• December 9, 2021

জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে শত মিথ্যাচার থাকলেও বামেদের অবস্থান অবিস্মরণীয়

 জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে শত মিথ্যাচার থাকলেও বামেদের অবস্থান অবিস্মরণীয়

অত্রি ভট্টাচার্য

২০১৯-লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে ভারতবর্ষের দক্ষিণপন্থীদের ভোট একজোট হতে শুরু করেছে। ভারতবর্ষের রাজনীতির ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা-র মর্জির দিকে হেলে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে । আরএসএস-বিজেপির যৌথ প্রচেষ্টায় সাধারণ মানুষের কাছে নিত্যদিনের সমস্যাগুলি হয়ে উঠেছে অপ্রধান । বিশেষত পুলওয়ামা বিস্ফোরণের পরে জনমত সম্পূর্ণভাবেই উগ্র-জাতীয়তাবাদী প্রোপাগান্ডা দ্বারা পুষ্ট হয়েছিল । এবং রিপাবলিক টিভি , জি নিউজ ও আজ তকের মতো জনপ্রিয় নিউজচ্যানেলের অ্যাঙ্করেরা তখন সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের উন্মাদনায় থরথর করে কাঁপছেন । পরবর্তীতে এই ঘটনার উপর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘উরি’-তে অভিনেতা ভিকি কৌশলের সংলাপ ‘হাউ ইস দ্যা জোশ ‘ ধব্বনিত হয় পার্লামেন্টের ভিতরেও । এবং এই উগ্র-হিন্দুত্ববাদী ও জাতীয়বাদী প্রচারযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর ‘অতিমানব ‘ হিসাবে প্রজেকশন । আরএসএস সুকৌশলে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অবস্থানকে জনমানসে ভোটের স্বার্থে ‘মুসলিম পাকিস্তান’-এর সঙ্গে ‘হিন্দু ভারত’ -এর লড়াইয়ে পর্যবসিত করে । একটা কর্পোরেট-কমিউনাল জোট যা ‘দেশ’ -কে মানুষের অধিকারের উপরে স্থান দিতে শুরু করে এবং জাতীয়তাবাদের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারিত হয় যেকোন মূল্যে দেশের মানুষের মানবাধিকার হরণ । সেই পরিস্থিতিতে যখন বিশেষত সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন ও চলমান কৃষক আন্দোলনের মঞ্চে আমরা দেখি লালঝান্ডার পাশে অবস্থিত হচ্ছে তেরঙা পতাকা । আমরা বুঝি বামপন্থীদের দিকদর্শনের আকাশে ভারতবর্ষের মাটি থেকে উঠে আসা প্রতিরোধ ও বহুচর্চিত ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া ‘-র শরীর ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে ডানা মেলবে বলে । একটু বিস্তৃতভাবে যদি আলোচনা করি তবে আমরা দেখবো ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’-র সংশ্লিষ্টকরণে বামেদের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিকভাবে অনস্বীকার্য । শেষ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে জমির দাবীতে কৃষকদের বৃহত্তর আন্দোলনগুলির দিকে চোখ রাখা যাক: কেরালার পুনাপ্রা ভায়ালার অভ্যুথান , মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি অভ্যুত্থান, পশ্চিমবঙ্গে তেভাগা ও নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন , অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেঙ্গানা অভ্যুত্থান সবই সংগঠিত করেছিলেন বামেরাই । এবং এই আন্দোলনগুলি কৃষকের নিজস্ব জমির অধিকার, সামন্ততন্ত্র-বিরোধীতায় রাজ্যে রাজ্যে ভূমি সংস্কারের প্রশ্নের বীজ চিরকালের জন্য ভারতবর্ষের মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল । যা পরবর্তীতে জমিদারী-ব্যবস্থার বিলোপ ও ভারতীয় মধ্যবর্গের উত্থানের একরকম সূচক বলা যেতে পারে । বহুকষ্টে অর্জিত কৃষকের সেই স্বায়ত্তশাসন আজ আবার এনডিএ-সরকারের কল্যাণে কর্পোরেট দাসত্বের দিকে মোড় নিচ্ছে । দ্বিতীয় প্রতর্কটি উঠে আসছে ‘আজাদি’ -স্লোগানটি ঘিরে । এটা সত্যিই যে ভারতবর্ষের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার পর অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির স্লোগান ছিল খানিক এরকম – যতদিন এদেশের দরিদ্র জনতা ক্ষুধার্ত থাকবে ততদিন এই তথাকথিত স্বাধীনতা মিথ্যেই হয়ে থেকে যাবে । মনে রাখতে হবে তখন বিশ্বসংসারে ‘সোভিয়েত রাশিয়া’ নামক একটি রাষ্ট্র ছিল , ছিল বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশকে সমাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করবার বিপ্লবী স্বপ্ন । আর ছিল পিঠে দেশভাগের ভয়াবহ ছুরিকাঘাত । গান্ধীহত্যার অভিশাপ । সমস্ত চরাচর জুড়ে বাস্তুহারা মানুষদের অনন্ত কান্না । সেই সময়ে সেই পরিপ্রেক্ষিতে সংগ্রামী – মেহনতি জনতার পাশে দাঁড়িয়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায় ‘ স্লোগান যথাযথ ছিল বলেই মনে করি । অবশ্য কর্পোরেট- চাঁদায় চলা আজকের ভারতীয় রাজনীতির ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ‘ভুখ’ ও ‘আজাদি’-র এই আন্তঃসম্পর্ক ঢুকবেনা । আজকের দেশপ্রেমিক আরএসএস ও বিজেপি তখন সেই স্বাধীনতার পুণ্যলগ্নে যা করছিলেন তা হল- ঠিক ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট আরএসএসের মুখপত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় লেখা হয়েছে:

“যে সমস্ত মানুষজন ভাগ্যের ফেরে ক্ষমতায় এসেছে তারা আমাদের হাতে তেরঙা পতাকা ধরিয়ে দিতেই পারে কিন্তু সেটা কোনদিনই হিন্দুদের দ্বারা গৃহীত বা সম্মানিত হবেনা। ‘তিন’ এই শব্দটা নিজেই একটি অশুভ শব্দ এবং একটি পতাকা যা তিনরঙা নিঃসন্দেহে খুবই খারাপ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে ও দেশের জন্য ক্ষতিকারক সাব্যস্ত হয়। “

আরএসএসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল গোটা দেশেরই
তাদের গেরুয়া পতাকার নীচে মাথা নত করা উচিত :

“ একমাত্র এই গেরুয়া পতাকাই পুরোপুরিভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে পারতো । এটাই ছিল ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি । আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি শেষপর্যন্ত সমস্ত দেশ এই গেরুয়া-ধ্বজার সামনে মাথা নিচু করবে।”

(এম এস গোলওয়ালকর, শ্রী গুরুজি সমগ্র দর্শন, নাগপুর, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ৯৮)

আরএসএসের তাত্ত্বিক ভিত্তির জনক সাভারকর ত্রিবর্ণ পতাকার বিরোধী ছিলেন :

“এই তেরঙাকে কখনোই ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা হিসাবে স্বীকৃত করা হবেনা। হিন্দুস্থান আমাদের মাতৃভূমি তথা পুণ্যভূমির প্রামাণ্য পতাকা ভাগওয়া(গেরুয়া পতাকা) ছাড়া অন্য কিছু হতে পারেনা। হিন্দুত্ব যেকোন মূল্যে অনুগতভাবে প্রণাম করবে
এই সামগ্রিক-হিন্দুধ্বজা, এই গেরুয়া পতাকাকে নিজের জাতীয় মানদন্ডে; অন্য কোনো পতাকাকে নয়”

(এস.এস সাভারকর সম্পাদিত , হিস্টোরিক স্টেটমেন্টস বাই বীর সাভারকর (১৯৬৭) ,পৃষ্ঠা ১২৭)

