• August 18, 2022

লোকসঙ্গীতে লিঙ্গবৈষম্য: গৃহবধূর গৃহবন্দীত্ব প্রসঙ্গ

 লোকসঙ্গীতে লিঙ্গবৈষম্য: গৃহবধূর গৃহবন্দীত্ব প্রসঙ্গ

ড. শিবলী চৌধুরী

লিঙ্গবৈষম্য সময়ের অতি আলোচিত বিষয় সমূহের অন্যতম। এই বিশেষ ‘শব্দবন্ধটি’ বর্তমান সময়ের সমাজ-অনুশীলনের ক্ষেত্রে বহুলভাবে চর্চিত। অক্সফোর্ড অভিধানে ‘লিঙ্গ’ এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘gender’ সম্পর্কে আমরা যে ব্যাখ্যা পাই তাহলো ‘the fact of being male or female, especially when considered with reference to social and cultural differences, not differences in biology’. আর তাই ‘জেন্ডার’ ও ‘সেক্স’ এক বিষয় নয়। অনেকেই এই দুই এর ভেতরকার পার্থক্যকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। সুমহান বন্দোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নারী ও পুরুষের যে বাহ্যিক ও প্রত্যঙ্গগত পার্থক্য রয়েছে তাকে বলা হয় যৌন পার্থক্য, আর এই যৌন পার্থক্যকে কেন্দ্র করে মূলত উভয়ের সাংস্কৃতিক বিভাজন গড়ে উঠেছে, এর ফলে নারী ও পুরুষের যে আলাদা আলাদা পরিচিতি তাই হল লিঙ্গ। তাহলে সেক্স হল মূলত জৈবিক ব্যাপার আর জেন্ডার হল সাংস্কৃতিক। (লিঙ্গ ও লোকসংস্কৃতি: মেয়েলি বিষয়ক, লোকসংস্কৃতি গবেষণা)। অন্যদিকে বৈষম্য হলো ‘পার্থক্য; প্রভেদ: অসমতা’। বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে অন্য কারো চেয়ে অথবা একই সমাজের কোনো গোষ্ঠী বা জাতিকে অন্য কোনো গোষ্ঠী বা জাতি থেকে কম মূল্যায়ন করা বা কম সুযোগ-সুবিধা প্রদানের যে অনুশীলন তাকেই আমরা ‘বৈষম্য’ বলতে পারি। ইতোমধ্যেই এটি উল্লিখিত যে এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো লিঙ্গবৈষম্য। নারী ও পুরুষকে অসম জ্ঞান করে তাদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যে দ্বিবিধ পারিবারিক আচার-আচরণ তাই লিঙ্গবৈষম্য।

