• December 4, 2021

হিরোশিমা – নাগাসাকিঃ ফিরে দেখা

 হিরোশিমা – নাগাসাকিঃ ফিরে দেখা

সুমন কল্যাণ মৌলিক 

আমাদের যাপনচিত্রের আরেক নাম ইতিহাস। একথা ঠিক ফেলে আসা সময়ের ইতিবৃত্ত ইতিহাসের অনিবার্য উপাদান তবুও গতানুগতিকতার বাইরে,প্রতিদিনের নিত্যনৈমত্তিকতার বাইরে এমন কিছু মুহুর্ত থাকে যা পাল্টে দেয় মানবজীবন।সেই মুহূর্তগুলো সমাজকে বদলে দিতে পারে,আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক চালচিত্রে স্থায়ী দাগ রেখে যেতে পারে।ইতিহাসে সেই মুহূর্তগুলিকে বলে ‘ জলবিভাজিকা ‘( watershed)।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসিকা শহরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পরমাণু বোমা নিক্ষেপ সেই ধরণের নির্নায়ক মুহূর্ত।

 যে কোন ঐতিহাসিক ঘটনা,বিশেষ করে যুদ্ধের মত সর্বাত্মক ধ্বংসের আখ্যান পাঠের সময় আমাদের এক নৈতিক অবস্থান নেওয়ার অভ্যাস থাকে,বিশেষ করে ন্যায়- অন্যায়ের প্রশ্নে।যুদ্ধের দুই পক্ষের মধ্যে কে ঠিক তা বিচার করার আকাঙ্খা থেকেই সম্ভবত আমরা পক্ষ নির্ধারণ করি।যেমন মহাভারতের যুদ্ধে আমরা পান্ডবদের পক্ষ নিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি কারণ দুর্যোধনের নেতৃত্বাধীন পক্ষের অনুষঙ্গে অনেক অন্যায়ের কাহিনী জড়িয়ে আছে।কিন্তু এ পক্ষাবলম্বন কিন্তু তলিয়ে বিচার করলে খুব যৌক্তিক নয়।আমরা যদি শুধু মহাভারতের উদাহরণ দেখি তাহলে দেখব কৌরবদের বিভ্রান্ত করতে জতুগৃহে এক বনবাসী পরিবারকে ন্যায়ের ‘ প্রতীক’ পান্ডবরা মদ- মাংস সহযোগে আতিথ্য দানের মাধ্যমে বাস্তবত যুদ্ধের ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করে কৌরবদের হাতে মৃত্যু নিশ্চিত করে।তাই এই বনবাসী মানুষের হত্যা হয়ে ওঠে আধুনিক রাজনীতির ভাষায় কোল্যাটারাল ড্যামেজ।কর্নকে ছলে বলে হত্যা,ধর্মপুত্রের মিথ্যাভাষনের নৈতিকতা প্রশ্নহীন আনুগত্যে আমরা মেনে নিই কারণ শেষ বিচারে ইতিহাস আদতে জয়ীদের কাহিনী।আর আধুনিক যুগে যুদ্ধ তা প্রথম হোক বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আদতে ক্ষমতার পাটিগণিত যেখানে পক্ষ,গোষ্ঠী, শত্রু- মিত্র, ন্যায়- অন্যায় গোটাটাই একটা আপেক্ষিক ধারণা এবং যে কোন মূল্যায়ণই নিয়তপরিবর্তনশীল।হিরোশিমা – নাগাসাকির ইতিহাস আলোচনায় আমরা যেমন বোমা নিক্ষেপের ঘটনাক্রমটিকে জানব,ঘটনার কুশীলবদের জানব,তেমনি কথা বলব তার প্রেক্ষাপট নিয়ে এবং বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মানবজাতির ইতিহাসে তার প্রভাব নিয়ে।     

       

