• December 4, 2021

ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ—ক্যুয়ো ভাদিস!পর্ব-এক

 ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ—ক্যুয়ো ভাদিস!পর্ব-এক

অশোক মুখোপাধ্যায়

[ভারতে বহুকাল ধরেই ধর্ম এক রকমের বারুদ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতা দখল করার পর সে সারা দেশে এক দলীয় শাসন চাপিয়ে আরএসএস বয়ানে লোকে হাসবে কাঁদবে জামাপ্যান্ট পরবে গান গাইবে আর হিন্দুধর্মের নামে গর্বিত হতে গিয়ে মুসলমান খ্রিস্টান বিরোধী ঘৃণার চাষ করবে—এরকম একটা অসহিষ্ণু হিংস্র পরিবেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় ঘৃণার এই বাতাবরণের আড়ালে চলছে দেশি বিদেশি কর্পোরেটদের হাতে দেশের জল জঙ্গল জমি পাহাড় খনি বিনি পয়সায় তুলে দেবার নোংরা প্রকল্প আর তার জন্য স্থানীয় গরিব মানুষকে উচ্ছেদ। এই ব্যাপারে দুচার কথা বলা এখন চিন্তাশীল শুভমনস্ক মানুষের জরুরি কাজ। তারই অংশ হিসাবে আজকের এই প্রতিবেদন—মূল রচনার প্রথম পর্ব।]

অথঃ গসাগু-কথা

৫, ১০, ১৫, ২০, . . . এই কটি সংখ্যার কথাই ধরা যাক। এদের মধ্যে সাধারণ সংখ্যা কিছু আছে কি?

আছে: ১ আর ৫। গসাগু করলে হবে ৫। প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকে গসাগু শেখানোর সময় ১-এর কথা বলা হয় না। কেন না, ওনাকে ধরলে আর না ধরলে ফলে কোনো পার্থক্য হয় না। ১ X ৫ = ৫-ই হবে। আর সমস্ত সংখ্যার মধ্যেই ১ আছেন। দুনিয়ায় এমন কোনো অখণ্ড সংখ্যা হয় না, যা ১-এর গুণিতক নয়; কিংবা ১ যার গুণনীয়ক নয়। অতএব উপরোক্ত সংখ্যাত্রয়ের মধ্যে সাধারণ সংখ্যা হিসাবে ৫-এর কথা বলাই যথেষ্ট এবং যথার্থ।

ধর্ম টর্ম নিয়ে আলোচনা করতে বসে অঙ্কের কথা পাড়ছেন কেন?

পাড়ছি একটাই কারণে। যদি উপরের অঙ্কের সমস্যাটা বুঝে থাকেন, তাহলে এবার ভেবে দেখুন, ঠিক ওরকমই, ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে সাধারণ গুণনীয়ক কিছু আছে কি?

আছে: ধর্ম।

সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র আপত্তি উঠে আসবে—কী বলছেন মশাই? ধর্ম মানেই সাম্প্রদায়িকতা? ধার্মিক হলেই কেউ সাম্প্রদায়িক হয়ে যান? জানেন, . . .—সঙ্গে সঙ্গে দুচারজন ধার্মিক অসাম্প্রদায়িক প্রসিদ্ধ মানুষের নাম তোড়ে উচ্চারিত হতে থাকে।

অথচ, না বললেও হত। ১০ বা ১৫ যেমন ৫ নয়, তেমনই ধার্মিক হলেই তিনি সাম্প্রদায়িক কিংবা মৌলবাদী হয়ে যাবেন—এটাও কেউ বলে না, বা মনে করে না।

তাই যদি হয়, বার বার কথাটা ওঠে কেন? কেন এই শব্দগুলো এক নিশ্বাসে উচ্চারিত হয়?

হয়, কেন না, ১০ বা ১৫ পেতে হলে ৫-এর থাকাটা যেমন নিতান্তই আবশ্যক, তেমনই সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ সমাজে থাকতে হলে ধর্ম থাকাটাও সমাজে জরুরি। ইসলাম ধর্মের কোনো অস্তিত্ব বা আবেদন না থাকলে দুনিয়ায় আইসিস, বোকো হারাম, আল কায়দা, ইত্যাদির জন্মই হত না। জন্ম সম্ভব ছিল না। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম না থাকলে আর এস এস-এর জন্মও ঘটত না। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অস্তিত্বই থাকত না। আম্বেদকরকেও জাতিপ্রথা বিলোপের জন্য আন্দোলন করতে হত না! এমনতর অনেক।

আসুন, কথাটাকে আর এক দিক থেকেও বোঝার চেষ্টা করি। যে কোনো সামাজিক সক্রিয় পরিঘটনার দুটো দিক থাকে: তত্ত্ব ও প্রয়োগ। সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদেরও এই দুটো দিক আছে। ধর্ম হচ্ছে তার তাত্ত্বিক দিক। দাঙ্গা হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ। কোনো তত্ত্বই শাস্ত্রের পাতায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে না। আর, তত্ত্ব ছাড়া ক্রিয়া হয় না। ঠিক তেমনই, ধর্মও শুধু পুজো-আচ্চা, তীর্থ, তর্পণ, ধ্যান, সেজদা, হজ, বলি, কুরবানিতে শেষ হয়ে যায় না। আরও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। উঠতে চায়। আপন শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করতে চায়। তার জন্য আসলে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। ছলে বলে কৌশলে। তাই বলছিলাম, ধর্মীয় ধ্যান ধারণা বিশ্বাস ছাড়াও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না। আবার দাঙ্গার পেছনে থাকে কিছু স্থির এবং দৃঢ় বিশ্বাস—আমরা ভালো, ওরা খারাপ; আমরা ওদের নিকেশ না করলে ওরাই একদিন আমাদের নির্মূল করে দেবে; ওদের ধর্মটাই এই রকম; ইত্যাদি।

এই হল সাম্প্রদায়িকতার তত্ত্ব আর প্রয়োগের কলকাঠি।

আর একটা কথা। ফ্যাসিবাদের মধ্যেও কীভাবে ধর্ম একটি গুণনীয়ক হিসাবে ঢুকে আছে, সেটা আমরা পরে দেখতে পাব। এখনই ধৈর্য হারাবেন না।

“ফিরকে দঙ্গে হোন্দে নহি করওয়ায়ে যান্দে হান”

হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছেন। আপনার সাথে আমিও সম্পূর্ণ একমত। কোনো ধর্মই সোজাসুজি মানুষকে দাঙ্গা করতে শেখায় না। বলে না, মানুষ মার; ভিন্ন ধর্মীকে বধ কর। বরং ধর্ম মাত্রই মানুষকে কাছে টানতে শেখায়, ভালোবাসতে বলে। সেই শুভ প্রয়াস ব্যর্থ করে দিচ্ছে রাজনৈতিক শক্তিগুলো। আধুনিক যুগের ক্ষমতার রাজনীতিই ধর্ম বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সরল বিশ্বাসী মানুষকে খেপিয়ে তুলে দাঙ্গা বাধিয়ে দিচ্ছে। ভারি চমৎকার কথা বললেন। অনেক কাল আগে, সেই ১৯৮৭ সালে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনাচক্রে চণ্ডীগড়ে কিছু দিন থাকার সুবাদে স্থানীয় পাঞ্জাব ট্রিবিউন পত্রিকার সামনের পৃষ্ঠায় পাঞ্জাবি বয়ানে প্রকাশিত একদিনের একটা শিরোনাম আজও আমি ভুলতে পারিনি: “ফিরকে দঙ্গে হোন্দে নহি, করওয়ায়েঁ জান্দে হান!” সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না, করানো হয়!!

