• December 4, 2021

বারোটি জেন গল্প

 বারোটি জেন গল্প

মওলবি আশরাফ

পরিচিতি : ‘জেন’ শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত ‘ধ্যান’ শব্দ থেকে। জেন দর্শন বৌদ্ধ দর্শনের একটি শাখা বিশেষ। ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারত থেকে চীন ও জাপানে পরিভ্রমণের মধ্যদিয়ে এর উদ্ভব ও বিকাশ। জেন চর্চা বিভিন্ন ধরণের ধ্যানের মাধ্যমে আত্মজ্ঞানের বিকাশকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয়ে এলেও এর শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে Kōan, বা জনসাধারণ্যে প্রচলিত গল্প, যে গল্পের মধ্য দিয়ে শ্রোতা বা পাঠক নিজেকে জেন দর্শনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করতে পারে। এখানে এমনই বারোটি গল্প পাঠকের সামনে হাজির করছি।

তুমি সাপ তুমিই ওঝা

এক জেন ছাত্র গুরু বানকেইর কাছে এসে অভিযোগ করল,‘আমার প্রচণ্ড রাগ, রাগ উঠলে নিজেকে থামাতে পারি না, এর কোনো চিকিৎসা আছে?’

গুরু বললেন, ‘বেশ তো, একটু রাগ দেখাও তো।’

ছাত্র হতভম্ব হয়ে বলল, ‘এখন কিভাবে দেখাব?’

গুরু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে কখন দেখাতে পারবে?’

ছাত্র বলল, ‘এটা তো হঠাৎ করে উঠে।’

বানকেই বললেন, তাহলে নিশ্চয় এটা তোমার স্বভাবজাত নয়, নাহলে যখন তখন আমাকে দেখাতে পারতে। যখন তোমার জন্ম হয়েছে, এটা তোমার সাথে ছিল না, এমনকি তোমার বাবা-মাও এটা তোমাকে দেয়নি। তার মানে এই “সাপ” তোমারই লালিত। তো এবার ভেবে বের করো “ওঝা” কোথায়?’

রেশমি কিমোনো পরা সুন্দরী

তানজান ও একিদো— দুই জেন ভিক্ষু কোথাও যাচ্ছিলেন। এর আগের রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত ছিল। পথে রেশমি কিমোনো পরা এক সুন্দরী ষোড়শীর সঙ্গে তাঁদের দেখা, চওড়া খাদ থাকায় পথের একপাশে সে দাঁড়িয়ে ছিল।

তানজান মেয়েটিকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি? মেয়েটি ইতিবাচক সম্মতি দিলে তানজান তাকে কোলে করে খাদ পাড় করে দেন।

একিদো মন্দিরে ফেরার আগ পর্যন্ত কিছুই বলেননি। রাতে তানজানকে উদ্দেশ্য করে একিদো বললেন, ‘বৌদ্ধ সাধকদের জন্য নারীদের নিকটবর্তী হওয়া একেবারেই অনুচিত, বিশেষ করে যুবতি ও সুদর্শনাদের, এটা সবদিক থেকেই বিপজ্জনক। তুমি তো এসব ভালো করেই জানো, তারপরেও আজ এমন কাজ করলে কেন?’

তানজান উত্তর করলেন, ‘আমি মেয়েটিকে খাদের পাড়ে নামিয়ে এসেছিলাম, তুমি এখনো তাকে বহন করে চলছ?’

মনোযোগ

জনৈক শিক্ষার্থী জ়েন গুরু ইক্কয়ুর সাক্ষাতে আসে এবং তাঁকে অনুরোধ করে এক ছত্র প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা লিখে দিতে।

ইক্কয়ু তুলি হাতে নিয়ে লিখলেন, ‘তাকাও’

‘এতটুকুই?’ শিক্ষার্থী জানতে চাইল।

ইক্কয়ু আবার লিখলেন, ‘তাকাও’

‘কিসে তাকাব?’, শিক্ষার্থী অস্থির হয়ে বলল, ‘গুরুজী, এই এক শব্দে আমি পূর্ণ কোনো ধারণা পাচ্ছি না।’

ইক্কয়ু তৃতীয়বার লিখলেন, ‘তাকাও’

শিক্ষার্থী এবার রাগতস্বরে জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, এই তাকাও শব্দের মানেটা কী?

ইক্কয়ু ভদ্রতাপূর্ণ স্বাভাবিকস্বরে বললেন, ‘তাকাও মানে তাকাও।’

মূল্য আরোপণ

সোজান নামী এক চীনা জ়েন গুরুর কাছে এক শাগরেদ জানতে চাইল পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি জিনিশ কী।

গুরু উত্তর করলেন, ‘মড়া বিড়ালের মাথা।’

‘মড়া বিড়ালের মাথা! মড়া বিড়ালের মাথা কেন সবচেয়ে দামি জিনিশ?’ বিস্ময় প্রকাশ করল শাগরেদ।

সোজান বললেন, ‘কারণ মড়া বিড়ালের মাথার দাম কেউ কখনো ধার্য করেনি!’

পথই লক্ষ্য

এক তরুণ কিন্তু পরিশ্রমী শিক্ষার্থী জনৈক জ়েন গুরুর কাছে এসে বলল, ‘যদি আমি শিক্ষার্জনে অন্যদের চেয়ে বেশি সময় দিই, নিরলস সাধনা করি, তাহলে আমার আলোকপ্রাপ্ত হতে কতদিন লাগবে?’

গুরু কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ‘দশ বৎসর।’

‘যদি আমি খুব বেশি শ্রম দিই, বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সারাক্ষণ শিক্ষার্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখি, তাহলে কতদিন লাগবে?’ ছাত্রটি এবার জিগ্যেস করল।

গুরু বললেন, ‘বেশ, তাহলে বিশ বৎসর লাগবে।’

ছাত্রটি বলল, ‘কিন্তু, আমি যদি তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি, সর্বোচ্চ শ্রম দিই, সেক্ষেত্রে?’

‘তিরিশ বৎসর’, গম্ভীরস্বরে জবাব দিলেন গুরু।

‘কিন্তু… আমি বুঝতে পারছি না’, হতভম্ব ছাত্রটি বলল, ‘যতবারই আমি বেশি শ্রমের কথা বলি, আপনি সময় আরো বাড়িয়ে দেন, এমন হচ্ছে কেন?’

গুরু বললেন, ‘তোমার এক চোখ যখন লক্ষ্যের দিকে থাকবে, পথ দেখার জন্য তখন একটি চোখই বাকি থাকবে।’

ভারী পাথর

হোগেন, একজন চীনা জ়েন শিক্ষক, একাকী ছোট একটা মন্দিরে বসবাস করতেন। একদিন চারজন পর্যটক ভিক্ষু আসে এবং তাঁর আঙ্গিনায় আগুন জ্বালিয়ে শরীর উষ্ণ করার অনুমতি প্রার্থনা করে। তারা যখন আগুন পোহাচ্ছিল, হোগেন খেয়াল করে দেখলেন তারা প্রাচীন দার্শনিক বিতর্ক সাবজেক্টিভিটি (ভাবগত) আর অবজেক্টিভিটি (বস্তুগত) নিয়ে আলোচনা করছে।

হোগেন তাদের সাথে যোগ দিলেন এবং জিগ্যেস করলেন, ‘এখানে একটা ভারী পাথরখণ্ড আছে, এটা কি মনের ভেতরের না বাইরের বস্তু?’

জনৈক ভিক্ষু বললেন, ‘বৌদ্ধদর্শনের দৃষ্টিতে বস্তু হলো মনের ভাব, সেই হিশেবে পাথরখণ্ডটি মনের ভেতরে।’

‘তাহলে নিশ্চয় তোমার খুব ভার সইতে হয়’, হোগেন বললেন, ‘যদি তুমি এতো বড় একটা পাথরখণ্ড মনে বহন করে বেড়াও!’

