• December 9, 2021

লখিমপুর খেরি-র কৃষক হত্যা এবং প্রসঙ্গত

 লখিমপুর খেরি-র কৃষক হত্যা এবং প্রসঙ্গত

অশোক চট্টোপাধ্যায়

দীর্ঘ দশ মাসাধিক কাল ধরে জারি রাখা কৃষকদের আন্দোলন কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে যে রীতিমতো অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে তা একদিকে এই আন্দোলনকে তাঁদের উপেক্ষা এবং একইসঙ্গে এই আন্দোলনকে জনস্বার্থবিরোধী হিসেবে দেগে দিয়ে তাকে রক্তাক্ত করার মতো দ্বৈত নীতির অনুশীলিত পদ্ধতির মধ্যেই প্রকট হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলনকে জনস্বার্থবিরোধী বলে তাঁদের চিহ্নিতকরণের অপপ্রয়াস সম্প্রতিকালের দেশের বিচারব্যবস্থার কাছে ন্যায্যতা পেয়েছে। দেশের সরকারের মতোই প্রায় একই পদ্ধতিতে বিচারব্যবস্থা এই কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্বরাস্ত্র প্রয়োগ শুরু করেছেন। এটা এক ভয়ঙ্কর বিপদের ইঙ্গিত। ন্যায্য একটি কৃষক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকার এবং বিচারব্যবস্থার যদি অভিন্ন স্বরাস্ত্র প্রয়োগ করতে থাকেন তবে অদূর ভবিষ্যতে এই সরকারের অপশাসন বিরোধী সমস্ত গণআন্দোলন এক বিষম নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে পারে।

গত রবিবার ৩ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরি-তে কৃষকদের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার যেভাবে এবং যে প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আক্রান্ত এবং রক্তাক্ত হয়েছে তা আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদের নগ্নরূপকে আরও একবার উলঙ্গ করে দিয়েছে। জিঘাংসা এবং রক্ততৃষায় কতখানি উন্মত্ত হলে তবে সরাসরি গাড়ির চাকায় প্রতিবাদকারী কৃষকদের পিষে মারা যেতে পারে, গুলি করে হত্যা করা যেতে পারে! উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর জনস্বার্থবিরোধী ভূমিকা এবং তাঁর অপকীর্তির বহর তো দেশের অন্য সব প্রদেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। তিনিই একসময় মুসলিম মহিলাদের কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করার নিদান দিয়েছিলেন! আর আমাদের দেশের দুই ফ্যাসিস্ত ‘মহারত্ন’ মোদি-শাহ তো অনবরত এই যোগীর প্রশংসায় অকৃপণতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা উত্তরপ্রদেশে যোগীতান্ত্রিকতার নগ্ন অনুশীলনকে অনুমোদনের শিলমোহর দিয়েছেন। ফলে যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই কৃষক আন্দোলন এবং বিক্ষোভকে যোগীর সরকার যে আদতে সুনজরে দেখেন না, তার প্রমাণ তো তাঁরা আগেই রেখেছেন। গত রবিবার এই মোদি-শাহ-যোগীর যুগলবন্দিত্বের নমুনা দেশ প্রত্যক্ষ করেছেন।

কেন্দ্রীয় তথা নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনি তো দিন দুই আগেই আন্দোলনকারী কৃষকদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে মাত্র দু’মিনিটেই তিনি তাঁদের ‘ঠাণ্ডা’ করে দিতে পারেন! আর এর অব্যবহিত পরেই সেই মন্ত্রীর ‘কৃতি’ সন্তান আশিস মিশ্র টেনি প্রকাশ্যে গাড়ির চাকায় পিষে মারলেন দুজন কৃষককে, গুলি করে মারা হলো আরও দুজন কৃষককে।পিতাপুত্র একযোগে অবশ্য তাঁদের এই অপকীর্তিকে অস্বীকার করেছেন। তবে বিভিন্ন ভিডিও চিত্র তাঁদের এই অস্বীকরণকে খারিজ করে দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে অবশ্য আন্দোলননকারী কৃষকরাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁরাও বেশ কিছু সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করেছেন। চৌরিচৌরায় এমনই এক কৃষক আন্দোলন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে স্বয়ং গান্ধিজি সেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন! এদিন অবশ্য এখানে কোনও গান্ধিজি ছিলেন না, তাই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিপ্রতীপে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

