• December 4, 2021

পেগাসাসকে কি আমরা আরেকটি ওয়াটারগেট বানাতে পারবো?

 পেগাসাসকে কি আমরা আরেকটি ওয়াটারগেট বানাতে পারবো?

সুমন সেনগুপ্ত :- অদ্ভুত এক দেশে আমরা বাস করছি। এই দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং শাসক দল সব সময়েই মনে করে যে দেশের জনগণ তাঁদের ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ষড়যন্ত্র করছে। তাই কারাকারা এই কাজে লিপ্ত তা জানার জন্য তিনি বা তাঁরা একটি পদ্ধতি নিয়েছেন। দেশ- বিদেশের বেশ কিছু সংবাদপত্র এই খবরটি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এনেছেন যে আমাদের দেশের বেশ কিছু বিরোধী নেতা, সাংবাদিক, ছাত্র এবং সমাজকর্মীদের ওপর নজরদারি করার জন্য ইজারায়েলের এক সাইবার যুদ্ধ ব্যবসায়ী সংস্থার থেকে পেগাসাস বলে একটি স্পাইওয়ার নিয়েছে। এই খবর জানাজানি হওয়ার সময় থেকেই সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। সবাই প্রশ্ন করছে, এই কি তাহলে হর হর মোদী, ঘর ঘর মোদী’ র মর্মার্থ?

তাহলে এখন জেনে নেওয়া দরকার পেগাসাস কি আর কিভাবেই বা কাজ করে ? যদি কোনও ব্যক্তির ফোনে এই স্পাইওয়ার ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সেটি ফোনের ক্যামেরা থেকে তাঁর অজান্তেই ছবি বা ভিডিও তুলতে পারবে। এছাড়াও তাঁর কল লিস্ট, কন্ট্যাক্ট, ক্যালেন্ডার, কথাবার্তা, সবই রেকর্ড করতে পারবে। চাইলে কিছু ডকুমেন্ট তাঁর ফোনে বসিয়েও দিতে পারবে। শুধু তাই নয়, এই ভাইরাস ফোন বন্ধ অবস্থায় থাকলেও যে কোনও মানুষের গতিবিধির ওপরে নজর রাখতে সক্ষম। শোনা যাচ্ছে যে বিভিন্ন সাংবাদিক, বিভিন্ন সমাজকর্মী যাঁরাই এই সরকারের বিরোধী তাঁদের ফোনে তাঁদের অজান্তেই এই ভাইরাস বা স্পাইওয়ার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যথারীতি সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এনএসও গ্রুপও তাঁদের বক্তব্য রেখেছে যে, এই রকম কোনও গুপ্তচরবৃত্তি করা হয়নি। অথচ আমরা কিন্তু জানি এই সংস্থা সরকারের কাছেই এই স্পাইওয়ার বা ভাইরাস বিক্রি করে। শুধু তাই নয় এইরকম অভিযোগও আসছে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন ২০১৭ সালে ইজরায়েল সফরে গিয়েছিলেন, তখনই নাকি এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়। আরও কিছু কথা শোনা যাচ্ছে যে এই পেগাসাস এতোটাই মহার্ঘ একটি স্পাইওয়ার কোনও সরকার ছাড়া অন্য কেউ এটা কিনতে পারবেন কি না সন্দেহ। একদিকে এনএসও গ্রুপ অস্বীকার করবে আর বলবে যে তাঁদের তৈরী স্পাইওয়ারের কোনও বেআইনি ব্যবহার হয়নি, এবং আমাদের দেশের প্রাক্তন এবং বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করবেন। অথচ ঘটনাচক্রে যে তালিকা আপাতত প্রকাশ পেয়েছে তার মধ্যে বর্তমান মন্ত্রী অশ্বিন বৈষ্ণবের নাম পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে এটা পরিষ্কার যে এই প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজের দলের মানুষদেরও বিশ্বাস করেন না।

এখন যে মানুষদের তালিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা থেকে এই কথাটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে এই সরকারের যারা সমালোচক তাঁদের এই সরকার সন্দেহের চোখে দেখে, শুধু তাই নয় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি যাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছিল, সেই অভিযোগকারিনীর পরিবার পরিচিতদের মধ্যে থেকে আরও ১১ জন মানুষের ফোনে আড়িপাতা হয়েছিল। এমনকি প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকও বাদ পড়েননি তাঁদের স্পাইওয়ারের নিশানা থেকে। তাহলে এখন প্রশ্ন এই সরকারের উদ্দেশ্য কি? কেনই বা তাঁরা কিছু বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে নিশানা বানিয়েছে? ২০১৬ সালে যখন ভীমা কোরেগাও মামলায় একের পর এক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, আর দেশের যে কোনো প্রান্তে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা একের পর এক তল্লাশি চালাচ্ছিলেন, তখন থেকেই এই পেগাসাস কাজ শুরু করেছে বলে এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই কিছুদিন আগে যখন অশীতিপর ফাদার স্ট্যান স্বামীর প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার খবর প্রকাশিত হলো, তখন থেকেই এই আলোচনা আবার সামনে এসেছে তবে কি এই পেগাসাস স্পাইওয়ারই আছে এই বৃদ্ধ খৃষ্টান ধর্মযাজকের গ্রেপ্তার এবং মৃত্যুর পিছনে? তাঁকেও কি একই ভাবে ফাঁসানো হয়েছিল? তাঁর কম্পিউটারেও কি মিথ্যে প্রমাণ এই পেগাসাসের মধ্যে দিয়েই এসেছে? যেভাবে, রোনা উইলসন, আনন্দ তেলটুমডে বা অন্যন্যদের কম্পিউটারে মিথ্যে প্রমাণ ঢোকানো হয়েছিল সেভাবেই কি স্ট্যান স্বামীকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে তিলতিল করে মেরে ফেলা হলো? যদি পেগাসাস এবং তার কাজের পদ্ধতি সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে তো ভীমা কোরেগাও মামলাই ধোঁপে টেঁকে না। তাহলে তো সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি সামনে আসা এখন সময়ের দাবী।

এতোখানি পড়ে অনেকে হয়তো ভাবছেন এই সমস্ত অসুবিধা তো রাজনৈতিক জগতের মানুষদের। দেশের ও সমাজের সাতে-পাঁচে না থাকা মানুষদের এতে কি অসুবিধা ? তাঁদের জন্য কিছু কথা বলা জরুরী। এখন বেশীরভাগ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, এবং এই ফোন থেকে কখনো কখনো ব্যাঙ্কের কাজও করেন। আজকের সময়ে যদি কোনও একজনের ফোনে পেগাসাস স্পাইওয়ার, সরকার ইন্সটল করে দেয় এবং তার ফলে তাঁর কন্টাক্ট লিস্টে থাকা সমস্ত মানুষের নাগাল যদি পেগাসাস পায় তাহলে কি নিশ্চিত করে এটা বলা যাবে যে ওই মানুষটির ব্যাঙ্কিং আদানপ্রদান অন্য কেউ দেখতে পাবেন না? আজকের সময়ে সামাজিক মাধ্যম হোক বা এমনিতেই প্রায় প্রতিটি মানুষই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত, তাই কোনও একজন মানুষকে যদি নজরবন্দী করে ফেলা যায়, তাহলে তাঁর সংস্পর্শে থাকা অন্যন্য মানুষদেরও সহজেই ধরা সম্ভব। এটা অনেকটা সেই মাকড়সার জালের মতো একটা বিষয়। এছাড়াও আরও পদ্ধতি আছে ধরা যাক এমনিতে কোনও একজন ব্যক্তি সরকার বিরোধী নন, কিন্তু সরকারের কোনও একটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁর মনে হয়েছে যে সরকার এই প্রক্রিয়া না নিলেও পারতেন। তাঁর এই ভাবনা তাঁর কোনও একজন পরিচিত বন্ধু সামাজিক মাধ্যমে একই রকম ভাবে প্রকাশ করেছেন, তা দেখে যদি সেই ব্যক্তির মনে হয় এই লেখা, কিংবা ছবি বা মিমকে পছন্দ করা যায়, তাহলেই সেই ব্যক্তি নজরদারির জালে জড়িয়ে পড়লেন। এরপর সেই পছন্দ করাকে মাথায় রেখে সামাজিক মাধ্যমও একই ধরনের অন্যন্য মানুষদের করা পোষ্ট,ছবি এবং লেখা সামনে আনতে থাকবে, যাকে ইংরেজিতে অ্যালগরিদম বলে। শেষ বিচারে এই প্রতিটি সামাজিক মাধ্যম এক একটি নজরদারির মাধ্যম, কারণ এই সংস্থাগুলো শেষ বিচারে প্রতিটি মানুষের এক একটি অবয়ব তৈরি করে। সেই অবয়ব অনুযায়ী মানুষদের চালনা করাই এই বহুজাতিক সামাজিক মাধ্যম সংস্থাদের কাজ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই খাঁচা বা মাকড়সার জাল থেকে বেরোনোর উপায় কি? আসলে সমস্যাটা সেইদিন হয়েছিল যেদিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া একটি শ্লোগানকে সারা ভারতবাসী আত্মস্থ করে নিয়েছিল- ‘আমিই চৌকিদার’। তার কিছুদিন আগেই সেই প্রধানমন্ত্রীর নামে অভিযোগ উঠেছিল যে রাফাল বিমান কেনার ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে এবং তার মধ্যে আম্বানির লাভ হয়েছে। যখন বলা উচিৎ ছিল যে না এই চোরের আমাদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা নেই, তখন আমরা তাঁকেই মাথায় বসিয়েছি, আর এখন দেখা যাচ্ছে সেই চোর শুধু ডাকাতিই করেনি, সে গুপ্তচরবৃত্তিও করেছে। তাহলে এখন করার কি থাকে? আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনকে তাঁর রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল ঠিক এই রকম একটি গুপ্তচরবৃত্তির কারণে, যা ইতিহাসের পাতায় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি বলে খ্যাত হয়ে আছে। অভিযোগ উঠেছিল রাষ্ট্রপতি নিক্সনের বিরুদ্ধে যে তিনি সিআইএর চরদের তাঁর বিপক্ষের কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময়েও একমাত্র ওয়াশিংটন পোষ্ট ছাড়া অন্য কোনও আমেরিকার সংবাদপত্র এই বিষয় নিয়ে খবর করেনি। নিক্সনও চেষ্টা করেছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চাপিয়ে দিতে, কিন্তু তিনি সফল হননি। শেষপর্যন্ত বিচারে নিক্সন দোষী সাব্যস্ত হন। আজ হয়তো বেশীর ভাগ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক নয় আমাদের দেশেও, কিন্তু এই পেগাসাস দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কাজকে যদি আমরা মুখ বুজে মেনে নিই, তা এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করাই হবে। সেই সমর্থন করলে কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্রেরই ক্ষতি। তার চেয়ে রাজনৈতিক সমাজ, নাগরিক সমাজ যদি এক হয়ে এই আন্দোলনে নামতে পারে তাহলে শেষ বিচারে ভারতের গণতন্ত্র সুরক্ষিত হবে, ভারতের প্রতিটি নাগরিক সুরক্ষিত হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *