• December 4, 2021

গল্প হলেও সত্যি…

 গল্প হলেও সত্যি…

অভিষেক মুখার্জী

জগ্গা কাল রাতে মরতে গিয়েছিল।মরে নি যদিও।জেলের ভেতর জেল।তার নাম সেল।দশ ফুট বাই আট ফুটের ঘর। সিলিং অনেক উঁচুতে।হাত পৌঁছায় না।তাই সেলের দরজাতেই গামছার ফাঁস লাগিয়েছিল জগ্গা।জোড়বন্দী করে পা দুটোকে আগে বেঁধে।তারপর বসে পড়ে।নাক,মুখ দিয়ে দমকে দমকে যখন রক্ত বেরিয়ে আসছে এক সেপাইয়ের আচমকা চোখে পড়ে তখন।লাইফ-সেভিং করে এরপর ছেলেটাকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়।এখন ওখানেই।

জগ্গাকে যখন স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয় আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম।বোধহয় স্বপ্নও দেখছিলাম কিছু একটা। তাই সেলের মধ্যে অত চীৎকারেও আমার ঘুম ভাঙ্গে নি।আজ সকালে জগ্গা যাদের সাথে ঘুরত,সারাক্ষণ সময় কাটাতো,ওরই মত পাতাখোর তাদেরই একজনকে যখন একথা ওকথার পর জিজ্ঞেস করলাম ‘কেন মরতে গিয়েছিলো ও’?অদ্ভুত নিরাসক্ত মুখে সে জানালো বেঁচে থেকেই বা করতোটা কি?

জগ্গার সাথে প্রথম পরিচয় কিভাবে? সেলের মধ্যে পাতা,গাঁজার সাপ্লাই বন্ধ করার জন্য যখন ওকে বলি সেই সময়ে চেনা।মাঝারি হাইট,পাতলা চেহারা,চোয়াড়ে মুখ।আমার পরিচয় জানার পর আমায় কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সেদিন বলেছিলো, আপনাদের সাথে মশাই আমাদের অনেক মিল আছে জানেন।বললাম কিরকম?একটুও অবাক না হয়ে বললো ‘কেন, সিস্টেমের বাইরে গিয়ে আপনারা লড়াই করছেন,মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন,আর আমরা যে সিস্টেমের মধ্যে থেকে এতগুলো মানুষকে সোস্যাল সার্ভিস দিচ্ছি তার বেলা?হেসে ফেলেছিলাম সেদিন।

আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম এই যে ছেলেটা গাঁজা,পাতার ব্যবসা করে,বছর চব্বিশ,পঁচিশ বয়স,জেলের মধ্যে এত মানুষের রক্তস্রোতে শিরায় শিরায় বিষ ঢুকিয়ে চলেছে প্রতিদিন আর সে বিষের টাকায় সে তিনটে মোবাইল রাখে,নিজের কেসের উকিলের খরচ,খরচা চালায়,গরীব মাকে মাসে মাসে টাকা পাঠায়,সেপাই,জমাদারদের পকেটে ঢোকায় ৫০০,১০০০এর নোট ও কি মুহূর্তের জন্যও ভাবে যে খাবারটা আজ ও মুখে তুলছে সেটা কত লোকের রক্তে মাখা? বোধহয় না।নিজের মুখেই সেদিন বলেছিলো আপনাদের সাথে আমার তফাতটা কোথায় জানেন?আপনারা বড্ড বেশী চিন্তা করেন।আর আমি?পাগল হয়ে যাবো অত চিন্তা করলে।এই বেশ আছি।মস্তির জীবন।কোনো চাপ নেই।শালা গোলী মারো ভেজে মেঁ।

অথচ এই ছেলেটাই সেলে একজন বয়স্ক বন্দীর আচমকা হার্ট অ্যাটাকের সময় কিভাবে যে দৌড়োদৌড়ি করেছিল আমাদের সাথে সে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
জগ্গার ভালো নাম শাহজাদা।সম্ভবতঃ ও নিজেও ভুলে গেছে ওই নামটা।যাঁরা রেখেছিলেন নিশ্চয়ই অনেক স্বপ্ন ছিলো তাঁদের চোখে। আচ্ছা জগ্গা কি স্বপ্ন দেখতো? যেমন আমি দেখছিলাম।বোধহয় না।যে অন্ধকারের প্রাণী সারা জীবনে যদি সে একবারের জন্যও আলোর সন্ধান পায় নিশ্চয়ই সে মরতে চাইবে না।নিজেকে শেষ করে দিতে চাইবে না মশা মাছির মতন যে মশাও কিন্তু অন্ধকার সঙ্ঘারামে ভেসে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।
সন্ধের লক আপ হয়ে যাওয়ার পর একদিন হঠাৎ শুনি দূরের সেল থেকে গানের গলা ভেসে আসছে।কিশোর কুমারের গান …একবার ওয়ক্ত সে লমহাঁ গিরা কহীঁ।অদ্ভুত সুন্দর গলা ওর।একের পর এক গান গেয়ে যাচ্ছিলো।কি হয়েছিলো কে জানে? নিজের নিজের সেলের বন্ধ গরাদের মধ্যে আমরা সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত ওর গান শুনেছিলাম।
বেঁচে থেকেই বা করতোটা কি?ওর বন্ধুরা বলেছিলো।আচ্ছা কিছুই কি করতে পারতো না?জেলের ভাষায় জগ্গাদের বলা হয় লাতখোর।মানে অনেক লাথি খেয়েও যার বিকার নেই।কিন্তু কাদের লাথি,কাদের জুতোর তলায় পিষতে পিষতে শাহজাদার মত ছেলেরা জগ্গা হয়ে ওঠে?

অভিষেক মুখার্জী ঃ সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • শাহাজাদারা যাতে আরো সহজে জগ্গা হয়ে ওঠে সেই পথ আরো প্রশস্ত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *