বি সৌন্দররাজনের মত নামি দামি প্রত্নত্তত্ববিদকে সংঘপরিবারের সমর্থনে নিয়ে এসে তারা যুক্তি সাজাতে কাজে লাগালেন। সেই মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করে কয়েক লক্ষ লোককে জড়ো করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯২ সালে ৬ই ডিসেম্বর সেই ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের সৌধকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন।
২। ‘কীভাবে জানব’
লেখক একটা মূল্যবান প্রশ্ন রেখেছেন: এই ইতিহাস আমরা ‘কীভাবে জানব’? অর্থাৎ ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্যকে জানতে হলে প্রকৃত তথ্যকে আগে খুঁজে বের করতে হবে। সে জন্য প্রধান দুটি উপাদান হল প্রত্ন-সাক্ষ্য ও নথি সাক্ষ্য। অর্থাৎ প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের সাথে সাথে সাহিত্যিক উপাদানও আমাদের কাজে লাগবে।লেখক মূলত এই দুই তথ্যকে হাতিয়ার করে বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিকে পাথেয় করে প্রকৃত তথ্যকে পাঠকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
৩। ‘রামায়ণ: পুরাণ না ইতিহাস’
এই অধ্যায়ে সাহিত্যিক উপাদানের ক্ষেত্রে রামায়ণের এক বড় ভূমিকা আছে। কারণ, রাম যেহেতু রামায়ণের এক প্রধান চরিত্র এবং অযোধ্যা যেহেতু সেই কর্মকাণ্ডের প্রধান ক্ষেত্র,রামায়নের রাম ও অযোধ্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে লেখক সামনে এনেছেন। সংঘ পরিবারের কাছের মানুষ,বিবেকানন্দের থেকে এই পুরাণ সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, সুনীতি চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেনের বক্তব্য সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন এবং এঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতে রামায়ণের বিভিন্ন সময়ে যে বিবর্তন হয়েছে তাও উল্লেখ করে দেখিয়েছেন। ‘অযোধ্যার ইতিহাস-ভূগোল’ এই নামে অযোধ্যার স্থানের প্রকৃত ইতিহাস এবং অবস্থান গত দিক থেকে তার গুরুত্ব। রামায়ণের উল্লিখিত অযোধ্যার সাথে বর্তমান অযোধ্যার কী কী সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য আছে, কেন রামায়ণের বর্ণিত অযোধ্যার সাথে আজকের মন্দিরওয়ালাদের অযোধ্যার কোন মিল নেই,সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও উল্লেখ করে দেখিয়েছেন।
৪। ‘লিখিত সাক্ষ্য- মন্দির নেই’
বর্তমানে বাবরি মসজিদের স্থানেই রামের জন্মস্থান এবং সেখানেই রাম মন্দির আগে থেকেই ছিল। মন্দিরওয়ালাদের এই দাবির পক্ষে তথ্য কী আছে বা প্রকৃত সত্য কী, এই বিষয়টিও লেখক অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই জন্য খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম-৫ম শতকের পাণিনি থেকে পতঞ্জলী, বিষ্ণুস্মৃতি সহ বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ, ফা-হি-ইয়েন, হিউ-য়েন-সাং থেকে হাল আমলের আকবরের সময়ের তুলসী দাস পর্যন্ত বিভিন্ন লেখকদের রচিত গ্রন্থ ধরে ধরে তিনি দেখিয়েছেন মন্দিরওয়ালাদের দাবি কতটা ভিত্তিহীন। সেখানে তাদের বর্ণিত মন্দিরের যে বাস্তবে কোন অস্তিত্ব ছিল না, পুরোটাই মিথ্যা যুক্তি, তিনি তা বিপুল পরিমাণ ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরে দেখিয়েছেন। এবং বাবরের আত্মজীবনী ‘বাবারনামা’-তেও যে এই মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির কোন উল্লেখ নেই এটাও সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।
৫।‘সাক্ষ্যের নামে জালিয়াতি’
‘মিথ্যা বল, জোর গলায় বল, বারে বারে বল, মিথ্যা সহজেই সত্যে পরিণত হবে’- হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবেলসের নীতি মেনে আমাদের দেশের সংঘের নেতারা ও মন্দিরের পক্ষে যুক্তি হিসাবে যে তথ্য পেশ করেছেন তার প্রায় পুরোটাই মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য। মন্দিরওয়ালারা সাক্ষ্যের নামে জালিয়াতি করেছেন কীভাবে তার এক সুন্দর তথ্য উপস্থাপনা করেছেন। এক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ার জেসুইট পাদ্রি টিফেনঠেলার ও উইলিয়ালম ফিনচ এর বক্তব্যকে এরা কীভাবে বিকৃত করেছেন, প্রকৃত তথ্যই বা কী ছিল, বিস্তারিত উদ্ধৃতি সহকারে উপস্থিত করেছেন। এরা দেশীয় নথি হিসাবে ১৯৩৪ সালে কলকাতার মর্ডান রিভিউ পত্রিকাতে সত্যদেব পরিব্রাজকের প্রকাশিত মন্দির ধ্বংসের নামে ‘বাবরের আদেশ নামা’র নামে এক জাল কাগজ ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। পরবর্তীকালে হরপ্রসাদ রায় ‘বাবারনামা’ র উল্লেখ করে বাবর, বাকি তাসখন্দিকে অযোধ্যার শাসক নিযুক্ত করে মন্দির দখল করে মসজিদ নির্মাণের ভার দেন। এটা যে বাস্তবে হরপ্রসাদ রায়ের বানানো ‘বাবরনামাতেই’ সম্ভব লেখক তা দেখিয়েছেন। এছাড়া বিশ্বহিন্দু পরিষদ তাদের বইতে উল্লেখ করেছেন ১লক্ষ ৭৪ হাজার হিন্দুকে হত্যা করেও মীরবাকি মন্দিরে নাকি ঢুকতে পারেননি, শেষে কামান দাগতে হয়। এই তথ্য সূত্রও যে বিকৃত করা, লেখক তাও প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। একই রকম ভাবে আইন-ই-আকবরী, দিবান-ই-আকবরী, জাফরনামা ও আলমগীরনামার নাম করেও মন্দিরপন্থীরা যে সমস্ত তথ্য মন্দিরের পক্ষে দিয়েছেন প্রতিটার সুত্র উল্লেখ করে ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, প্রতিটা তথ্যই আসলে ভুয়ো। এই কারণেই এই বইয়ের এই অংশটিকে আমি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করি।
৬। ‘প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য- মন্দির ছিল না’
যদি মন্দির ভেঙে মসজিদ হয়ে থাকে তাহলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে তার কিছু নিদর্শন নিশ্চিত ভাবেই পাওয়া যাবে। ঐতিহাসিকরা সেই তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল হাসান ‘রামায়ণ বর্ণিত অঞ্চলে প্রত্নতত্ত্ব’ নামে যে প্রকল্প চালু করেন সেই প্রকল্পে কিন্তু অনেক খোঁড়াখুঁড়ি করেও সেই রকম কিছুই যে তথ্য পাওয়া যায়নি, বি বি লালের সেই রিপোর্ট উল্লেখ করে লেখক তা দেখিয়েছেন। আর সেই কারণেই ১৯৭৭ সালে মোরারজি দেশাই সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদবানি সেই প্রকল্প চালু রাখা দূরে থাক, তা এক প্রকার বন্ধই করে দেন। মজার বিষয় হল, এই রামায়ণ প্রকল্প যখন বন্ধ হয় সেই প্রকল্পের মন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার মন্ত্রী ছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানি। আগামীদিনে খনন কার্যের নামে আসল সত্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়েই আদবানি ও বাজপেয়ির উদ্যোগেই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যটিও লেখক বেশ সুন্দর ভাবে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন।
৭। ‘অপসাক্ষ্যের আহাম্মকি’
১৯৭৫-৭৬ সালে শুরু হওয়া যে খনন কাজ বিজেপি নেতারা ক্ষমতায় গিয়ে বন্ধ করেদিলেন,তাঁরা এবার সেই রিপোর্টের নাম করে বিকৃত রিপোর্ট কে প্রকৃত সাক্ষ্য বলে প্রচার করতে শুরু করলেন। এই বিকৃত তথ্যের সূত্রপাত ১০-১১শ শতকের এক পাকা ভিতকে কেন্দ্র করে। মন্দির পন্থীরা দাবী করতে থাকেন এটাই প্রকৃত মন্দিরের ভিত্তি। লেখক এখানে দেখিয়েছেন, এটাই যদি মন্দিরের ভিত্তি হয় তাহলে একটা হিন্দু মন্দিরে মুসলিম কারুকার্যময় পাত্র ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গেল, অথচ হিন্দুদেব-দেবীর ছবি, মূর্তি, পট, আলপনার খচিত কোন পাত্র ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গেল না এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা? বরং মুসলিম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন পাত্রের টুকরো টাকরা থেকে প্রমাণ হয় যে মন্দির সংলগ্ন এলাকাটায় ত্রয়োদশ শতাব্দ থেকেই মুসলিমদের বসবাস ছিল এবং বাড়ছিল। এর সাথে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের আরো কিছু তথ্যের প্রমানের মাধ্যমে তিনি দেখালেন মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর যে কাহিনীকে কেন্দ্র করে সারা দেশে জঙ্গি হিন্দু চক্রের লোকেরা দাঙ্গার আগুন জ্বালিয়েছে, মন্দির সমর্থক প্রত্নতত্ত্ববিদদের বক্তব্যগুলিও তার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে।
৮। ‘স্থাপত্য প্রমাণ- তাও বিপক্ষে’
মসজিদে আজান দেওয়ার ‘মজিনা’ নেই কেন এই প্রশ্ন যাঁরা তুলেছেন, লেখক তাঁদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ৮৪৭ সালে সামারায় খলিফা আলমুতাওয়াক্কিল যে মসজিদ নির্মাণ করেন তাতে কোন মজিনা ছিল না। দিল্লিতে ফিরোজ শাহ-তুঘলক (১৩৫১-৮৮) যে জামি মসজিদ তৈরি করেন তাতেও আজান দেওয়ার কোন মজিনা ছিল না। অতএব মজিনা নেই মানেই যে তা মসজিদ নয় বা মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি হয়ে ছিল এই যুক্তিও ধোপে টিকছে না। বাবরি মসজিদ যে বাবর তৈরি করেছিলেন তার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। লেখক দেখিয়েছেন ঐতিহাসিক আর. নাথের মতে ভারতে বাবরের নামের সাথে যুক্ত অধিকাংশ মসজিদই বাবরের তৈরি নয়। অযোধ্যা সহ সম্ভল, পানিপথ, রোহতক, পালাম, পিলখুবা, মোহাম বা সোনিপতের যে সব মসজিদের গায়ের শিলালিপিতে বাবরের নাম আছে তার কোনটাই ‘বাবর নামায়’ উল্লেখ নেই। বাবর তাঁর দিনলিপিতে একটি মাত্র মসজিদ নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন – তাহল ধৌলপুরে। এছাড়া বাবরি মসজিদের গম্বুজের চুড়া, ভিতরের বিভিন্ন মূর্তি ও ছবি এবং কালো স্তম্ভগুলিরস্থাপত্য, বৈশিষ্ট্য ও শিল্পরীতিও মন্দিরপন্থীদের রামমন্দির তত্ত্বের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে — লেখক তা সন্দেহাতীত ভাবেপ্রমাণ করেদেখিয়েছেন।