পিতৃতান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজে শ্বশুরালয় নারীর জন্য বন্দীশালা সদৃশ। সেখানে শাসন-অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ নারীর প্রাণ হয়ে ওঠে প্রায় ওষ্ঠাগত। শ্বশুরবাড়ির বৈরী পরিবেশে একজন গৃহবধূ প্রায় প্রতিদিনই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। গৃহের সকল কাজ তার দ্বারা শুধু করিয়েই নেয়া হয় না, তার সাথে গৃহভৃত্যের মত আচরণও করা হয়। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে শুরু করে পরিবারের সকলের সে আজ্ঞাবহ। স্বাভাবিকভাবেই পিতৃগৃহ থেকে দূরে এই প্রতিকূল পরিবেশে কাউকেই একান্ত আপন করে না পাওয়ায় তার মাঝে প্রায়ই বিষণ্নতা । বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করে। আলোচ্য প্রবন্ধে উত্তরাঞ্চলের কিছু লোকসঙ্গীতকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূর বন্দীদশার একটা সার্বিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বিয়ের সাথে সাথেই একজন নারীকে আবাস বদল করতে হয়, বাবার গৃহ ছেড়ে তাকে শ্বশুরবাড়ির বন্দী জীবনে প্রবেশ করতে হয়। পুরুষেরা যেহেতু বিয়ের পরেও পিতামাতার সাথে বা তাদের বাসস্থানের পাশেই বসবাস করে, তাই আবাস বদলের কারণে স্ত্রীদের মাঝে বিদ্যমান পিতৃগৃহকাতরতা স্বাভাবিকভাবেই তাদের (পুরুষ) মাঝে থাকে না। এই বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতি একজন বিবাহিত রমণীকে তার পিতামাতা তথা কাছের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকেই শুধু বিচ্ছিন্ন করে না, তাকে করে দেয় শেকড়হীন ও পরাশ্রয়ী। এটি তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনকেও তার প্রতি রূঢ় ও নির্দয় হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়। এ নতুন আবাস তার কাছে বন্দীখানা সদৃশ, কেননা এখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তার নিত্যদিনকার অভিজ্ঞতা। একজন বিবাহিত নারীকে যেহেতু তার পিতামাতার আবাস চিরকালের জন্য ত্যাগ করতে হয় এবং শ্বশুরবাড়ির বৈরী পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয়, সেখানে তার অবস্থা হয় লেজেগোবরে, আর এমন নাকাল অবস্থায় সে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই নতুন ঠিকানায় সে সকলের জন্য নিয়োজিত, কিন্তু তার জন্য এমন কেউই নেই। সারাজীবন তাকে অন্যের প্রয়োজনে কাজ করতে হয়, নিজের জন্য সে কিছুই করতে পারে না। খেয়ালখুশি মতো কাজ করার স্বাধীনতাও তার নেই। এখানে তার নিজস্বতা নেই, নিজের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এখানে তাকে চিরপরাধীন ও চিরনির্ভরশীল হয়েই জীবন যাপন করতে হয়।

কী প্রাচ্য কী প্রতীচ্য সর্বত্রই নারীরা আজ পিতৃতন্ত্রের একদেশদর্শিতার শিকার। তবে উন্নত বিশ্বে নারী অধিকার আন্দোলন বেগবান থাকায় সেখানে তাদের অধিকার এখন সকল ক্ষেত্রে না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই স্বীকৃত। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে বিশেষ করে এর অনগ্রসর গ্রামীণ জনপদে এমনটি আশা করা এখনও সুদূরপরাহত। কেননা, সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনপদের জনজীবনে লিঙ্গ-বৈষম্য আজও এক অতি সাধারণ ঘটনা। লিঙ্গ-বৈষম্যের ছবি তাই প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে প্রতিটি এলাকারই জনপ্রিয় লোকসংগীতসমূহে। আলোচনার সুবিধার্থে বর্তমান প্রবন্ধে শুধুমাত্র ভাওয়াইয়া, মেয়েলী গীত ও পালাগানকে স্থান দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষণের পরে দেখা যায়, এ সঙ্গীতসমূহের অধিকাংশই বৈষম্যের শিকার অবহেলিত অপাঙ্ক্তেয় নারীদের দুঃখকথায় পূর্ণ।

লোকসঙ্গীতে সাধারণত গ্রামীণ জীবন ও বাস্তবতা সুরে সুরে বাঙ্ময় হয়ে উঠে। ভাওয়াইয়া, মেয়েলী গীত, বিয়ের গীত, পালাগান, যোগীর (স্থানীয়ভাবে ‘যুগী’ বলা হয়) গান ইত্যাদি হলো লোকসঙ্গীতের কতিপয় শাখা যেখানে আমরা পুরো জনজীবনের অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাই। আর উল্লেখ করার মতো যে বিষয়টি তাহলো এ গান বা গীতগুলোর অধিকাংশেরই কথক হলো নারী; অর্থাৎ একজন নারী তার জীবনের কথা গানের ভাষায় বলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই নারী জীবনের দুঃখ, কষ্ট, ভোগান্তি, স্বামীগৃহে তাদের বন্দীদশা, তাদের জীবনের চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদির সুনিপুন চিত্রায়ণ ঘটেছে এই গান ও গীতগুলোতে। নিচের ভাওয়াইয়ায় এক বিবাহিত রমণীর অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে যে কিনা তার অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছাপোষণ করেছে, কিন্তু তার যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে তার স্বামীর মর্জির উপরে। স্বামীকে রাজি করাতে স্ত্রীর এই মিনতিই শ্বশুরবাড়িতে তার বন্দীত্ব তথা তার দ্বিতীয় লিঙ্গগত নির্ভরশীল অবস্থানকেই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে:

