• June 29, 2022

বাওবাব এক আশ্চর্য গাছ

 বাওবাব  এক আশ্চর্য গাছ

সুদীপ মিশ্র

একটি সুবৃহৎ” বাওবাব “গাছের তলায় দু – টুকরো কেম্বিশ ঝুলিয়ে ছোট্ট একটা তাঁবু খাটানো হোলো। কাঠ কুটো কুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাত্রে খাবার তৈরী করতে বসল শঙ্কর। তারপর সমস্ত দিন পরিশ্রমের পরে দুজনেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।”

– চাঁদের পাহাড়

          

সাল 2005 সেপ্টেম্বর মাস। UN এ থাকাকালীন গোমা থেকে ভুনিয়া যাচ্ছিলাম আমাদের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার গ্রুপ ক্যাপ্টেন অজিত কুমারের সাথে। সেটাই ছিল কমান্ডারের প্রথম familiarisation trip.8 সিটের ছোট্ট এয়ারক্রাফটটা যখন “কিংশাসা”(Democratic republic of Congo র রাজধানী) ঢুকছে তখন শহরের বাইরে বেশ কিছু অদ্ভুত দর্শন গাছ দেখেছিলাম। অনেকটা জলের বোতলের মতন টেঁপা গোছের, কোনটা জলভর্তি কুঁজো র মতন। এয়ারপোর্টে দুএকজন কে জিজ্ঞাসা করতেই যা বলেছিলো ফ্রেঞ্চ ভাষায় তা আমার কৌতুহল নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ ছিলো। বেশ কয়েকমাস পর একদিন আমার রাত্রিকালীন ডিউটি চলাকালীন ডেজিরে কে সময় কাটানোর জন্য গাছটা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ডেজিরে ছিলো আমাদের airport coordinator. মাঝ রাত্তির, সন্ধ্যের একপশলা বৃষ্টির পর চারিদিকে সোঁদা সোঁদা গন্ধ, রানওয়ের ওপর স্তূপীকৃত লাভা অন্ধকারে ঢিপির মতন অবয়ব নিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে, ডানে উগান্ডা সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলে “নিয়ারারঙ্গো”আগ্নেয়গিরি টগবগ করে ফুটছে, ফুটন্ত লাভার লেলিহান শিখায় আকাশের কিছু অংশ গোধূলির সূর্যের ছটার মতন। এরকম এক প্রাকৃতিক পরিবেশে লাভার ওপর দিয়ে মচমচ শব্দে হাঁটতে হাঁটতে “ডেজিরে”কে শুধিয়েছিলাম গাছটা সম্পর্কে। ও তখন ইন্ডিয়ান এনসিয়েন্ট হিস্ট্রী নিয়ে মাস্টার্স করছিলো। মাঝে মধ্যেই আমাকে বিভিন্ন টপিক নিয়ে জিজ্ঞাসা করতো। ভাবলাম ও হয়তো কিছু বলতে পারবে! কৃষ্ণবর্ণ মুখের ফাঁকে বত্রিশ পাটি বের করে শুধু বলেছিলো – give me some clue. Clue বলতে গিয়ে হ্যালোজেন বাতির নীচে আমার আকাশ থেকে দেখা গাছের ছবির সাথে,airport এর জিজ্ঞাসায় সামথিং সোনিয়া শোনার পর জানতে পেরেছিলাম, গাছটার নাম “এডানসোনিয়া” যার অর্থ “বাওবাব”গাছ। ছোটবেলায় পড়া বিভূতিভূষণের “চাঁদের পাহাড়”, রিকসারফেল্ড , শঙ্কর, আলভারেজ, বুনিপ সব চিত্রপটে ভেসে এলো।


অদ্ভুত দর্শন এই গাছটির ইতিহাস কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং। পৃথিবীতে যে নয় প্রকার প্রজাতির বাওবাব গাছ আছে তার মধ্যে ৬ প্রকার গাছ পাওয়া যায় মাদাগাস্কার এলাকায়, ২প্রকার গাছ আরব এবং সাহারা সংলগ্ন আফ্রিকায়, মানে যে এলাকার কথা আমি বলছি, আর শেষোক্ত প্রজাতি অস্ট্রেলিয়া তে। এই গাছের কাণ্ড ৭- ১১মিটার লম্বা। দক্ষিণ আফ্রিকার লিস্পপো প্রদেশের সানল্যান্ড খামারের গাছটির পরিধি ৪৭ মিটার এবং উচ্চতা ২২মিটার। বাওবাব গাছের বয়স কয়েক হাজার বছর হয়। যেহেতু এই গাছের কাণ্ডে কোনো বর্ধন বলয় থাকেনা তাই গাছের বয়স অনুধাবন করা কঠিন। সবচেয়ে পুরানো গাছের বয়স প্রায় ৬০০০ বছর মানে খ্রীষ্টের জন্মের অনেক আগে।
আফ্রিকান লোকমতে প্রচলিত ঈশ্বর এই গাছটিকে অন্যান্য গাছের মতই সৃষ্টি করেছিলেন। তালগাছের জন্ম হলে বাওবাব ঈশ্বরকে বলে তার এমন উচ্চতা নেই কেন? সেটি হবার পর লালফুল জাতীয় গাছ দেখে আবার আবদার এমন ফুল তার নেই কেন? সেটি সম্পূর্ন হলে সে ফলের দাবী রাখে। অগত্যা ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হয়ে সমূলে উৎপাটিত করে গাছটিকে উল্টোমুখে প্রতিস্থাপন করেন। এই জন্যেই এই গাছ দেখে অবাক হতেই হয়। যেন আকাশের দিকে শিকড় ছড়ানো, আদপে এটাই এর ডালপালা। আফ্রিকার সাহারা সংলগ্ন দেশ, দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু এলাকা, সুদান, জিম্বাবুয়ে অঞ্চলে এই গাছ বেশী দেখা যায়। সব মরু অঞ্চলে এই গাছ পাওয়া যায় না।
এটি পর্ণমোচী বৃক্ষ। বসন্তে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসে। ফুলগুলো অনেকটা সাদা মাশরুমের ন্যায়। এর কুড়ি সন্ধ্যেবেলায় ফুটে আবার ভোররাতে ঝড়ে মাটিতে পড়ে। এর ফল প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার লম্বা, স্বাদ অনেকটা পাউরুটির মতন। তাই এই ফলকে “monkey ‘s bread ও বলা হয়। ফলে কমলালেবুর থেকে ৬ গুণ বেশী ভিটামিন C ছাড়াও, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য মিনারেলস পাওয়া যায়। ফলের বীজ থেকে তেল ও ওষুধ তৈরী হয়। তন্তুর উৎস, রং তৈরী বা জ্বালানী হিসাবেও এই বীজের বহুল প্রচলন। তানজানিয়া তে বিয়ার তৈরীতে এই বীজ খুবই প্রচলিত। জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে সহ আফ্রিকা ভূখণ্ডের অনেক অঞ্চলে এই গাছের পাতা সবজি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। নাইজেরিয়া তে এই পাতার তৈরী স্যুপ “কুকা”নামে বিখ্যাত। জাপানে পেপসি কোম্পানি বাওবাব ব্যবহার করে সীমিত সংস্করণে টক স্বাদ যুক্ত কার্বনেটেড পেপসি তৈরী করে যা “বাওবাব পেপসি”নামে খ্যাত। একটি পূর্ন বয়স্ক বাওবাব গাছ প্রায় ১২০০০০ লিটার জলধারণের ক্ষমতা রাখে। মরুঅঞ্চলে বা মাদাগাস্কারের ইফাতি অঞ্চলে গাছগুলো বোতল, হাঁড়ি বা গামলার মতন দেখতে হয়। বৃষ্টির সমস্ত জল শুষে নিয়ে মরু অঞ্চলে জলের তৃষ্ণা মেটায় এই গাছটি। গাছের ছাল দিয়ে কাপড়ের তন্তু তৈরী হয়।
প্রাণীকুলের মধ্যে হাতি আর ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এই গাছের ক্ষতি করে। তবুও সমস্ত ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে অবাক করা এই গাছ আজও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। মজার ব্যাপার হলো কর্ণাটকের সাভানুর জেলায় তিনটি বাওবাব গাছের হদিস পান অধ্যাপক Van Heerden ১৯৯৩ সালে যেগুলোর আনুমানিক বয়স ৫০০০ বছর। তারমধ্যে একটি গাছের মধ্যে কিছু ফাঁকা অংশ পরিষ্কার করে তিনি জানান যে একদা ভারতীয় বুশম্যানেরা এখানে বসবাস করতো। বাংলায় হলদিয়া শহরে জেটির ধারে একটি, রামকৃষ্ণ সেবায়তনের পাঁচিল ঘেষা আরেকটি, মোট দুটি বাওবাব প্রজাতির গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে।
হটাৎ বাওবাব কেন! কৌতুহল তো মিটেই গেছিলো জানার। আসলে গতকাল মাঝরাতে হটাৎ গলা শুকিয়ে গেছিলো কোনো এক স্বপ্ন দেখে । হাত বাড়িয়ে জলের বোতল নিয়ে আধশোয়া অবস্থায় যখন জল খাচ্ছি (! থুড়ি পান করছি) জলের বোতল, রাতের ডিম আলো আর আবছায়া ফ্যানের ব্লেডের মধ্যেই কেমন যেনো ২০০৫সালটা ফিরে এলো। সত্যিই তৃষ্ণা নিবারণে বাওবাব লা জবাব!!

সুদীপ মিশ্র : প্রাক্তন বায়ুসৈনিক,বর্তমানে ব্যাঙ্ক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.