• December 9, 2021

দয়াময় সম্প্রদায়ের ধর্ম ও দর্শন, পর্ব-১

 দয়াময় সম্প্রদায়ের ধর্ম ও দর্শন, পর্ব-১

রঞ্জনা বিশ্বাস


ভারত উপমহাদেশে বস্তুবাদী দর্শন বলে কিছু হয় না; সবই প্রায় ভাববাদী দর্শন। এক সময় ভারতীয়দের দর্শনের আদি নাম ছিল ‘ন্যায়শাস্ত্র’- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দর্শনশাস্ত্র’। যুক্তিবাদী মানুষের দর্শন আর ভাববাদী মানুষের দর্শনে পার্থক্য যা-ই থাকুক ,একথা মানতে হবে যে- বিজ্ঞানের আবিষ্কারের আগে দর্শনের মতো-ই ধর্মও বস্তুর কারণ ও উৎপত্তি  নিয়ে আলোচনা করতো। আদিকালে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে যেতো তখন ধর্মই তাকে পথ দেখাতো। এ উপমহাদেশে এখনও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। ধর্মের প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে বিশ্বাস বা প্রত্যয়। সেই আদি কাল থেকেই মানুষ এক মহাশক্তিকে বিনা বিচারে- বিনা তর্কে  মেনে নেয় এবং বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে নানা রকম আচার রীতি। ফলে গোত্রে গোত্রে মানুষের বিশ্বাস ও বিশ্বাস কেন্দ্রিক আচার রীতিরও ভিন্নতা দেখা দেয়। গীতায় চার শ্রেণির বিশ্বাসীর বা ধার্মিকের কথা বলা হয়েছে। এরা হলো- আর্ত, অর্থার্থী, ভক্ত ও জিজ্ঞাসু। যে আর্ত সে বিপদ থেকে পরিত্রানের আশায় মহাশক্তির আরাধনা করে। আর যে ব্যক্তি কোনো ধরনের অভাব বা আকাক্সক্ষা পূরণ হওয়ার বাসনায় আরাধনা করে সে অর্থার্থী। আর যে ভক্ত, সে বিনা শর্তে শ্রষ্টার আরাধনা করে। আর জিজ্ঞাসু যে, সে নানা রকম প্রশ্ন, প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে মহাশক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার ভিতর দিয়ে তাকে উপলব্দি করে।বিখ্যাত দার্শনিক স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত মানুষকে তিনটি উপায়ে সাধন কর্মের প্রণালী বাতলে দিয়েছেন- জ্ঞানীর জন্য জ্ঞানমার্গ, নিপাট ভক্তের জন্য ভক্তিমার্গ আর কর্মীর জন্য কর্মমার্গ। তবে সকল ধর্ম বিশ্বাসীর বিশ্বাস একটি জায়গায় স্থির হলেও আরাধনার আচার ও রীতি পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে ধর্মের সাথে ধর্মের বিরোধ প্রকট হয়ে ওঠে। এই বিরোধের জের ধরে প্রান্তিক মানুষেরা ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। চতুবর্ণের ঘেরাটোপের মধ্যে পড়ে প্রান্তিক মানুষ যখন ক্রমেই আরো অস্পৃশ্য হয়ে উঠতে থাকে, যখন সমাজে তাদের জায়গা হয় একেবারেই নিচে, তখন এই জলঅচল মানুষের বেদনা হৃদয়ে ধারণ করে মহামানবের আবির্ভাব হয়। ইতিহাসে সেই সব মহামানবের কারো ঠাঁই হয়েছে কারো হয়নি। কিন্তু তাতে সেই সব মানুষের জীবনে কোনো ছন্দপতন ঘটে না। তেমনই এক মহামানব আনন্দচন্দ্র নন্দী- যাকে মহারাজ আনন্দ স্বামীজী বলে আখ্যায়িত করে থাকেন তার অনুসারীরা। বাংলাদেশে তার প্রবর্তীত ধর্ম দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক নাম-‘ সর্বধর্ম সমন্বয়’ বা ‘ সর্বধর্ম যোগ’ হলেও এটি ‘দয়াময়’ নামে বিশেষ পরিচিত। এই ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে আশ্চর্যরকম সমন্বয়বাদী ধ্যানধারণা প্রকট। বাংলদেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া , কুমিল্লা, নরসিংদী, চট্টগ্রামঅঞ্চলে দয়াময় সম্প্রদায়ের সন্ধান মেলে। এছাড়া ভারতের কোলকাতা, ২৪ পরগণা এবং আগর তলায় দয়াময় সম্পদায়ের অনুসারীরা রয়েছেন।দয়াময় সম্প্রদায়ের কোনো উপাস্য দেবতা নেই। তারা নিরাকার শ্রষ্টাকে দয়াময় নামে ডেকে থাকে। এক ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের উপাসনার মাধ্যমে আনন্দ স্বামীজী এবং তাঁর সুযোগ্য শিষ্য মনোমোহন দত্ত ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ বা সর্বধর্ম যোগ’ সাধনের ভাবান্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। আনন্দস্বামীজী মনে করেন, ‘ ঈশ্বরের কাছে ভিন্ন ভিন্ন জাতি বলিয়া কিছু নাই। সকলেই এক জাতি। সকলেই ঈশ্বরের ‘দয়াময়’ নামের গুণে এক, কারণ তার দয়াতেই এই বিশ্বব্রহ্মান্ড টিকে আছে।’  যেহেতু সকল ধর্মের মানুষই বিশ্বাস করে ঈশ্বর দয়ালু, তার কৃপা বা দয়ার গুণে সকল জীব বা সৃষ্টিকুল বেঁচে আছে তাই ঈশ্বরের একমাত্র ‘ দয়াময়’ নামের কারণেই মানুষ মুক্তি পেতে পারে, হিংসা- ভেদাভেদ ভুলে এক হতে পারে। দয়াময় সম্প্রদায়ের বিখ্যাত প্রচারক ও সাধক মনোমোহন দত্ত বলেন- ‘ দয়াময় নামেতেই সকল নামের যোগ আছে এবং এই নামের মহিমাতেই সকল জাতি এবং সকল ধর্ম এক হইবে। নাম লইয়াই জগৎ জীবন মুক্তির আশা পূর্ণ করিতে পারিবে।’