৯। ‘শিলালিপির নামে জালিয়াতি’
মুখোপাধ্যায় এখানে তথ্য সূত্র সহ দেখিয়েছেন, ভারতের প্রাচীন শিলালিপি সংগ্রহ করেছেন যে সমস্ত ব্যক্তি তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফ্রান্সিস বুকানন, যিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুরোধে ১৮০৭-১৪ সালে সমীক্ষা চালিয়ে শিলালিপি সংগ্রহ করেন। প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশের মতে “সমীক্ষক সুলভ মানসিকতা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মনোবৃত্তির জন্য তিনি সর্বকাল গ্রাহ্য উৎকর্ষের অধিকারী”। বাকি যে দুজন তারা হলেন ১৮৮০-র দশকে এ ফুহরের ও বেভারিজ। তাঁরা প্রত্যেকেই বাবরি মসজিদ তৈরির সময়কাল নিয়ে আলাদা আলাদা সময় নির্ধারণ করেছেন। বুকাননের মতে এই সময়টা হবে ৯২৩ হিজরি সাল(১৫১৬খ্রিঃ), যখন বাবর কাবুল থেকে কোন অভিযান শুরুই করেননি। দ্বিতীয় জন ফুহরের এর মতে ৯৩০ হিজরি সাল( ১৫২২-২৩ খ্রিঃ) যখন বাবর কাবুল থেকে বেরিয়ে লাহোর, দীপালপুর এই এলাকায় যুদ্ধ করছেন। বেভারিজের মতে ৯৩৫ হিজরি সাল(১৫২৭-২৮খ্রিঃ) যখন বাবর অযোধ্যা থেকে ৭০-৮০ মাইল দূর দিয়ে ঘুরে যান। মন্দিরপন্থী লোকেরা উপরের দুটি সালকে গুরুত্ব না দিয়ে কোন প্রমাণ ও যুক্তি ছাড়া কীভাবে তাঁদের প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে ৯৩৫ হিজরি সালকেই মন্দির তৈরির সময়কাল বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তথ্য জালিয়াতির চেষ্টা করছেন, লেখক তার এক সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন।
১০। ‘সাম্রাজ্যবাদী সাক্ষ্য- মন্দিরপন্থীদের একমাত্র ভরসা’
বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ অফিসারদের মধ্যেও দুরকম মত দেখা গেছে। সিপাহি বিদ্রোহের আগে যাঁরা কাজ করেছেন, যেমন এফ বুকানন(১৮১৩-১৪), ডব্লিউ হ্যামিলটন(১৮১৫), আর হেবার(১৮২৯), এম মার্টিন(১৮৩৮) — এরা প্রত্যেকেই তাঁদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন যে বাবরি মসজিদের জায়গায় কোন মন্দির ছিলনা। এর পর ১৯৩৯ সালে ভারত সচিব ইলিয়ট মুসলিম যুগের ইতিহাস লেখকদের একটা গ্রন্থপঞ্জি তৈরি করেন এবং তার ভূমিকায় লেখেন যে মুসলিম শাসন কালে হিন্দুদের উপর যে অবর্ণনীয় ধর্মীয় নির্যাতন চলেছিল, এই বই পড়ে হিন্দুরা তা জানতে পারলে আর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোন দিন লড়াই করতে চাইবে না। এর পরেই, সিপাহি বিদ্রোহের সময়কাল থেকে তার পরে ব্রিটিশ অফিসাররা, যেমন– ই থর্নটন(১৮৫৪), এইচ এম ইলিয়ট(১৮৭০), এ ক্যানিংহাম(১৮৭১), এ ফুহরের(১৮৯১) — তাঁদের রিপোর্টে বারে বারে উল্লেখ করতে লাগলেন যে মন্দির ভেঙেই বাবরি মসজিদ তৈরি হয়েছে। আর আমাদের দেশের মন্দিরপন্থী লোকেরা সেই সাম্রাজ্যবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির এই বিকৃত সাক্ষ্যকেই প্রমাণ হিসাবে প্রচার করতে উঠেপড়ে লাগলেন।
১১। ‘সাম্প্রতিক খননঃ তথ্য হনন’
এর পর অতীতের সমস্ত রিপোর্ট ও তথ্য যখন তাদের মন্দির ভাঙার দাবিকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, সেই কারণে বিজেপি ক্ষমতায় থাকার কারণে নিজেদের লোককে দিয়ে একটি প্রমাণ হিসাবে কিছু সাক্ষ্যকে সরকার স্বীকৃত করিয়ে নেওয়ার জন্য এএসআই-কে দিয়ে ২০০৩ সালের মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বাবরি মসজিদ এলাকায় খনন কার্য চালানো হয়। সেই সময় এএসআই-এর মহা অধীক্ষক পদে ছিলেন কস্তুরী গুপ্ত মেনন। উৎখনন করার ঠিক আগেই সরকারের নির্দেশে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মূরলী মনোহর যোশীর দপ্তর থেকে এক জন আই এ এস অফিসার গৌরী চট্টোপাধ্যায়কে বসিয়ে নিজেদের লোকদের দিয়ে খনন কার্য চালানো হয়। যদিও এত কিছু করার পরও ২৫শে আগস্ট পুরাতাত্ত্বিক দপ্তর যে রিপোর্ট প্রকাশ করল সেই রিপোর্ট সম্পর্কে এক দল বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ খুঁটিয়ে পড়ে দেখার চেষ্টা করে প্রশ্ন তুলেছেন: প্রত্নতত্ত্ববিদ অফিসাররা একটা মন্দির কীভাবে খুঁজে পেলেন? সেই ঐতিহাসিকদের বক্তব্যকে তুলেধরার সাথে সাথে বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ শ্রীমতি বিষ্ণুপ্রিয়া বসাক, যিনি চারদিন অযোধ্যায় গিয়ে খননকার্য পর্যবেক্ষন করেছিলেন, তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের ট্রেঞ্চে নামা বারন ছিল, কিছু প্রত্নসম্পদ(এএসআই কর্মীরা) না দেখলে হাতে স্পর্শ করাটাও ছিল ঘোর অপরাধ। বুঝতে পেরেছিলাম তাঁদের কাজে কোন স্বচ্ছতা নেই। অসহায়ভাবে দেখতে হচ্ছিল অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একটা প্রত্নস্থল কীভাবে ধ্বংস হচ্ছিল খননের মধ্যদিয়ে”।
১২। ‘পশ্চাদবলোকন: শিক্ষা’
লেখক এখানে আমাদের শিক্ষা প্রণালীতে যে গলদ আছে তা দেখাতে চেয়েছেন। ভারতে হিন্দু শাসকদের পুনরুত্থান হয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধদের ধর্মীয়স্থান ধ্বংস ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের হত্যার মাধ্যমে, হিন্দু শাসকরাও সাম্রাজ্য দখলের কারণে অন্যের মন্দির ধ্বংস ও মূর্তি লুঠ করেছেন সেই ইতিহাসকে প্রকাশ না করে মুসলিম শাসকরাই শুধু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছেন — এই রকম একটা মিথ্যা তথ্য বহু কাল আগে থেকেই পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ভাবীপ্রজন্মের কাছে রেখে একটা সাম্প্রদায়িক ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই রামমোহন-বিদ্যাসাগর-অক্ষয়দত্ত-রবীন্দ্র-নজরুল-রোকেয়া-ভগৎ সিং এর ঐতিহ্যকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে এমন কি বিবেকানন্দের মতো উদারপন্থী ধর্মীয় ভাবধারাকেও মুছে দিতে। ওরা চাইছে – এমন একটা মানসিকতা গড়ে তুলতে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শুধু হিন্দু পরিচয়টাকে আঁকড়ে ধরবে, যুক্তি তথ্য ও সত্যকে বিষের মত পরিত্যাগ করে ওদের প্রচার যন্ত্রকেই গভীর বিশ্বাসে মেনে নেবে। এই জন্যই ওদের আক্রমণ অত্যন্ত ভয়ানক, বিপজ্জনক, সর্বশক্তি দিয়ে একে রুখতে হবে।