২০০২ সালের ২৬শে জানুয়ারি আরএসএসের নাগপুর দপ্তরে সর্বপ্রথম তেরঙা পতাকা উত্তোলিত হয় । এর আগে ৫২ বছর স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা এই ‘দেশপ্রেমিক’ সংগঠন ও তাদের নেতারা নিজেদের কার্যালয়ে উত্তোলিত করতে অপ্রস্তুত ছিলেন ।

আরএসএস নেতা গোলওয়ালকরের মত ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদদের কখনোই সমাজের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয় ; তিনি বলছেন :

“ … . . আমরা এদের শাহাদতকে সেরকম মহানুভবতার সর্বোচ্চ স্তর মনেই করিনা যাকে মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিষয় বানানো উচিত । কারণ শেষপর্যন্ত তারা নিজেদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ব্যর্থতা তাদের মারাত্মক ত্রুটিগুলোর উপরেই বর্তায় । “

( গোলওয়ালকর, বাঞ্চ অফ থটস , পৃষ্ঠা ২৮৩ )

আরও বলছেন ; “কিন্তু একজনের নিশ্চয়ই ভাবা উচিত যে আদৌ এসবের দ্বারা সম্পূর্ণ জাতীয় স্বার্থ সম্পূর্ণ হয় কি?ত্যাগ কখনোই রাষ্ট্রের স্বার্থে সমাজকে সমস্ত কিছু দিয়ে দেবার ভাবনাকে বাড়ায়না। এখনো অবধি পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায়; হৃদয়ের এই আগুন সাধারণ মানুষের কাছে অসহনীয় “

(গোলওয়ালকর, শ্রী গুরুজি সমগ্র দর্শন নাগপুর,প্রথম খন্ড পৃষ্ঠা ৬১-৬২)

যাইহোক , ফিরে আসা যাক মহামহিম নরেন্দ্র মোদীর ভারতবর্ষে । আবার বিতর্কিত ‘আজাদি’-র শ্লোগান । এবারেও অভিযোগ ‘দেশদ্রোহী’ বামেদের দিকে । জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদে মদত দিচ্ছে । সেই তরীও তীরে এসে ডুবেছিল । সারা ভারতে ছড়িয়ে গিয়েছিল- ক্ষুধা,দারিদ্র্য ও ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে ‘আজাদি’-র স্লোগান । কাজেই স্বঘোষিত দেশপ্রেমিকেরা ও কর্পোরেটধন্য – প্রতিষ্ঠান যতই বামেদের ‘দেশপ্রেম’ নিয়ে মিথ্যাচার করুন । আমাদের পক্ষে আছে চট্টগ্রামের দামাল ছেলেমেয়েরা- কল্পনা দত্ত, গণেশ ঘোষ , অনন্ত সিংহেরা । আমাদের মিছিলের সামনে আছে ফাঁসির আগে লেনিনের ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ পড়তে থাকা ভগৎ সিং। থাকবেন কমরেড ইলা মিত্রের নেতৃত্বে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির মেয়েরা । আছেন কমরেড অরুণা আসফ আলি ও তার অপ্রতিরোধ্য নৌবহর । আজও ভারতরাষ্ট্র ভয় পায় কমিউনিস্টদের । তাই বি-গ্রেড ফিল্মমেকার লেলিয়ে লিখতে হয় ‘আরবান নকশাল ‘ প্রকল্প । হ্যাঁ রাজনৈতিক ভাবে অপ্রাসঙ্গিক বামেদের জন্যই এখনো এসব করতে হয়। কারণ তাদের ডাকে লাল ঝান্ডা কাঁধে এখনো কৃষকেরা জমির দাবীতে রাজপথে এসে দাঁড়ায় । কে আটকাবে? কাকে আটকাবে? আজাদি এদেশের মানুষের জন্মগত অধিকার। না দিলে তারা ছিনিয়ে নেবেন ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post