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনাক্রম কম- বেশি বহু আলোচিত তবুও কালানুক্রমিকতার স্বার্থে আমরা আরেকবার বিষয়টা দেখে নেব।১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা শহরে বোমারু বিমান এনোলা – গে ( বি-২৯ শ্রেণির বিমান) এর সাহায্যে জাপানের স্থানীয় সময় ৮-১৫ মিনিটে একটি আণবিক বোমা ( লিটিল বয়) নিক্ষেপ করে।বোমাটি হিরোশিমার ২০০০ মিটার উপরে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং এক মেঘের আকারে ( মাশরুম ক্লাউড নামে পরিচিত)  মাটিতে নেমে আসে।মুহূর্তের মধ্যে শহরের নব্বই শতাংশ এলাকা মুছে যায়।৮০,০০০ মানুষ তৎক্ষনাৎ মারা যান এবং ৩৫,০০০ মানুষ  মারাত্মক ভাবে আহত হন।তারপর তেজস্ক্রিয়তার ভয়ংকর ক্ষত নিয়ে কত প্রজন্মকে মৃতবৎ জীবন যাপন করতে হয় তার কোন ইয়ত্তা নেই।জানা যায় এই বোমাটির মধ্যে ৯,০০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম মজুত ছিল। এই ঘটনার তিনদিন পর ৯ আগস্ট জাপানের জাহাজ নির্মাণের জন্য বিখ্যাত শহর নাগাসাকিতে জাপানি স্থানীয় সময় ১১-০২ মিনিটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি বোমা নিক্ষেপ করে।এবার বোমাটির নাম ছিল ফ্যাট বয় এবং যে বোমারু বিমানটি বোমাটি বহন করেছিল তার নাম ‘ বকসকার’।বোমাটি ছিল ২২,০০০ টিএনটি দিয়ে তৈরি  এবং বিস্ফোরণের কারণে তৎক্ষনাৎ ৬০,০০০-৭০,০০০ মানুষ মারা যান।এখন প্রশ্ন উঠতে পারে হিরোশিমার ভয়াবহতা উপলব্ধি করার পরেও নাগাসাকিতে বোমা ফেলা হল কেন! এ ব্যাপারে মার্কিন লবির বক্তব্য ছিল পটাসডাম সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল জাপান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করবে।কিন্তু হিরোশিমার পরেও জাপানি ওয়ার কাউন্সিল আত্মসমর্পনের কথা বলে নি।তাই তাঁদের বাধ্য করার জন্য পুনরায় বোমা নিক্ষেপ। নাগাসাকির ঘটনার পরে জাপানের সম্রাট হিরোহিতা ১৫ আগস্ট এক রেডি বার্তায় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা ঘোষণা করে।যদিও মার্কিন বক্তব্যের বিরুদ্ধেও অন্য মত আছে।তবে জাপানে আনবিক বোমা নিক্ষেপের সমগ্র পরিকল্পনা ( ম্যানহাটন প্রজেক্ট নামে পরিচিত)  যার দায়িত্বে ছিল সেই জেনারেল  লেসলি আর গ্রিভের বয়ান মোতাবেক যদি জাপান নাগা সাকির পরেও আত্মসমর্পণ না করত তবে ১৭-১৮ আগস্টের মধ্যে তৃতীয় বোমা নিক্ষেপ করা হত। 

         

 হিরোশিমা – নাগাসাকি ঘটনাপ্রবাহের মূল চরিত্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্ত হল সেটাও কম চিত্তাকর্ষক নয়।১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধের জোট বিন্যাসের একদিকে ছিল অক্ষ শক্তি ( রোম- বার্লিন – টোকিও)। অন্যদিকে মিত্র শক্তি গ্রেট ব্রিটেন,ফ্রান্স ও তাদের সহযোগী দেশ ও তাদের উপনিবেশগুলি।সোভিয়েত ইউনিয়ন এই মিত্র শক্তির অংশ হিসাবে প্রথমে না থাকলেও ঘটনাক্রম তাদের মিত্র পক্ষভুক্ত করে।কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদেশ নীতি মেনে নিজেদের নিরপেক্ষ ঘোষনা করে।কাগজে কলমে এই নীতি থাকলেও বাস্তবে ‘ ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি ‘ নীতি মেনে বিবদমান পক্ষ গুলিকে অস্ত্র বেচে প্রচুর মুনাখা অর্জন করে।তবে যুদ্ধ শুরু হলে মিত্র শক্তি আমেরিকার কাছে আরও সহজ শর্তে ( নামমাত্র মূল্যে) অস্ত্র, রসদ ও ওষুধের জোগান দাবি করতে থাকে।কিন্তু সাধারণ ভাবে আমেরিকার জনমত ও মিলিটারি কর্তৃপক্ষ গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্সকে সেই ধরণের সাহায্য দিতে অস্বীকৃত হয়।এর কারণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, ধার মেটাতে মিত্র শক্তি পারবে না এমন ধারনা।মার্কিন সেনানায়কদের এমনো আশঙ্কা ছিল যে হিটলারের অগ্রগতির সামনে দাঁড়াতে না পেরে গ্রেট ব্রিটেন আত্মসমর্পণ করবে ফলত সেই অস্ত্রগুলি জার্মানদের হাতে চলে যাবে।১৯৪০ সালের ২ সেপ্টেম্বর মার্কিনীরা ব্রিটেনকে ৫০ টি ডেস্ট্রয়ার দেয়।বদলে উত্তর আমেরিকায় ব্রিটেনের অধীনে থাকা নিউ ফাউন্ডল্যান্ড ও বেশ কিছু ক্যারিবিয়ান দ্বীপের ৯৯ বছরের জন্য লিজ পায়।এর পরের ঘটনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র গ্রেট ব্রিটেন সহ মিত্র শক্তির দেশ গুলির জন্য ‘ Lend-Lease Deal ‘ চালু করে।এর ফলে অস্ত্র কিনে পয়সা মেটানোর শর্তকে বহুলাংশে নমনীয় করা হয়।কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির সাত নম্বর আর্টিকেল যাতে বলা হয়েছে এই চুক্তি মোতাবের যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়াতে এক নতুন, মুক্ত অর্থনৈতিক দুনিয়া তৈরি করতে হবে।এর আসল অর্থ হল এতদিন ধরে চলে আসা গ্রেট ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন পাউন্ডের অনুকূলে সাজানো পৃথিবীর বদলে ডলারের অনুকূলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নতুন আর্থিক ব্যবস্থা গঠিত হবে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল নিজেরা যুদ্ধে না যোগ দিয়েও নাজি জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত করা এবং আগামী পৃথিবীতে তাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করা।   