১৩।‘ আদালতের শেষ রায় – হিসাব নিকাশ’
২০১৯ এর ৯ই নভেম্বর সুপ্রিমকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা এই সময়ে সম্ভাব্য সব চাইতে কম খারাপ রায়। লেখক দেখিয়েছেন এই আদালত সুচারূ বর্ণমালায় মেনে নেবে, বর্তমান বিবাদিত অযোধ্যায় রামচন্দ্রের জন্মস্থানের ‘বিশ্বাস ব্যতীত’ এরকম কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণযোগ্য নথি নেই। এর ফলে এক ধাক্কায় ২০০৩ সালে এএসআই প্রদত্ত রিপোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে গেল। আমরা আমাদের জীবদ্দশায় একটা মিথ্যা দাবিকে গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখলাম। এটা অভিজ্ঞতা হিসাবে কম মুল্যবান নয়। আর এই মিথ্যার প্রশ্নে বিভিন্ন পক্ষকে চেনার ও সুযোগ পেলাম। সব চাইতে বড় কথা, যে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক প্রশাসনের আওতায় এই সব ঘটনা এতকাল ঘটতে দিয়েছে তার সেই ছদ্ম সেকুলার মুখোশটাকে নিজেই ছিঁড়তে ছিঁড়তে আজ সে টান মেরে খুলেই ফেলল। যারা এতদিন বোঝেননি, তাদের এবার চৈতন্যোদয় হবে নিশ্চই। লেখক উপরিউক্ত বক্তব্যে এই কামনা করেছেন।
এই বইটি পড়ে আমি বলতে চাই, মাননীয় লেখক অশোক মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ের উপর কোন প্রথাগত ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও বিষয়টিকে তিনি এত সুন্দরভাবে গবেষণার আকারে অধ্যয়ন করেছেন, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্যকে এত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন, যা এক ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এবং ভাবী প্রজন্মকে এই বিষয়ের সাথে সাথে নতুন ইতিহাস নির্মাণেও এক নতুন পথ দেখাবে। যাঁরা এই পর্যালোচনাটি পড়লেন, তাঁদের এই বিষয়ের উপর পূর্ণ জ্ঞান বা ধারণা জন্মানোর জন্য অবশ্যই এই মূল্যবান বইটি পড়া উচিত বলে আমি মনে করি।
তবে পরিশেষে সামান্য কয়েকটি ত্রুটির কথা বলব, বইটিতে শেষ দিকে একটা নির্ঘন্ট থাকা উচিত ছিল। তাছাড়া, বিতর্কিত বিভিন্ন উপাদান নিয়ে আলোচনার সময় প্রাসঙ্গিক কিছু ছবি যুক্ত করা একান্তই প্রয়োজন ছিল বলে মনে করি। আজকের দিনে ছবি সংগ্রহ এবং মুদ্রণ – দুটোই তুলনামূলক ভাবে অনেক সহজ হয়ে গেছে। প্রথম সংস্করণে না রাখতে পারলেও এই সংস্করণে না পারার কোন কারণ ছিল না। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে লেখক এই দুই ত্রুটি থেকে বইটিকে মুক্ত করে আরও সর্বাঙ্গ সুন্দর করে তুলবেন।

মন্দির-মসজিদ বিসম্বাদ
লেখক: অশোক মুখোপাধ্যায়।
বহুবচন প্রকাশনী, কলকাতা; পেপারব্যাক; পৃষ্ঠা সংখ্যা – ১২৬; মূল্য – ১২০ টাকা

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post