• December 8, 2022

“এখন আবার আগুন চাইছে…তুমি কি জাতপাত, নিয়ম রীতি সব ভুলে গেছো নাকি? চামার, ধোপা যে যখন পারছে নিজের বাড়ি মনে করে চলে আসছে। আর তুমিই বা কি ভেবেছো? এটা ধর্মশালা না হিন্দু বাড়ি? ওকে বলো এখান থেকে চলে যেতে, নয়তো মুখে নুড়ো জ্বেলে দেবো।”

 “এখন আবার আগুন চাইছে…তুমি কি জাতপাত, নিয়ম রীতি সব ভুলে গেছো নাকি? চামার, ধোপা যে যখন পারছে নিজের বাড়ি মনে করে চলে আসছে। আর তুমিই বা কি ভেবেছো? এটা ধর্মশালা না হিন্দু বাড়ি? ওকে বলো এখান থেকে চলে যেতে, নয়তো মুখে নুড়ো জ্বেলে দেবো।”

সাত্যকি দাসগুপ্তঅন্বেষা মুখার্জীর লেখা অনুবাদ করেছেন শ্রেয়া চক্রবর্তী

ব্রাহ্মণ পুরোহিতের স্ত্রী তার স্বামীকে ঠিক এই ভাবেই ভর্ৎসনা করেন যখন দুখী নামের এক দলীয় মজদুর তার কাছে ছিলিম জ্বালানোর আগুন চায়। ওমপুরি অভিনীত সদগতি (১৯৮১) সিনেমার একটি দৃশ্য। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র দুখী এক ব্রাহ্মণ পুরোহিতের কাছে গেছে তার মেয়ের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে। ফলত, Cast hierarchy এর সুযোগ নিয়ে পুরোহিতটি দুখীকে দিয়ে উঠোন ঝাঁট দেওয়া থেকে শুরু করে গুদামঘরে ভুসির বস্তা জড়ো করা, কাঠ কাটা এই সকল কাজ করিয়ে নেয় বিনা পারিশ্রমিকে। একসময় ক্ষুধা তৃষ্ণায় ক্লান্ত অবসন্ন দুখী অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে মারা যায়। তার দেহ পড়ে থাকে পূরোহিতের বাড়ির বাইরে। অবশেষে ব্রাহ্মণ পূরোহিতকে বাধ্য হয়ে তার শুচিতা বিসর্জন দিতে হয় চামার দুখীর শবদেহের সদগতি করার জন্য। সে শবদেহের পায়ে দড়ি বেঁধে ফেলে আসে ভাগাড়ে।

সত্যজিৎ রায়ের এই সিনেমাটি দেখায় কিভাবে জাতিভেদ প্রথা সমাজের নিচু শ্রেণীর মানুষের উপর (বিশেষত দলিতদের উপর) ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য উচ্চবর্ণের শোষণকে চিরস্থায়ী করতে ভীত প্রশস্ত করে। মনুস্মৃতিতে দলিতদের অচ্ছুৎ বলা হয়েছে এবং সমাজের সমস্ত রকমের “নীচু” “নোংরা” “ঘৃণ্য” এবং কায়িক পরিশ্রমের কাজ গুলি ধার্য্য করা হয় এদের জন্য।

এবার একটু এখনকার ” Netflix and chill” এর যুগে ফিরে আসা যাক। নীরজ ঘাওয়ান পরিচালিত “Geeli Pucchi” তে আমরা দেখি সিনেমাটির মুখ্য চরিত্র , এক দলিত মহিলা কারখানার কর্মী হিসাবে ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা করেন। কঙ্কনা সেন শর্মা অভিনীত উক্ত চরিত্রটির নাম ভারতী মন্ডল। তার লক্ষ্য ডেটা অপারেটর হয়, কিন্তু যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতীর বদলে অন্য এক বিবাহিত ব্রাহ্মণ মহিলা সেই পদটি পায়।
সিনেমাটি যেমন নগরজীবনে দলিতদের প্রতি হওয়া লাঞ্ছনা, অসহায়তা এবং শোষণ তুলে ধরার জন্য একদিকে যেমন প্রশংসিত হয়েছে তেমনি অপর এক columnist এই ছবির অপর এক দিক তুলে ধরে সমালোচনা করেছেন, “এই সিনেমাটিও সেই চিরাচরিত ধ্যান ধারনা থেকে বেরোতে পারেনি, যে একজন দলিতকে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে তাকে হতে হবে exceptional…প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা মানুষদের ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের একমাত্র উপায় হলো তাদের এই exceptional achievement”

দুটি সিনেমাই জাতি প্রথার বৈশিষ্ট্য এবং সময়ের সাথে সাথে এর রুপগত ও গুণগত পরিবর্তন অনুধাবন করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক দলিত মজদুর কি ভাবে জাতিভেদ প্রথার দ্বারা সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয় তার ঐতিহাসিক দলিল হলো “সদগতি”। অপর দিকে “Geeli Poochi” তুলে ধরেছে বর্তমান নগরজীবনে কাস্ট সিস্টেমের বৈশিষ্ট্য। এখানে লেবার মার্কেট থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের বৈষম্য ও বঞ্চনার দিকটি ফুটে উঠেছে। গায়ত্রী সিং, ত্রিনা বিথায়থিল এবং কানহু চরণ প্রধানের একটি সমীক্ষা দেখায় যে ভারতের ৬০ শতাংশ শহরের বসতি অঞ্চল গুলো জাত ও গোত্রের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা অবস্থিত। ২০০১ থেকে ২০১১ এর মধ্যে মহারাষ্ট্রের ৩৪% এবং গুজরাটের ২৯% শহর গুলিতে জাতি ও গোত্র ভিত্তিক আলাদা বাসস্থানের পরিমাণ বেড়েছে।

গবেষক মাধেশ্বরণ ও আত্তেওয়েল শহরের লেবার মার্কেট পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, শহরাঞ্চলে ST, SC ও higher cast শ্রমিকদের মধ্যে বেতনের বৈষম্য দৃষ্টিকটু ভাবে চোখে পড়ার মতো। সাধারণত ST, SC সম্প্রদায়ের শ্রমিকরা তুলনামূলক ভাবে ১৫%কম বেতন পান, এবং জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরো প্রকট রূপ ধারণ করেছে।
National Sample Survey  ২০১১-১২ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতের পদার্থবিদ ও রসায়নবিদের মধ্যে ৬১% উচ্চ বর্গীয় হিন্দু, ১.২৪% তপসিলি এবং ৩৭% হলেন আদিবাসী ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। কম্পিউটার ও টেকনিক্যাল কাজগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অন্যদিকে, যেখানে উচ্চবর্ণের মাত্র ৬.৬৬ শতাংশ মানুষ জুতো তৈরি ও পরিষ্কারের কাজের সাথে যুক্ত, সেখানে তফসিলি জাতির ৫৯ শতাংশর মূল জীবিকা হল এটা।

“সদগতি” তে দেখানো দলিতদের জন্য নির্ধারিত সমাজের তথাকথিত ‘ঘৃণ্য, নোংরা’ কাজগুলির প্রকৃতি বর্তমানে সময়ের সাথে সাথে বদলেছে। দীর্ঘকাল ধরে দুখীর মতো মানুষেরা সামাজিক উন্নতি, মূলধন সমস্ত কিছুর থেকেই বঞ্চিত হয়ে এসেছে।এমনকি, আজকের ‘urban labour market’ এও দলিতদের জন্য কিছু সীমিত জীবিকা নির্ধারিত।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে , অনেক জাতিভিত্তিক কাজ গুলোর মধ্যে অন্যতম ড্রেন পরিষ্কারের কাজ এখনো নিম্নবর্গীয় মানুষরাই করে থাকেন। কারণ, এই কাজটি এখনো সমাজে ” নোংরা” “অপবিত্র” বলে মনে করা হয়। এই পেশায় জড়িত ৯৯% মানুষই দলিত সম্প্রদায় ভুক্ত এবং তার মধ্যে ৯০% কর্মীই হলেন মহিলা । এর থেকেই বোঝা যায় যে কি করে সময়ের সাথে সাথে জীবিকার চরিত্র বদলালেও জীবিকা বৈষম্যের চরিত্র বদলায়নি, তার নতুন আঙ্গিক উঠে এসেছে। এমনকি যে সকল ক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্যের অস্তিত্ব নেই বলে মনে করা হয়, সেখানেও ভারতীর মতো মহিলাদের এই বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
যদিও ভারতে জাতিভেদ প্রথা এবং বৈষম্য সমস্যা গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত, এটা স্বীকার করতেই হবে যে একটা সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য জাতিভেদ প্রথা ভিত্তিক বৈষম্য দূর করাই যথেষ্ট নয়।দলিতরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে অসুবিধার ও বঞ্চনার সম্মুখীন হয়েছে তা শুধুমাত্র কয়েক বছরের আধুনিক অনুশীলনের মাধ্যমে দূর হবে না।কিছু কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দলিত সম্প্রদায়ের পরিস্থিতির আংশিক উন্নতি হলেও দীর্ঘ কাল ধরে সামাজিক ও আর্থিক ভাবে বঞ্চনার কারণে তারা এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন যেখানে সমস্ত রকমের সুযোগ সুবিধা ভোগকারী উচ্চবর্ণের মানুষদের সাথে অসম প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠা সম্ভব নয় তাদের পক্ষে।
“যদি তুমি সব শিখেও ফেল, তবুও তুমি ওই পদ পাবে না। কারণ তুমি ভারতী মন্ডল। তুমি ব্যানার্জি, মিশ্র বা শর্মা নও।তোমরা দলিত। তুমি কি এক মুহূর্তের জন্য সেটা ভুলে গিয়েছিলে? ওরা আমাদের একটি টেবিলে খেতে দেবে, কিন্তু এক সারিতে কাজ করতে দেবে না। যা তোমার হতে পারে না তার জন্য লড়াই করো না, নয়তো ওরা তোমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেবে” এই ভাবেই পদবী উল্লেখ করে ভারতীর সহকর্মী তাকে মনে করিয়ে দেয় কিভাবে তার নামের মাধ্যমে তাকে তার জাতিগত পরিচয় আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। যা এক লমহায় তাকে দলিত বলে দাগিয়ে দেবে।একদিকে দুখীকে পুরোহিতের বাড়িতে অপমান করা হয়, উল্টো দিকে আমরা দেখি ভারতীকে, অফিসের কোনো সহকর্মীর জন্মদিনের কেক সবার মধ্যে বিলি করার ভার পরে তার উপর। যদিও দুটি সিনেমার শেষ দুই রকমের। “সদগতিতে” দুখী গোটা সিনেমায় কোনো দোষ না করেও বার বার ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি, পুরোহিতের বাড়িতে ঢোকার জন্যও সে ক্ষমা চায়, কাজের বিনিময়ে ন্যূনতম খাবার টুকুও চাইতে সে দ্বিধা বোধ করে।এমনকি প্রচন্ড পরিশ্রমে মারা যাওয়ার পরও তথাকথিত ব্রাহ্মণদের সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে সে। অপর দিকে “Geeli Pucchi” আমাদের দেখায় যে, দলিতদের মুখ বুজে অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করার দিন ফুরিয়ে এসেছে। ভারতীর চোখে ফুটে ওঠা প্রতিরোধ তারই ইঙ্গিত। যদিও তার যোগ্য সম্মান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেতে আরো অনেক সংগ্রাম করতে হবে তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post