• December 4, 2021

চিত্রকলার উপনিবেশায়নঃ উন্মেষপর্ব(পর্ব-২)

 চিত্রকলার  উপনিবেশায়নঃ উন্মেষপর্ব(পর্ব-২)

ফকরুল চৌধুরী :- উপন্যাস বাস্তবের চিত্রায়ন হলেও কল্পনা এখানে বড় অনুঘটক। চরিত্রাবলী কাল্পনিক। মোল্লাহাটি নীলকুঠি ঘিরে যে-আখ্যান বিভূতিভূষণ উপস্থাপন করেছেন, তা ইতিহাসের সত্য। কিছু চরিত্র বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। এই উপন্যাসের কোলসওয়ার্দি গ্রান্ট ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নের একটি প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র। এটি কোন কল্পনিক চরিত্র নয়, আর তিনি এদেশে কেবল ভ্রমণ করতে আসেননি। তিনি এসেছিলেন একটি উপনিবেশিত দেশে বিজয়ী জাতির গর্বিত একজন হয়ে। একটি অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও তার ছিল, যে-উদ্দেশ্য তৎকালে এদেশে ঝাকেঝাকে সাধারণ ব্রিটিশরা আসতেন ‘নবাব’ হতে। তখন কোম্পানির নিম্নভুক কর্মচারীও লুটেপুটে ধনাঢ্য হয়ে স্বদেশে প্রত্যাপর্ণ করতেন। এ খবর সেখানে চাউর হতে বেশী সময় লাগেনি। এমন ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, কোনভাবে সমৃদ্ধ ভারতবর্ষে উপনীত হওয়া সম্ভব হলে ধনরত্নের মালিক হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। ব্রিটিশরা তো দল বেঁধে আসতেন, আসতেন ইউরোপের অন্য দেশ থেকেও। নানা পেশার মানুষের মতো চিত্রশিল্পীরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল না।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গ্রান্ট ছিলেন কলিকাতার বাসিন্দা। তখন অসাধারণ কৃতিত্ব কলম ও তুলিতে তিনি কলকাতার অন্তরঙ্গ চিত্রভাষ্য তুলে ধরেন, তার ‘অ্যান অ্যাংলোইন্ডিয়ান ডোমেস্টিক স্কেচ’-এ। বইটির প্রকাশকাল ১৮৪৯। মূলত এই গ্রন্থের লেখাগুলি তার মায়ের কাছে লিখিত পত্রগুচ্ছের সমাহার। জানা যায়, এ চিঠিগুলো ইংল্যাণ্ডে খুব সমাদৃত হয়েছিল এবং সেখানে হাতে হাতে ঘুরত। সেকালের গ্রামজীবন নিয়ে গ্রান্টের ‘রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। প্রদ্যোৎ গুহ’র ‘কোম্পানি আমলে বিদেশী চিত্রকর’ গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, ‘কলকাতায় অবস্থানকালে গ্রান্ট অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। শরীর সারাবার জন্য তিনি নদীয়া জেলার সুখসাগরে ইংরেজদের এক কুঠিতে অতিথি হয়েছিলেন।’ আর এই কুঠি যে ইছামতি নদীর পারের শিপ্টমস সাহেবের মোল্লাহাটি তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার নয়। এখানে গ্রামে বাস করতে গিয়ে বাংলার গ্রামজীবনের সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় ঘটেছিল। তিনি শুধু শিল্পীই ছিলেন না, ভ্রামনিক চোখে বাংলার যাপনচর্চা থেকে বাংলার ভূমিব্যবস্থা, কৃষি পদ্ধতি, কৃষিপণ্যেও অনুপযঙ্খ বিবরণ নথিবদ্ধ করেন। ভগ্নীর কাছে লিখিত চিঠির ভিত্তিতে প্রণীত ‘ ‘রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল’-এ তিনি বাংলার নিসর্গ, বৃক্ষ-উদ্ভিদ, নিত্যব্যবহার্য উপাদান এবং সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিচরিত্র; পাশাপাশি তাদের বিবরণ তুলে ধরেন। এই গ্রন্থের