• June 29, 2022

গোর্কির ‘মা’

 গোর্কির ‘মা’

মোজাফ্ফর হোসেন

গোর্কির ‘মা’ আমি পড়ি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। কার অনুবাদে মনে নেই। সেই বয়সেই পুরো বইটি দাগিয়ে দাগিয়ে লাল করে ফেলেছিলাম। এরপর গোর্কির গল্প সংকলন ‘গোর্কি অমনিবাস’, স্মৃতিকথার তিনখণ্ড- আমার ছেলেবেলা, পৃথিবীর পথে ও পৃথিবীর পাঠশালায় কিনে ফেলি। গোর্কির মা-প্রীতি থেকে আমি নোবেলজয়ী পার্ল এস বাকের মা, মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা, শওকত ওসমানের জননী ও আনিসুল হকের মা পড়ি।

লেখক হিসেবে গোর্কি ভীষণ সমকালীন ছিলেন। শিল্পের অমরত্ব লাভের জন্য তিনি লেখেননি। তাঁর সাহিত্যকর্ম ছিল সময়ের দায়িত্ব পালনে ‘নিয়োজিত’। অর্থাৎ বিপ্লবী চেতনাপুষ্ট। গোর্কি মনে করতেন, সর্বাধিক মনোযোগী ও খুঁতখুঁতে পাঠক হচ্ছে গণতন্ত্রমনা শ্রমিক ও কৃষক–যারা লিখতে-পড়তে শিখে গেছে। তারা বই পড়ে তাদের সামাজিক ও নৈতিক নানা প্রশ্নের সদুত্তর, মুক্তিলাভের প্রণোদনা খুঁজতে। গোর্কি সাহিত্যকে আক্টিভিজমের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মার্কসবাদী দায়িত্বপালনে তিনি নিযুক্ত থেকে পার্টি-সাহিত্য রচনা করেছেন। তবে নিশ্চয় বলা যায়, গোর্কি আগে শিল্পী, তারপর আন্দোলনকর্মী। যে কারণে লেনিন তাঁর কর্মীদের বারণ করে দিয়েছিলেন গোর্কিকে সবসময় বিরক্ত না করতে। এর কারণ হয়তো, লেখক গোর্কিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তাকে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে নিযুক্ত করতে চাননি লেলিন। গোর্কি সেটি করতে সফল হয়েছিলেন বলেই মার্কসবাদী আন্দোলন বিশ্বব্যাপী স্তিমিত হয়ে পড়লেও গোর্কির সাহিত্যকর্ম বিক্রি হওয়া কিন্তু বন্ধ হয়নি। এখনো গোর্কি প্রায় পৃথিবীর সব দেশে পঠিত হচ্ছে।

পৃথিবীর ১৩০টির বেশি বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে মা। বাংলা সাহিত্যে প্রথম হয় বোধহয় কল্লোল যুগে। কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় লাঙল পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে। হায়াৎ মামুদ স্যার জানাচ্ছেন, বিমল সেন মা-এর সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেন। ১৯৫৪ সালে অশোক গুহ ও পুষ্পময়ী বসুর করা উপন্যাসটির দুটি পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

বহুদেশে চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছ উপন্যাসটি। গোর্কির অনুমতি নিয়ে বের্টোল্ট্ ব্রেশ্ট্ এটির মঞ্চভাষ্য তৈরি করে নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন ১৯৩২ সালে। কলকাতায় ১৯৫৫ সালে মিনার্ভা রঙ্গমঞ্চে বেহালার শৌখিন নাট্যসংঘ ‘মায়ামঞ্চ’ গোর্কির মা মঞ্চস্থ করে। ঢাকা শহরে মা-র মঞ্চায়ন ঘটেছিল ১৯৬৭ সালের দিকে। নাট্যরূপ দিয়েছিলেন সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু ও মোহাম্মদ সোলায়মান হোসেন। খান আতাউর রহমান ও সৈয়দ হাসান ইমাম নাট্যপরিচালনায় ছিলেন এবং অভিনয়ে মা-র চরিত্রে ছিলেন রওশন জামিল। পাভেলের ভূমিকায় ছিলেন আনোয়ার হোসেন।

