• December 9, 2021

সুফিবাদ

 সুফিবাদ

মূল : মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

আধ্যাত্মিকতা মানবমনের অন্তস্তলে লুক্কায়িত এক রত্নভাণ্ডার। প্রাকৃতিকভাবেই কারো রত্নভাণ্ডারে থাকে আশ্চর্য আশ্চর্য জওহর, কারো-বা থাকে সাদামাটা রত্ন। কেউ সেই রত্ন দিয়ে নিজেকে সাজায়, কেউ-বা তা ফেলে রাখে বে-দামি পাথরের মতন। কিন্তু এই রত্নভাণ্ডার প্রত্যেকের মনেই আছে, এর ব্যতিক্রম জগতে নাই। তবে প্রশ্ন ওঠে— এই আধ্যাত্মিকতার আগ্রহটা আসলে কী, আর মানুষের জীবনে এর কাজই-বা কী?

মানুষ কোনো মাংসের দলা না, এই মাংসের ভেতরে একটা জিনিস আছে— যেটা চিন্তা করে, কথা কয়, পঞ্চেন্দ্রিয়ের সাহায্যে কাজকারবার করে। এইটা হলো মানুষের ‘আমিত্ব’ বা ‘খোদ’। এটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মন’। এই ‘আমিত্ব’ বা ‘খোদ’-এর কাজটা কী? এই ‘আমিত্বই’ সবকিছু ভাবে, সবকিছু বলে, তারপর সবকিছু করার জন্য চেষ্টা-শ্রম দেয়। মানুষ নামের মাংসের মূর্তিতে এই ‘আমিত্ব’ একটি পরিচয় দেয়, অস্তিত্বের জানান দেয়, এবং সৃষ্টি করে ঝংকার। এই ‘আমিত্বই’ মানবমনে তৈরি করে ‘ইচ্ছা’, এবং সেই ‘ইচ্ছার’ আদলেই মানুষ গড়ে তোলে পৃথিবী। ধর্ম, শরিয়ত, পূজাপার্বণ কিংবা নামাজের নাম আধ্যাত্মিকতা নয়। আধ্যাত্মিকতা এসব কাজ করতে মনের ভেতরে ঝোঁক তৈরি করে বটে, কিন্তু আধ্যাত্মিকতা কখনো নির্দিষ্ট পথ দেখায় না, বরং পথপরিক্রমায় হিম্মত ও স্থিরতার ভাবাবেগ যোগান দেয়।

এমনিতে সকল মানুষ একই গুণসম্পন্ন। পার্থক্য কেবল গুণের পরিমাণে। আধ্যাত্মিকতা মানুষের ওই গুণের পরিমাণকে আরও চমকদার ও অলঙ্কৃত করে তার থেকে ভালো কাজ আদায়ের জিম্মাদারি নেয়। এই কারণে আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্র মানুষের সবকিছুতে, কেবল শরিয়তে নয়। এর মানে শরিয়তের কোনো প্রয়োজন নেই এমন নয়, আধ্যাত্মিকতা শরিয়তের আত্মাকে আপন করে নিতে পারে, এবং ইমানে জোর দিয়ে ভালো কাজে জজবা তৈরি করে। সুফিরা শরিয়তের পথেই চলে, কিন্তু নিজেদের ধ্যানে-জ্ঞানে, নিজেদের তালে-লয়ে। তাদের সেই তাল ও লয়, জজবা ও খেয়াল আধ্যাত্মিকতারই সৃষ্টি। আধ্যাত্মিকতা মানুষের আপনসত্তা (খুদি) জাগিয়ে তোলে। যখন মানুষের মনের ভেতরের পর্দা সরে যায়, তখন সেই ভেতরের আমিত্বের দেখা পায়, এবং বোধোদয় হয় এই আমিত্ব কোনো ‘মহান আমিত্বের’ বেদনাবিধুর অংশ।

এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত বললে এভাবে বলতে হয়— ‘এই আমিত্বকে জাগিয়ে তোলাই নবীদের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।’ কারো মধ্যে যদি এই ‘আমিত্ব’ জেগে ওঠে, তাহলে মৃত্যুর পর তার রুহ কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই সর্বোচ্চ মাকামে পৌঁছে যায়, আমরা তাকে বলি বেহেশত। আর যে এই ‘আমিত্বকে’ জেগে উঠতে দেয়নি, জুলুম অত্যাচার করে চাপিয়ে রেখেছে, মৃত্যুর পর তাকে দোজখে পাঠানো হবে, এবং যেদিন তার ‘আমিত্ব’ জেগে উঠবে সেদিনই কেবল মুক্তি পাবে।

মানুষের মনে ‘আমিত্ব’ জেগে না ওঠাকে আমরা ‘কুফর’ বলি। আমরা ধর্মকে মানুষের জন্য একারণেই জরুরি মনে করি যে, এর পথে মানুষ নিজের ভেতরকার আমিত্বকে জাগিয়ে তুলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিকতা মনকে ধর্মের রঙে রঙিন করে। রসুল (স) একেই ‘এহসান’ শব্দ দিয়ে ব্যক্ত করেছেন। এহসানের মর্ম শাস্ত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না, বরং মহান মানুষদের সান্নিধ্যে যাওয়ার মাধ্যমে এবং আত্মিক প্রভাবে পাওয়া যায়। আমার সৌভাগ্য আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, এবং এমন মুর্শিদ পেয়েছি যাদের সান্নিধ্যে জীবনের উদ্দেশ্যে খুঁজে পেয়েছি। ওই মুর্শিদদের ফয়েজ ও মহব্বতে আমার মন শক্ত মুসিবতেও কখনো ভেঙে পড়েনি। এই আধ্যাত্মিকতা আমাকে একটা কাজও উদ্দেশ্যহীন করতে দেয়নি, আমি সবসময় একটি উদ্দেশ্যময় পথের যাত্রী ছিলাম, এবং সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই ছিল সংগ্রাম ও সাধনা।