কথাটা মেনে নিয়েই আসুন একটু বিশ্লেষণ করি। না না, আবেগ তাড়িত হয়ে রাজনীতিকে গাল পেড়ে আমরা আমাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারি না। ওটা সহজ কাজ, কিন্তু কাজের কাজ নয়। আর আসল কাজ তো নয়ই। তাই চিন্তাশীল শুভমনস্ক মানুষ হিসাবে আমাদের ভাবতে হবে, বুঝতে হবে, সাম্প্রদায়িকতার কার্যকারণ খুঁজতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে।

আপনাকে বলছি আপনারই উপরের কথার মধ্যে দুটো পরস্পর বিরোধী বাক্যাংশকে লক্ষ করতে। খুঁজে পাচ্ছেন না? আচ্ছা, আমিই দেখিয়ে দিচ্ছি। একদিকে আপনি বলছেন, ধর্ম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, আর এক দিকে বলছেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতারা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দেয়। তা, তাদের খেপাতে গেলেই তো তখন যার যার ধর্মের ভালোবাসার শিক্ষাগুলি বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা। দাঁড়াচ্ছে কি? মানছেন তো যে দাঁড়ায় না!

এবার ভাবুন, কেন দাঁড়াচ্ছে না।

কিংবা, ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকেই বা তারা মানুষকে খেপিয়ে তুলতে কাজে লাগাচ্ছে কীভাবে? সেই সব বিশ্বাসকে চাগিয়ে তুললেই তো প্রেম প্রীতি ভালোবাসার উষ্ণ প্রস্রবণ জেগে ওঠার কথা। উঠছে না যে! তার মানে সেই বিশ্বাসসমূহের মধ্যেই এমন কিছু কিছু উপাদান আছে যার উপযুক্ত ব্যবহারের দ্বারা এক ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে উত্তেজিত করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে হিংস্র যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া যায়!

বাঃ, এটা কিন্তু সঠিকভাবে আন্দাজ করেছেন। সমস্ত ধর্মে সব রকমের নিদানই আছে। ধর্ম গ্রন্থ খুলে পড়লেই দেখবেন, তাতে প্রেম ভালোবাসার কথাও আছে, ঘৃণা বিদ্বেষের কথাও আছে। যে যার পছন্দ মতো বেছে নেয়। খ্রিস্টধর্ম বাইবেল হাতে নিয়ে আফ্রিকার কালো মানুষদের জমি দখলেও সাহায্য করেছে, আবার ভারতে এসে দলিত জনজাতির মধ্যে স্কুল হাসপাতাল স্থাপন করেছে, কুষ্ঠ রোগীর সেবাও করেছে। ব্রুনো, গ্যালিলেওও খ্রিস্টান ছিলেন, তাঁদের হত্যাকারী নির্যাতনকারীরাও খ্রিস্টান ছিল। যিশুর বাণী বাইবেল প্রেমকথা কাউকেই নিরাশ করেনি। প্রত্যেকেই নিজের নিজের দরকার অনুযায়ী বাণী বা উপদেশ খুঁজে পেয়েছিলেন। কিংবা পরে যাঁরা ধর্মীয় চিন্তার আলোকে এঁদের মূল্যায়ন করেছেন, যিনি ব্রুনোর পক্ষ নিয়েছেন তিনি বাইবেলের প্রেম বিতরণের কথাগুলির উপর জোর দিয়েছেন। আক্ষেপ করেছেন, এত সুন্দর সুন্দর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন ওঁরা ব্রুনোকে অমন নিষ্ঠুরভাবে মারলেন, গ্যালিলেওকে কেন ওই রকম অসম্মান করলেন। আর যাঁরা চার্চের পক্ষাবলম্বন করেছেন, তাঁরা দেখাতে চেষ্টা করেছেন, ব্রুনো এবং গ্যালিলেও কোথায় কীভাবে ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করেছিলেন! তাঁরা নিরীহ খ্রিস্টানদের সরল বিশ্বাসকে কত ভাবে আঘাত করেছেন! ইত্যাদি। শাস্ত্রোল্লেখের প্রশ্নে কোনো পক্ষই ভুল বলেননি।

ইসলাম ধর্মের বাণীও কোনো পক্ষকেই হতাশ করে না। মানুষে মানুষে প্রেম, সমাজ জীবনে শান্তি, ভিন্ন ধর্মীর প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বজনীন সাম্য, সকলের সাথে ভ্রাতৃত্ব—এক দিকে এসবও যেমন আছে, অপর দিকে ভিন্‌ধর্মীকে হয় ইসলামে ধর্মান্তরিত করা, অথবা তাকে কাফের হিসাবে কোতল করা এক পুণ্যের কাজ হিসাবে স্বয়ং আল্লাহ্‌র নির্দেশ হিসাবেই দেওয়া আছে। ধর্মযুদ্ধে জিতলে গাজী আর মরলে শহিদ! নারীকে সর্বপ্রকারে গৃহে আবদ্ধ ও শরীর আবৃত করে অবদমিত করে রাখ—এও যেমন বলা আছে, আবার নারীকে সম্মান দাও, লেখাপড়া শেখাও—একথাও ওতে বলা হয়েছে। যে যা করে সেটাই কিন্তু শাস্ত্র সম্মত। আপনি যা-ই করুন, শাস্ত্রবিরোধী কাজ করার আপনার হাতে কোনো উপায় কোনো ধর্মগ্রন্থ রাখেনি।

না, আপনাকে দোষ দিচ্ছি না। আপনি ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছেন, আর হ্যাঁ, আমিও শুনেছি—এই পুণ্যভূমিতে পবিত্র হিন্দু ধর্ম নাকি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ভগবানকে দেখেছে। নর = নারায়ণ! দ্বন্দ্বসমাসে নরনারায়ণ! এই সেদিনও আপনি এক কম্প্রকণ্ঠ যুবকের বজ্রনির্ঘোষ শুনেছেন: দরিদ্র ভারতবাসী আমার ভাই, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই! অপর এক জৈন প্রৌঢ়ের নরম শান্ত কণ্ঠে বাণী উবাচ হয়েছিল, কেউ নীচ জাতি নয়, ওরা হরিজন! আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ক্লাশে সে কি গুরু গম্ভীর ভাব সম্প্রসারণ: সোহহং = আমিই সে! তত্ত্বমসি = তুমিই সে, আদি আদি। সে মানে কে? সে মানে ব্রহ্ম, স্বয়ং পরম ব্রহ্ম। অহম ব্রহ্মাস্মি! আপনি আমি সকলেই সেই পরম ব্রহ্ম। আমি আপনি সেই একই ব্রহ্মে লীন। আমাতে আপনাতে আর তাতে কোনো ভেদ নেই। যতক্ষণ বুঝিনি ভেদজ্ঞান; একবার বুঝলেই সমস্ত ভেদজ্ঞান লুপ্ত হয়ে একেবারে অভেদ। জলের মধ্যে চিনি যেমন গুলে যায়, আর আলাদা করে চেনা যায় না, আপনি আর আমিও তেমনই পরমার্থ জ্ঞান লাভ করে ব্রহ্মে বিলীন হই। তাকে এক রকম আধ্যাত্মিক ব্রহ্ম-দ্রবণ বলা যায়!

আচ্ছা বলুন তো, তারপরেও সেই ধর্মের এক বর্ণগোষ্ঠী কী করে বলল, অপর গোষ্ঠীর সেই ধর্মেরই মন্দিরগুলোতে প্রবেশের অধিকার নেই? তাহলে তো ব্রহ্মই ব্রহ্মকে মন্দিরে ঢুকতে দিচ্ছে না! তবে কি সব ব্রহ্ম সমান নয়? গুজরাতের গান্ধীনগর শহরের সীমানায় এক বসতির কাছে বিজ্ঞপ্তি—হরিজন পল্লী। যেতে যেতে রিকশায় আমার সঙ্গী বুঝিয়ে দিলেন, আগে এই জায়গাকে বলা হত ডোম পাড়া। এখন বলে হরিজন পল্লী। এদের বাড়ির মহিলারাই আমাদের ভদ্র পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে। তবে কি ছোঁওয়াছুঁয়ির ভেদভাব চলে গেছে? তা যায়নি। বর্ণ হিন্দুরা এখনও ওদের হাতের জল খায় না। তবে ডোম বা চণ্ডালের বদলে হরিজন নামটা খুব সুন্দর। সেদিক থেকে নিশ্চয়ই খানিকটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মানবেন নিশ্চয়ই! হ্যাঁ হ্যাঁ, মানব না কেন? ভাষা বা শব্দ প্রয়োগে বিপুল অগ্রগতি সাধন হয়েছে। যেমনটা ওই ব্রহ্মের বেলায় হয়েছিল। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুই এগোয়নি।

