• September 27, 2022

প্রসঙ্গ ‘পিয়ের লে ফু’– আসলে এক ‘নরকযাত্রা’

 প্রসঙ্গ ‘পিয়ের লে ফু’– আসলে এক ‘নরকযাত্রা’

সৌমিক কান্তি ঘোষ

প্রসঙ্গে ঢোকার আগে সুধী পাঠককে অবহিত করি যে ‘নুভেল ভাগ’ বা ‘নবতরঙ্গ’ নামক যে চলচ্চিত্র সম্বন্ধীয় আন্দোলনটি ষাটের দশকের গোড়ায় ফরাসী দেশে এবং পরবর্তীকালে সারা বিশ্বে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে তা আসলে চলচ্চিত্রের আঙ্গিকগত দিকটাকেই নির্দেশ করে। বিশেষত ছবির টেকনিকের দিকটা — ফ্রিজ শটের ব্যবহার, অধিক পরিমাণে হ্যান্ড হেল্ড ক্যামেরার ব্যবহার, স্লোমোশন জাম্পকাট, পেইনটিংয়ের ব্যবহার প্রভৃতি এবং সর্বোপরি গল্প বলার ভঙ্গির পরিবর্তন; সব মিলিয়েই যে আন্দোলন তাই আসলে নবতরঙ্গ বলে অভিহিত।

প্রথামিক ভাবে নবতরঙ্গ বলতে যে পাঁচজন ফরাসী পরিচালকের কথা বলা হয় (ত্রুফো, গদার, রোমার, রিভেং, শ্যাব্রল) তাদের মধ্যে জাঁ লুক গদারই চলচ্চিত্রের আঙ্গিকগত দিকটি নিয়ে সব থেকে বেশী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যার ফলস্বরূপ আমরা পেয়ে যাই ব্রেথলেস, মাস্কুলা ফেমিনা কিংবা ‘পিয়ের লে ফু’-র মতো ছবি। গল্প না, বক্তব্যটাই যেখানে প্রধান। মনে করুন ঋত্বিক ঘটকের সেই উক্তি – “… ছবিতে গল্পের যুগ শেষ হয়ে গেছে এখন এসেছে বক্তব্যের যুগ।” কিন্তু হঠাৎ ধান ভানতে শিবের গাজন কেন ? ছবিটি বুঝতে সুবিধে হবে তাই।

এবার প্রসঙ্গে।

ইউরোপে ‘নরক’ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। দান্তের ডিভাইন কমেডিতে আমরা নরক দর্শন করি। যার শেষে থাকে এক আলোকোজ্জ্বল সময়ের ইঙ্গিত। ‘পিয়ের লে ফু’ তেও গদার এক ধরনের নরক দর্শনের কথাই বলেন। তা আরও স্পষ্ট হয় যখন ছবির শুরুতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে শব্দ দিয়ে তৈরী র‍্যাবো-র প্রতিকৃতি। ছবির শেষেও ভেসে আসে র‍্যাবো-র কবিতার লাইন। বোঝাই যায় এ আসলে র‍্যাবো-র প্রতি এক ধরণের শ্রদ্ধাঞ্জলি। যিনি লিখেছিলেন ‘নরকে এক ঋতু’-র কবিতা গুচ্ছ। যা আসলে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার প্রেক্ষিতে মায়া, মমতা, ভালাবাসা প্রভৃতিকে নিক্তিতে মেপে নেওয়ার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। বুর্জোয়া সমাজ-অর্থনীতির কাঠামোয় মানবিকতার সহজাত বোধ কিংবা উপাদানগুলিকে ব্যঙ্গ করে তিনি দেখিয়ে দেন এগুলি আসলে কতটা ঠুনকো। সভ্যতার যান্ত্রিকতাকেই তিনি আক্রমণ করেন। আমাদের মনে করিয়ে দেন এ সভ্যতা আসলে নরক যাত্রারই সামিল।