আন্দোলনকারী কৃষকরা তাঁদের শহিদ সহযোদ্ধাদের মৃতদেহ আগলে বসেছিলেন যতক্ষণ না সরকার তাঁদের প্রতি নতচিত্ত হয়। অবশেষে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানিয়েছেন যে ১) হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনও বিচারপতিকে দিয়ে ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত করা হবে ২) নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি এবং ৪৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে এবং ৩) আহতদের প্রত্যেকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি অবশেষে সরকারিভাবে ৮ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন সাংবাদিকও আছেন। এই সাংবাদিকের নাম রামন কাশ্যপ। তিনি ছিলেন ‘সাধনা নিউজ চ্যানেল’-এর সাংবাদিক। এই গণহত্যা সংঘটনে মূল অভিযুক্ত আশিস অবশ্য এই নিহত সাংবাদিককে তাঁদের দলীয় অর্থাৎ বিজেপি-র সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে এই হত্যার অভিযোগের তীর কৃষক-আন্দোলকারীদের দিকেই নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু সেই অপচেষ্টাও সফল হয়নি। নিহত সাংবাদিকের পিতা জানিয়েছেন রামন গাড়ির চাকায় কৃষকদের পিষ্ট হওয়ার ছবি তুলছিলেন, আর সেইসময় তাঁকে গুলি করে মারা হয়। সাংবাদিক রামনকে অবশ্যই এই কৃষকহত্যার ছবি তোলার ‘অপরাধে’ই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। স্বভাবতই এই অভিযোগের তীরও আশিসের দিকে নিক্ষিপ্ত হতে পারে জেনেই অজয় মিশ্র টেনির ‘সুপুত্র’ আশিস আগেভাগে তাঁকে তাঁদের দলীয় সদস্যের তকমা দিতে চেয়েছিলেন !

অন্যদিকে সংঘপরিবারের কৃষক সংগঠন ভারতীয় কিসান সংঘ (বিকেএস) অবশ্য দাবি করেছে যে লখিমপুর খেরি-তে গত রবিবারের এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার জন্যে কৃষকরা দায়ী নন। দায়ী হলেন কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এই আন্দোলনকারী কৃষকরা যেসব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, সেইসব রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা প্রচলিত ‘বামপন্থী ধারায়’ এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন। আরএসএস-এর অনুমোদনপ্রাপ্ত এই সংগঠনের তরফে আরও বলা হয়েছে যে এইসব রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা একদম পেশাদার খুনিদের মতোই এদিনের এই হত্যাকাণ্ড সংঘঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিল!—ফ্যাসিস্তদের প্রচলিত পদ্ধতিতেই আরএসএস তার কৃষক সংঠনের মাধ্যমে এমত প্রচারে আন্দোলনকারী কৃষকদের বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস পেলেও দীর্ঘ দশমাস ধরে রাস্তায় নেমে আন্দোলনকারীরা তাতে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হননি।

তবে রবিবার অর্থাৎ ৩ অক্টোবর গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার অব্যবহিত পরে আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা কৃষকদের এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে দিয়েছে। ভারত সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে ভেনুগোপাল জানিয়েছেন যে এক বিশাল সংখ্যক কৃষক সরকারের তিনটি কৃষি আইনের যৌক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যে আবেদন (পিটিশান) করেছেন তা এখন বিচারাধীন। ফলে বিষয়টি বিচারারাধীন থাকায় কৃষকদের এই প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে বিরত থাকা উচিৎ। এতদসত্ত্বেও লখিমপুর খেরি-তে এক ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে যার ফলে ৮ জনের মৃত্যু ঘটেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল-এর এই বক্তব্য শোনার পরই সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে নির্দিষ্ট ‘বেঞ্চ’ জানান : ‘এধরনের ঘটনার দায় কেউ নেন না; মৃত্যু এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের দায়দায়িত্বও কেউ নেন না’। সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট ‘বেঞ্চ’এর এই ব্যাখ্যার-অপেক্ষা-রাখা বক্তব্যের পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল বিচারকদের কাছে আবেদন করেন তাঁরা যেন বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনকারী কৃষকদের এই অনুশীলিত কাজকর্মের যৌক্তিকতা বিচার করে দেখেন ! আর এর পরেই সুপ্রিম কোর্ট অ্যাটর্নি জেনারেল-এর আবেদনের সূত্র ধরেই কৃষক ৪৩ টি সংগঠনের কাছে আলোচ্য কৃষি আইন তিনটি এখনো কার্যকরী না-হওয়া সত্ত্বেও, এই আইনগুলি দেড় বছর যাবৎ স্থগিতাদের অধীন থাকা সত্ত্বেও, কেন তাঁরা তাঁদের প্রতিবাদ আন্দোলন, রাস্তা অবরোধের মতো কাজগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে করে চলেছেন, তার কারণ জানাতে চেয়ে নোটিশ জারি করেছেন!—৩ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরি-তে কৃষকহত্যা সংঘটিত হওয়ার এবং উত্তরপ্রদেশ এবং দেশের কেন্দ্রীয় সরকার চরম অস্বস্তির মুখে পড়ার অব্যবহিত পরেই সুপ্রিম কোর্টের তরফে এই নোটিশ জারি অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী, সন্দেহ নেই।

অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সুপ্রিম কোর্ট সরকারের তিনটি কৃষি আইনের বিলোপসাধনের দাবিতে কৃষকদের দীর্ঘ দশমাসাধিক কালের আন্দোলন কীভাবে কোর্টের ‘বিচারাধীন’ হতে পারে এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই আন্দোলনকারী কৃষকদের যৌথমঞ্চ সংযুক্ত কিসান মোর্চা। এই সংগঠনের তরফ থেকে স্পষ্টভাবেই জানানো হয়েছে যে এই সংগঠন এব্যাপারে কখনো সুপ্রিম কোর্ট কিম্বা অন্য কোনও কোর্টে কোনও আবেদন জানায় নি। তাঁরা কৃষকস্বার্থবিরোধী এই তিনটি আইন বাতিলের দাবি যেমন সরকারের কাছে জানিয়েছেন তেমনই তাঁরা এব্যাপারে আবেদন জানিয়েছেন দেশের রাষ্ট্রপতিকেও। কোনও কোর্টের কাছে তাঁরা এব্যাপারে কোনও আবেদন জানান নি।সংযুক্ত কিসান মোর্চার তরফে ৯ জন নেতা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে স্থগিত আর বাতিল সমার্থক নয়। স্থগিত একসময় উঠে যেতে পারে এবং তা আবার কার্যকরী হতে পারে, তাই তাঁরা নিঃশর্তে এই কালাকানুন তিনটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করে চলেছেন।

আসলে রাজস্থানভিত্তিক একটি সংগঠন কিসান মহাপঞ্চায়েত একসময় যন্তরমন্তরে প্রতিবাদী আন্দোলন সংঘটনের ব্যাপারে অনুমতি চেয়ে রিট পিটিশান করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট এবং অ্যাটর্নি জেনারেল সেই পিটিশনকে ধরেই এতদিন পর এই আন্দোলন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ এই পিটিশান আন্দোলনকারী কৃষকদের যৌথমঞ্চের তরফে আদৌ করা হয়নি। আবেদনকারী কিসান মহাপঞ্চায়েত বস্তুত এই যৌথমঞ্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্টও ছিলনা। তারা একথাও জানিয়েছিল যে তারা এই আন্দোলনে নেই। ফলে তাঁদের তরফে কৃত আবেদনকে এই আন্দোলনকারী কৃষকদের আন্দোলন বলে একীভুত করে কৃষকদের ন্যায্য আন্দোলনের অধিকারকেই প্রশ্নাকীর্ণ করার প্রয়াস চলেছে। বিজেপি সরকারের কৃষকদের দাবি নস্যাৎকরণের প্রয়াসকেই এই ‘নোটিশ’ শক্তি যোগাবে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে কৃষকদের এই আন্দোলন দমনে সরকার আরও নির্মম দমনমূলক ভূমিকা নেবে এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সরকার চাইছে এইরকম কিছু ঘটনা সংঘটনের মাধ্যমে আন্দোলনকারী কৃষকদের প্রতিবাদকে হিংস্র করে তোলা, তাহলেই দমনমূলক আইন প্রয়োগ করে এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করা সরকারের পক্ষে সহজ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে এই আন্দোলনে মদতকারী রাজনৈতিক সংগঠনগুলির নেতৃত্বের অধিকাংশই দেশের সংবিধান, আইন ইত্যাদির প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যের জায়গা থেকে এই আন্দোলনের রাশ টেনে ধরতে পারেন। সব আন্দোলন সমসময় নিষ্পত্তিমূলক হয়না, সুতরাং একপা এগিয়ে চার পা পিছিয়ে আসাই ভবিষ্যৎ লড়াইয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ—এমন যুক্তিও সাড়ম্বর ঘোষণায় মূর্ত হতে পারে। এসবের ফলে এমন একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন একটি অনাকাঙ্কখিত বিয়োগান্তর পরিণতির শিকার হতে পারে।

স্বভাবতই ৩ অক্টোবরের কৃষকহত্যা সরকার তথা এই রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি সুপরিকল্পতি অনুশীলন বলেই মনে হয়। দেশের বিচারব্যবস্থার ভূমিকাও সরকারকে এব্যাপারে অকসিজেন সরবরাহ করতে পারে।

অশোক চট্টোপাধ্যায় : বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • বেশ ভালো লেখা ও তথ্যসমৃদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post