বই কেবলই মাধ্যম

জনৈক প্রসিদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানী ও দার্শনিক বহুবছর নিজেকে জেন দর্শন পাঠ ও সাধনায় নিয়োজিত রাখার পর অতঃপর একদিন আলোকপ্রাপ্ত হন। সাথেসাথে তিনি তাঁর সব বই উঠোনে এনে ফেলেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন।

সব পথই পথ

একদিন এক নবীন বৌদ্ধ দেশভ্রমণের পথে এক উত্তাল নদীর পাড়ে এসে উপস্থিত হলো। নদীতে না ছিল নৌকা না ছিল সাঁতরে পার হওয়ার হাল। দীর্ঘক্ষণ নদীর পাড়ে বসে বসে সে উপায় খুঁজতে লাগল। যখন সে আশা ছেড়ে উল্টো ফেরার পথে পা বাড়াবে এমন সময় নদীর ওপাড়ে জনৈক জেন গুরুকে দেখতে পেলো। যুবকটি চীৎকার করে জানতে চাইলো,‘ওস্তাদ, দয়া করে বলবেন নদীর ওপাড়ে কীভাবে যাওয়া যায়?’

গুরু নদীর দিকে একনজর তাকিয়ে যুবককে চীৎকার করে বললেন, ‘বাছা, তুমি নদীর ওপাড়েই আছো।’

যার যা ধর্ম

নদীতে থালাবাসন পরিস্কার করার সময় একটা বিচ্ছুকে পানিতে ডুবে যেতে দেখে জনৈক ভিক্ষু ওটাকে উপরে ওঠায়। উঠানোর সময় বিচ্ছুটা তাঁকে দংশন করে, তিনি ব্যথায় নীল হয়ে যান। তিনি আবার ধোয়া শুরু করলে দেখেন বিচ্ছুটা আবার পানিতে পড়ে গেছে। তিনি বাঁচাতে গেলে বিচ্ছুটা আবার দংশন করে।

তাঁর সঙ্গী ভিক্ষুটি তাঁকে বললেন, ‘বন্ধু, কেন ওটাকে বারবার বাঁচাচ্ছো, ওটার ধর্মই তো দংশন করা।’

‘তাতে কী’, ভিক্ষু উত্তর করলেন, ‘বারবার বাঁচানোটা আমার ধর্ম।’

পূর্ণ চাঁদ

‘আলোকপ্রাপ্ত হতে হলে কেন ধ্যান করতেই হবে’, এক রাজপুত্র খেদিতকণ্ঠে তার গুরুকে বললেন,‘আমি পড়ব, প্রার্থনা করব, একটা বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে পারব, কিন্তু এই মনকে শূন্য করা আবার কী জিনিশ?’

‘আচ্ছা, আমি তোমাকে দেখাব।’, গুরু বললেন। তারপর পূর্ণিমা রাতে এক বালতি পানি হাত দিয়ে নেড়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘কী দেখতে পাচ্ছো’।

রাজপুত্র উত্তর করলেন, ‘আলোর ঝলকানি।’

‘এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকো।’, গুরু বললেন। কিছুক্ষণ বাদে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন কী দেখতে পাচ্ছো?’

‘পূর্ণ চাঁদ।’, রাজপুত্র বললেন।

গুরু বললেন, ‘জী, মশাই, পূর্ণ আলোক উপলব্ধির একমাত্র পথ হচ্ছে স্থিতিশীলতা ও শূন্য মন।’

আগামীকাল বলে কিছু নেই

এক জাপানি যোদ্ধা শত্রুর হাতে ধরা পড়ে জেলবন্দি হন। সেই রাত্তিরে তিনি ঘুমোতে পারছিলেন না, আগামীকাল যা ঘটতে যাচ্ছে— জেরা, নির্যাতন অতঃপর মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে। ঠিক সেসময় তাঁর জ়েন গুরুর বাণী মনে পড়ল : ‘আগামীকাল বলে কিছু নেই, এ কেবল মায়া, বাস্তবতা শুধুমাত্র এই মুহূর্তটিই।’

এই বাণী ভাবতে ভাবতে তিনি ঘুমে ঢলে পড়লেন।

কোনো নীতিই ধ্রুব নয়

সিউঙ স্যান বলতেন, ‘যখন তুমি খাবে, কেবলই খাবে, যখন তুমি পড়বে, তখন কেবল পড়বে, এক কাজের সময় অন্য কাজ করবে না।’

একদিন তাঁর শিষ্য দেখল যে গুরু খাচ্ছেন আর পড়ছেন। শিষ্য তাঁকে জিগ্যেস করল, ‘এটা কি আপনার শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক না?’

সিউঙ স্যান বললেন, ‘যখন তুমি খাবে আর পড়বে, তখন কেবল খাবে আর পড়বে!’

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post