• December 4, 2021

জাপানি জেন গল্প জেন দর্শন

 জাপানি জেন গল্প জেন দর্শন

মওলবি আশরাফ :- সংস্কৃত ‘ধ্যান’ শব্দ থেকে জাপানি ‘জেন’ শব্দের উৎপত্তি। জেন দর্শন বৌদ্ধ দর্শনের একটি শাখা। ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারত থেকে চীন ও জাপানে পরিভ্রমণের মধ্যদিয়ে এর উদ্ভব ও বিকাশ। জেন সাধকগণ মনে করেন ধ্যান জরুরি, ধ্যানের মধ্য দিয়েই মন স্থিতিশীল হয়, মন উপলব্ধ করে জগতের রহস্য।
এই দর্শনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে শূন্যতা। জাপানি লেখক দাইসেতসু তেইতারো সুজুকি তাঁর প্রবন্ধ The Philosophy of Zen এ শূন্যতার ধারণাকে বাস্তবতার সমার্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মানুষ তার পারিপার্শ্বিক জগতকে নিজের কাছে বোধগম্য করে তোলার চেষ্টায় বিভিন্ন প্রত্যয় বা ধারণা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে তাদের এই স্বনির্মিত ধারণাগুলোকেই বাস্তব হিসেবে ভাবতে শুরু করে। জেন দর্শনের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলোর উদ্দেশ্য থাকে বাস্তবতাকে ঘিরে থাকা এসব নিয়ম-জ্ঞানের বিদ্যা সরিয়ে এর স্বরূপ বা suchnessকে বের করে আনা, যা আদতে এক ধরনের শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নয় এবং তাঁর মতে, ‘এর অনুধাবন সম্ভব তখনই যখন এটি একই সাথে অনুসন্ধানের লক্ষ্য এবং উপলক্ষ্য।’

জেন চর্চা বিভিন্ন ধরণের ধ্যানের মাধ্যমে আত্মজ্ঞানের বিকাশকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয়ে এলেও এর শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে Kōan, বা জনসাধারণ্যে প্রচলিত গল্প। মূলত দশম-একাদশ শতক থেকে জেন গুরু এবং শিষ্যের মৌখিক কথোপকথনগুলোর লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে এই প্রথার সূত্রপাত, পরবর্তীকালে এই পুরনো আলোচনা বা caseএর ওপর পরবর্তী প্রজন্মের গুরু বা শিক্ষার্থীদের নতুন করে মন্তব্য করার প্রক্রিয়াই মূলত এর পুরো কার্যপদ্ধতি। এই কথোপকথনের এবং এতে সংযোজিত মন্তব্যের মূখ্য বিষয় হিসেবে থাকে কোন উপদেশ, নির্দেশনা অথবা কোন ঘটনার মূল্যায়ন অথবা কোন দ্ব্যর্থতা নিরূপণের প্রচেষ্টা।
তবে জনসাধারণের কাছে জেন দর্শনের প্রচারণার প্রধানতম উপকরণ হিসেবে কাজ করে কিছু ‘গল্প’ যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূলত এই Kōan বা ঘটনাগুলোর নির্দিষ্ট কিছু অংশ। সুতরাং এগুলোতে কাল্পনিক উপাদান কতটুকু তা প্রশ্নের অধীন।

গল্পগুলো আমি আমার সমঝদারির আলোকে ব্যাখ্যা করলেও এই পাঠ ব্যর্থ হবে না যদি প্রতিটি গল্পে আলোচ্য বিষয়ের কেন্দ্রকে ঘিরে পাঠক সক্রিয়ভাবে চিন্তাপ্রক্রিয়ায় নিযুক্ত হন, কারণ জেন দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গল্পগুলোরও মুখ্য উপাদান— দ্বন্দ্ব, আর গল্পের আলোচনায় এর নিষ্পত্তি যদি থেকেও থাকে, এর উৎসের অনুসন্ধান বা বা অর্থ বিশ্লেষণ অথবা নতুন যুক্তির উত্থান হতে পারে পাঠকের ব্যক্তিগত অর্জন।

সবকিছুই ভালো

‘সবকিছুই ভালো’, এমতই বলে থাকেন জেন সাধকগণ। জীবনে নানা সময় নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসে, ফলে কখনো লক্ষ্যচ্যূত হই কখনো হই না, এর পুরোটাই নির্ভর করে ব্যাপারটাকে আমরা কিভাবে দেখছি। যদি মনে করি এই ক্ষতি আমার অভিজ্ঞতা শাণিত করেছে, মনোবল শক্তিশালী করেছে, আমি অন্য দিক থেকে লাভবান হবো। কারণ সবকিছুই ভালো, কোনো না কোনো দিক থেকে।

একটা জেন গল্প আছে—

❝সাধু বানজান বাজারের মধ্য দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। মাংসের দোকান পাশ কাটার সময় তিনি কসাই ও ক্রেতার কথোপকথন শুনলেন। ক্রেতা বলছিল, ভালো দেখে দুই কেজি মাংস দিয়েন তো। কসাই বলল, আমার দোকানের সব মাংসই ভালো, দোকানে ভালো না এমন এক টুকরা মাংসও দেখাতে পারবেন না।

এই কথা শুনে বানজান আলোকপ্রাপ্ত হয়ে গেলেন।‌❞

এই গল্পে কসাইয়ের কথা থেকে এই সত্য পাই— একজন বিক্রেতার চোখে তার দোকানের সব পণ্যই ভালো, কারণ তার সবই বিক্রি করতে হবে। অথচ একজন ক্রেতা তার কাছে আলাদা করে ভালো পণ্য চাচ্ছে, কারণ সে নিজের জন্যে খারাপ পণ্য চায় না।

কিন্তু এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমন্বয় আনা অসম্ভব, কারণ জগৎ কেবল ভালো জিনিসে পরিপূর্ণ নয়, এখানে ভালো জিনিসের সমানুপাতে খারাপ জিনিসও মওজুদ।

তাহলে গল্পে সাধু বানজান কিভাবে আলোকপ্রাপ্ত হলেন? তিনি অন্তহীন এই দ্বন্দ্বের সমাধান করেছিলেন ‘সবকিছুই ভালো, কোনো না কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে’ এই সূত্র দিয়ে। তিনি লোকসান হওয়াকেও প্রকৃতির অংশ মেনে নিয়েছিলেন। কেননা প্রকৃতি আমাদের ঋদ্ধ বৈ অন্যকিছুই করে না।

বৈপরীত্যেই নির্ধারিত হয় মূল্য

যেকোনো জিনিসের মূল্য আরোপ হয় তার বিপরীত জিনিসের মাপকাঠিতে।

আমাদের বেঁচে থাকা কি আসলেই অর্থময়? হ্যাঁ, অর্থময়। কারণ আমরা উপলব্ধি করতে পারি না মৃত্যুর পর কি এরচেয়ে ভালো অবস্থানে যাব না মন্দ অবস্থানে। নাকি মৃত্যুই সবশেষ, এরপর কিছুই নেই।

কিন্তু আমরা এর অর্থময়তা টের পাই না। যেমন অক্সিজেনের মহাসমুদ্রে থাকি বলে এর কোনো মূল্য উপলব্ধি করি না। তবে উপলব্ধি করা তখন সম্ভব হবে যদি অক্সিজেনশূন্য কোনো অবস্থানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। বৈপরীত্যেই আমরা বস্তু বা বিষয়ের মহানত্ব খুঁজে পাই।

অহম— আল্লামা ইকবালের ভাষায় ‘খুদি’— মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অহম থেকে অহংকার। আপনার অহম নাই মানে আপনি নাই। দীর্ঘদিনের পরিচিত কেউ আপনাকে রাস্তায় দেখে না দেখার ভাণ করে চলে গেল, আপনি যদি ব্যাপারটা নিয়ে না ভাবেন তার মানে আপনি নিজের মূল্য দাঁড় করাতে পারেননি। কিন্তু আপনি যদি ভাবেন,— ‘তিনি এমন করলেন কেন, আমি কি তার কাছে মূল্যবান কেউ না? আবার দেখা হলে জিগ্যেস করব।’ তাহলে আপনি আপনার অস্তিত্বকে মূল্য দিচ্ছেন।

❝জেন লোককথায় আছে, এক বিক্ষিপ্ত মনের ছাত্র একদিন তার গুরুকে বলল, ‘ওস্তাদ, আমি মনে হয় পথভ্রষ্ট, মাথায় কিছুই কাজ করছে না, এমনকি বুঝতে পারছি না আমি কে। দয়া করে আমাকে বলবেন আমি কি সত্যিই আছি?’

গুরু ভাবলেশহীন চোখে তার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত রইলেন।

ছাত্রটি বারবার তাঁকে একই অনুরোধ করে যেতে লাগল, এবং করজোড় করে অনুনয়-বিনয় করতে লাগল। কিন্তু গুরু কোনো সাড়া দিলেন না, এমনকি তাকালেনও না। শেষমেশ ছাত্র বিরক্ত হয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো, ঠিক তখন গুরু তার নাম ধরে ডেকে বললেন, ‘হাঁ’। ছাত্রটি থমকে দাঁড়িয়ে গুরুর দিকে তাকাল। গুরু উল্লসিত হয়ে বললেন, ‘এই তো, এইখানে তুমি আছো!’❞

প্রকৃতির সাথে একাত্মতাতেই মুক্তি

জেন দর্শনের প্রধান শিক্ষাই হলো নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যেখানে আশা হতাশা দূরাশা কিছুই থাকবে না। তাই ‘সুখ কী?’ জনৈক শিক্ষার্থীর এমন প্রশ্নের জওয়াবে চুয়াং ৎজু বলেছিলেন, ‘সুখ হলো সুখের সন্ধান না করা।’ অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘সুখের প্রত্যাশাই দুঃখ।’

যা ঘটার তা তো ঘটবেই, কিন্তু আপনি ভিন্ন কিছু ঘটার আশা করলেই আপনার মনে দুঃখ জন্ম নিবে, হতাশা জেঁকে বসবে আপনার ওপর। আর একটা আশা ঘটনাক্রমে পূরণ হলে নতুন আশা জন্ম নিবে, মির্জা গালিব যেমন বলেছেন,

❝হাজারো খাহিশ এয়সী হ্যায়ঁ হার এক পে দম নিকলে
বহুত নিকলী হী আরমাঁ ফির ভী কম নিকলে।❞

অর্থাৎ, হাজারও এমন আশা রয়েছে একেকটি পূরণ হতেই জীবনগতি শেষ হয়ে যাবে,/ জীবনে বহু আশা পূর্ণ হয়েছে বটে তারপরেও অনেক কম পূর্ণ হয়েছে।, সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আশামুক্ত না হতে পারলে আপনি দুঃখ কখনোই অতিক্রম করতে পারবেন না।

সোজা কথায় আশা জিনিসটাই যেহেতু একটি অন্তহীন ফাঁদ, তাই মুক্তির পেলব ছোঁয়া পাওয়া যাবে কেবল প্রকৃতির অধীনে নিজেকে খুইয়ে ফেলার মধ্য দিয়েই।

প্রসঙ্গত একটি জেন গল্প বলি :
❝জনৈক বৃদ্ধ উঁচু পাহাড়ের একটি ভয়ানক স্রোতস্বিনী ঝরনায় পা ফসকে পড়ে যান, যেখানে পড়লে জ্যান্ত ফেরা সম্ভব নয়। কিন্তু বৃদ্ধ সবাইকে তাজ্জব করে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসেন। লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল কীভাবে এই অলৌকিক ঘটনা ঘটল। তিনি বললেন, ‘পানির সাথে আমি সন্ধি করেছি। কোনো চিন্তা ছাড়াই নিজেকে আমি সমর্পণ করেছি পানিতে— যেন আমিই পানি। ঘূর্ণিতে ডুবে গিয়ে আবার ঘূর্ণিতেই উঠে এসেছি। কোনো অলৌকিকতা নয়, বরং স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই বেঁচে ফিরেছি।❞

বস্তু বস্তুই

শিশুকালে আমরা একটা গাছকে গাছ হিসেবেই জানতাম। একটু বড় হওয়ার পর জানলাম গাছ থেকে ফল আর ফুল নয়, কাঠ হয় কাগজ হয় অক্সিজেন হয় আরো অনেক কিছুই হয়। তারপর পাঠ্যপুস্তকে পড়লাম প্রতিটি গাছই বেড়ে ওঠে গাণিতিক সূত্রে, একটি গাছের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত রয়েছে জ্ঞানলাভের নানা ক্ষেত্র, আমরা বিভ্রান্ত হয়ে বললাম— এ যে অপার রহস্য! এরপর জ্ঞানলাভের এক পর্যায়ে উপলব্ধি করলাম গাছ গাছই, গাছের প্রতি আরোপিত সমস্ত তথ্য-উপাত্ত একান্ত আমরা মানুষদের সুবিধার জন্য, গাছের জন্য গাছ কেবলই গাছ।

❝বিখ্যাত দার্শনিক চিং-য়ুয়ান ওয়েহসিন বলেন—
‘আমি জেন-চর্চার আগে পাহাড়কে পাহাড়ই মনে হতো, পানিকে পানিই মনে হতো।
আমি যখন জেন-চর্চা শুরু করি, আমি দেখলাম পাহাড়গুলো আর পাহাড় নেই, এই পানি পানি নয়।
তারপর যখন আমার তিরিশ বৎসরের জেন-চর্চা পূর্ণ হয়, আমি দেখতে পেলাম পাহাড়গুলো পাহাড়ই আছে, পানি পানি বৈ অন্য কিছু নয়।❞

এখানে তিন তিনটি অবস্থানের কথা বলা হয়েছে—

১) বিশ্বাস/অবিশ্বাস

২) সংশয়

৩) শূন্যতার উপলব্ধি

শূন্যতার উপলব্ধি হলো জেন দর্শনের সর্বশেষ স্তর। কারুর সেই স্তরে পদার্পণ হলে বস্তুকে তার সব সংশয় ও আরোপিত ধারণার ঊর্ধ্বে তার প্রকৃতরূপেই দেখতে পারবে।
আমরাই পথ আমরাই পথচারী
❝এক নবীন শিক্ষার্থী হাতের মুঠোয় ছোট একটি পাখি ধরে গুরুকে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন তো, পাখিটা মৃত না জীবিত?’
ছেলেটি প্রবীণ গুরুকে আটকাবার জন্য মনে মনে কৌশল এঁটেছিল— গুরু যদি বলে মৃত, তাহলে মুঠো খুলে দিবে, পাখিটা উড়ে যাবে, আর যদি বলে জীবিত, তাহলে মুঠোতেই পাখিটা মেরে ফেলবে।
কিন্তু গুরু জবাবে বললেন, ‘এর উত্তর তোমার হাতে!❞

পাখি এখানে মানুষের জীবনের রূপক। আমরা কী হবো, ভালো না মন্দ, সেই ক্ষমতা আমাদেরই হাতে। দুটো পথের সম্ভাবনা থাকে সবসময়, আমরা একটাকে গ্রহণ করি অন্যটা ছাড়ি। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ আমাদের বর্তমান পদক্ষেপই করে।
আমরাই পথ, আমরাই পথচারী। আমাদের কর্মের জন্য আমরা ছাড়া অন্য কেউ দায়ী নয়।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post