পতি এ্যাকনা কতা কনু হয়,/ বাপের বাড়ি নাইয়র গেনু হয়,

দিন চারিক ও মুই থাকিয়্যা আনু হয়।/ ও মোর মাও জননীর হইচে জ্বর

নিন্দতে মুই পানু খবর –

সারা রাইতে পানি বুলি ঘ্যাংগায়/ সারা রাইতে পানি বুলি নালায়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান সর্বক্ষেত্রেই পুরুষের নিচে। পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই তার জীবনের গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো বিষয়েই যে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে না উপরের গানটিতে আমরা সেই নির্মম বাস্তবতার খোঁজ পাই। স্ত্রী রাতে স্বপ্ন দেখেছে যে তার মা জ্বরে আক্রান্ত। স্বপ্নে সে এও দেখেছে, তার মা পানির জন্য ছটফট করছে, অথচ তাকে এক গ্লাস পানি দেওয়ার মতোও কেউ সেখানে নেই। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এদের অনেকের কাছেই স্বপ্নের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের বেশির ভাগেরই ধারণা স্বপ্নের অনেক কিছুই বাস্তবে সত্য হয়ে দেখা দিতে পারে। আর তাই আমরা উপরের গানের কথককে অস্থির হয়ে যেতে দেখি স্বপ্নে তার মাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখার পরে। অতঃপর মায়ের অসুখের আশঙ্কায় কাতর মেয়ে তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য স্বামীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করছে। অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও যখন একজন নারীকে তার স্বামীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল হতে হয়, তখন সেই সমাজে বসবাসকারী মেয়েরা পুরুষদের তুলনায় ঠিক কতোটুকু ব্যক্তি-স্বাধীনতা উপভোগ করছে তা সহজেই অনুমেয়। গানটির শেষ অংশে দেখা যায় মাকে দেখতে যাওয়ার অনুমতি আদায়ের জন্য স্বামীর কাছে সে নানাভাবে অনুনয় করছে। অবশ্য এ পর্যায়ে তার প্রত্যাশা স্বামীও যেন তার সঙ্গী হয়;

মায়ের আপনজন আর কেউই নাই/ আপন বলতে বেটি জামাই।

চলো পতি দোনো জনে যাই/ আইসো পতি দোনো জনে যাই। স্বামীকে সে বোঝানোর চেষ্টা করছে, মেয়ে ও জামাই ছাড়া বর্তমানে তাঁর মায়ের আর কেউ নেই। তাই সে মনে করছে, এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব অসুস্থ মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে কয়েক দিনের জন্য সেবা দিয়ে আসা। কিন্তু তার স্বামী যখন এতে ইতিবাচক কোনো সাড়া দিচ্ছে না, তখন নিরুপায় হয়ে সে বলছে:

ছাড়িয়্যা দিলে পতি

দ্যাখিয়্যা আনু হয়।

অর্থাৎ‍ স্বামী সাথে না গেলেও অন্তত তাকে যেন একা যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় এটাই তার প্রত্যাশা। কিন্তু তার এই অসহায় আকুতি পাষাণ স্বামীর মনকে আদৌ সিক্ত করতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু স্বামীটি যদি সুবিবেচক হতো এবং স্বামী স্ত্রীর সমঅধিকারে তার শ্রদ্ধা থাকতো তাহলে পরিবারটিতে উভয়ের পারস্পরিক সহাবস্থান বৈষম্যহীন ও মর্যাদার হতো। আর সত্যি সত্যিই এমনটি হলে অসুস্থ মাকে দেখতে যাওয়ার জন্য স্ত্রীকে তার স্বামীর ইচ্ছার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো না। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজে এসব কিছুই কেবল অবাস্তব সম্ভাবনা আর অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। আসলে এখানে সকল আয়োজনই পুরুষের জন্য। আর নারীদের জন্য যা হওয়া উচিত সবসময়ই তার উল্টোটা ঘটে।