আমাদের সেই সব মনীষীরাও খুব সচেতন ছিলেন। যা কিছু ঠান্ডা গরম বলেছেন, তা ওই ছোঁওয়াছুঁয়ির বিরুদ্ধে। চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের মতো শূদ্রাণির হাতে ব্রাহ্মণের জল পান নাটকের বার্ষিক প্রদর্শনী। জাতপাত ভেদাভেদ নিয়ে তাঁরা কেউ টুঁ শব্দটিও করেননি। অদ্বৈত বেদান্তও জাতিভেদ প্রথার ক্ষেত্রে স্পর্শক হয়ে বেরিয়ে গেছে! সেই মহান বৃত্তের ভেতরে ঢুকে জ্যা হওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি। শূদ্রকে ব্রহ্মাস্মি-র বাইরের উঠোনেই বসিয়ে রেখে গেছে!

এসব শুনলে বা জানলে মন খারাপ হয়ে যায়! হ্যাঁ, সে তো বটেই। সব ধর্মেই কিছু না কিছু খারাপ দিকও আছে। তবে কি না, আমাদের ভালোটাকে নিতে হবে, খারাপ জিনিসগুলোকে বাদ দিতে হবে।

খারাপ মানে? ধর্মে কিছু জিনিসকে খারাপ বলার মানে জানেন? ভগবান বা আল্লাহ্‌র তরফে যে সব জিনিস ধর্মীয় বাণী হয়ে এই নশ্বর ধরার ধুলিতে নেমে এসেছে, তাদের একটাকেও খারাপ বলার অর্থ হল, ভগবান বা আল্লাহ্‌ অন্তত এক আধটা খারাপ কাজ করেছে। বাপ রে! যেই না বলেছেন, ওয়াশিকুর রহমান বাবু কিংবা নরেন্দ্র দাভোলকর উপর থেকে মুচকি হাসি হেসে উঠবেন। আসুন আসুন। মৃত্যুপুরীতে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। ত্রিশূল বা চাপাতি আপনার আত্মাকে খুব দ্রুত পরমাত্মার সাথে মিলিয়ে দেবে! ব্রহ্মাস্মিতার সুযোগ না পেলেও ভস্মাস্মিতার সুবর্ণ সুযোগ হাতে এসে যাবে!

তাই বলছিলাম, দাঙ্গা নিজে থেকে না হলেও, দাঙ্গা কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা সংগঠিতভাবে করানো হলেও, দাঙ্গা যে করানো যায়, তার সহায়ক অনেক উপচারই ধর্মের কাঠামোয় বিদ্যমান। সমস্ত ধর্মের কাঠামোতে। সেই সব জিনিস না থাকলে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সাধ্য ছিল না ধর্মের নামে মানুষকে খেপিয়ে তোলার।

ধর্ম মানে জিরাফ?

কিন্তু এবার অন্য একটা তথ্যের দিকে চোখ ফেরানো যাক।

ধর্মের ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় কাঠামোতে পরধর্ম বিদ্বেষ অন্তস্থিত (in-built) হয়ে থাকলেও অনেক দেশেই পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষজন দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করেছে। একে অপরের ধর্মাচরণে সাহায্যও করেছে, আবার কখনও কখনও ঝগড়াঝাঁটি মারপিটও করেছে। কিন্তু তারা কখনই সংগঠিতভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে মেরু বিভাজন ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা করেনি। শাস্ত্র শিকেয় তুলে রেখে কোনো এক অদৃশ্য ঈশ্বরের উদ্দেশে ফুল বেল পাতা জমা দিয়ে ধূপ মোমবাতি জ্বেলে তারা অবশেষে নিত্যদিনের জীবন জীবিকার সংগ্রামে একে অপরের সহায়ক হয়ে দিন কাটিয়েছে। ধর্মের তত্ত্বকে তেমন ভাবে গ্রহণ করেনি বলেই তার ব্যবহারিক রূপে দাঙ্গাও সর্বজনীন ও সর্বকালীন হয়ে উঠতে পারেনি। যদি হতে পারত, এতদিনে মানব প্রজাতি এই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

মন্দির মসজিদে মোল্লা পুরোহিতের রাজত্ব কায়েম থাকলেও সুফি বাউলরাই গ্রামে গঞ্জে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম চর্চাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই চর্চায় মাঠের ধান আর আশমানের ঈশ্বরে কোনো ধর্মীয় ভেদরেখা অঙ্কিত হয়নি। গায়ের ঘাম আর চোখের পানিতে সব একাকার হয়ে রয়েছে। এমনটা বাস্তবে ঘটেছিল বলেই আরবের পণ্ডিত আল-খোয়ারিজমি-র পক্ষে হিন্দু গণিত (তার শূন্যের ধারণা ও স্থানমান পাতন পদ্ধতি সহ) আরব হয়ে ইউরোপ অবধি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বাগদাদে উপনিষদের পাঠ শোনার জন্য হিন্দু পণ্ডিত আচার্য কনকের ডাক পড়েছিল। রামায়ণ মহাভারত সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদের প্রতি মুসলমান রাজাদের মধ্যে আগ্রহ জন্মেছিল এবং তাদের কাছ থেকে এই কাজের জন্য অনুদান পাওয়া গিয়েছিল।

আর সঙ্গীত? ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল ধারাকে রক্ষা করেছেন যাঁরা, তাঁদের এক বড় অংশই মুসলমান। তাঁরা এক আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যকে স্বীকার করেন না। আর হিন্দুস্থানি সঙ্গীত মানেই হল তাতে শিব দুর্গা কালী কৃষ্ণ প্রমুখর সরব উপস্থিতি। তাঁরা এই গানগুলি ধরলেন এবং করলেন কীভাবে? তাঁদের ধর্ম বিশ্বাসে লাগল না? গা রি রি করে উঠল না?

না। লাগল না। কোন আপত্তি জেগে উঠল না। অন্তত তেমন কিছু ঘটেছে বলে প্রমাণ নেই। জিরাফ না দেখলেও জিরাফে বিশ্বাস স্থাপন করা যায়। তারপর দৈনন্দিন কাজেকর্মে আর জিরাফ নিয়ে না ভাবলেও চলে। অদৃশ্য ঈশ্বরও তাই। না দেখলেও তাকে বিশ্বাস করা যায়। দিনের কোনো এক সময় তার উদ্দেশে প্রণাম বা সালাম জানিয়ে রাখা যায়। একটা লেবু বা বাতাসা, দুটো নকুলদানা, চারটে ফুল নিবেদন করে কিংবা একটা সুগন্ধী ধুপ জ্বালিয়ে রেখে দিলেই কাজ শেষ। তার পর আর তাকে নিয়ে সারা দিন না ভাবলেও কোনো অসুবিধা নেই। “সাঁইয়া, তু মুঝে সমঝা দেঁ, অব মুঝে ক্যায়া করনা . . .” বলে মুদারার গান্ধার থেকে ধৈবতে চলে গেলেই আর ভাবনা নেই! ঈশ্বর আল্লাহ্‌ তখন সবই সুরের তুরীয় দ্রবনে গলে মিলেমিশে হারিয়ে গেছে! এর তসবি আর ওর উপবীতের তখন গলায় গলায় কী ভাব!

এইভাবেই জীবন চলে যাচ্ছিল। ইতিহাসের কিছু ধূসর পৃষ্ঠা উলটে দেখুন। ইসলামের প্রবল প্রতাপের কালে যখন সে আরব থেকে বেরিয়ে মধ্য প্রাচ্যের মরুদেশ জয় করে পারস্য আফঘানিস্থান পর্যন্ত একশ শতাংশ জনগণকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে ফেলে অবশেষে এই ভূভারতে এল, প্রায় সাতশ (১১৯২-১৮৫৭) বছর ধরে একটানা রাজত্ব করে ইংরেজদের কাছে পরাভূত হওয়ার সময় পর্যন্ত সে এক চতুর্থাংশ জনমণ্ডলিকেও ইসলামিত করে উঠতে পারল না। এই ঘটনাটা এই দেশে কত জন লক্ষ করেছেন? কত জন এই ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজেছেন? উত্তর ভারতের রাজপুত রাজারা দলে দলে সুলতান ও মোগল সম্রাটদের সহায়তা করেছে, তাদের সেনাপতি হয়েছে। না করলে সুলতান ও মোগলরা এত দিন এখানে নির্বিঘ্নে রাজত্ব করতে পারতই না। কিন্তু, কই? তাদের তো মুসলমান হতে হয়নি! তারা এমনকি তাদের কন্যা বা ভগ্নিদের মোগল সম্রাটদের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে, আত্মীয়তা সম্বন্ধ পাতিয়েছে। এবং এই সবই করেছে নিজেদের সামন্তী পাট্টা বাঁচিয়ে সুখে থাকার জন্য। তারাও তার জন্য মুসলমান হয়ে যায়নি, তাদের কন্যা বা ভগ্নিরাও মুসলিম বাদশাহর হারেমে গিয়ে নিজস্ব ধর্ম চর্চা বজায় রেখেছে।

তার মানে হল, আজ হঠাৎ করে যে ধর্মীয় সত্তাকে সঙ্কটগ্রস্ত বা বিপন্ন বলে মনে হচ্ছে, সেদিন তা হয়নি। শাসকেরও মনে হয়নি, শাসিতেরও মনে কোনো ভয় ছিল না। তার ফলে উভয় পক্ষই ধর্মকে জিরাফের মতোই স্বীকার করেও জীবনের নিত্যকর্ম থেকে প্রায় সরিয়ে রাখতে পেরেছিল। তত্ত্ব এবং কর্ম—উভয়ক্ষেত্রেই! অচেতনে তারা ধর্ম বিশ্বাসী থেকেও, জীবনের অনেক আচরণেই ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলেও, সচেতন জীবন যাত্রায় পারস্পরিক মেলামেশায় উৎসব অনুষ্ঠানে সুখে দুঃখে ধর্মীয় ভিন্নতাকে দূরে সরিয়ে রেখে চলতে পেরেছিল। তারা এই ভয় সেদিন পায়নি যে এর ফলে তাদের ধর্ম বিপন্ন হবে বা সঙ্কটে পড়ে যাবে!!

আজ সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। আজ জিরাফ যেমন বিপন্ন প্রজাতি, বিলীয়মান প্রাণী, ধর্মও তেমনই বিপন্ন সংস্কৃতি, বিলুপ্তপ্রায় পরিঘটনা। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তারা সকলেই তাই আজ তটস্থ—কিসে কী হয়ে যায়! আত্মরক্ষায় সে এখন তাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যত তার সঙ্কট বাড়ছে, ততই সে মরিয়া হয়ে উঠছে, সামান্যতম বিরোধী কাউকে বা কিছু দেখলে সে ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে। আর তারপর সেই মরণ ভয় থেকেই সে হিংস্র আক্রমণ করতে চাইছে।

যা বলেছেন। একেবারে হক কথা! আক্রমণ করতে চাইলেই তো আর করা যায় না। এখন তো রাজার শাসন নেই, কাজির বিচার নেই। সব দেশেই—সে ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তান যাই হোক না কেন—আইন আছে, সরকার আছে, রাষ্ট্র আছে, থানা-পুলিশ আছে, বিচার ব্যবস্থা আছে। হিংসাত্মক কিছু করতে গেলেই তো বাধা পাবে। অন্তত পাওয়ার কথা। সেখানেও তার ভয় থাকার কথা। তাহলে সে সাহস পাচ্ছে কোত্থেকে?

এই আমাদের দেশেই তো আরএসএস তিন বার আইনত নিষিদ্ধ হয়েছে। তিন বারই সে দেশের আইনকানুন মেনে চলার মুচলেকা দিয়ে তবে আবার কাজ করার অধিকার ফিরে পেয়েছে। মনুসংহিতার দোহাই পেড়ে বা শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার জোরে সে আজ আর ইচ্ছামতো কাজ করে যেতে পারে না। ইচ্ছে হল আর কেউ গরুর মাংস খেয়েছে বলে আওয়াজ তুলে তাকে মেরে ফেললাম—এরকম তার করতে পারার কথা নয়। তবুও পারছে কীভাবে? সেই সব খুনিদের বিচার ব্যবস্থার হাত থেকে ছাড়িয়ে আনছে কারা? তাদের হিরো বানাচ্ছেই বা কারা? পহলু খানের খুনিদের ধরা গেল না কেন?

বাংলাদেশের কথাও এই প্রসঙ্গে ধরা যেতে পারে। পাকিস্তানের কবল থেকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ইসলাম ধর্মের নামাঙ্কিত “পবিত্র” সব সংগঠন “আল বদর” “রাজাকার” ইত্যাদিই শুধু বদনাম অর্জন করে গর্তে মুখ লুকায়নি। পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়ে ন্যক্কারজনক নানা ক্রিয়াকলাপ করার জন্য জামাত শিবির সহ ইসলাম ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সংস্থাকেই সাধারণ মানুষ বয়কট করেছিল এবং ভাষার প্রবল সেন্টিমেন্টের সামনে ধর্মের তথাকথিত “অনুভূতি” পালিয়ে গিয়ে জন্নত দোজখ যেখানে পেরেছে ঢুঁ মেরেছে। সেই তারাই এখন আবার নতুন নাম বা নামাবলি গায়ে দিয়ে আবার সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তালিকা তৈরি করে যুক্তিবাদী ব্লগারদের অক্লেশে খুন করে যাচ্ছে। পাকিস্তান আমলের কট্টর ধর্মীয় প্রশাসনের আমলে আরজ আলী মাতুব্বর অনেক ঝক্কি ঝামেলা মোকাবিলা করেও গোটা জীবন কাটিয়ে যেতে পারলেন। আর আজ স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রে রাজা হায়দার থেকে শুরু করে পর পর চোদ্দ জন ব্লগারকে মুক্তচিন্তার কথা বলার জন্য নৃশংসভাবে খুন হতে হল ধর্মীয় উন্মাদদের হাতে! এর ব্যাখ্যা কি আপনি পেয়েছেন? বুঝতে পারছেন, কোন খুঁটির জোরে এরা লড়ছে?

সহজেই মালুম, এই দুঃসাহস এরা নিজেদের শক্তির জোরে, বা, ধর্মের কিংবা শাস্ত্র গ্রন্থের নামে পাচ্ছে না। নিছক গীতা বা কোরানের দোহাই দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটানো যাচ্ছে না। ধর্মগ্রন্থগুলো স্রেফ প্রতীকী ব্যানার হিসাবে সামনে আছে। কিন্তু এরা সাহস এবং প্রশ্রয় পাচ্ছে সেখান থেকে, যেখান থেকে তাদের বাধা পাওয়ার কথা ছিল। পাচ্ছে তাদের কাছ থেকে যাদের থেকে তার বিরোধিতার মোকাবিলা করার কথা। অর্থাৎ, রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, শাসক দল, ইত্যাদি। ধর্মের নামে এই যে লাগামহীন সন্ত্রাস, তার বেলায়ও আবার সেই “হোন্দে নহি করওয়ায়েঁ যান্দে হান”! ইহাঁ ভি, উধর ভি!


  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post