১.ভগবানিয়া, বলাহারি প্রভৃতি লোকধর্মের কোনো লিখিত ধর্মগ্রন্থ নেই কিন্তু দয়াময় সম্প্রদায় ব্যতিক্রম । মহারাজ আনন্দস্বামীজী রচিত ‘প্রকৃততত্ত¡’ হচ্ছে এই সম্প্রদায়ের অমূল্য দলিল। শ্রী আনন্দ স্বামী কতৃক প্রচারিত ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ ধর্মের মূল গ্রন্থই হচ্ছে প্রকৃতিতত্ত¡।এই ধর্মের বিশেষ তত্ত¡ ও সাধনা প্রণালীই ‘প্রকৃত তত্ত¡’ গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। প্রকৃত তত্তে¡ পঞ্চান্নটি তত্ত¡সূত্র রয়েছে যার মাধ্যমে কর্মমার্গ, জ্ঞান মার্গ ও ভক্তি মার্গের নানা দিক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ বের হয়ে ১২৯০ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম সংস্করণে এর মূল্য রাখা হয় আট আনা। বইটির ভ’মিকা লিখেছিলেন শ্রী দয়াল চন্দ্র ঘোষ। এরপর বইটির ২য় সংস্করণ বের হয় ১৩১৭ বঙ্গাব্দে বা ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে। ২য় সংস্করণের ভ’মিকা লিখেছিলেন আনন্দ স্বামীর একমাত্র পুত্র শ্রী মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দী। প্রকৃত তত্ত¡গ্রন্থে বর্ণিত সকল তথ্য অনুসরণ করা ভক্তের একান্ত কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়। এই গ্রন্থ মতে- এক পরম ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু ছিল না। তার সত্তাতেই কার্য কারণ উভয়ই নিহিত।তঁর ইচ্ছাতেই সকল কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। সকল শক্তি তাঁর। তিনি ছাড়া পূর্ণ বা আংশিক শক্তিশালী আর কিছুর অস্তিত্ব জগতে নেই। এ কারণে- এই সম্প্রদায়ের ভক্তকুল বিপদে-আপদে-সম্পদে, অভাবে, জন্মে-মৃত্যুতে সর্বাবস্থায় তারা একটি প্রার্থনাই করে-‘ জীবন মুক্তি সমন্ধে তোমার যা ইচ্ছা তা সম্পন্ন হোক।’ এই পরম ব্রহ্মকেই তারা ‘ দয়াময়’ নামে ডেকে থাকে। এছাড়া তাদের আর কোনো উপাস্য নাই। তবে যার মধ্যে জগত দেখতে পাওয়া যায় তাকে ঈশ্বর বলে মনে করা যেতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