শুধু র‍্যাবো নন। প্রসঙ্গ ক্রমে গদার টেনে এনেছেন ‘ফ্ল্যার দ্যু মালে’-র রচয়িতা বোদলেয়ারকেও। আধুনিক রোমান্টিক কবি, অথচ তথাকথিত রোমান্টিকদের সঙ্গে তার দুস্তর ব্যবধান। প্রকৃতি এবং নগ্নতা, যেখানে রোমান্টিকদের স্বাভাবিক আনাগোনা, সে পথ পরিত্যাগ করলেন বোদলেয়ার। বন্দনা করলেন অলংকারের, কৃত্রিমতার, শিল্পের। রবীন্দ্রনাথ যেখানে বলেন ‘পরো শুধু সৌন্দর্যের নগ্ন আবরণ’, সেখানে বোদলেয়ারের নায়ক তার প্রেমিকাকে বিবসনা দেখে প্রতিবাদ করে। বোদলেয়ারের কাছে তাই সুন্দর যা চেতনার দ্বারা পরিশোধিত। গদারও সেই চেষ্টাই করেন। আমাদের চেতনাকে জাগ্রত করতে চান। তাই খুব সচেতন ভাবেই আখ্যানের শুরুতেই র‍্যাবো এবং ক্রমে বোদলেয়ার আসেন।

গদার মানুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলেন, একইসঙ্গে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়েও। উন্মোচন করতে চান বাস্তব সম্পর্কিত তার স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তাকে। ইন্দ্রিয়গোচর পারস্পরিক সম্পর্কের সংবেদনীয় মৌল অভিপ্রায়কে। আধুনিক সভ্যতাকে দেখতে শেখান নতুন চোখ দিয়ে। ছবির প্রায় শুরুতে ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী-র একটি সিকোয়েন্স উল্লেখযোগ্য। যেখানে গদার আধুনিক সভ্যতাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন রেঁনেসা কিংবা গ্রীক সভ্যতার সামনে। ফার্দিনান্দের স্ত্রী অন্তর্বাস সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে একটি ম্যাগাজিনের দিকে দৃষ্টি আকষর্ণ করে। ফার্দিনান্দ সেটা তুলে জোরে পড়তে থাকে। ক্যামেরা নীচ থেকে প্যান করে, দেওয়ালে টাঙানো বিজ্ঞাপনের উপর দিয়ে চলমান হয়, যেখানে ‘SCANDALE’ শব্দটি দেখা যায় আর অডিওতে ভেসে আসে ফার্দিনান্দের গলা ‘under my new knicker…. ‘SCANDALE’… youthful contour…. তখন মনে হয় সভ্যতার নামে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আমাদের রুচিবোধ। ঠিক তখনই আরও একটা ধাক্কা; যখন ঐ একই সিকোয়েন্সে ফার্দিনান্দের গলায় উচ্চারিত হয় রেনেসা এবং গ্রীক সিভিলাইজেশনের কথা (There was the greek civilization, there was the Renaissance)। আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয় এ সভ্যতার অন্তঃসার শূন্যতা। নারকীয়তা। এ হেন সভ্যতার আর একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত আমরা পাবো ‘পার্টি’ সিকোয়েন্সে। এখানে আমরা মানুষকে রোবট হয়ে যেতে দেখি। রোবটের সত্ত্বা নিয়ে প্রত্যেকটি মানুষ যেন তাদের নিজস্ব – একটা ভাষা গড়ে তুলেছে। নিজের নিজের বিজ্ঞাপনের ভাষা। পণ্যের ভাষা। প্রত্যেকেই নিজের নিজের দ্রব্যের কথা বলে চলেছে এককভাবে। কেউ কাউকে ‘কমিউনিকেট’ করে না। এমনকি স্বীকৃতি দেয় না অন্যের উপস্থিতিকেও। পার্টির বিভিন্ন দৃশ্য বিভিন্ন কালার ফিল্টারের মধ্যে দিয়ে ফ্রেমে উপস্থাপিত হয়। রুপাবয়বে স্পষ্ট একান্তবদ্ধ আত্মতা। প্রত্যেকের হাতে মদের গ্লাস এবং কথা বলে নিজেদের ‘প্রোডাক্টের মাধ্যমে’। পুরুষেরা বলেন গাড়ির বিজ্ঞাপনের ভাষায় (… fantastic braking power…) । মহিলারা বলেন সাবান অথবা পারফিউমের ভাষায় (keeping fresh is easy. Lava soap)। যেন নিজেরাই এক একটা ‘Commodity’ । নিজস্বতা বলে কিছু নেই। মানবীয় অনুভবগত বোধহীন এক একটা ‘Gesture’ কোন এক মহিলাকে দেখা যায় উর্ধ্বাংশ সম্পূর্ণ অনাবৃত ; হঠাৎ-ই কোন এক পুরুষ কোন মহিলাকে চুম্বন করে; আশেপাশে কে আছে বা কে কী করছে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই কারোর। আসলে সমস্ত ব্যাপারটাই একটা যান্ত্রিক পদ্ধতি মাত্র। মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলি মনের সহজাত প্রবৃত্তিগুলি সবই আজ লুপ্তপ্রায়। রোবটের মেকানিজমের মতোই হয়তো কোনো ‘অদৃশ্য হাত’ বোতাম টিপে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

কিন্তু ফার্দিনান্দ ‘মানুষ’। অন্তর্মুখী, চেতনা সম্পন্ন, বুদ্ধিমান। তাই ফোন নাম্বারের পরিবর্তে উচ্চারিত হয় ‘বালজাক’। আর মানুষ বলেই সে প্রতিবাদ করে ঐ যান্ত্রিক পদ্ধতির। সে বলে, দেখার জন্য আমার চোখ আছে, শোনার জন্য কান, বলার জন্য মুখ এবং তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে তাদের কাজ করে চলেছে কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো ঐক্যসাধন বা সংযোগ হচ্ছে না (There’s no co-ordination), আসছে না মানবিক পরিপূর্ণতা। প্রত্যেকটা অঙ্গই আলাদা আলাদা ভাবে কাজ করছে অথচ গোটা শরীরের কোনো স্পন্দন অনুভূত হচ্ছে না। ‘পিয়ের লে ফু’-র মূল কথা এটাই। আধুনিক সভ্যতার সমাজ যন্ত্রণা। সেইজন্য ঠিক ঐ সিকোয়েন্সেই উচ্চারিত হয় ‘ফ্ল্যার দ্যু মাল’ কবিতা গুচ্ছের কথা। যার প্রথম সংস্করণের (১৮৫৭) প্রায় একশ বছরের পর ‘পিয়ের লে ফু’ (১৯৬৪) চলচ্চিত্রে গদার যে একটি নরকযাত্রার কথাই বলছেন তা বুঝতে সময় লাগে না।
সমকালীন জীবনের বৃহত্তর পটভূমিকায় যান্ত্রিক আগ্রাসিতার চাপে ক্ষীয়মান মানবজীবনের ঐতিহাসিক ভবিষৎকেই যেন প্রশ্ন চিহ্নের সামনে ফেলে দেয় পরিচালক।
আর একটি সিকোয়েন্স এ প্রসঙ্গে উল্লেখ না করে পারছি না। ফার্দিনান্দ ও মারিয়ান গাড়ীতে , শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শহরের গ্লো সাইনগুলির লাল, নীল, সবুজ আলো গাড়ীর উইন্ডস্কিনে ধাক্কা খায়। তারই মাঝে রেডিওয় খবর শোনা যায় ভিয়েতনামে ১১৫ জন মারা গেছে। কি নির্লিপ্ত একটা খবর। কিন্তু ফার্দিনান্দ ভাবে, একই সঙ্গে গদার আমাদের ভাবতে বলেন – তারা কারা? তাদের নিশ্চয়কোন প্রেমিকা বা সন্তান ছিলো অথবা তারা কি সিনেমা দেখতে ভালবাসতো? শুধুমাত্র ১১৫ সংখ্যাটা দিয়ে কিছুই বোঝা যায় না। শুধু বোঝা যায় মানুষ আজ একটা সংখ্যা মাত্র। এই ইট, কাঠ, পাথরের সভ্যতার মাঝে মানুষকে তাই আজ সনাক্ত করা কঠিন। কিন্তু ফার্দিনান্দ চিন্তক। তাই সে ভাবে ঐ মানুষগুলির কথা। ফার্দিনান্দের মাধ্যমে এ আসলে গদারের মনুষ্যত্বের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। সমকালীন বিনষ্টিদীর্ন জীবনের ঐতিহাসিক চরিত্র ও পরিণাম ভাবনায় বিচলিত হন ছবির নায়ক। এ যেন তার স্ব- চেতনার মন্থনজাত বিষামৃত ।জীবন বোধ ও বিচার বোধের প্রতীকী তাৎপর্য।

হিংসা, হত্যা কিংবা মৃত্যু সবই ‘পিয়ের লে ফু’-তে ঘটে অত্যন্ত সাধারণভাবে। রেনোয়ার পেইন্টিং দিয়ে যাকে তুলনা করেন গদার সেই মারিয়ানের হাতে ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে ধরা কাঁচি যখন ফ্রেম জুড়ে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয় তখন আমরা বুঝি এ আসলে গদারের ‘হিংসার নন্দনতত্ত্ব’। এ ছবিতে নরহত্যাও খুব স্বাভাবিক ও নির্লিপ্ত ভাবে দেখানো হয়। যা দেখে মনে হতেই পারে আজকের সভ্যতায় এ খুবই সাধারণ ব্যাপার। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটা মানুষ আর একজনকে খুন করতেও পিছপা হয় না। হয় না আলাদা কোনো অনুভূতি যা তাকে মানুষ হিসাবে চিনতে সাহায্য করে।

শুরু থেকেই ‘পিয়ের লে ফু’ আধুনিক সভ্যতার অন্তঃসারশূন্যতাকে তুলে ধরে। তাই অধিকাংশ সিকোয়েন্সই লক্ষ্য করি মানব সভ্যতার ইতিহাসের উল্লেখ- কি ছিলাম, এখন কি হয়েছি। এ ছবিতে র‍্যাবো আছে। আছে বোদলেয়ার। রেনোয়া এবং পিকাসো, কিংবা বালজাক শব্দের উপস্থিতি। এরই সঙ্গে আছে পেইন্টিং, নগ্ন নারীদেহ, হিংস্ৰ কাঁচি কিংবা নরহত্যা, প্রেম এবং বিশ্বাসঘাতকতা। সবই পাশাপাশি;নির্লিপ্ত ভাবেই। ফলে খুব স্পষ্ট হয় বিভাজন রেখা। আধুনিক সভ্যতার বিচ্ছিন্নতা। সমস্ত পৃথিবীটাই আজ নৈরাজ্যময়। ভিয়েতনাম কিংবা লেবালনের উল্লেখ করে সেটাই বোঝাতে চান গদার। গভীর সত্য সন্ধানে মানসতায় আমাদের সমীহ আদায় করে নেন।

সুতরাং বলা যায় আমরা যা চেয়েছি দুটি বিশ্বযুদ্ধ তা দিতে পারেনি; রাস্ট্রে রাস্ট্রে হানাহানোথেমে থাকেনি;বরং যতটুকু মানবিকতা অবশিষ্ট ছিলো তাও নিঃশেষ করেছে। মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তিগুলি হারিয়েছে। নতুনত্ব নয়। পুনরাবৃত্তিতেই আজ সে অভ্যন্ত। তাই আজকের এই সভ্যতা কোনো অর্থেই নরকের চেয়ে উন্নত নয়, বরং জাহান্নামেই পর্যবসিত। এমতাবস্থায় একজন অনুভূতি প্রবণ, ইন্দ্রিয়- চেতনাসিদ্ধ, রক্তমাংসের মানুষের কাছে এই সমাজ-সভ্যতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া আসলে নরকযাত্রার ই সামিল।
পথচলতি বাস্তবতার মাঝেই এ ছবির সৃষ্টি হয়। সভ্যতার সংকটে যে আত্মনাশন, সর্বায়ত বিনাশ, তারই দিকে যেন তর্জনী সংকেত করেন পরিচালক। তীব্র অভিঘাতে চেতনার গভীরে পৌঁছে যান তিনি।
জাঁ লুক গদার।

সৌমিক কান্তি ঘোষ : শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.