গোর্কি আমাদের নজরুলের মতোই স্বশিক্ষিত, আত্মপ্রশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। অল্পবয়সে মা বাবা হারিয়ে নজরুলের মতোই নানা জায়গায় নানা ধরনের কাজ করেছেন : মুচির দোকানে, স্টিমারে রসুইখানার বাসনপত্তর ধোওয়া, ড্রাফটসম্যান, পাখি শিকার, খেতমজুরের কাজ, রাজমিস্ত্রিগিরি, রুটির দোকানে চাকরি ইত্যাদি।

আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন উনিশ বছর বয়সে। জমানো পয়সায় একটা পিস্তল কিনে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বুকে গুলি করলেন। পুলিশ একটা চিরকুট আবিষ্কার করল তার পকেট থেকে: ‘জেনে রাখুন, আমার মৃত্যুর দায়দায়িত্ব জার্মান কবি হাইনের : হৃদয়ের দন্তশূল তিনিই আবিষ্কার করেছেন। আমার পরিচয় সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র এখানে থাকল, আমি এই বিশেষ উদ্দেশ্যেই এগুলো সংগ্রহ করেছি। আমার অনুরোধ আমার লাশ কেটেকুটে ভালোভাবে যেন পরীক্ষা করা হয়, কারণ দেখা দরকার কোন ধরনের শয়তান শেষকালে আমার ভিতরে বাসা বেঁধেছিল।’
আহা! এ যেন কবির ভাষ্য!

আমাদের সকলের ভাগ্য ভালো যে সেদিন তিনি মরেননি। এরপর ফের ওষুধের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, বেঁচে গেলেন সেবারও।

গোর্কি মা উপন্যাস লিখেছিলেন আত্মগোপনে থাকার সময়। ১৯০৬ সালে গোর্কি প্রথমে গেলেন জার্মানি, তারপরে ফ্রান্স, সেখান থেকে আমেরিকা। মা-র প্রথম খসড়া ১৯০৩-০৪ সালে তৈরি হল। নিউ ইয়র্কগামী জাহাজের কেবিনে। ইতালির কাপ্রি দ্বীপে বসে লেখা হলো দ্বিতীয় খণ্ড। মা প্রথমে রাশিয়ান ভাষায় বেরোয় নি, বেরিয়েছিল ইংরেজি অনুবাদে। জারের আমলে এই উপন্যাসের পূর্ণরূপ রাশিয়াতে প্রকাশিত হয়নি। ১৯০৭-০৮ সালের ভিতরেই ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, তুরস্ক, সুইডেন, আলবেনিয়া, ডেনমার্ক, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়ায় ও আরো অনেক দেশে বেরিয়ে গিয়েছিল।

ভ্লাদিমির নাবোকফ্’র মতো উল্লেখযোগ্য লেখক ও পণ্ডিত মা উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘The Mother a very second-rate production’; সুধীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমার জানতে বাকি নেই যে সাম্য ও মৈত্রীর মন্ত্র সেধে মানুষ মুক্তি পায় না, নামে পিশাচের পর্যায়ে। উপরন্তু অনাবশ্যক নরবলি ছাড়া বিদ্রোহের যে অন্য কোনো পরিণাম আছে, তা আমি ভাবতে পারি না; […] অতএব গোর্কির বিপ্লব-বিলাসে আমার সহানুভূতি নেই।’ এটা দর্শনগত বিভেদ থেকে বলা। মজার ব্যাপার গোর্কির টার্গের রিডার কিন্তু এঁরা কেউ না। গোর্কি ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এলিওনস্কি নামে জনৈক লেখককে লিখেছিলেন : ‘কাদের জন্য এবং কোন উদ্দেশ্যে তুমি লিখবে? এই প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে তোমাকে। তোমাকে বুঝতে হবে যে, আমাদের কালে সবচেয়ে যোগ্য ও দামি, আর সেইসঙ্গে সর্বাধিক মনোযোগী ও খুঁতখুঁতে, পাঠক হচ্ছে গণতন্ত্রমনা শ্রমিক ও কৃষক- যারা লিখতে-পড়তে শিখে গেছে। কোনো বইয়ের ভিতরে তারা সবচেয়ে বেশি করে যা চায় তা হলো তাদের সামাজিক ও নৈতিক নানা প্রশ্নের সদুত্তর, মুক্তিলাভের প্রণোদনা- এই কথার সম্পূর্ণ অর্থ যা ঠিক ততখানিই। তারা অস্পষ্টভাবে অনেক কিছুই বুঝতে পারে। তারা অনুভব করে যে মিথ্যে-ভরা জীবন তাদের পিষে ফেলছে; তারা বুঝতে চায় ঐ মিথ্যার স্বরূপ, আর তার থেকে বাঁচতে চায়।’[‘মা : পাঠকের নিজস্ব পাঠ’- হায়াৎ মামুদ]

[ছবিতে শেখব ও তলস্তয়ের সঙ্গে গোর্কি]

মা উপন্যাসকে বুঝতে হলে এলিট শিল্পবোধ থেকে এটিকে বোঝা যাবে না। গোর্কি ও তাঁর সময়কে বুঝে সেই প্রেক্ষাপটে ফেলে মা’কে পড়তে হবে। কোনো কোনো সমালোচক এও বলেন যে মা বক্তব্যধর্মী উপন্যাস। তাদের কথা অবশ্য মিথ্যে নয়। কিন্তু সেই বক্তব্যটা গোর্কি শিল্পিতভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। এতদিন বাদে আমরা যখন গোর্কির মা পড়ছি তখন সেটি আর কেবল বক্তব্য বোঝার জন্য নয়। গোর্কির আর্ট অব টেলিংটা বোঝার জন্যে। এখন আর রাজনৈতিক আন্দোলনকর্মী গোর্কি বেঁচে নেই, বেঁচে আছেন শিল্পী গোর্কি–মানবতাবাদী সাম্যবাদী শিল্পী, যিনি শিল্পকে সমাজকাঠামোর বাইরে থেকে দেখেননি। শিল্পকে তিনি রাজনীতি এবং আক্টিভিজমের অংশ মনে করেছেন। তিনি রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, ছিলেন ক্রিটিকও, প্রয়োজনে নিজের দলের সমালোচনা করতে ছাড়েননি। এই কারণে তার মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল স্তালিনই তাকে বিষপানে হত্যা করিয়েছে। শিল্পীরা এমনই, নিজের দল ও দলীয় ব্যক্তিদের সমালোচনা করতে ছাড়বেন না। শিল্পীর রাজনীতি অন্ধ ক্ষমতার রাজনীতি না। বঞ্চিতদের অধিকার আদায় করা বিপ্লবীদের কাজ, আর শিল্পীর কাজ সেই বিপ্লবীদের মুখে ভাষা তুলে দেওয়া। গোর্কি স্বকালে সেটা পেরেছেন। আর মৃত্যুর এত বছর পর মেহেরপুরের এক পাড়াগাঁ থেকে তাঁকে পড়ে আমার মতো এক কিশোর পণ করেছিল লেখক হবে প্রতিষ্ঠিত ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ করতে।

১৯৩৬ সালের আজকের এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন আমার কৈশোরের সেই নায়ক পাভেলরূপী মাক্সিম গোর্কি।

লেখক পরিচিতি : কথাশিল্পী-প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মোজাফ্ফর হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ উপবিভাগে কর্মরত। প্রধানত ছোটগল্পকার। পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচক ও অনুবাদক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি আছে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post