             

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের ক্ষেত্রে পার্ল হারবার ঘটনার উল্লেখ বারংবার করা হয়।এটারও কিন্তু একটা ধারাবাহিকতা আছে।বিংশ শতাব্দীর সূচনায় জাপান সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করে।চিন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে দুটি সফল যুদ্ধ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সফল অংশগ্রহণ তাদের গ্লোবাল পাওয়ারের মর্যাদা দেয়।গ্রেট ডিপ্রেশন জনিত বিশ্বজনীন আর্থিক সংকটের সময় জাপান চিনের সমৃদ্ধ মাঞ্চুরিয়া দখল করে।ফলে লিগ অব নেশনস জাপানের বিরুদ্ধে শাস্তির হুমকি দেয়। এর পর আসে নানজিং গণহত্যা। তখন এশীয় মহাদেশে বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ গুলিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে তৎপর মার্কিন দেশ জাপানকে রুখতে তার বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।এই চলমান বিরোধের ফয়সালার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যুদ্ধ অনিবার্য ছিল। 

                 

এখন প্রশ্ন হল হিরোশিমা ও নাগাসাকির এই ভয়াবহ ধ্বংস লীলা প্রত্যক্ষ করার পর আমরা কি পরমাণু অস্ত্রকে পরিত্যাগ করেছি বা আণবিক অস্ত্র মুক্ত পৃথিবী গঠনের লক্ষ্য কে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি!  উত্তরটা হল না এবং  না।১৯৪৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া নিজেদের পরমাণু অস্ত্রধর দেশ হিসাবে ঘোষনা করে।তারপর ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, চিন,ভারত,পাকিস্তান, ইজরায়েল, উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে এই মুহূর্তে ১৮ টি দেশ পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে সমর্থ। এই গ্রহে পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা মোটামুটি ২৬০০০- ২৮০০০, যা দিয়ে পৃথিবীকে বেশ কয়েকবার ধ্বংস করা যায়।আমরা যদি ইতিহাসের পাতায় নজর ফেরাই তাহলে দেখতে পাব যেদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে বার্লিনের পতন ঘটছে তখন এই গ্রহের দখলদারি নিয়ে ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা ঘটছে।এ কথা অনস্বীকার্য যে ঠান্ডা যুদ্ধের সময়পর্বে আণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা চরমে ওঠে।এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ করা দরকার কিউবা মিসাইল সংকট যা সারা পৃথিবীকে আরেকটি আণবিক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।এটা ছাড়াও গত সাত দশকে আমরা ছোট বড়ো অজস্র আঞ্চলিক যুদ্ধ দেখেছি যা আগামীদিনে বড়ো যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে পারত।এক্ষেত্রে আলাদা করে উল্লেখ করা দরকার ভারত- পাকিস্তান ধারাবাহিক দ্বন্ধের কথা।দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের এই নির্বোধ অস্ত্র প্রতিযোগিতা দুদেশের সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। কেউ কেউ একথা বলার চেষ্টা করছেন যে বিশ্বের প্রধান দেশগুলি যদি পরমাণু অস্ত্রধর হয় তবে কোন দেশই কারোর বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের সাহস পাবে না।ফলে পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে।কিন্তু এই যুক্তির সবচেয়ে বড়ো ভ্রান্তি হল তা দেশগুলির মধ্যে এক ব্যয়বহুল অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করে ফলে দেশগুলোতে আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসে। 

                 

একথা ঠিক পারমাণবিক অস্ত্র  প্রসার নিরোধক কিছু আইন ও প্রটোকল জাতি সংঘের প্রযোজনায় এসেছে।পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ( ভারত,পাকিস্তান, ইজরায়েল ও নবগঠিত দক্ষিণ সুদান ব্যতিক্রম) তাতে স্বাক্ষর করেছে।কিন্তু সমস্যা হল এই চুক্তিগুলো প্রথম বিশ্বের আধিপত্যকে নিশ্চিত করেই তৈরি হয়েছে ফলে এই চুক্তিগুলির মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত পৃথিবীর সম্ভাবনা নেই। আজ তাই আমাদের ভরসা করতে হবে যুদ্ধ বিরোধী, পরমাণু অস্ত্র মুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য শান্তিকামী মানুষের গণ প্রতিরোধের উপর।আমরা যদি যুদ্ধ মুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে না পারি তাহলে পরমাণু যুদ্ধের আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকাই আমাদের ভবিতব্য।

সুমন কল্যাণ মৌলিক : মানবাধিকার কর্মী, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক।

  

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • বেশ ভালো লেখা। চেতনা ও জ্ঞ্যানে সমৃদ্ধ হলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post