ভারত থেকে যখন আমি আফগানিস্তানে যাই, আমার সামনে অনেক নতুন নতুন পরিস্থিতি হাজির হয়। তারপর যখন রাশিয়া যাই, দেখি এ সম্পূর্ণ আলাদা এক পৃথিবী। যেই সমস্ত ধ্যানধারণার ওপর সারাটা জীবন পার করেছি, চোখের সামনে সব ভেঙে পড়তে দেখেছি, দেখেছি তারচেয়ে জোরালো ও সপ্রাণ ধ্যানধারণা এই অঞ্চলের মানুষ ধারণ করে। তুর্কিতেও এমন কমবেশি হয়েছে। এই পুরোটা সময়ে একবারের জন্যও ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস থেকে আমার মন বিন্দুমাত্র নড়েনি, এবং আমার ধর্মীয় বিশ্বাস রাশিয়ানদের ধর্মহীনতার যৌক্তিকতার উপরে জয়ী ছিল। আর এই সবই শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির রুহানি ফয়েজ ছিল, শুধুমাত্র আধ্যাত্মিকতার কারনে যার ইনকিলাবি চিন্তা-ফিকির ওইসব দর্শনের চেয়ে প্রমাণিত শক্তিশালী।

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবির আধ্যাত্মিক চিন্তা-ফিকিরে মনের ভেতরকার মনকে সুন্দর সজ্জিত ও বিকশিত করবার পন্থা মিলে— যা প্রকৃত ইসলাম ও মানবতার সাথেও সাযুজ্য রাখে। এমনকি শাহ সাহেবের এই আধ্যাত্মিকতা বর্তমানকালের ধর্মহীনতার দর্শনকেও সঠিক পথ দেখায়। এই কারণে কোনো মুসলমান ‘ইউরোপিয়ানিজম’ (মানে ইউরোপের প্রগতি ও বস্তুবাদ) গ্রহণ করে নিলেও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। এটাই প্রকৃত সুফিবাদ। সুফিবাদের কথা শুনে মনে হয় এটা কোনো নিবর্তনমূলক প্রাচীন ধ্যানধারণা, আধিভৌতিক তথা দুনিয়ার সাথে সম্পর্কহীন এবং প্রগতিশীলতার বিপরীত কিছু। কিন্তু সুফিবাদ হলো গভীর চিন্তা আর চূড়ান্ত পাগলামির একত্রিত রূপ। আমাদের কর্ম-বাস্তবায়নের কাঁথা এই সুতাতেই সেলাই হয়। এই আধ্যাত্মিকতাই আমাদের সবধরনের বিপদআপদ ও বালা-মুসিবত থেকে খোদার আঁচলে হেফাজত রেখেছে, এবং এর বদৌলতেই আল্লার ওপর আমাদের বিশ্বাস এত বিস্তৃত হয়েছে যে, আল্লার ওপর বিশ্বাসের আওতায় সমস্ত জাতি সমস্ত ধর্ম এবং পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ও প্রান্তের প্রত্যেক মানুষ ঢুকে পড়েছে। এই আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিমানুষ থেকে মুক্ত করে দুনিয়ায় সমস্ত মানুষের মুক্তির চিন্তায় উদ্দীপ্ত করেছে। সুফিবাদ একদিকে যেমন আমাদের চিন্তা-ফিকিরকে প্রসারিত করেছে, অন্যদিকে যুগিয়েছে একিন ও অটলতার শক্তি। ফলে আমরা অন্তরের শক্তিমত্তাকে বাহিরে সংগ্রাম-সাধনায় নিয়ে আসতে পেরেছি। এবং জাগতিক প্রতিবন্ধকতাকে কখনোই পরোয়া করিনি।

আমার কথা হলো— মুসলমানদের প্রথম প্রজন্মে আধ্যাত্মিকতা সর্বমানবের মুক্তির জন্যে চর্চিত হতো। এরপর মুসলমানরা যখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল, তখন আধ্যাত্মিকতার চর্চা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যায়। শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি সুফিবাদের যেই সংজ্ঞা দিয়েছেন, অর্থাৎ আধ্যাত্মিকতা মানে আমিত্বকে জাগিয়ে তোলা, আর যখন মানুষের আমিত্ব জেগে ওঠে তখন সে কোনো রকমের ভয়ডর ছাড়া তার ওপর আপতিত সব অনাচার-অবিচার বীরবিক্রমে রুখে দেয়, তারপর নীতিহীন আদর্শ আর অন্যায় আইনের ভিত তীব্র আক্রমণে ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলে, অবশেষে গড়ে তোলে জীবনের নতুন বুনিয়াদ— এটাই প্রকৃত সংজ্ঞা। যদি এই কিসিমের আধ্যাত্মিকতাকে জনজীবনে প্রয়োগ ঘটাতে পারি তাহলে উপমহাদেশের ইতিহাস আবার গৌরবময় হয়ে উঠবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

  • 🙏💐❤🌺🌸

    • অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *