• August 18, 2022

আ ডল্স হাউস: নাটকে নারী অধিকার প্রসঙ্গ

 আ ডল্স হাউস: নাটকে নারী অধিকার প্রসঙ্গ

ড. শিবলী চৌধুরী

আ ডল্স হাউস নাটকটি যখন ১৮৭৯ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত হলো, তখন সমগ্র ইউরোপের গতানুগতিক নিস্তরঙ্গ জীবন যাত্রায় হঠাৎ করেই যেন এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটলো। আর এতে শতাব্দী প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ অকস্মাৎ এক চরম ধাক্কা খেলো। সময়টা ছিলো এমন যখন স্ত্রীকে স্বামীর অনুগত দাসী জ্ঞান করা হতো। স্বামী তার স্ত্রীকে কতোটুকু ভালবাসলো, আর কতোটাই বা মর্যাদার আসনে বসালো – সেগুলো কখনোই বিবেচ্য বিষয় ছিলো না। সামাজিক বিধানই বলুন আর প্রথাগত রীতিনীতিই বলুন বিষয়টা ছিলো এমন যে স্ত্রীরা স্বামীর দ্বারাই নির্দেশিত হবে, স্বামীর চোখেই বিশ্বকে দেখবে, স্বামীর চিন্তা-চেতনার সাথেই নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে। আর এ সব কিছুই তথাকথিত নিয়মতান্ত্রিকভাবেই চলছিলো। কিন্তু সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়া এক মহান নাট্যকারের আবির্ভাবে পুরুষতন্ত্রের এসব প্রতিষ্ঠিত আদর্শিক মূল্যবোধ হঠাৎ‍ করেই যেন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো।

একশত বিরানব্বই বছর আগে (২০ জানুয়ারি, ১৮২৮) আজকের এই দিনে নরওয়র শিয়েন শহরে জন্মগ্রহণকারী সেই কালজয়ী নাট্যকার হলেন হেনরিক ইবসেন। শেক্সপীয়রের পরে বিশ্ব নাট্যমঞ্চে ইবসেনের মতো শক্তিমান নাট্যকার খুব কমই এসেছেন বলে সাহিত্য সমালোচকেরা মত প্রকাশ করেন। তিনি যখন নাটক লেখা শুরু করেন তখন প্রচলিত নাটকগুলো সামাজিক মূল্যবোধের গুণকীর্তন করেই শেষ হতো। সেই ধারার বিপক্ষে প্রবলভাবে দাঁড়িয়ে নাটক নির্মাণে তিনি বৈচিত্র্য আনেন। নারী অধিকার নিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজও যে তুমুল আলোচনা, তা কিন্তু নাটকে তাঁর হাত ধরেই প্রথম এসেছে, বিশেষ করে তাঁর ‘আ ডলস হাউস’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

আ ডল্স হাউস নামের তাঁর যে অসামান্য সৃষ্টকর্ম পিতৃতন্ত্রের শক্ত ভিতকে কাঁপিয়ে দিলো তা কিন্তু নোরা নামের এক সাধারণ নারীর অসাধারণ হওয়ার আখ্যান, পিতৃতান্ত্রিক একপেশে মূল্যবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর এক নজিরবিহীন ইতিহাস। স্বামীর বশীভূত পোষ্য গৃহবধূ নোরা যখন আট বছর বা এরও অধিককাল স্বামীর ঘরে আনুগত্যপ্রবণ অক্রিয় জীবন যাপনের পর নাটকের শেষ দিকে এসে তার বন্ধন থেকে চিরমুক্তির সিন্ধান্ত নিলো, তখন তার সেই সাহসী পদক্ষেপ বর্তমান সময়ের চোখে অস্বাভাবিক মনে না হলেও উনিশ শতকীয় ইউরোপের প্রেক্ষাপটে তা কিন্তু ছিলো এক বিরাট ব্যতিক্রমী ঘটনা। কেননা, চারদেয়ালের মাঝে স্বামীর কর্তৃত্বপরায়ণ অনুশাসনেই অভ্যস্ত নোরা যখন এক ঘটনায় স্বামীর ভালবাসাহীন চরম স্বার্থপর চরিত্রের মুখোমুখি হলো তখন তার সামনে বিকল্প হিসেবে দুটি পথ খোলা ছিলো। প্রথমটি হলো আত্মহননের পথ বেছে নেয়া আর অন্যটি সবকিছু ত্যাগ করে ব্যক্তিসত্তার বিকাশে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার তাগিদে অনিশ্চিত অন্ধকার গন্তব্যের দিকে পা ফেলা। প্রথম বিকল্পের ভাবনা মাথায় দুএকবার উকি দিলেও শেষোক্তটিকে সে বেছে নেয় বলেই তা তাকে এক অনন্য অনুকরণীয় চরিত্রের মর্যাদা এনে দিয়েছে। আজ যে মেয়েরা পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার চেষ্টা করছে, আজ যে তারা স্বকীয় অস্তিত্ব বজায় রেখেই স্বতন্ত্র পরিচয়ে স্বামী-সংসার-সন্তানসহ পারিবারিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তার পেছনে কিন্তু ইবসেনের নোরার ভূমিকা অনেকখানিই।

নারী স্বাধীনতায় ইবসেনের যে অসীম আগ্রহ ছিলো তার প্রতিফলন কিন্তু আছে তাঁর পূর্ববর্তী নাটক দ্য পিলারস অব্ সোসাইটিতেও (১৮৭৭)। সেখানেও লোনা ও ডিনা নামের স্বকীয় অস্তিত্বের স্বতন্ত্র মনের দুটি নারী চরিত্রের সন্ধান মেলে। নারী অধিকার বাস্তবায়নে ইবসেন যে কতোটা উচ্চকণ্ঠ ছিলেন তার আরও নজির আমরা দেখতে পাই বিশেষ করে যখন তিনি রোমের স্ক্যান্ডেনেভিয়ান ক্লাবে একটা যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করেন। আর তাহলো ক্লাবের কার্যনির্বাহী পর্ষদের সভায় মেয়েদেরকে ভোট দেয়ার অধিকার প্রদান করা হোক। প্রস্তাবটি ভোটে পরাজিত হলে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি ক্লাব থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এখান থেকেই পরিষ্কার, বিষয়টিতে মানসিকভাবে তিনি কতোটা সম্পৃক্ত ছিলেন। সাহিত্য সমালোচকেরা এও মনে করেন, এই ব্যর্থতাই হয়তো তাকে আ ডল্স হাউস নাটকটি লেখার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছিলো।

তিন অঙ্কের নাটকের প্রথম অঙ্কেই আমরা প্রধান চরিত্রসমূহ টোরভাল্ড হেলমার, তার স্ত্রী নোরা হেলমার, নোরার বান্ধবী মিসেস ক্রিস্টিনা লিন্ডে এবং ক্রোগস্ট্যাডের সাথে পরিচিত হই। শুরুতে নোরাকে গতানুগতিক এক পোষ্য গৃহবধূর ভূমিকায় দেখা যায়। কোনো সন্দেহ নেই, স্বামী হেলমার তাকে ভীষণ ভালবাসে। স্ত্রীকে গুনগুন করে গান গাইতে দেখলেই সে আদর করে বলে, “আমার ছোট্ট পাখিটা কি গান গায় নাকি রে?” আরেক জায়গায় তাকে বলতে শোনা যায়, “আমার ছোট্ট কাঠবিড়ালীটা কি তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে নাকি রে?” হেলমারের ভালবাসার প্রকাশে এই যে ‘ছোট্ট’ শব্দের ব্যবহার এখান থেকেই কি বিষয়টি স্পষ্ট নয় যে, তার এ ভালবাসা হলো অধন্তনের জন্য ঊর্ধ্বতনের ভালবাসা। কেননা নোরার মনে সে এ ধারণা স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে যে, সেই হলো বাড়ির সর্বময় কর্তা। সংসারের সবকিছুই তার খেয়ালখুশি মতো চলবে। নোরার প্রতি হেমারের যে দিক-নির্দেশনা তা থেকে বিষয়টি পরিষ্কার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাপারেই সে নোরার সাথে পরামর্শ করতে অভ্যস্ত নয়। সে শুধু উপদেশ দিতেই জানে, নিতে নয়। নীতিবাগীশদের মত তার মুখ থেকে শুধুই নীতির ফোয়ারা ছুটতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ্য, অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে বরাবরই নোরাকে সংযমী হওয়ার পরামর্শ দেয়। তাকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করে, কারণ তা তার দাঁতের ক্ষতি করতে পারে। নোরাকে সে বলে, “কোন ঋণ নয়, কোন ধার নয়। যে সংসার ঋণ আর ধারের উপর দাঁড়িয়ে থাকে সে সংসারে শ্বাসরুদ্ধকর কুৎসিত একটা ব্যাপার থাকে।” [প্রথম অঙ্ক]। নোরাকে সে খোঁচা দিয়ে এও বলে, তার বাবা ছিলেন ভীষণ অমিতব্যয়ী একজন মানুষ এবং বাবার নেতিবাচক দিকটি নোরার মধ্যেও চলে এসেছে। স্ত্রীর ত্রুটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তার সামনে তারই মৃত বাবাকে এমন ছোটোভাবে উপস্থাপন করে হেলমার মূলত নিজের কুৎসিত কর্তৃত্বপরায়ণ মানসিকতাকেই উলঙ্গভাবে প্রকাশ করেছে। হেলমারের চোখে নোরা অমিতব্যয়ী হলেও আসলে কিন্তু সে তা নয়। বরং বাজার খরচের হিসাব থেকে টাকা বাঁচিয়ে সে ঋণের কিস্তি শোধ করে, যে ঋণের ব্যাপারে তার স্বামী বিন্দুবিসর্গও জানে না। স্বামীকে বাঁচাতেই সে ঋণ নিয়েছিলো, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নয়।

আ ডল্স হাউস এর কাহিনীর শুরু ক্রিস্টমাস ডে এর প্রাক্কালে, আর তা শেষ হয় মাত্র তিনদিন পরেই। নাটকটির সময়কাল স্বল্প হলেও অতীতের কাহিনীর বর্ণনাও সেখানে এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবেই। আট বছর আগে হেলমার একবার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। ডাক্তার নোরাকে পরামর্শ দিলো স্বামীকে বাঁচাতে হলে সে যেন তাকে নিয়ে দক্ষিণ ইউরোপের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে ঘুরে আসে। হঠাৎ করে নোরা তাই এক মহা সমস্যার মধ্যে পড়লো। এমন একটা ব্যয়বহুল ভ্রমণের জন্য তার কাছে যেমন পর্যাপ্ত অর্থ ছিলো না, তেমনি তার স্বামীকে বিদেশে না নিলেও আবার নয়। বাধ্য হয়ে তাই তাকে ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং সে ক্রোগস্ট্যাড নামের একজনের দ্বারস্থ হয়। ক্রোগস্ট্যাড ছিলো হেলমারের স্কুল জীবনের সহপাঠী। কয়েকদিন পরেই হেলমার যে ব্যাংকে ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করতে যাচ্ছে বর্তমানে সে ঐ ব্যাংকের একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী। নোরা একটা চুক্তিপত্রের মাধ্যমে ক্রোগস্ট্যাডের কাছ থেকে সুদের উপরে ১২০০ ডলার ধার নিয়েছিলো। ঋণ প্রদানের পূর্বে ক্রোগস্ট্যাড নোরাকে একটা শর্ত দেয়। আর তাহলো চুক্তিপত্রের উপর এমন আরেক ব্যক্তির স্বাক্ষর থাকতে হবে যে কিনা অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম এবং নোরার ব্যর্থতায় যে ঋণের অর্থ শোধ করতে বাধ্য থাকবে। হেলমার যেহেতু ঋণ গ্রহণের ব্যাপারটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখে না, তাই সে স্বামীকে বিষয়টি অবহিত করতে চায়নি। ফলে এই ঋণের জামিনদার হিসেবে চুক্তিপত্রের উপরে তার স্বামীর স্বাক্ষর গ্রহণও সম্ভব হয়নি। কাকে ঋণের জামিনদার বানানো যায় ভেবে কোনো কল-কিনারা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ঋণপত্রের উপরে সে নিজেই তার বাবার স্বাক্ষর নকল করে প্রদান করে। স্বাক্ষর জালিয়াতি যে দল্গুনীয় অপরাধ বিষয়টি না জেনেই না বুঝেই সে ঘটিয়েছে। আসলে সেসময় সবকিছু ছাপিয়ে অসুস্থ স্বামীকে বিদেশে নেয়ার বিষয়টি নোরাকে এতোটাই বিহ্বল করে তুলেছিলো যে, স্বাক্ষর জালের অপরাধের বিষয়টি তার মাথাতেই আসেনি।

নোরা যেহেতু কিস্তিতে নেয়ার শর্তে ঋণ গ্রহণ করেছিলো, তাই সে ভেবেছে, ঋণ শোধ করতে তার কোনো সমস্যা হবে না। স্বাক্ষর জাল করে ঋণ নিলেও তা শোধের ব্যাপারে মানসিকভাবে সে কখনোই অসৎ ছিলো না। ঋণের টাকা দিয়ে ডাক্তারের পরামর্শমত সে তার স্বামীকে নিয়ে ইতালি গিয়েছিলো। সেখানে এক বছর অবস্থানের পরে হেলমার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তারা দেশে ফিরে আসে। ঋণ গ্রহণের বিষয়টি এবং তা গ্রহণ করতে গিয়ে যে নোরাকে তার বাবার স্বাক্ষর জাল করতে হয়েছিলো তা সে হেলমারকে শেষপর্যন্তও অবহিত করেনি। তার কারণ হিসেবে সে ভেবেছে, ‘হেমারের স্বার্থে হেমারকে বাঁচাতে স্ত্রী নোরা ঋণ নিয়েছিলো’ বিষয়টি জানলে তা তার পৌরুষত্বে আঘাত হানতে পারে। স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি ক্রোগস্ট্যাডের নজরে আসলেও বিষয়টিকে সে এতোদিন গোপন রাখে। কারণ, ফিরে আসার পরে নোরা মাসিক কিস্তির টাকা নিয়মিত ও সময়মত শোধ করে আসছিলো। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই চলছিলো। কিন্তু কাহিনী জটিল আকার ধারণ করে যখন ব্যাংকের চাকরি বাঁচাতে ক্রোগস্ট্যাডের নিজেরই সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কেবল নোরাই তাকে তার বর্তমান বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। কেননা, ক্রোগস্ট্যাড যে ব্যাংকে চাকরি করে নোরার স্বামী আর কদিন পরে সেই ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। হেমার আগাম অবহিত হয়েছে যে, ক্রোগস্ট্যাড দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে অনিয়ম ও দুর্নীতির চর্চা করে আসছে। হেলমার তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই সে ক্রোগস্ট্যাডকে বরখাস্ত করবে। আর সেই পদে সে নোরার বান্ধবী ক্রিস্টিনা লিন্ডেকে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার সাথে একসময় ক্রোগস্ট্যাডেরই প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। কূলকিনারা না পেয়ে নিজেকে বাঁচাতে ক্রোগস্ট্যাড তাই নোরাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। নোরাকে সে পরোক্ষভাবে শাসিয়েও দেয়, স্বামীকে থামাতে না পারলে স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি সে হেলমারকে তো জানাবেই, এমনকি বিষয়টিকে সে কোর্টেও উঠাবে। নোরা এতে শঙ্কিত হয়ে পড়লেও এই ভেবে আশ্বস্ত হয় যে, তেমন খারাপ কিছু ঘটলে নিশ্চয়ই তার স্বামী সাহায্যের হাত বাড়াবে। নিশ্চয়ই হেলমারের স্বার্থে করা নোরার এই অনিচ্ছাকৃত ভুলকে হেলমার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তাকে রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। এক ঘটনায় হেলমার তো বলেছিলো, যদি নোরার জীবনে কখনো অশুভ কিছু ঘটেও, তার দায়ভার নিজের কাঁধে নেয়ার মত মানসিক সামর্থ্য তার আছে। নাটকের তৃতীয় অঙ্কে হেলমারকে এমনকি এও বলতে শোনা যায়, “নোরা, তুমি তো জানো, আমি মাঝে মাঝে বলতাম তুমি যেন সাংঘাতিক কোন বিপদে পড় যাতে আমি তোমাকে – রক্ষা করার জন্য আমার সবকিছুর ঝুঁকি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে পারি সে ঝুঁকি যদি আমার জীবনের ঝুঁকি হয় তাতেও ক্ষতি নেই।” [প্রবন্ধটিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন চরিত্রের উক্তিসমূহ খায়রুল আলম সবুজ কর্তৃক অনূদিত আ ডল্স হাউস এর বঙ্গানুবাদ নোরা থেকে চয়িত। এই বঙ্গানুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা । নোরার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার এতোসব বাসনার কথা হেলমার কিন্তু বলেছিল নোরা সত্যিকার বিপদে পড়ার পূর্বেই, অর্থাৎ ক্রোগস্ট্যাড কর্তৃক তার স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস করে দেয়ার আগেই।

এতোকিছুর পরেও ঋণ নেয়ার বিষয়টি নোরা নিজের মাঝেই রাখতে চায়, এখনই হেলমারকে কিছুই জানাতে চায় না। কেননা, স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা তাদের সুন্দর সম্পর্কের উপরে যে কোনোই অশুভ ছায়া ফেলবে না। সে ব্যাপারেও নোরা নিঃশঙ্কচিত্ত নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে নোরা তাই স্বামীর কাছে ক্রোগস্ট্যাডের হয়ে ওকালতি করে, কিন্তু কোনোভাবেই সে কিছুই করতে পারে না। হেলমার তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে শুধু অনড়ই থাকে না, বরং এমন একজন খারাপ ব্যক্তির হয়ে তার কাছে সুপারিশ করায় সে নোরাকে কিঞ্চিৎ ভর্তসনাও করে। নোরা তখন হেমারের কাছে জানতে চায়, ক্রোগস্ট্যাড কী এমন দোষ করেছে যে তার জন্য তাকে চাকরি খোয়াতে হবে? উত্তরে হেমার জানায়, সে একটা সই (স্বাক্ষর জাল করেছে যা কিনা এক ভয়াবহ অপরাধ। চকিতেই নোরার মানসচোখে নিজের স্বাক্ষর জালিয়াতির ছবিটি ভেসে ওঠে এবং সাথে সাথেই তার অন্তর নদীতে ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। আর এদিকে হেলমার ক্রোগস্ট্যাডের অপকীর্তির কাহিনী বর্ণনা করেই চলে, “একটু ভেবে দেখ, এ রকম একজন জালিয়াতকে কী পরিমাণ মিথ্যা বলতে হয়, মানুষকে ঠকাতে কতো রকম ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে হয়, তার কাছের মানুষগুলোর সামনেও তাকে কীভাবে মুখোশ পরে থাকতে হয় হ্যাঁ, এমনকি তার বৌ ছেলেমেয়ের সামনেও। ….এরকম মিথ্যার পরিবেশ সংক্রামক রোগের মতো ঘরের সবগুলো প্রাণীকে বিষাক্ত ও সংক্রামিত করে ফেলে।” [প্রথম অঙ্ক]। নোরা এক অশুভ আশঙ্কায় ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে ভাবছে, তার সংস্পর্শেও কি তার ছেলেমেয়েরা কলুষিত হয়ে যাবে, তার ঘরেও কি বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়বে? নিজেকে নিজেই সে প্রবোধ দেয়, “না, সত্য নয় একথা সত্য নয়। এ হতে পারে না কখনোই না।”

হেমারের অনুরোধে বিদায়ী ম্যানেজার তাকে ব্যাংকের কার্যপদ্ধতিসহ কর্মচারী রদবদলের একটা আগাম আইনসঙ্গত অধিকার প্রদান করেছে। আর এরই ক্ষমতাবলে সে ইতোমধ্যে ক্রোগস্ট্যাডকে বরখাস্ত করার ব্যবস্থা পোক্ত করে এবং তা তাকে ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করে। শুধু সই (স্বাক্ষর) জাল করা বা অনৈতিক কার্যকলাপের জন্যই যে হেলমার ক্রোগস্ট্যাডকে বরখান্ত করছে তা কিন্তু নয়। ব্যাপারটা আসলে অন্যখানে। ক্রোগস্ট্যাড যে হেলমারের স্কুল জীবনের বন্ধু এ বিষয়টিই মূলত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রোগস্ট্যাড এখনও হেলমারকে ডাক নামেই (টোরভাল্ড) ডাকে। হেমারের ভাষায়, “সে সবসময় ‘টোরভাল্ড এইটা’ ‘টোরভাল্ড এটা’ বলতে থাকে।” হেমারের আশঙ্কা চাকরিতে যোগদানের পরেও হয়তো নিচু পদের ক্রোগস্ট্যাড উঁচু পদের হেলমারকে নাম ধরেই ডাকবে এবং সম্পর্কের সূত্র ধরে তার কাছ থেকে অবৈধ সুযোগেরও প্রত্যাশা করবে। হেলমার আরও বলে, “ও মনে করে আমার সাথে সুসম্পর্ক থাকাটা তার অধিকার। —ও ব্যাংকে থাকলে ব্যাংকের চাকরিই আমার অসহ্য মনে হবে।” দ্বিতীয় অন্ত]। ক্রোগস্ট্যাড যে দক্ষ লোক সে ব্যাপারে হেলমারের মনে কোনোই সন্দেহ নেই। নোরার সাথে কথোপকথনের এক ফাঁকে হোমারের স্বীকারোক্তি, “শুনেছি সে কাজও নাকি ভাল করে।” [দ্বিতীয় অঙ্ক]। নোরার সাথে ক্রোগস্ট্যাডের কথোপকথনেরও কিছু অংশ এখানে উল্লেখ্য, “গত আঠারো মাসে আমি কোনো অসৎ কাজ করিনি।—আমি ধীরে ধীরে আমার অবস্থানে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম।” এখান থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট, আত্মসংশোধন প্রক্রিয়ায় থাকা দক্ষ ক্রোগস্ট্যাডের বলি হওয়াটা যতোটা না তার স্বাক্ষর জালিয়াতির অপরাধের কারণে, তারচেয়ে বরং বেশি হোমারের ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে, খোলাখুলি বললে তার বড়ত্বের জটিলতায় ভোগার কারণে। নোরা হেলমারকে ক্রোগস্ট্যাডের বিষয়টি পুনর্বার বিবেচনা করতে বললে তার এই বরিষ্ঠম্মন্যতাই প্রকাশ পায়, “ব্যাংকের সবাই এর মধ্যেই জানে আমি ক্রোগস্ট্যাডকে বরখাস্ত করেছি, এখন যদি লোকমুখে এটা ছড়িয়ে পড়ে যে, নতুন ম্যানেজার তার বউয়ের কথায় ওঠেবসে তাহলে ।” [দ্বিতীয় অঙ্ক]। হেমারের এ উক্তি থেকে তার পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় মেলে এবং একইসাথে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়ে উঠে আর তাহলো ক্রোগস্ট্যাডকে বাঁচানোর আর কোনো পথই নোরার সামনে খোলা থাকে না।

কিন্তু ক্রোগস্ট্যাড তো আর সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। সে আবার নোরার কাছে আসে এবং তার স্বামীকে বোঝানোর জন্য বলে যেন সে তার বরখাস্তের আদেশটা প্রত্যাহার করে নেয়। নোরা এতে অসহায়বোধ করে। কারণ, বিষয়টিকে ক্রোগস্ট্যাডের অনুকূলে আনার জন্য সে তো আর চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি। ক্রোগস্ট্যাড যখন বুঝতে পারল নোরার আসলে কিছুই করার নেই, তখন সে শেষ অস্ত্রটা প্রয়োগ করে। অর্থাৎ‍ সঙ্গে করে আনা হেলমারকে লেখা চিঠিটা সে নোরাদের ব্যক্তিগত চিঠির বাক্সে ফেলে দিয়ে চলে যায়। চিঠিটা যে নোরা বের করবে তারও কোনো উপায় নেই, কারণ চিঠির বাক্সের চাবিটা তো সবসময় হেমারের কাছেই থাকে। নোরা ভাবছে, “সর্বনাশ আর ঠেকানো গেল না – ” [দ্বিতীয় অঙ্ক]।

ক্রোগস্ট্যাডের চিঠিটা পড়ার পরে হেলমার যখন নোরার ঋণগ্রহণ ও তার স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনাটি জানতে পারলো, তখন সে অতিশয় ক্রুদ্ধ হলো। নোরা যেখানে ভেবেছিলো, বিষয়টি জানতে পারলে হেলমার হয়তো সবকিছুর দায়িত্ব নিয়ে তাকে নির্ভার করবে, সেখানে ক্রোগস্ট্যাডের ছোট্ট একটা চিঠির ধাক্কায় তার সেই প্রত্যাশার অপমৃত্যু হলো। হেলমার যেখানে নিজেই আশ্বাস দিয়েছিলো নোরার বিপদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে তার পাশে এসে দাঁড়াবে, নোরার আসল বিপদে ক্রোগস্ট্যাডের হুমকির মুখোমুখি তার সেই পৌরুষত্ব এক চতুষ্পদ প্রাণির মত লেজ গুটিয়ে ফেললো। হেলমার যে পুরোপুরি স্বার্থান্ধ ও আত্মকেন্দ্রিক একজন মানুষ এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটলে তা হয়তো নোরার কখনোই জানা হতো না। নিজেকে একটুখানি বিপদের মুখে দেখেই সে নোরার উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছে, “তুমি আমার সব সুখ নষ্ট করেছ, শান্তি বিনাশ করেছ সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছ আমার গোটা ভবিষ্যৎ।” (তৃতীয় অঙ্ক)। নোরার দিকটা ইতিবাচকভাবে দেখার কোনো মানসিকতাই তার নেই। বরং মানুষ কী ভাববে বা ভাবতে পারে তাই তাকে হতবিহ্বল করে তুলেছে, “মানুষ ধরেই নেবে আমিও তোমার অসৎ কাজের সঙ্গী।” আর তাই হেলমার নোরাকে নিষ্ঠুর বাক্যবাণে জর্জরিত করেই চলেছে, “তুমি একটা মিথ্যুক – ভঙ—- তারচেয়েও বেশি তুমি একটা দুর্বৃত্ত। ওহ্ কী কুৎসিত! কোনো শব্দের শক্তি নেই এই কুৎসিতের মাত্রা ধারণ করে, ওহ্ ।” সংকটের এই পর্যায়ে সে এমন কথা বলারও স্পর্ধা দেখায়, “আমি তোমার উপর আমার বাচ্চা মানুষ করার ভার দিতে পারি না। তাদের ব্যাপারে তোমাকে আমি আর বিশ্বাস করতে পারি না।” [তৃতীয় অঙ্ক)। একজন মায়ের জন্য এর থেকে অপমানজনক এরচেয়ে অবমাননাকর আর কীইবা থাকতে পারে। যে ঋণগ্রহণ বা স্বাক্ষর জালিয়াতির জন্য হেলমার আজ তাকে অপমান করে ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছে তা কিন্তু সে হেলমারের স্বার্থেই করেছিলো, নিজের জন্য নয়। কী পরিস্থিতিতে আর কেনোই বা নোরাকে এই অনিচ্ছাকৃত অপরাধ করতে হয়েছিলো তা বোঝার বা মূল্যায়ন করার যোগ্যতা অবশ্য এই স্বার্থপরের নেই। তার প্রিয় নীতি-নৈতিকতা ভুলে গিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে হেলমার এমনকি ক্রোগস্ট্যাডের সব দাবী মেনে নিতেও প্রস্তুত, “কোনো-না-কোনোভাবে তাকে থামাতেই হবে যে করেই হোক এ জিনিস চাপা দিতেই হবে।” [তৃতীয় অঙ্ক]।

আর অন্যদিকে একই সময়ে সাব-প্লটে আরেকটি ঘটনা ঘটে। নোরার বান্ধবী বিধবা ক্রিস্টিনা লিন্ডের সাথে বিপত্নীক ক্রোগস্ট্যাডের ভালোবাসার সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয় এবং বিয়ে করে শেষ জীবনটা তারা একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফুরফুরে মেজাজে থাকা ক্রোগস্ট্যাড নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়। কারণ, তারা যখন সংসার শুরু করতে যাচ্ছে, তখন তার চিঠির কারণে নোরাদের সংসারে অশান্তির ঝড় বইতে শুরু করেছে। তাই সে সব দাবী প্রত্যাহার করে নিয়ে ঋণপত্রের বন্ডসহ নোরাদের কাছে দ্রুত আরেকটি চিঠি পাঠায়। চিঠি পাওয়ার পর হেলমার যখন দেখলো তার সব বিপদ কেটে গিয়েছে, তখন সে দপ করে নিভে যায়। একটা স্বস্তির হাওয়া এসে যেন হেলমারের মুখ থেকে আশঙ্কার সব মেঘ সরিয়ে নিয়ে গেলো। নিজেকে ফিরে পেয়ে সে আবার এমন আচরণ করতে শুরু করলো না যেন কিছুক্ষণ আগে কিছুই ঘটেনি। অকৃতজ্ঞ বেহায়ার মত উল্টো সেই আবার বলে, “আমি তোমার সবকিছু ক্ষমা করে দিয়েছি।” তৃতীয় অঙ্ক]। বিপদ কেটে যাওয়ার পরেই কেবল সে বুঝতে পারে, “তুমি যা করেছ সে আমার ভালবাসার জন্যই।” নোরাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে একাই বক্বক্ করতে থাকে। তার কন্ঠস্বরে পূর্বের অভিভাবকসুলভ ভাবটা যথারীতি স্বমহিমায় হাজির, “এ বাড়ি এটাই তোমার নির্ভয় আশ্রম। ক্ষিপ্ত বাজের তীক্ষ্ণ নখের কবল থেকে পালিয়ে আসা পাখির মত তোমাকে আমি অভয়ারণ্য দেব। …আমিই তোমার ইচ্ছা, আমিই তোমার বিবেক।” [তৃতীয় অঙ্ক)। কিন্তু এসব কিছুই নোরাকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারে না। কেননা, বিবাহিত জীবনের এতোদিন পরে নোরা যখন দেখলো ছোট্ট এক ঝড়ে তার প্রতি হেমারের ভালোবাসা আজ টলটলায়মান, তার নৈতিক মূল্যবোধ আজ পথ হারিয়ে ফেলেছে, তখন একই ছাদের নিচে থেকে শুধু শুধুই বিষবাষ্প ছড়িয়ে আর কী লাভ?

তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর নয় – এই গ্লানি এই সংসার আর নয়। সংকটের মুখে হেমারের চরম স্বার্থপরতা তার (নোরার ভেতরের সুপ্ত আমিত্বকে জাগিয়ে দিয়েছে। আজ তার বোধের উদয় হয়েছে, তার নিজেরও একটা স্বাধীন মন আছে এবং তা হেমারের কপট ভালোবাসার খাঁচায় আর কখনোই বন্দী থাকবে না। সে এখন নিজস্বতাকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে চায়। হেমারের ঘরে যেহেতু তার কোনোই সুযোগ নেই, তাই সে একলা পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর প্রস্থানের প্রাক্কালে হেলমারের সামনে সে তার সংসার ছাড়ার কারণগুলো তুলে ধরে, “বাবার সঙ্গে যখন ছিলাম তখন বাবার ধারণাই আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিল, কখনো যদি আলাদা করে ভেবেছি সেটা তাকে বলতে পারিনি, বরং লুকিয়েছি।…..যখন আমি বাবার হাত থেকে তোমার হাতে পাচার হলাম…তখন তোমার পছন্দই আমার পছন্দ হয়ে গেল।…আমি কৌশল করে তোমার সংসারে জীবন যাপন করেছি… আমি এখানে ছিলাম তোমার পুতুল-বৌ যেমন বাবার বাড়িতে ছিলাম তার পুতুল-মেয়ে।…এ গণ্ডির বাইরের পৃথিবীকে এবং আমার নিজেকে যদি জানতে হয় তাহলে আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সেজন্যই আমি এখানে তোমার সঙ্গে আর থাকছি না।” তৃতীয় অঙ্ক)। হেলমার যখন তাকে স্বামী-সন্তানের প্রতি তার কর্তব্যের কথা খেয়াল করে দেয় তখন সে বলে যে, তার আরও একটি দায়িত্ব আছে যা কিনা অধিকতর পবিত্র। আর তাহলো নিজের প্রতি নিজের দায়িত্ব। অতঃপর সে হেলমারকে বিয়ের আংটি ফেরত দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই হেলমার নিচ থেকে সজোরে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনতে পায়।

নাটকের একদম শেষে এসেও আমরা বুঝতে পারি, আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে তখনো আছে নোরা। তার বোধোদয়কে আমাদের অনেকের কাছেই যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়। স্বামীকে রেখে চিরতরে বাড়ি ছাড়াটা তার জন্য কতোটা সমীচীন হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অনেকে হয়তো এও মনে করতে পারেন, হেমারকে নোরা অন্তত একটা সুযোগ দিতে পারত যাতে করে সে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে। কিন্তু কথা হলো, বিপদমুক্তির পর হেলমারের চারিত্রিক রূপবদল ঠিক কতোটা হতো তা কিন্তু প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। কেননা, বিপদ কেটে যাওয়ার পরেও তার স্বভাবে পূর্বের আচরণের পুনরাবৃত্তি পুরোমাত্রায় লক্ষণীয়। নোরার সাথে তখনো সে আগের মত স্বভাবজাত অভিভাবকসুলভ ভঙ্গিতেই কথা বলে। নোরার মাতৃত্ব নিয়েও অনেকে বিতর্ক করতে পারেন সে কেমন মা যে কিনা নিজেকে জানতে নিজের স্বার্থে সন্তান ফেলে রেখে চলে যাওয়ার মত একটা মারাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নাটকটি নিয়ে যতোই বিতর্ক হয়েছে ততোই এর শিল্প-সুষমা বেড়েছে। কেননা, হেমারের সাথে সমঝোতার মধ্য দিয়ে যদি নাটকের শেষ হতো তাহলে কিন্তু তা কখনোই এতোটা বিখ্যাত হতো না, আর তা নিয়ে এত স্বাস্থ্যবান আলোচনা-সমালোচনারও প্রয়োজন পড়ত না। আমাদের ওপর নাটকটির যে প্রভাব, আমাদের উদ্দেশ্যে এর যে শক্তিশালী বক্তব্য তা কিন্তু সম্ভব হয়েছে নাটকটির এই সাহসী এন্ডিং-এর কারণেই। স্বামীর মুখের ওপর দরাম্ করে দরজা বন্ধ করে নোরা চলে যায় বলেই তা পাঠক ও দর্শককে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়। সমাজে প্রচলিত স্বামী-স্ত্রীর তথাকথিত সম্পর্ক কতোটা পারস্পরিক – তা নিয়ে পুনর্ভাবনা ও পুনর্মূল্যায়নের একটা সুযোগ কিন্তু আমাদেরকে করে দিয়েছে ইবসেনের এই অবিস্মরণীয় নাটক।

ড. শিবলী চৌধুরী : সহকারী অধ্যাপক, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post