• December 4, 2021

অফ স্ক্রীন বাঙালিয়ানা….’ওগো শুনছো’

 অফ স্ক্রীন বাঙালিয়ানা….’ওগো শুনছো’

ওহিদ রেহমান :- সেলুলয়েডের অন স্ক্রীন বাঙালিয়ানা আমরা মাঝে মাঝেই চাক্ষুষ করি। কিন্তু, বলিউডের অনেক সেলেব দম্পতির অফ স্ক্রীন কেমিস্ট্রিও বাঙালিয়ানায় ভরপুর। সকালের বেডটি নিতে নিতে বাজারের ফর্দ দফারফা করে ‘মারাঠি মানস’ কে। নটে শাক থেকে কুঁচি মাছ, টকদই থেকে রসগোল্লা, বলিউডের অনেক তারকার অফ স্ক্রীন অবস্থা ‘ঘেঁটে ঘ’ করে ছাড়ে। কথায় আছে, যারা রসগোল্লা খেয়ে বড়ো হয়, তাদের মুখের ভাষা মায়াবী। এই ভাষার প্রেমেই মজে আছে বিগ বি থেকে দেবগন। শেষ পাতে দই মিষ্টি না পেলে, অনেকেই হাঁক পাড়ে….ওগো শুনছো… হ্যাঁ, ঠিকই পড়লেন….। বাংলার রুচি, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস আজ প্রভূত জনপ্রিয় বি টাউনে। তালে তাল মিলিয়ে, অনেক বলিউডের সেলেব রপ্ত করেছেন, তাদের ‘বেটার হাফ’দের বহুল ব্যাবহৃত শব্দবন্ধ…ওগো শুনছো…

আসুন, একে একে প্রবেশ করি, ‘আমচি মুম্বাই’ থেকে ‘ক্যামোন আছো কোলকাতা’- বলা দম্পতিদের ড্রয়িং রুমে…। চিনে নিন, ‘ওগো শুনছো’ শোনা তারকাদের। টেক ওয়ান, সিন ওয়ান।

আমরা রয়েছি ‘জলসায়’। বচ্চন পরিবারের আলিশান একটি বাংলো। বলিউডের শাহেনশা আদতে বাঙালি জামাই ১৯৭৩ সাল থেকে। তবে একথাও সত্যি যে, কলকাতার সাথে অমিতাভের সম্পর্ক আরও পুরোনো। অভিনয়ের পূর্বে তিনি কলকাতার ‘ব্ল্যাকার এন্ড কোং’ নামের একটি জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কিন্তু, তিনি তো জন্মেছেন রুপোলী পর্দার বেতাজ বাদশা হবার জন্য, তাই পাড়ি দিলেন বোম্বে নাগরি (মুম্বাই)। ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাত হিন্দুস্তানি’ দিয়ে যে ইনিংস তিনি খেলতে শুরু করেছেন, ২০২১ এ দাঁড়িয়েও, তিনি নট আউট। হাজারো কেচ্ছা, সমালোচনাকে ফুৎকারে উড়িয়ে, তিনি আদন্ত্য পারিবারিক। দুই সন্তানের নাতি নাতনি কে নিয়ে সত্যিকার অর্থেই ‘যশবর্ধন রাইচাঁদ’ বচ্চন। বলিউডের এই অ্যাংরি ইয়ং ম্যান, ‘ওগো শুনছো’ শুনতে শুনতে, এখন নিজেই বলেন….

এবারে আমরা এসে পৌঁছেছি দেবগনের ডেরায়। পেল্লাই প্রাসাদ। দাঁড়ান, হ্যাঁ, নামটা পেয়ে গেছি, শিব শক্তি। এখানেই আমাদের বাঙালি জামাই অজয় দেবগন সংসার করছেন বঙ্গ তনয়া কাজলের সাথে। ‘ফুল উওর কাঁটে’ থেকে ‘সিংঘাম’, ‘গোলমাল’ থেকে ‘জখম’, অজয়কে দখলেই বলতে ইচ্ছে করে ‘হাম দিল দে চুকে সানম’। বলিউডের এই অ্যাকশন হিরো নব্বইয়ের দশকে ছিলেন উঠতি তরুন প্রজন্মের আইকন। ১৯৯৯ এ বিয়ের পিঁড়িতে বসা অজয়, বর্তমানে একজন আদন্ত্য ফ্যামিলি ম্যান। তাদের রয়েছে দুই সন্তান। পদ্মশ্রী অজয়, ওগো শুনছো শুনলেই, পরের টাস্কের জন্য তৈরি হয়ে পড়েন।

আমাদের এবারের জামাই ‘পান সিং তোমার’ থুড়ি ইরফান খান (প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি)। সুতপা শিকদার, অনেকের কাছেই এক আনকোরা নাম। কিন্তু, তিনিই ছিলেন সদ্যপ্রয়াত ইরফান খানের মেন্টর কাম ডাক্তার কাম লাইফ পার্টনার। একসাথে দু’জনে কাজ করছিলেন ‘বানেগি আপনি বাত’ ধারাবাহিকে। ইরফান অভিনেতা, সুতপা চিত্রনাট্যকার। ১৯৯৫ এ করলেন বিয়ে। তারপর ইরফান ‘লাঞ্চবক্স’ নিয়ে কখনো উঠলেন ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ থেকে ‘লাইফ অফ পাই’ এ। অসম্ভব এই গুনী মানুষটি কাজ করেছেন হলিউডের ‘ইনফার্নো’, ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ প্রভৃতি ছবিতে। ভূষিত হয়েছেন পদ্মশ্রী পুরস্কারে। তোমার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। ভালো থেকো বাংলার জামাই।

‘ওগো শুনছো’র আরেক শরিক আদিত্য চোপড়া। যশরাজ প্রোডাকশন হাউসের বড় ছেলে বিয়ে করেছেন পরিচালক রাম মুখার্জির মেয়ে রানি মুখার্জিকে। যশের খারাপ সময়ে তাকে ভরসার সঙ্গ দিয়েছেন রানি। একাধারে পরিচালক, প্রযোজক, পরিবেশক আদিত্য, যশরাজ প্রোডাকশন হাউসের সভাপতি, যা ভারতবর্ষের অন্যতম বড় সিনেমা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আদিত্য চোপড়ার হাত ধরেই সোনা ফলেছে বলিউডে। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে'(১৯৯৫), ‘মোহাব্বতে'(২০০০), ‘রাব নে বানা দি জোড়ি'(২০০৮) প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবি পরিচালক রূপে। রানির ভোকাল টনিকে বাংলার জামাই আদিত্য এখন সত্যিই অপরাজিত।

আমাদের নেক্সট জামাই বাবু, বলিউডের হট বাঙালি কুইন বিপাশা বসুর বর করণ সিং গ্রোভার। সিরিয়ালের সিরিয়াস অভিনেতা। তাই, বড় পর্দায় একটু কম উঁকি মারেন। কিন্তু, ‘অ্যালোন’ সিনেমায় অভিনয় তাঁদেরকে আর একা থাকতে দিল না। নিন্দুকেরা পই পই করে বারণ করেছিল বিপসকে, কিন্তু, বিপাশা মানুষ চিনতে ভুল করেন নি। ‘কসৌটি জিন্দেগী কে’ থেকে ‘কবুল হ্যায়’, করণ চিনিয়েছেন তার জাত প্রতিভা। করণ যেন বলতে চায়,
‘ক্ষুদ্র আমি তুচ্ছ নই,
জানি আমি ভাবী বনস্পতি।’
আমরা নিশ্চিত, করণ আগামী দিনের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ঝুলির শেষ বিড়ালটি থুড়ি বরটি হলেন, রুপোলী পর্দার ব্যাডবয় আশিস বিদ্যার্থী। কলকাতার মেয়ে রাজষী বড়ুয়ার স্বামী পর্দার এই ডাকসাইটে ভিলেন। ১৯৮৬ থেকে পর্দা কাঁপানো এই অভিনেতা কাজ করেছেন ভিন্ন ভিন্ন ভারতীয় ভাষার ছবিতে। অভিনয় কে জীবন্ত করতে গিয়ে আশিস অনেকবার হয়েছেন মৃত্যুর মুখোমুখি। একবার তো জলে ডুবে মরেই যেতে বসেছিলেন ছত্তিশগড়ের এক দূর্গে শুটিং চলাকালীন। এখনো পর্যন্ত পর্দায় ১৮০ বারের অধিক তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। এহেন, ডেয়ার ডেভিল অভিনেতাকে প্রতি মুহূর্তে চোখে চোখে রাখে আমাদের বাঙালী তনয়া রাজষী। আশিসের সাফল্যে গর্বিত আমরা। ভালো থেকো তোমরা।

‘Behind every successful man, there is a woman’- নিশ্চয় আপনার মনে পড়ছে এই লাইনটি।
বিশ্বাস করা হয়, জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ আকাশেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। তারকাদের অধিকাংশই ঘর বেঁধেছেন নিজস্ব ভালোলাগায় ভরে করে। হিন্দু শাস্ত্র মতে, এই বিবাহ গুলোকে বলা হয় ‘গান্ধর্ব’। এইভাবেই, বিশ্বজোড়া বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বা ছড়িয়ে পড়েছে কাকদ্বীপ টু ক্যালিফোর্নিয়া, বান্দ্রা টু বরিশাল। এই সভ্যতা এখন মিশ্র সংস্কৃতির মিশেল। একক সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের দিন এখন ফুরিয়েছে। তেমনিভাবে ‘রিল’ ও ‘রিয়ালের’ ফারাক ও ঘুচে যাচ্ছে দিন প্রতিদিন। বলিউড তার উজ্জ্বলতম নমুনা।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post