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, শ্বশুরবাড়ির বন্দীশালায় নারীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। আর তাই এ ক্লান্তিকর নিরানন্দ জীবনে অনেকেই ক্ষণিকের জন্য হলেও মুক্তির স্বাদ পেতে চায়। তাইতো গৃহবধূরা তাদের বাবার বাড়িতে নাইয়র যাওয়ার সুযোগ লাভের আশায় অপেক্ষার প্রহর গোণে। তারা অপেক্ষায় থাকে কখন বাবার বাড়ি থেকে কেউ একজন এসে তাদেরকে সেখানে বেড়াতে নিয়ে যাবে। যদি কেউই না আসে তখন তারা রাস্তার পানে চেয়ে থাকে এটা দেখতে যে বাবার বাড়ির আশেপাশের কেউ ঐ পথ দিয়ে চলাচল করে কিনা। তেমন কাউকে পেলে তারা নিজেদের আবেগকে সংবরণ করতে পারে না। নিচের ভাওয়াইয়া গানটিতে এমনই এক চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাড়িরও বগল দিয়্যা/ কারবা গাড়ি যায় দুই বান্দিয়্যা

পরানটা মোর আউলারে আউলি করে।/ ওকি ও গাড়িয়াল পাও ধরো এ্যাকনা কতা পুচ্ করো / ক্যামন আছে মোর দয়ার বাপ ও মাও?

এই লোকসঙ্গীতটির কথক এবং পূর্বে আলোচিত ভাওয়াইয়া গানটির কথকের সমস্যা প্রায় অভিন্ন। এ গানের কথক তার স্বামীর বাড়ির চারদেয়ালের বন্দীজীবনে হাঁপিয়ে উঠেছে। এদিকে আবার তার বাবার বাড়ি থেকেও কেউ তাকে নাইয়র নিতে আসে না। দীর্ঘদিন পিতামাতার সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই, আর তাই তারা কেমন আছে তাও সে জানে না। সে প্রায়ই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া সদর রাস্তায় চলে আসে এটা দেখতে যে, তার বাবার এলাকার কোনো গাড়িয়াল ঐ পথ দিয়ে যায় কিনা। এমন কাউকে পেলে সে এতোটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে যে, পিতামাতার খবর নেয়ার জন্য গাড়িয়ালের পা ধরতেও সে দ্বিধা করে না।ইতোমধ্যে এটি উল্লিখিত যে, শ্বশুরবাড়িতে মেয়েরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করতে পারে না। সেখানে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো তাদের দ্বারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিচের গানের কথকও তার শ্বশুরবাড়ির আবদ্ধ পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলিত। সকলের মন যুগিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টার পরেও লাঞ্ছনা-গঞ্জনাই তার নিত্যদিনকার পুরষ্কার। স্বামীর বাড়ির এতোসব সামাল দিতে দিতেই সে এখন প্রায় নিঃশেষিত। তাই সে ভাবছে, এখানে আর এক মুহূর্তও নয়। শারীরিক ও মানসিক পীড়ন থেকে মুক্তি পেতে সে তার বাবার বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছাপোষণ করেছে:

বাপ ও ভাইয়ের বাড়ি যাব / বারা বানিয়া খাব

তবু না যাব পানিয়্যা মরার বাড়ি। উপরের গানের কথক এই প্রত্যয় ব্যক্ত করছে যে, সে যদি একবার তার বাবার বাড়িতে যেতে পারে তাহলে আর কখনোই স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসবে না। সে আরো বলছে, পিতার বাড়িতে যদি তার কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় এবং অন্নের সংস্থান যদি সেখানে নাও হয়, তবুও সে স্বামীর বাড়িতে ফিরবে না। সেক্ষেত্রে সে ঢেঁকিতে অন্যের ধান ভেনে (ডানা) জীবিকা নির্বাহ করবে।

নিচের গানের কথক কিছুটা সৌভাগ্যবান, কারণ তার ভাই এসেছে তাকে বাবার বাড়িতে নাইয়র (বেড়াতে) নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু অবিবেচক স্বামী এতে বাধ সাধছেন। এ মুহূর্তে সে স্ত্রীকে তার বাবার বাড়িতে পাঠাতে নারাজ। নিচের ভাওয়াইয়া গানটির কথকের ভাষায়

তার স্বামীর এই পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবটিই ফুটে উঠেছে। ওরে ভাইয়া আলচে গাড়ি ধরি/ মুই যাইম মোর বাপের বাড়ি

পানিয়া মরা না দেয় যাবার মোক।

স্বামীর কারণেই সে গত তিন-চার বছরে একবারও তার বাবার বাড়িতে নাইয়র যাওয়ার সুযোগ পায়নি। এই দীর্ঘ সময়ে তার মা অনেকের দ্বারাই জামাই এর কাছে খবর পাঠিয়েছে যাতে করে সে স্ত্রীকে নিয়ে তার শশুর বাড়িতে (স্ত্রীর বাবার বাড়ি) বেড়াতে আসে। কিন্তু শাশুড়ির এই প্রত্যাশা যে বারংবার তার জামাই এর স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের কাছে দলিত হয়েছে, একই গানের নিচের অংশে আমরা এর প্রমাণ পাই।

ওরে তিন-চারি খ্যান বছর যায়/ কতোয় খবর দিচে মাঝে

ঘাটায় পথে যার নাগাল পায়।/ পানিয়্যা মরার এমন মন

আশায় আশায় কাটাই ক্ষণ/ একবারো নাইয়র যাওয়া না হয়। কিন্তু এবার সে যাবেই। যেহেতু তার ভাই তাকে নিতে এসেছে, এই সুযোগটাকে সে কোনোভাবেই ছাড়তে চায় না। কোনো সন্দেহ নেই, ভাই এর আগমন তাকে সাহসী ও অদম্য করে তুলেছে। আর তাই বাবার বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে এবার সে দৃঢ় প্রতীজ্ঞ। সন্তান ছোটো থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তাকেও সে সাথে নিতে চায়:

ওরে না নাগে তোর ঘর-বাড়ি/ মুই যাইম মোর ছাওয়া ধরি।

দ্যাখিম এবার কে আটকায়।

কিন্তু তাকে প্রশমিত করতে তার স্বামী ও শ্বশুর কৌশলের আশ্রয় নেয়। তারা তাকে দোষারোপ করে এই বলে যে, বাবার বাড়িতে নাইয়র যাওয়ার কারণেই কয়েক বছর আগে তার প্রথম সন্তানের মৃত্যু হয়। আর এ কারণেই এবার তারা জীবিত অন্য সন্তানটিকে তার মায়ের সাথে যেতে দিতে ঘোর আপত্তি জানাচ্ছে। তাদের ধারণা সন্তানকে যেতে না দিলে তার মাও হয়তো বাবার বাড়ি যাওয়ার তীব্র বাসনা থেকে সরে আসবে। বাড়ির বউকে আটকাতে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের চাতুর্যই ফুটে উঠেছে ভাওয়াইয়া গানটির এ অংশে।

ছাওয়ার বাপ, দাদা, চাচায় কয়

“ছাওয়ার যাওয়া হবার নয়

ঐ বাদে তোর ছাওয়ায় না টেকে।”

উপরের গান থেকে আমরা জানতে পারি, এই গানের কথকের এক সন্তান পূর্বে কোনো এক সময় মারা গিয়েছিলো। স্বামীর বাড়ির আত্মীয় স্বজনের ধারণা, বাবার বাড়িতে নাইয়র যাওয়ার কারণেই তার সন্তানের এই করুণ পরিণতি হয়েছিলো। এই ধারণাটি যে ভ্রান্ত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার স্বামী, শ্বশুর, দেবর-ভাসুরেরা ভাবছে, গানটির কথক যখন আগেরবার তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো, তখন তাকে ভূতে ধরেছিলো, অর্থাৎ সে কোনো এক অশরীরী আত্মার সংস্পর্শে এসেছিলো। তাদের ধারণা, এই অশরীরী আত্মাই পরবর্তীতে কথকের সন্তানকে হত্যা করে থাকতে পারে। আর তাইতো উপরের গানের কথককে শায়েস্তা করার জন্য শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার সন্তানের মৃত্যুর দায় তারই কাঁধে চাপিয়ে তাকে বাগে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে কোনোভাবেই এর জন্য দায়ী নয়। এর দায় বরং দুর্ভাগা সন্তানটির বাবা, চাচা ও দাদার কাধে চাপানো যেতে পারে। কেননা, ভূত-প্রেতের উপর তাদের অতি মাত্রার বিশ্বাসও সন্তানটির অকাল মৃত্যুর একটি বড় কারণ। ভৌতিক বিষয়ে তাদের এই অন্ধবিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটেছে কথকের কন্ঠে:

ওরে মোক আরো কয় মাসের শ্যাষ (শেষ)/ না যাইস তোর ভাইয়্যার দ্যাশ নাইয়র গেইলে দোষে ধরিবে তোকে।কাজেই সন্তানের মৃত্যুর কারণ নিয়ে তার দাদা-বাবা-চাচার ধারণা সঠিক নয়। আগেরবার (চার-পাঁচ বছর আগে) এই গানের কথক যখন তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো এবং সেখানে কয়েকদিন থাকার পরে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসে তখন সেই সন্তানটি হঠাৎ করে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। হয়তো তখন অসুস্থ সন্তানকে চট্‌শদি কোনো ডাক্তারের কাছে বা কোনো হাসপাতালে না নিয়ে তার অসুস্থতার জন্য কথকের (সন্তানের মা) উপর দোষ চাপানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিলো। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস থাকায় ডাক্তারের কাছে না নিয়ে তারা তখন অসুস্থ সন্তানটির চিকিৎসার ভার কোনো ফকির, ভণ্ড সাধু-দরবেশ বা হাতুড়ে কবিরাজের উপর ন্যাস্ত করে থাকতে পারে। আর তাই দুর্ভাগা সন্তানের অকাল মৃত্যুর জন্য যদি কাউকে দায়ী করার ব্যাপার এসেই যায়, তবে এর দায় গিয়ে পড়বে তার পিতা, চাচা ও দাদার উপরে। কেননা মৃত সন্তানটি তাদের অন্ধ বিশ্বাস বা কুসংস্কারের শিকার হয়েছিলো। যদি ভূত-প্রেতে তাদের বিশ্বাস না থাকতো এবং সন্তানটির মায়ের কাধে অহেতুক দোষ না চাপিয়ে যদি তারা তাকে নিয়ে কোনো ডাক্তারের শরণাপন্ন হতো, তাহলে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও থাকতো। আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের উপর অন্যায়ভাবে দোষ চাপানো হয় আর পুরুষেরা দোষ করেও পার পেয়ে যায়।

শ্বশুরবাড়ির শত প্রতিকূলতা সামলে উপরের গানের কথক ভাই এর সাথে তার বাবার বাড়িতে নাইয়র যেতে পেরেছিল কিনা আমরা তা জানি না, কেননা সে ব্যাপারে আর কোনো তথ্য নেই গানের কোনো অংশেই। তবে এরূপ ক্ষেত্রে বিবাহিত মেয়েরা অধিকাংশ সময়েই তাদের শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বা স্বামীর ইচ্ছার কাছে নিজেদের চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দেয়। কিন্তু নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হওয়া এমন কেউ যদি কোনোভাবে তার বাবার বাড়িতে নাইয়র যাওয়ার সুযোগ লাভ করে, তাহলে সে আর শ্বশুরবাড়ির বন্দী জীবনে ফিরতে চায় না। নিচের ভাওয়াইয়া গানটিতেই এ বিষয়টির নিপুন চিত্রায়ণ ঘটেছে।

নানী, মুই বলে যাইম ‘পরার বাড়ি/ ঐ যে দ্যাখ আইচে গাড়ি

বুক খানোতে মোর ধরফরানি ওঠে। রংপুর অঞ্চলের উপভাষায় ব্যবহৃত ‘পরার’ শব্দটির অর্থ ‘নিজের নয়, অন্যের’। উপরের গানের কথকের কাছে শ্বশুরবাড়ি হলো ‘পরার বাড়ি’, অর্থাৎ তা তার নিজের নয়, অন্যের বাড়ি। যে বাড়ির সদস্যরা সবসময় তার ত্রুটি খুঁজতে ব্যস্ত, যেখানে পান থেকে চুন খসলেই দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মানসিক বা শারীরিকভাবে নিপীড়ণ করা হয়, যেখানে তার চিন্তা-চেতনার কোনোই মূল্য নেই, যেখানে তার মত প্রকাশের বা সিদ্ধান্ত প্রদানের কোনো অধিকার নেই, সর্বোপরি যেখানে তাকে একজন বন্দীর মত জীবন যাপন করতে হয়, সেই বাড়িকে কীভাবে সে আপন জ্ঞান করবে, আর কীভাবেই বা তা তার নিজের হবে? তাইতো উপরের গানের কথককে দেখি স্বামীর বাড়িকে সে অন্যের আবাস হিসেবে গণ্য করছে এবং বাবার বাড়ির নাইয়র শেষ করে সেখানকার আবদ্ধ জীবনে ফিরতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে। আর সে কারণেই স্বামীর বাড়ি থেকে তাকে নেয়ার জন্য পাঠানো গাড়ি দেখে সে সম্রস্ত হয়ে পড়েছে। বাবার বাড়িতে কয়েকদিন আয়েশি জীবন কাটানোর পর পুনরায় শ্বশুরবাড়ির বন্দী জীবনে প্রবেশ করতে হবে ভেবে সে ভীষণভাবে আঁতকে উঠছে। স্বামীর বাড়ির বন্দী খাঁচায় সে আর প্রবেশ করতে চায় না, কারণ

শ্বশুরবাড়ি দিদি বাঘের ঘর/ মোক না মোনায় যাবার দিদিলো।

উপরের গানের কথক শ্বশুরবাড়িকে বাঘের ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছেন যেখানে তার অবস্থা যেন অনেকটাই হরিণের মতো। শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূরা যে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় সে বিষয়টিকে বিবেচনায় আনলে এটা সহজেই অনুমিত হয় উপরের গানের কথক কেন তার শ্বশুরবাড়িকে বাঘের ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। শ্বশুরবাড়িকে পাখির খাঁচার সাথে তুলনারও নজির লোকসঙ্গীতে বিদ্যমান। নওগাঁ অঞ্চলের এই মেয়েলী গাঁতে তেমনি এক উদাহরণ আমরা খুঁজে পাই

আইস আইস আইসরে নাসিমা / আমার খাঁচার মইধ্যে কি নারে। তোমার খাঁচার মইধ্যে রে গেলে/ আব্বা হারা হব কি নারে। তোমার খাঁচার মইধ্যে গেলে/ আম্মা হারা হব কি নারে। আলাপচারিতামূলক এই লোকসঙ্গীতটিতে প্রেমিক প্রেমিকাকে তার খাঁচায় প্রবেশের আহ্বান জানাচ্ছে। অর্থাৎ সে তাকে বিয়ে করে তার বাড়িতে তুলতে চায়। স্বামীগৃহ বা শ্বশুরবাড়ি যে গৃহবধূর জন্য বন্দীখাঁচা সদৃশ সে বিষয়টির দিকেই এখানে সরাসরি ইঙ্গিত করা হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির চৌহদ্দি যেহেতু তারা পেরুতে পারে না, তাদের মাঝে স্বামীগৃহেই কারারুদ্ধ থাকার অনুভূতি কাজ করে। সঙ্গত কারণেই শ্বশুরবাড়িতে বসবাসের সময়কালটাকে কোনো কোনো বিবাহিত রমণী বনবাসে থাকার শামিলও জ্ঞান করেছে। নিচের লোকসঙ্গীতটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ:

ভাবী গো/ বনবাস থাকি হামাক / নাইয়র নিয়া যাও।

মাস শেষে বছর আসে/ দ্যাখং না বাপের গাও। নিচের গানের কথকের কাছেও শ্বশুরবাড়ি যে একটা গৃহকারাগার, সেখানে যে তাকে নিদারুণ মনোকষ্টে দিনাতিপাত করতে হয় গানটির বিশ্লেষণে আমরা তার প্রমাণ পাই। স্বামীগৃহে অবরুদ্ধ থাকার ভাবনাটি অনেকের মাথায় এমনভাবে জেকে বসে যে তাদের কেউ কেউ মানসিক সুস্থতা হারানোর পর্যায়ে চলে যায়। এই গানের কথকের ক্ষেত্রেও এ ব্যাপারটি অনেকখানিই সত্যঃ
ওকি কাগারে কন কথা মোক / মাও বা কেমন আছে কাগারে।

যখন মাও মোর আন্দনরে আন্দোগান কাগা মোর মাওয়ের আগেরে। উপরের গানের কথক স্বামীগৃহের বৈরী পরিবেশে মানসিকভাবে অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। স্বামীর বাড়ির কেউ তার আপনারান নয়, কোনো কিছুই তার অনুকূলে না। দুঃখ-কষ্টের কথা কারো কাছে বলে যে সে নিজেকে একটু হালকা করবে তেমন কাউকেই সে খুঁজে পায় না। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে কাকই (পাখি) তার কাছে নিকটজন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ককের কাছেই সে বরং তার মনের কথা খুলে বলছে। তার মা এখন কেমন আছে তা যেমন সে জানতে চাচ্ছে, তেমনি নিজের কষ্টের কথাও তার মাকে জানাতে বলছে। কাককে যে বলছে, তার মা যখন রান্না করতে বসবে ঠিক তখনই যেন সে তার মাকে গিয়ে তার কষ্টের কথাগুলো বর্ণনা করে। একটা মেয়ে কতোটা অসহায় আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লে কাকের মতো একটা পাখির সাথে এমন নিবিড়ভাবে কথা বলতে পারে তা ভেবে দেখার জন্য পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। উপরের আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায়, শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূরা যেহেতু খুবই নিয়ন্ত্রিত ও সংযমী জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়,

এখানেই তারা কারাগারে থাকার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা লাভ করে। অন্যদিকে, বিবাহিত পুরুষেরা সর্বক্ষেত্রেই মুক্ত ও স্বাধীন। বিয়ের পরেও

দেহেতু তারা নিজ গৃহে বা পিতামাতার সাথে বসবাস করে, তাই বাড়ির পরিবেশ সবসময় তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে। আর এর ফলে

তাদেরকে ভাবনাহীন ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করতে দেখা যায়। কেবলমাত্র শিক্ষা ও কর্মসংস্থানই একজন বিবাহিত নারীকে তার

গৃহবন্দীত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে। শিক্ষিত হয়ে কর্মজীবী শ্রেণিভূক্ত হওয়া তাই তার জন্য অতীব জরুরি। আত্মনির্ভরশীলতা তাকে পরিবার

ও সমাজের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস যোগাবে।

ড.শিবলী চৌধুরী : সহকারী অধ্যাপক, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post