ছাপা হয়েছিল তিলু এবং ভবানীর পূর্বোল্লিখিত ছবি। উল্লেখ্য, উপরোল্লিখিত গ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হয়েছিল ছদ্মনাম, ‘অ্যান আর্টিস্ট ইন ইন্ডিয়া’ ধারণ করে। গ্রান্টের ছবির বইয়ের মধ্যে স্বনামে প্রকাশিত হয়েছিল, ‘লিথোগ্রাফিক স্কেচেস অব দি পাবলিক ক্যারেকটারস অব ক্যালকাটা, স্কেচেজ অব ওরিয়েন্টাল হেডস ও রাফ পেন্সিলিংস অব এ রাফ ট্রিপ টু রেঙ্গুন। ১৮৩৮ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে গ্রান্ট কলিকাতার অভিজাত পত্রিকা ও জার্নালে সেকালের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ছবি এঁকেছিলেন। এবং প্রচলিত ধারা এ অনুযায়ী এটাও বলা যায়, তিনি অর্থের বিনিময়ে সেকালে কোম্পানির কর্মকতা থেকে শুরু করে দেশীয় রাজন্য, জমিদার ও উচ্চবিত্তদের ছবি এঁকেছিলেন। তিনি ছবিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতির আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলেন ‘স্কেচেজ অব ওরিয়েন্টাল হেডস’-এ।
গ্রান্ট অবশ্যই বিদেশীর চোখে কলকাতাকে দেখেছেন এবং প্রধানত বিদেশীদের জীবনযাত্রার বিবরণই লিপিবদ্ধ করেছেন। তবুও যুগসন্ধির কলকাতার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর স্কেচে। সেকালের বাংলার জীবনযাত্রার যে অন্তরঙ্গ পরিচয় তিনি তার বইতে ধরে রেখেছেন তার ইতিহাসের দলিল হিসাবে অপরিসীম মূল্যের দাবি রাখে। গ্রান্ট তাঁর বইতে বাঙলার শাক-সব্জি, ফলমূল ও গাছ-পালার যে সচিত্র বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন তা শুধু উদ্ভিদবিদের পক্ষেই সম্ভব। আবার এদেশীয়দের নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানও তার ছবি ও লেখায় উঠে এসছে।
কুলওয়ার্দি গ্রান্টের মতো অসংখ্য শিল্পী তৎকালে এদেশে এসেছিলেন ভাগ্যবদলে। গ্রান্ট একটি উদাহরণ মাত্র। সবার বিবরণ দেয়া এখানে সম্ভব নয়। তবে গ্রান্টের পরিচয়ের মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ডের ধারা সম্পর্কে অবহিত হওয়া সম্ভব। এখন আমরা সামগ্রিকভাবে এতদ্বিষয়ের আরও কিছু আলোচনা করব।

সুপ্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ জ্ঞানে ও ধনে সম্পদশালী। বাণিজ্যব্যপদেশে এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বনিক-ব্যবসায়ীরা এসেছেন, আবার এদেশের বাণিজ্য জাহাজগুলো নিজেদের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য ভূখণ্ডে পাড়ি জমিয়েছে। ফলে বহিঃবির্শ্বের সঙ্গে দেওয়া-নেওয়া চল ছিল, শিল্প, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
সতেরো শতকে ইউরোপীয় দেশগুলোর নতুন ভূখণ্ড আবিস্কারের পর্যায়ে ভারতবর্ষে আসার নৌপথ আবিস্কারে বেশ কিছু অভিযান পরিচালিত হয়। কলম্বাস ভারত ‘আবিস্কার’ করার লক্ষে বেরিয়ে ‘আবিস্কার’ করেন আমেরিকা। অনেকদিন আমেরিকাকেই তার ভারতবর্ষ ভেবে ভ্রমে ছিল। পরে ভাস্কো ডা গামার নেতৃত্বে তাদের লক্ষ পূরণ হয়। ইউরোপ ভারতবর্ষে আসার নৌপথ খুঁজে পান। সমুদ্রের ওপার থেকে এভাবে প্রথমে এসেছে পর্তুগিজ, তারপর ওলন্ডাজ, ইংরেজ ও ফরাসিরা। ভারতবর্ষের ঐশ্বর্যই প্রলুব্ধ করে বলদর্পী দিগ্বিজয়। বাণিজ্য এখানে এক লক্ষ ছিল অবশ্যই, তবে খ্রিষ্টধর্ম বিস্তার আর ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যও একেবারে গোপণ ছিল না। আঠারো শতকের মাঝামাঝি এসে ভারতবর্ষে মুঘল কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে আসে, রাজ্যগুলি প্রায় স্বাধীনভাবে কর্মকা- পরিচালনা করতে থাকে। অন্যদিকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, অবশেষে ইংরেজরা সংহত অবস্থানে পৌঁছুতে সমর্থ হয়। বাংলা বিহার উড়িষ্যায় তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মাধ্যমে কার্যত এতদঞ্চলের শাসক হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতবর্ষ তাদের অধীন। ইংরেজরা এদেশের এমন এক শাসন কায়েম করে, যা ঔপনিবেশিক শাসন নামে পরিচিত। এই ধরনের শাসন-শোষণ ব্যবস্থা ভারতবর্ষ আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি।
১৮৯০ সালে জব চার্নক সুতানুটিতে ইংরেজের বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের মাধ্যমে যে ভিত্তি গড়ে তোলেন, তাই কালক্রমে ইংরেজদের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ও রাজধানী কলিকাতা হয়ে উঠে। অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকেই ইংরেজ ও ইউরোপীয় বণিকরা আসতে থাকেন, আসতে থাকে ‘রাইটার’, ‘ফ্যাক্টর’ ও অন্যান্য কর্মচারীরা। এরা সৎ-অসৎ উপায়ে প্রচুর টাকা আয় করেন, দেদার লুটতরাজও হয়। ইংরেজ শাসন মোটামুটি থিতু হওয়ার পর ভাগ্যান্বেষীদের সঙ্গে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি, শিল্পীরাও আসতে থাকেন। কলিকাতা হয়ে উঠে ইংরেজ-আদর্শিত সংস্কৃতি কেন্দ্র।
যতটুকু জানা যায়, পলাশীযুদ্ধের একযুগ পর ১৭৬৯ সালে শিল্পী টিলি কেটল-এর আগমনের মাধ্যমে এদেশে ইংরেজ শিল্পীদের অভিযান শুরু হয়। প্রদ্যুাৎ গুহ’র গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এরপর থেকে ১৮২০ সালের মধ্যে আরও ৬০ জন শিল্পী ভারতবর্ষে আসেন। টিলি কেটল বেশ বিত্ত সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন। বিয়ে-থা করে বণ্ডস্ট্রিটে বাড়ি করেছিলেন। মূলত ভাগ্য ফেরাবার আশা চুম্বকের মতো শিল্পীদের এদেশে টেনে এনেছিল। কারণ তার দেখেছেন-শুনেছেন এদেশে কোম্পানির ফালতু কর্মচারীরাও দুহাতে টাকা ওড়াচ্ছে। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ফেরার পর কোম্পানির কর্মচারী-কর্মকর্তারা শিল্পকলার সমঝদার হয়ে উঠেন। তাদের দেখাদেখি ভারতীয় অভিজাত ও রাজন্যগণ পশ্চিমী চিত্রকলার পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেন। সাহেব শিল্পীদের দিয়ে নিজেদের পোট্রেট করান। আবার ছবি এঁকে অ্যালবাম বানিয়ে কিংবা আর্ট শিখিয়ে অর্থ আয় করেন। সুতরাং ইউরোপীয় শিল্পীদের কাছে এই তথ্য চাউর হয় এদেশে পৌঁছতে পারলে আর ভাবনা নেই।
