• December 4, 2021

ফিরে দেখা আফগানিস্তান, পর্ব-৭

 ফিরে দেখা আফগানিস্তান, পর্ব-৭

(আফগানিস্তান:দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নয়া সমীকরণ।)

সংগ্রাম চক্রবর্তী

আমরা হাটতে হাটতে ডুরান্ড লাইন পেরিয়ে চলে এসেছি, যা একদা জোর করে স্বাধীনচেতা পাখতুনদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আমরা দেখেছি জাতীয়তাবাদ, মার্ক্সবাদ কাবুল কেন্দ্রীক অভিজাত শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে আপামর জণগনের বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি, সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে বদলে যাওয়া পাক আফগান সম্পর্কেও আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ক্যাসপিয়ান সাগর সহ মধ্য এশিয়ার তেল ও গ্যাস পরোক্ষে আফগান রাজনীতিতে কি প্রভাব ফেলেছে তাও আলোচনা হয়েছে।
এবার আমাদের একটু খুটিয়ে দেখার প্রয়োজন রাশিয়া চীন ইরান পাকিস্তান ও তালিবানের যৌথ রাজনৈতিক কেন্দ্রকে, আগামীতে গোটা এশিয়া মহাদেশে এর প্রভাব ও গুরুত্ব অপরিসীম। তবে একটা জিনিষ সুনিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে তালিবানের কাবুল দখন ও মার্কিন সেনার ঐভাবে কাবুল ত্যাগে সবথেকে বেশী লাভবান হয়েছে রাশিয়া ও সবথেকে পরাজিত বিধস্ত রিক্ত শক্তির নাম ভারতবর্ষ, আঞ্চলিক রাজনীতির বিচারে তা আমেরিকার থেকেও বেশী। এটাই মোদীজ্বীর নতুন ভারতবর্ষের আন্তজাতিক কূটনৈতিক সাফল্য। ছাগল দিয়ে যেমন হাল চাষ হয় না, তেমনি আমলা দিয়েও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটনীতি হয় না।

আসলে গোটাটাই একটা অবিচ্ছিন্ন ফ্রন্ট আর যার মুল লক্ষ্য হচ্ছে রাশিয়া।পশ্চিম এশীয়ায় ইরাক যুদ্ধ, ফ্রী সিরিয়ান আর্মি, থেকে উত্তর আফ্রিকার লিবিয়ায় গদ্দাফিকে হত্যা থেকে আজকে আলজেরিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা নির্মাণ, দক্ষিণ চীম সাগরে মার্কিন দাদাগিরি থেকে বাল্টিকে ন্যাটোর নৌমহড়া,পোলান্ডে মার্কিন সেনার অবস্থান, রোমানিয়ায় “থাড” মিসাইল সিস্টেম বসানর পরিকল্পনা- স্থান ও সময় পৃথক পৃথক হলেও আদপে একটি পরিকল্পনার অন্তগত আর তা হল রাশিয়াকে দখল করে ইউরোপীয় ন্যাটোর সদস্যদের সস্তা জ্বালানী ও অন্যান কাচামাল যোগান দেওয়া। বিশ্বকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
৩০ দশকে “পূর্বের এশীয় জাতি ও বর্বর বলশেভিজম” থেকে “ইউরোপীয় প্রিন্সিপ্যালিটি” রক্ষার হিটলারী নীতি আজও অব্যাহত ধারায় প্রবাহমান। সোভিয়েত ইউনিয়ানের অকল্পনীয় সামরিক শক্তি বিগত দশকে সরাসরি আক্রমণ বা যুদ্ধ আটকাতে সমর্থ হলেও ছায়াযুদ্ধ কিন্তু সমানে চলেছে, এমন কি সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরেও রাশিয়া অতুলনীয় সামরিক শক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী।গোটা আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশে তারা রাজনৈতিক প্রভাব যথেস্টই, কিন্তু এহেন রাশিয়ার একীলীস হিল হল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর তার অর্থনীতির মারাত্মক নির্ভরতা, আয়ের দ্বীতিয় উৎস হল খনিজ সম্পদ এবং সামরিক ক্ষেত্র।আবার শক্তিশালী রুশ ভালুকের সফট বেলী হল ককেশাস এবং মধ্য এশিয়া।আর ভূ-রাজনৈতিক ভাবে আফগাবিস্তানের অবস্থান এমনই যে মধ্য এশীয়ায় কাজাখস্থান বাদ দিয়ে সব কটা দেশের সাথে তার সীমান্ত আছে তাই নয়, ককেশাস থেকেও দুরত্ব খুব বেশী নয়। তাই আফগানিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরী হওয়া মানে তার প্রভাব অনিবার্যভাবে মধ্য এশিয়া, ককেশাস ও দক্ষিণ রাশিয়ায় অনিবার্যভাবে তার প্রভাব পড়া, রাশিয়ার ১৭% মুসলিম জনসংখ্যা মুলত দক্ষিণ রাশিয়া ও ককেশাসে বসবাসরত, মনে করে দেখুন নয়ের দশকের কাবুলের অস্থিরতা শুধু কাশ্মীরেই আগুন জ্বালিয়েছে তা নয়, দাগেস্তান ও চেচেনিয়াও রাশিয়া কে তিন টে বড় যুদ্ধ লড়তে হয়েছে।ঠিক এই কারণেই ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ান কাবুলে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছিল অনেকটা।
কিন্তু একনিংশ শতকের প্রথম দুই দশকের কাবুলের পরিস্থিতি অনেকটা বিংশ শতাব্দীর ৩০ ও ৪০ দশকের চীনের মত।চীয়াংকাই শেকের মতই দূর্নীতিগ্রস্ত তাই নয়, নর্দান এলায়েন্সের নিজের মাঝেই কোন ঐক্য নেই, হামিদ কারজাই মার্কিন পুতুল তো আব্দুল্লা আব্দুল্লার প্রধান লক্ষ্য তাজিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা, উজবেক দের সাথে আবার তাজিকদের ক্ষমতার ভাগ নিয়ে দ্বন্দ, শিয়াপন্থী হাজারে জনগোস্টী আবার দলে দলে শিয়া মিলিশিয়ায় (হেজবুল্লাহ আফগানিস্তান) নাম লেখাচ্ছে.।এই রকম একটা বহুধা বিভক্ত দূর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক কেন্দ্রের সাথে কোন আলোচনা বা সমাধান সম্ভব নয়, ফলে পড়ে থাকে একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি তালিবান, তালিবানের প্রতি সাধারণ আফগানের যে সমর্থন তা কিন্তু শুধুমাত্র ধর্মজাত নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনচেতা মানসিকতা ও মার্কিন পুতুল কাবুল রেজিমের অপর্দথতাই আসল কারণ এই বিপুল সমর্থনের কারণ।আর যখম কোন শক্তির রাজনীতি থাকে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও লোকবল থাকে পরাশক্তিও তার বিনিয়োগ করে, এই জন্যেই ২০১৭ সালে মার্চে মার্কিন সেনেটের প্রতিরক্ষা কমিটির সামনে ন্যাটোর তৎকালীন সুপ্রীম কম্যান্ডার অভিযোগ করেন যে তালিবান বাইরের থেকে (রাশিয়া) সাহায্য পাচ্ছে, ডেমোক্রাটরা অভিযোগ তোলে রুশ গুপ্তচর সংস্থা মার্কিন সেনাদের মাথার দাম ধার্জ করেছে ৭০০ ডলার,সি.এন.এন ও সি.এন.বি.সি দেখায় যে তাজিক সীমান্তে তালিবানদের কাছে রুশ অস্ত্র ও অর্থ পৌছে দেওয়া হয়েছে।এই সি.এন.এন ই কিন্তু ৯/১১ জোড়া টাওয়ার আক্রমণে সঠিক সময় সঠিক স্থানে হাজির ছিল।
কিন্তু ইত্যবসারে ক্যাসপিয়ান গ্যাস বেসিনে মার্কিন নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন রাশিয়া চিরতরে ঘুচিয়ে দেয় ২০১৮ সালে, রাশিয়া, ইরান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান,কাজাখস্তান এক চুক্তিতে আসে যে এই অঞ্চলে কোন বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ মানা হবে না এবং একটি যৌথ কনসোর্টিয়াম গ্যাসের দাম নিরন্ত্রণ করবে, আর প্রতি টা দেশই নিজ নিজ সীমানা অনুযায়ী শেয়ার পাবে। আবার ২০১৬ সালে রাশিয়া ও সৌদি আরব এক চুক্তি তে আসে যে তেল উৎপাদন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে একে অপরের স্বার্থ বিবেচনায় রাখবে। ফলে তেলের দাম ফেলে দিয়ে রুশ অর্থনীতি কে দুর্বল করার যে খেলা তা অন্তত মার্কিনদের পক্ষ্যে খেলা সম্ভব নয় এবার, তাই আপাতত পাততাড়ি গোটানোর পালা।

চীনের জিংজিয়ান প্রদেশের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে আফগানিস্তানের।এই সেই প্রদেশ যেখানে উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদ মার্কিন মদতে চীন কে দুর্বল করার চেস্টা করছে।জিংজিয়ান আয়তনে চীনের সবথেকে বড় প্রদেশ, মধ্যে এশিয়া বা পশ্চিম এশীয়ায় চীনের যোগাযোগের পথও এই প্রদেশের উপর দিয়েই, ফলে এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চীনের বেল্ট রোড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে এক বড় বাধা, ককেশাস ও কাশ্মীরের মতই জিংজিয়ানও আফগানিস্তানের পরিস্থিতি এক বড় ভূমিকা রাখে, পাশাপাশি চীনের বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্পের সম্প্রসারণে আফগানিস্তান ভৌগলিকভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, পাশাপাশি আফগানিস্তানে আছে এমন একটি খনিজ সম্পদ যা আগামীর এনার্জী কে নিয়ন্ত্রণ করবে-লিথিয়াম, ২০০৮ সালে মার্কিন জিওলজিস্টরা আবিষ্কার করে যে আফগানিস্থানে সংরক্ষিত আছে বিশ্বের দ্বীতিয় বৃহত্তম লিথিয়ামের ভান্ডার।যা ব্যাটারী তৈরীর অপরিহার্য উপাদান, আর চীন সৌর শক্তি বা গ্রীণ এনার্জী তে বিশ্বের প্রধান শক্তি।এছাড়াও আফগানিস্তানে আছে তামা, সীসা, রেডিয়াম, মলিবডেনামের ভাণ্ডার।উদাহরণ স্বরুপ উত্তর আফগানিস্তানের মেস আয়নাক তামার খনির কথা বলা যায়, যার সঞ্চিত তামার পরিমাণ ৯৩ মিলিয়ান টন, ২০১১ সালে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানী এই খনি থেকে তামা উত্তোলনের অধিকার পায়, প্রাথমিক কাজ শুরু হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উত্তোলনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
আবার চীন ইরানের সাথে ২০০ বিলিয়ান ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, ইরানী তেলের সবথেকে বড় ক্রেতা চীন, এখন কাবুলের বন্ধু সরকার থাকলে চীন ও ইরানের মাঝে স্থলপথে যোগাযোগ সহজ হয়ে যায়, গুয়াদরের পাশাপাশি ছাবাহার বন্দর কেও সে মুল চীনা ভূখন্ডের সাথে রেলপথে জুড়তে পারে, ব্রাইডাস কোম্পানীর বিকল্প পথে পাইপলাইন সংক্রান্ত প্রস্তাব নিশ্চয় মনে আছে. এর ফলে পশ্চিম চীন অর্থনৈতিকভাবে আরো উন্নত হতে পারে, পূর্ব চীনের তুলনায় পশ্চিম অংশ পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ এই জ্বালানীর সংকট,এতদিন তাকে মালাক্কা প্রণালী পেরিয়ে পূর্ব চীনে ট্যাংকার নিয়ে যেতে হত,১৯৯৬ সালে যখন প্রথম তালিবান সরকার গঠিত হয় তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল মাত্র তিন টে দেশ- সৌদি আরব, আরব আমীরশাহী ও পাকিস্থান. আর এর চরম শত্রু হল শিয়ামতালম্বী ইরান, এমম কি বুশের সাথে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেও রেভোলিউশনারী গার্ড যোগ দিয়েছিল অঘোষিত ভাবে।কিন্তু দ্বিতীয় তালিবান সরকার গঠনের সময় ঠিক উল্টো পুরাণ।সৌদি ও আমীরাত তাদের দূতাবাস এখনও পর্যন্ত বন্ধই রেখেছে, অন্যদিকে সৌদির অন্যতম প্রতিন্দদ্বী কাতার কাবুল বিমানবন্দর চালু করা থেকে মানবীয় সাহায্য দেওয়া সব ব্যাপারেই অগ্রণী।আর মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি তে ইরান হল কাতারের অন্যতম প্রধান মিত্র. আই.আর.জি.সির বিখ্যাত কমান্ডার কাসেম সুলেইমানী কে হত্যার এক সপ্তাহের মাঝে মুল পরিকল্পনাকারী সি.আই.এ অপারেশন হেড রহস্যজনকভাবে প্লেন ক্র‍্যাশে মারা যান তালিবান নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই. আবার সিরিয়া যুদ্ধে ইরান আফগানিস্তান থেকে নিয়মিত শিয়া মিলিশিয়া সরবরাহ করে গেছে, পাকিস্থানের শরর্ণার্থী শিবিরের থেকেও মিলিশিয়া সংগ্রহ হয়েছে, কিন্তু তালিবান ঘোষিতভাবেই চরম সুন্নী (দেওবন্দী) মতালম্বী, কিন্তু তাদের সাহায্য ও সহযোগীতা ছাড়া ইরানের পক্ষ্যে এত নিরবিচ্ছিন্নভাবে কর্মকান্ড চালান সম্ভব হত না,
আফগানিস্তানে শক্তিশালী স্বাধীন সরকার মানে ইরানে সামরিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাওয়া, পূর্ব সীমান্তে নিশ্চিত হয়ে ইরান পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী তে আরো মনোনিবেশ করতে পারবে।কারণ আফগানিস্তানের অধিকাংশ মার্কিন ঘাটি ব্যবহার হত ইরান, চীন পাকিস্তানের উপর নজরদারী চালাতে।

সংগ্রাম চক্রবর্তী :

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post