২.তবে স্বামীজি বারবার মনে করিয়ে দেন যে,‘ সাকার মুর্ত্তি নির্ম্মাণ করিয়া পূজা করার কোনো আবশ্যকতা নাই। ঈশ্বর নিজ হস্তে যাহা নির্ম্মান করিয়া দিয়াছেন তাহা হইতে অচেতন জড় কোনো মুর্ত্তিকে কখনও শ্রেষ্ট মনে করা যাইতে পারে না।’

৩. এই বক্তব্যে এটা প্রতীয়মান হয় যে, দয়াময় সম্প্রদায় নিরাকার এক ব্রহ্মার আরাধনা করে। তারা মুর্তির উপাসক নয়। তবে তারা মানুষকে মুর্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে। এই কারণে- মায়ের মুখের দিকে তাকালে যে প্রেমময়ী মুর্তি মনে আনন্দ দান করে, সহপাঠী, সমবয়সীর প্রতি যে প্রণয় মনে প্রফুল্লতা আনে, ভাই বোন আত্মীয় পরিজনের প্রতি যে প্রীতি আমাদের মনে যে ভাব ভালোবাসার জন্ম দেয়, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি মনের মধ্যে যে প্রশান্তি আনায়ণ করে এর সবই হচ্ছে সাকার উপাসনার ফল। এর জন্য আলাদা করে মুর্তি নির্মাণের প্রয়োজন নেই। কেবল হৃদয়ভাব জাগ্রত করা আবশ্যক বলে ‘দয়াময়’ সম্প্রদায়ের ভক্তগণ মনে করেন। তবে তারা একথাও বলেন-‘ একমাত্র পরম ব্রহ্ম থেকে মানুষ সৃষ্টি হলেও পৃথিবীতে মানুষ একই ভাবে পরম সত্তার আরাধনা করে না। এমন কি দুজন মাত্র মানুষের মধ্যেও একই রকম কাজ ও একই রকম ভাব লক্ষ করা যায় না। এই সকল কাজ ও ভাবের পিছনে পরম ব্রহ্মের বিশেষ অভিপ্রায় আছে। সে অভিপ্রায় বুঝতে হলে হৃদয়কে শান্ত করা আবশ্যক। তারা বলেন,‘ প্রাণায়াম, ন্যাসাদি, হঠযোগের কাজ করার প্রয়োজন এখন শেষ হয়েছে। নাম জপ এবং ধ্যানই মুখ্য সাধন।

৪.নাম হচ্ছে ‘দয়াময়’ নাম। এই নাম জপ করার মধ্য দিয়ে মন শান্ত হয়। শান্ত মনে শান্তি বিরাজ করে। শান্তি দয়াময়ের এক স্বরূপ। তবে শান্তি অশান্তি এক জায়গাতেই স্থির হয়ে আছে। এরা উভয়ই মঙ্গল সাধক।তাই শান্তি ও অশান্তিকে সমান ভাবে গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দয়াময়ের অনুগামীরা মনে করে ‘ মঙ্গলের রাজ্যে অমঙ্গল অশান্তি কিছুই থাকিতে পারে না।’ এই বিশ্বাসে কেবল দয়াময়কেই আশ্রয় করতে হবে। যখন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মসমূহ তাদের চারপাশে নানা রকম বিধিবিধানের বেড়া দিয়ে রেখেছে, যখন তারা নিজ নিজ শাস্ত্রকে, মত-পথ ও দর্শনকে শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র অনুসরণীয় বলে মনে করছে তখন দয়াময় সম্প্রদায় বলছে – পরম দয়াময়ের কাছে জগতের কোনো ধর্মই অগ্রাহ্য হয় না। দয়াময়ের কাছে ভিন্ন ভিন্ন জাতি বলে কিছু নাই, তার পরম দয়ার গুণে সকলেই এক জাতি । আমরা তা সাময়িক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনাদীতে পর্যবসিত করেছি। আনন্দ স্বামী বলেন,‘ কেহই সরল বিশ্বাস ভিন্ন, কৈতবযুক্ত হৃদয় লইয়া ধর্ম প্রচার করেন নাই বরং যাহারা সেই প্রচারানুযায়ী কার্য্য অবলম্বন করিয়াছেন তাহারাই এক এক সম্প্রদায়বদ্ধ হইয়াছেন। এই সাম্প্রদায়ীকতা শৈশব জীবনের শৈশবাবস্থা, তাহা হইতে মনের বিরাগ পৌঢ়াবস্থা এবং তাহা সম্যকরূপে পরিত্যাগ সৎ ও সিদ্ধাবস্থা।’

৫. অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে ধর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বালকিল্য আচরণ। এই আচরণ থেকে মানুষের প্রতি বিরাগ তৈরি হয় যা তার মনকে পৌঢ়ত্ব বা বার্ধক্যে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি এই বিরাগ ভাবকে জয় করতে পারে, ভেদাভেদ জ্ঞান শূন্য হতে পারে সেই সিদ্ধি লাভ করে। দয়াময়ের কাছে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। প্রকৃততত্তে¡র বিশ নং সূত্রে স্বামীজী বলেন,‘ প্রত্যেক ধর্ম্মাবলম্বীদিগের মধ্যে কেহ বা মধ্যস্থ কোন ব্যাক্তির প্রতি, কেহ বা কল্পিত কোন এক কিংবা অধিক মূর্ত্তির প্রতি, কেহ কেহ বা বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, জল, স্থল, পক্ষী, চন্দ্র, সূর্য্য প্রভৃতি পদার্থ সকলের উপর, কেহ বা শুদ্ধাচার, কেহ বা অশুদ্ধাচারের উপর, কেহ বা কোন ব্যক্তি বিশেষকে গুরু স্বীকার করিয়া তাঁহার বাক্যের প্রতি পূর্ণ বিম্বাস স্থাপন পূর্বক ও কেহ বা কোন পুস্তকের লিখিত বিষয়ের উপর নিভৃর করিয়া পরিত্রাণের আশা করিতেছে। ইহারা কেহই বিপথগামী নহে। সকলেই পথ চলিয়া যাইতেছে। যাহার যেরূপ বিশ্বাস হইতেছে তাহাই তাহার জন্য নির্দিষ্ট ছিল বলিতে হইবে। এই নির্দ্দিষ্ট ব্যাপার সাময়িক ও ঈশ্বরের মঙ্গল ইচ্ছার অধীন। প্রত্যেকে ইহার মধ্য দিয়া প্রস্তুত হইয়া প্রকৃত জ্ঞানের পথে আসিবে ও সময়ে সকলে প্রেমযোগে মিলিত হইয়া পরিত্রাণ লাভ করিবে, ইহাতে সন্দেহ করিবার কারণ কিছুই নাই।’প্রায় সকল ধর্মেই মৃত্যুর পরে আর এক জীবনের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে। তারা একে স্বর্গ বা বেহেস্ত এবং নরক বা দোজখ বলে থাকে। সকল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই এই ধারণা পোষন করে। কিন্তু দয়াময় সম্প্রদায়ের ভক্তগণ মৃত্যুর পর স্বর্গ নরকের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। তারা বলেন, ‘ স্বর্গ ও নরক নামে কোনো নির্দিষ্ট স্থান নাই। মৃত্যুর পর নিজ নিজ কার্যানুসারে স্বর্গ নরক ভোগ করিতে হইবে এইরূপ ধারণাও অলীক। কেননা শরীরের সঙ্গেই শুভশুভাদির উৎপত্তি এবং তাহার সঙ্গেই নাশ।’

৬.তারা মনে করে স্বর্গ শব্দের অর্থ সুখ আর সুখময় ভাবই হচ্ছে স্বর্গ। মানুষ সুখের জন্যই ব্যকুল এজন্য স্বর্গের ভাবও সুখের মধ্যে পরিব্যাাপ্ত হয়ে আছে। আবার বিষয়ের মধ্যে অসুবিধা বা দুঃখ বোধ তৈরি হয়। এই দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে সে দয়াময়ের কাছে প্রার্থনা করে। দয়াময় তার দুঃখ হরণ করেন, মুক্তি দেন। কাজেই মৃত্যুর পরে তার দেহ নাশ হয় কিন্তু আত্মা দয়াময়ের সাথে লীন হয়ে যায়। আনন্দ স্বামী বলেন- ‘ আমাদের দৈবসিক কার্য্য ও ভাবের মধ্যে পর্যায়ক্রমে স্বর্গ ও নরকের ভাব যাতায়াত করিতেছে। জীবিতাবস্থাতে প্রকৃত সুখের ভাব ও ক্লেশ নিবৃত্তি না দেখিয়া মানুষের মৃত্যুর পর সম্পদ অথবা বিপদের দিন আসিবে, এই বিশ্বাস পূর্বকালের সাধকদিকের মনে স্থান প্রাপ্ত হওয়াতে সে ভাবী সুখ ও দুঃখকেই তাহারা স্বর্গ ও নরক নামে অভিহিত করিয়াছিলেন।’

৭.দয়াময় সম্প্রদায় পূনর্জন্মবাদে বিশ্বাসী নয়। তারা বিশ্বাস করে দয়াময়ের দয়ার গুণেই মানুষের মধ্যে থাকা দুঃখের নিবৃত্তি হবে এবং চির সুখের ভাব তাকে আচ্ছন্ন করবে। পুনরায় জন্ম হলে পূর্বের জন্ম সম্পর্কে সকল কাজ অর্থহীন হয়ে যায়। তারা মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মতো শেষ বিচারের কথাও বলে না। তারা মনে করে ‘ মঙ্গলময়ের রাজ্যে এমন দিন অবশ্যই আসবে যেদিন প্রত্যেক মৃত মানুষ পূর্বের শরীর ধারণ করে পৃথিবীতে এসে শরীর সাধনের প্রকৃত ফল- জীবন মুক্তি লাভে দয়াময়ের পূর্ণ মঙ্গল ভাবের পরিচয় প্রদান করবে’

৮.প্রকৃতিতত্ত্বের  ৪৭ নং সূত্রে স্বামীজী আরো বলেন- ‘ বাস্তবিক ইহকাল ও পরকাল শরীরের জন্য আত্মার জন্য নহে। শরীর না থাকিলে সু² আত্মার যোগ ঈশ্বরের সাথে অভেদ, সুতরাং আত্মার নিবাসের জন্য কোনো স্থানের আবশ্যকতা বোধ করা অলীক।… পৃথিবীর লোক অন্য কোনো গোলকে যাইয়া অবস্থিতির দ্বারা সুখ বোধ করিবে, এইরূপ মনে করা যাইতে পারে না।’ অথাৎ দয়াময় সম্প্রদায়ের লোকেরা স্বর্গ নরক ও পরলোকের ধারণায় বিশ্বাসী নয়। তারা মনে করে আত্মার অবস্থিতির জন্য কোনো স্থান নির্ধারিত হতে পারে না। সু² আত্মা ঈশ্বরের সাথে অভেদ সম্পর্কে লীন হয়ে যায়। দুঃখ- সুখের সকল অনুভুতি কেবল শরীরের, আত্মার নয়। তাই আত্মার জন্য কোনো নিবাস কল্পনা করা অযৌক্তিক।দয়াময় ধর্ম মতে গার্হস্থ্য কর্ম শ্রেষ্ঠ। সংসার ছেড়ে স্বর্গলাভ অসম্ভব। প্রকৃতি তত্ত্বর ২৩ নং সূত্রে বলা হয়েছে,‘… সঙ্গী বা সঙ্গিনীর ভাব ভালো হউক বা মন্দ হউক, ঈশ্বর যখন তাহাকে আমার সহিত যোগ করিয়া দিয়াছেন ও তাহার সহিত আমার দৈহিক ও আধ্যাত্মিক চির সম্বন্ধ রহিয়াছে তখন আমার ঈশ্বর  সেবা তাহার মধ্যে ও তাহার ঈশ্বর সেবা আমার মধ্যে অবশ্যই আছে।… অতএব যাহাতে স্ত্রীর সহিত সর্ব্বোতো ভাবে মিলিত হইয়া জীবন উন্নত করা যায় তাহাই প্রত্যেক সাধন ভজনের পূর্ণ আদর্শ ও একতার কারণ’ অন্য দিকে ৩৭ নং সূত্রে বলা হয়েছে-‘ সংসারে যাহার যত কার্য্য করিয়া স্বর্গের জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে, তাহা তাহাকে করিতেই হইবে। অল্প অথবা অধিক পরিমানে হউক, সংসারের কার্য্য সকলের জন্যেই আছে এবং এই সংসারেই স্বর্গ আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। এই জন্য সকলেরই গৃহধর্ম্ম ছাড়িয়া স্বর্গ লাভ অসম্ভব’ একারণে দয়াময় ভক্ত ও বিশ্বাসীরা ব্রহ্মাচর্য পালন করেন না। আনন্দস্বামী ও মনোমোহন দয়াময় সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় আদর্শ হিসেবেই গৃহীত হয়েছেন। গৃহাভ্যন্তরে থেকেই একজন প্রকৃত সাধক ধর্ম পালনের পথে সমস্ত বাঁধা বিপত্তিকে প্রেম ভালোবাসা দিয়ে নিষ্ঠার সাথে অতিক্রম করে যেতে সক্ষম হয়। সংসারে দায়িত্ব কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে সততার সঙ্গে সফল হওয়ার কথা বলা হয়েছে দয়াময় ধর্মে।দয়াময় ধর্মে আমিত্বের কোনো স্থান নেই। শ্রেষ্ঠত্বের অহং অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলে। মূলত আমি তুমি বলে আলাদা কিছু হয় না। আমিত্বের নাশ হলে মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম ভক্তি ও তার প্রতি কর্মচর্চা স্বার্থহীন হয় না। নিঃস্বার্থ চিত্তে সহজে দয়াময়ের প্রতি প্রেম জাগ্রত হয়। সমাজের মানুষ মনে করে প্রত্যেকে এক একটি পৃথক সত্তা বা অস্তিত্ব। এই ধারণা থেকে আমি আমার স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যকুল তুমি তোমার সত্বের জন্য প্রাণ করছ। কিন্তু দয়াময় সম্প্রদায়ের প্রবর্তক স্বামীজী  ১৫ নং সূত্রে বলেন, ‘ আমি তুমি এই দুই বাক্যের মধ্যে সাধারণত, যে ভাব বিচরণ করিতেছে তাহা ঐক্য ভাবের বিরোধী। বাস্তবিত আমিও যাহা তুমিও তাহা, এই সমভাব জ্ঞানযোগেতে স্থিরতর হয় এবং প্রেমযোগেতে কার্যে পরিণত হয়। যে কাল পর্য্যন্ত মানুষকে দোষী ও গুণী বলিয়া মনে ধারণা থাকিবে ততকাল জগতে ঐক্যের বন্ধন অসম্ভব।” তারা বিশ্বাস করেন অদ্বৈত ভাব ছাড়া কোনো ভাবেই মানুষের প্রতি মানুষের মন্দভাব দুর হতে পারে না। তারা মনে করেন ঈশ্বর কোনো বিশেষ নিয়মে আবদ্ধ নন। কোনো বিশেষ নিয়ম কানুন ও যাগযজ্ঞেও ঈশ্বর থাকেন না। ঈশ্বর থাকেন মানুষের প্রেম ভাবে তাই মানুষের সঙ্গে মানুষে পেমযোগ স্থাপিত না হলে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না। আর তাই মানুষের সাথে মানুষের প্রেমযোগ স্থাপন করতে হলে দরকার আমিত্ব নাশ করা কেননা আমিত্ব সকল ঐক্যের বিরোধী। এজন্য মুক্তির জন্য ৫৫ নং সূত্রে বলা হয়েছে –‘ সর্ব্বপ্রকারের পার্থক্য পরিত্রাগ করিয়া গশলেই নাম যোগ সাধন করলে অমরত্বের যোগে জগতে একতা আসিবে ও ধর্মমতের আর অনৈক্য থাকিতে পারিবে না।’ অর্থাৎ বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বন্ধনের মিলনই ঐশভাবের মূল কথা।

রঞ্জনা বিশ্বাস :লোকসংস্কৃতি গবেষক।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post