ইউরোপ থেকে আগত বেশীরভাগ শিল্পীই ছিলেন অখ্যাত ও অবজ্ঞাত। মূল ভূখণ্ডের শিল্পাঙ্গনে টিকতে না পেরেই হতাশাগ্রস্ত-পর্যুদস্ত এসব শিল্পী এদেশে ভাগ্যবদলে সমাগম ঘটান। কেমন রোজগার করতেন তারা? হিকি নামক একজন শিল্পী পোট্রেট করার জন্য দক্ষিণা নিতেন ২৫০ পাউন্ড, বিচি নামে আরেকজন নিতেন ৭০০ পাউন্ড। সেকালে ইউরোপীয় শিল্পীরা এদেশে এসে পত্রিকায় ‘নোটিশ’ দিয়ে তাদের আগমন বার্তা ঘোষণা করতেন। যেমন মরিস নামের এক শিল্পী ক্যালকাটা গেজেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে পোট্রেট আঁকায় তার দক্ষিণার জানান দেন : হেড সাইজ ১৫ স্বর্ন মোহর, থ্রি-কোয়ার্টার ২০ স্বর্ণ মোহর, কিটক্যাট ২৫ স্বর্ণ মোহর, হাফ সাইজ ৪০ স্বর্ণ মোহর এবং ফুল সাইজ ৮০ স্বর্ণ মোহর। ১৭৮৪ সালের ৪ মার্চ ক্যালকাটা গেজেটে ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস সোয়েন ওয়ার্ড নিজেকে জেন্টু বা হিন্দু স্থাপত্যের চিত্রাঙ্কনে দক্ষ শিল্পী দাবি করে একটি প্রকাশিতব্য একটি চিত্রসঙ্কনের জন্য অগ্রিম চাঁদার জন্য বিজ্ঞাপন দেন, প্রতি সেটের দাম ১০০ রুপি। ১৮৮৫ সালে রাধা বাজারের মি. হোন ভদ্রমহোদয় মহিলাদের তিনদিন চিত্রশিক্ষা দেয়ার সুযোগ দিবেন জানিয়ে বিজ্ঞাপন দেন। এক্ষেত্রে দক্ষিণা কম ছিল না।
শুধু পোট্রেট নয়, সব ধরনের ছবিই উচ্চ দামে বিক্রি হতো। কাজের ধারা অনুযায়ী এদের আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়। টিলি কেটল (১৭৬৯-৭৬), জোফনি (১৭৮৩-৮৯), আর্থার ডেভিস (১৭৮৫-৯৫) প্রমুখ প্রথম ভাগে পড়েন। এরা পোট্রেট করতেন, আঁকতেন তেল রঙে। দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন জন স্মার্ট (১৭৮৫-৯৫), ওজিয়াস হামফ্রি (১৭৮৫-৮৭), স্যামুয়েল অ্যাগুরুজ (১৭৯১-১৮০৭), ডায়না ছিল (১৭৮৬-১৮০৭), জর্জ চিনারী (১৮০২-২৫)। এরা হাতির দাঁতের উপর মিনিয়েচার পোট্রেট অঙ্কনে দক্ষ ছিলেন। তৃতীয় ভাগের শিল্পীরা জলরঙে ছবি আঁকতেন। কেউ কেউ এনগ্রেভিং, অ্যাকোয়াটিন্ট বা লিথোগ্রাফ তৈরি করতেন। প্রাকৃতিক দৃশ্যচিত্র প্রধানত আঁকতেন। উইলিয়াম হজেস (১৭৮০-৮৩) এবং টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল এই ধারার সাফল্য পেয়েছিলেন। এই তিন ধারার শিল্পীদের মাধ্যমে আমরা সে-সময়ের, যখন কোন ফটোগ্রাফের চল ছিল না, পোট্রেট ছবিগুলোর মাধ্যমে ইতিহাসের চরিত্রগুলো কেমন ছিল বুঝতে পারি, আবার অনুধাবন করতে পারি সেকালের ভূসংস্থান, মানুষের যাপন, পোশাক-পরিচ্ছেদ, আচার ব্যবহার। ফলে এসব ছবি শিল্পমূল্য যাই হোক, ঐতিহাসিক মূল্য প্রচুর। এছাড়া এসব শিল্পীদের মাধ্যমে উপনিবেশিত ভারতে শিল্পচর্চার আমূল পরিবর্তন ঘটে, ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নের সূচনাপর্বটি সম্পন্ন হয়। এ ঘটনাটি তাৎপর্যবহ।

এটা প্রমাণিত যে, অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইংল্যান্ড ও ইউরোপ থেকে যেসব শিল্পী এদেশে এসেছিল বাড়তি আয়ের প্রত্যাশায়, তারা পুরোপুরি সফল হয়েছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া কর্মচারী ও কর্মকতারাই ছিল প্রথম দিকে শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে কোম্পানির আধিপত্য বাড়ার সঙ্গে কলিকাতায় পাশ্চাত্যরুচির সাংস্কৃতির পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়। সরকারের বিচারক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে শিক্ষিত, পণ্ডিত ও সংস্কৃতিবান কিছু ব্যক্তির এদেশে আগমন ঘটে। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। ফলে কলিকাতার উঠতি এদেশীয় মুৎসুদ্দি শ্রেণীর রুচিবদল অনিবার্য হয়ে উঠে। পশ্চিমা সব কিছুই তাদের কাছে আদর্শে পরিণত হতে থাকে। এভাবে এদেশী জমিদার, রাজন্য, বনিক, এমনকি শিল্প-সংস্কৃতির পরিম-লে ইউরোপীয় চিত্রকলার আদর্শ সমাধান পেতে থাকে। ইউরোপীয় ধারার ভূচিত্র, নিসর্গচিত্র এবং পোট্রেট জনপ্রিয় হয়। এদেশীয় সামর্থবানরা ইংরেজ শিল্পীদের দিয়ে পোট্রেট করে আত্মতুষ্টি বোধ করেন। সে-সময়ে কিছু বাঙালি অভিজাত পরিবার রীতিমতো পাশ্চাত্য চিত্রকলার সংগ্রহ গড়ে তোলেন। অন্যদিকে কোম্পানির কর্মচারী-কর্মকর্তারা এসব শিল্পীদের দিয়ে নিজেদের পোট্রেট করান এবং তাদের আঁকা এদেশীয় সামাজিক জীবনভিত্তিক চিত্র ও নিসর্গচিত্র সংগ্রহ করেন। স্বদেশে ফিরে যাওয়ার সময় এসব চিত্রাবলী স্মৃতিচিহ্ন ও নমুনাস্বরূপ নিয়ে যান।
বস্তুত ইংরেজ রাজকর্মচারী এবং দেশীয় অভিজাতশ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে ইউরোপীয় চিত্রকলা আদৃত হতে থাকে। অপরদিকে দেশীয় চিত্রকলা অপসৃয়মান ও অনুজ্জ্বল হয়ে উঠে। পরিণত হয় পাশ্চাত্য চিত্রকলার ‘অপর’ হিসাবে। দেশীয় অভিজাত ও শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে দেশীয় ঐতিহ্য ও আদর্শ উপেক্ষিত। শিক্ষা, জ্ঞান, শিল্পসংস্কৃতি সব কিছুই পাশ্চাত্য ছাঁচে রূপান্তরের প্রবণতা জোরালো হয়। এক্ষেত্রে শাসক ইংরেজের তুলনায় দেশীয় নেতৃত্বস্থানীয়দের আগ্রহ অধিক বলে প্রতিভাত হয়। এই অবস্থায় ইংরেজ শিল্পীদের জন্য দেদার আয়ের উপায় হয়। পাশাপাশি ইউরোপীয় চিত্র আদর্শ এদেশে সংক্রমিত করার প্রকল্পটিও চালু হয়।
পাশ্চাত্য তখন নিউ-ক্লাসিক চিত্রকলার অবসান, নিসর্গচিত্রের সমাদর। আদর্শ হিসাবে অ্যাকাডেমিক ধারা জনপ্রিয়। অশোক ভট্টাচার্য ‘বাংলার চিত্রকলা’য় খবর দেন, ‘তাৎপর্যপূর্ণভাবেই উল্লেখ করা যায় যে টিলি কেটল ভারতে আসার ঠিক আগের বছরই (১৭৬৮ খ্রি.) ইংল্যান্ডে রাজা তৃতীয় জর্জের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েল অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি হন তখনকার ইংল্যান্ডের সবথেকে খ্যাতিমান ও প্রতিপত্তিশালী শিল্পী যোশুয়া রেনল্ডস (১৭২৩-৯২ খ্রি.)।’ তিনিই অ্যাকাডেমিক আদর্শকে নির্ধারণ করেন, এর আদর্শ হিসাবে ইতালির রেনেসাঁস শিল্পীদের সৃষ্ট রূপাদর্শকেই তুলে ধরেন। বস্তুজগতকে ঘনিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করে, প্রকৃতির রূপ থেকে তার সারাৎসার আহরণ করে, ‘আদর্শ সৌন্দর্য’ রচনাই ছিল লক্ষ্য। ব্রিটিশ তথা পশ্চিমা চিত্র আদর্শের এই ধারা ভারতীয় চিত্রধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ভারতীয় চিত্রকলার একটি মৌল আদর্শ হল চিত্রে প্রকৃতির সরাসরি অনুকরণ নয়, অন্তর্নিহিত বোধ তুলে ধরা। কিন্তু তৎকালে ইংরেজ শিল্পীরা শুধু নিজেদের ভাগ্যবদলই করলেন না, উপরন্তু অ্যাকাডেমিক ধারাকে এদেশে প্রোথিত করলেন। জানা যায়, টিলি কেটল, জোফনি, ডেভিস প্রমুখ শিল্পীরা রয়াল অ্যাকাডেমির সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে তাদের ছবিতে অ্যাকাডেমিক-রীতিই অনুসৃত হয়েছে।

ব্রিটিশ উপনিবেশের কোম্পানি পর্বে আগন্তুক ইংরেজ ও অপরাপর ইউরোপীয় শিল্পীরা বাংলা তথা ভারতবর্ষের সামাজিক জীবন এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের যেসব স্কেচ করেছেন তাতে তৎকালীন সময়ের একটি চিত্র পাওয়া যায়। এটা তাদের ছবিগুলোর মূল্য তুলে ধরে। তবে বড় দাগে তারা যে কাজটি করেছেন, তা হল, তারা এদেশে ব্রিটিশ চিত্র-আদর্শের ভিত্তি ও রুচি নির্মান করেছেন। যা ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নে ভূমিকা রাখে।
উপনিবেশস্থাপনকারীরা অধীনস্তু দেশটিকে তাবে রাখার জন্য নিজেদের মতো কিছু নিয়ম-কানুন ও আদর্শ নির্মাণ করেন। এটা করতে যেয়ে বন্দুক ও জ্ঞানকে যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেন। প্রথমে তারা দূরবর্তী দেশটিকে নিজের অধীন ভূখ- হিসাবে গণ্য করে। যেমন ভারতবর্ষে কলম্বাস ও ভাস্কো-ডা-গামার নেতৃত্বে নৌপথ ‘আবিস্কারে’ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই আবিস্কার মানে যে দেশটিকে তারা শাসন করবে তার পুনর্জয় (Recon)। আর এটা করতে খ্রিস্টীয় ক্যাথলিক গুরু পোপ তাদের বৈধতা দেয়, যিশু খ্রিষ্টের বানীতে পাপগ্রস্ত ভূমি আলোকিত করতে। ফলে অভিযানকারীরা নৌপথ আবিস্কার করেই তাদের কর্মের লাগাম টানেনি, তারা দেশটি দখলে ক্রমে আক্রমন শানিত করেছে। আর এটা করেছে একটি আদর্শিক জায়গা থেকেই। পোপ ঈশ্বরের নামে তাদের দিয়েছে নৈতিক ভিত্তি। এর ভিত্তিতেই কলম্বাস আমেরিকায় গণহত্যা চালিয়েছে, ভাস্কো-ডা-গামাও ভারতে দেদার মানুষ হত্যা করে। তথাকথিত আবিস্কৃত এলাকায় মানুষদের তারা পশুবৎ জ্ঞান করেছে, বস্তুতায়িত করেছে। কলম্বাস কথিত ভারতবর্ষ (মূলত আমেরিকা) আবিস্কারের নমুনা হিসাবে স্থানীয় জিনিসপত্র, পশুপাখির মতো ইউরোপে নিয়ে গেছে মানুষ। এভাবে ঔপনিবেশিক দেশগুলোর মানুষের মধ্যে এমন একটি গরিমা গড়ে উঠে যে, তারা অন্যদের চেয়ে সেরা। তারা উন্নত, অন্যরা অনুন্নত। তারা জ্ঞানী, অন্যরা মুর্খ। তারা উচ্চ অন্যরা নিম্ন। এই মানসিকতা পেছনে তাদের জ্ঞানতত্ত্বও কাজ করেছে, তারা তাদের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপন্ন করতে জ্ঞানকা- নির্মান করেন, এটা প্রাচ্যতত্ত্ব।
প্রাচ্যতত্ত্ব অনুযায়ী প্রাচ্য বা পূর্ব অদ্ভুত, উদ্ভট; প্রাচ্য যুক্তিহীন, অস্বাভাবিক, খেয়ালি। প্রাচ্যের ইতিহাস, স্বর নেই। আর পাশ্চাত্য যুক্তিবাদী, জ্ঞানী বিচক্ষণ ও অনুভুতিপ্রবণ। এভাবে প্রাচ্যতত্ত্ব এক ধরনের যুগ্মবৈপরীত্য জারি রাখে। এডওয়ার্ড সাইদ বলেন, এ প্রাচ্য পশ্চিমা জগতের নির্মাণ। মূলত প্রাচ্যকে উপনিবেশে পরিনত করার পর শাসনের বৈধতা ও কর্তত্ব কায়েমে প্রাচ্যের পুনর্গঠন করে। প্রাচ্যতত্ব একটি পুরুষতান্ত্রিক ডিসকোর্স পশ্চিম হল পুরুষ, পূর্ব নারী। আর প্রাচ্য নারীসুলভ হওয়ায় সবকিছু নতমুখে মেনে নেয়। অন্যদিকে পশ্চিম বীর, যুক্তিবাদী। ইউরোপ থেকে ভাগ্যান্বেষী শিল্পীরা আঁকা ছবি ও রচনা বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে তাই প্রাচ্যতত্ত্বের দুরভিসন্ধি স্মরণে রাখতে হবে।
কোলসওয়ার্দি গ্রান্টের ছবি ও রচনাবলী প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দোষ জ্ঞানচর্চা মনে হলেও এর একটি সাম্রাজ্যিক বাসনা, সচেতন কিংবা অবচেতনে হোক, ছিল। তিনি এদেশে ব্যাপক ভ্রমণ করেছেন, নীলকুঠিতে আতিথেয়তা নিয়েছেন। আর ভ্রমণে ভ্রমণে এরা এক সময় তাদের উপনিবেশিত দেশটি বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেদেও ভাবতে শুরু করেন। দেখা যায় প্রশাসনে কাজে করতে এসে কেউ হয়তো ভাষা নিয়ে কাজ করছেন, কোন সাদা চামড়ার বিচারক কাজ করছেন শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে। যেমন লেখক ও শিল্পী কোলওয়ার্দি এদেশের উদ্ভিদ, জনজীবন এবং আচার-রীতি নিয়ে একাধিক সচিত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন।
কথিত মূল ভূখ- থেকে অধীনস্ত দূরবর্তী দেশটিতে (exotic lands) তারা (শিল্পীরা) প্রধানত ঔপনিবেশিক দেশটির প্রতিনিধি হিসাবেই আবির্ভূত হন। দখলকৃত দেশটি, তাদের ভাবনায় যা উদ্ভট, অদ্ভুত ও চমকপ্রদ; এর নিসর্গ তাদের কাছে মনোরম মনে হয়। মানুষ এখানে শাসন-শোষনের বস্তু, প্রকৃতি উপভোগের। তাদের তাড়না হয়ে উঠে সাম্রাজ্য থেকে দূরবর্তী দেশটিকে প্রগাঢ়ভাবে আবিস্কার এবং নথিকরন। গ্রান্টের সচিত্র বইগুলো তলিয়ে দেখলে এটা স্পষ্ট হবে যে, এ দুটি কাজই তিনি অত্যন্ত সুচারুরূপে প্রতিপালন করেছেন। এ অর্থে তিনিও একজন প্রাচ্যতত্ত্ববিদ। প্রসঙ্গত, আমরা জগৎখ্যাত ফরাসী চিত্রশিল্পী পল গগ্যাঁর কথা স্মরণ করতে পারি। তিনি প্রথমে তাহিতী গিয়েছিলেন ফরাসী দেশের সরকারি প্রতিনিধি হিসাবে। ছবি আঁকা অবশ্যই লক্ষ ছিল, তবে উদ্দেশ্য ছিল ছবির মাধ্যমে ফরাসি উপনিবেশ তাহিতীকে আবিস্কার ও নথিবদ্ধ করা। আর এ আবিস্কার ও নথিকরণ অবশ্যই, অপরকে সভ্য করণের ফরাসি উপনিবেশবাদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে নির্মিত হওয়া চাই। এরকম কর্ম উপনিবেশের বিদ্ধান সোৎসাহে করে থাকেন।
গ্রান্ট বাংলা তথা ভারতবর্ষের বর্ণময়, চমকপ্রদ (Picturesque) ছবি এঁকেছেন। এ দৃশ্যমান চিত্রাঙ্কনগুলো প্রাকৃতি, ভৌগোলিক, সামাজিক এবং নৃতাত্ত্বিক তথ্যের সমাহারও বটে। ঔপনিবেশিক দেশটির ‘গর্বিত’ সন্তানে এ ছবি ও রচনা দেখে-পড়ে পুলকিত হবে, শাসকশ্রেণী এখান থেকে তথ্য নিয়ে উপনিবেশিতদের শাসনের পন্থা খুঁজবেন আর উপনিবেশিতরা অভিভূত হয়ে বাস্তব বিস্তৃত হয়ে ভাববে, চিত্রবৎ এগুলোই তাদের জীবন ও আপন।
উপনিবেশানের চূড়ান্ত পর্বটি হল আত্মীয়করন। আক্রমন ও দমনের পর ঔপনিবেশিক শাসক পর্যদস্তু অধীনদের নিজ ভাবমূর্তির প্রতি মোহমুগ্ধ করে তোলে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতির পরিসরে এটা অতিমাত্রায় ঘটে থাকে। চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা সময় এদেশীয়দের ধারণা জন্মাতে শুরু করে পশ্চিমই সেরা, এটাই প্রকৃত চিত্র আদর্শ। তেলরং আর রৈখিক পরিপ্রেক্ষিতের সমন্বয়ে পশ্চিমা আগন্তুক শিল্পীরা এরকম ধাঁধা সৃষ্টি করে যে, শিক্ষিতজন, জমিদার-রাজন্য এবং উঠতি সংস্কৃতবান মহাত্মারা এই ধরনের ছবি সংগ্রহে আকুল হয়ে উঠেন। পাশাপাশি শাসনের প্রয়োজনে বিভিন্ন আঁকাআঁকির জন্য পশ্চিমা রীতি ছবি আঁকা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়ে উঠে। ফলে প্রথমে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইউরোপীয় শিল্পীরা আর্ট শিক্ষা দিতে থাকেন। শুধু ভদ্রমহাদয়-মহাদয়ারা নন, চাকুরী প্রার্থীরা আগত শিল্পর্চ্চায় আগ্রহী হয়ে উঠেন।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই অঞ্চলে শিল্পশিক্ষার সূচনা ঘটে চল্লিশের দশকের একেবারে শেষের দিকে। কলিকাতায় গড়ে উঠে ‘মেকানিক্যাল ইনস্টিটিউট’। উদ্দেশ্য হল নির্মাণপ্রকল্প সহায়ক ব্যবহারিক কাজে এ দেশের ছাত্রদের দক্ষ করে তোলা। শিল্পী কোল্সওয়ার্দি গ্রান্ট এ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বেসরকারি পর্যায়ের এই প্রতিষ্ঠানটি ঢিলেতালে চলছিল। এর এক যুগ পর কোম্পানির প্রকৌশলী কর্নেল ই. গুডউইনের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘সোসাইটি ফর দি প্রমোশন অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট’। সোসাইটি তাদের প্রথম সভাতেই ‘দি ক্যালকাটা স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট’ নামে একটি শিল্পশিক্ষালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। শুভানুধ্যায়ী ও সরকারের অনুদানে প্রতিষ্ঠানটি একদশক টিকে ছিল। অতপর ১৮৬৪ সালে সরকারি শিল্পশিক্ষা কেন্দ্র ‘কলিকাতা আর্ট স্কুল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে পশ্চিমা পদ্ধতি ও আদর্শে শিল্পশিক্ষার ষোলকলা পূর্ণ হয়। অন্যদিকে ভারতশিল্প চর্চা ততদিনে অন্তরালে চলে যায়, পাশ্চাত্য শিল্পের আলোর নিচে পিদিমের মতো তা গ্রাম-গঞ্জে চর্চিত হতে থাকে। এরই মধ্যে কালিঘাটের পটচিত্র ভারতশিল্পের একটি ধারা তৈরি করে, কিন্তু ভারতীয় শিক্ষিত ও অভিজাতশ্রেণীর কাছে তা অবজ্ঞাত হয়। ক্রমে পাশ্চাত্য চিত্রকলা এদেশীয় শিল্পী-বোদ্ধাদের নিকট এমনই মজ্জাগত হয়ে পড়ে যে, বিশ শতকের উন্মেষে হ্যাভেল-অননীন্দ্র নাথের নেতৃত্বে যখন ভারতশিল্পের পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু হয়, এর বিরুদ্ধে প্রবল বাঁধা আসে ভারতীয়দের কাছ থেকেই।
পাশ্চাত্য শিল্পের প্রতি নির্বিচার মুগ্ধতা, যা বিশ্লেষণ ব্যতিরেকেই অনুসরণ-অনুকরণে পারঙ্গম চলমান পন্থা। আজ শিল্পসমালোচক কোন শিল্পীর ছবি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে, যে-কথাটি ঘুরেফিরে বলেন, তাহল, শিল্পীর ছবিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারার চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সমন্বয় স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করছে কীনা সেদিকে খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। ঔপনিবেশিককালে পাশ্চাত্য শিল্পশিক্ষা প্রণীত হয়েছিল উপনিবেশের প্রয়োজনেই, দেশীয় সৃজন উৎকর্ষের তাগিদে নয়। এ শিল্প-শিক্ষার বিউপনিবেশায়নে হ্যাভেল-অবনীন্দ্র উদযোগ নেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিবেতনে গড়ে তোলেন কলাভবন। কিন্তু উপনিবেশিতের মননে পশ্চিমা চিত্র-আদর্শ এবং বাহ্যিক চাকচিক্য দৃঢ়ভাবে লেপ্টানো রয়েছে। এর মধ্যে থেকেও দেশীয় চিত্রকলার প্রতি নিদর্শন খুঁড়ে খুঁড়ে কেউ কেউ নিজস্ব আধুনিকতার পথ খুঁজে পেয়েছেন। তারা বরণীয় হয়েছে।
স্বদেশী চিত্রঐতিহ্য ও বিশদেশী চিত্রকলার রূপরস ও গৌরব নিয়েই এগুতে হবে, কিন্তু থাকা চাই হাত ও মগজের অন্তরঙ্গতা।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *