• December 4, 2021

বিপ্লবী কবি চেরাবান্ডারাজু

 বিপ্লবী কবি চেরাবান্ডারাজু

শুভনাথ

কবিতা! আশ্চর্য ভাবে কিছু শব্দপিণ্ড জাগিয়ে তোলে মনের আবেগ। কবিতা প্রেমের হতে পারে, হাসির হতে পারে আবার হতে পারে বিদ্রোহের। বিদ্রোহের কবিতা জন্ম নেয় কবির জীবন ও তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তবে আমাদের এই তৃতীয় বিশ্বের দেশে লেখকদের জীবন দুর্বিষহ! কারণ এই তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ জনগন ভাবতেও সঙ্কোচ বোধ করেন যে কোন মানুষের পেশা লেখালিখি হতে পারে। তবু দিন বদলের স্বপ্ন দেখে বহু কবি তাদের জীবন উৎসর্গ করে দিতে ঝাঁপিয়ে পরে শব্দ পিণ্ড দিয়ে হাজার বছর ধরে বন্দি শ্রমকে মুক্ত করতে। পুঁজির জাঁতাকলে বন্দি শ্রমিক, কৃষক, মেহেনতি জনতার মনে শেকল ভাঙার আগুন ছড়িয়ে দিতে। আর এই আগুন ছড়িয়ে দিতে গিয়ে কবিদের পুড়ে যেতে হয় রাষ্ট্রীয় রোষে। তিল তিল করে রাষ্ট্র মেরে ফেলে এই সব কবিদের। শুধু কবি বললে ভুল হবে। সংগ্রামী লড়াকু কবিদের। এমনি একজন ভারতীয় কবি হলেন চেরাবান্ডারাজু।

১৯৭৯ সাল , দুই বার মস্তিষ্কে টিউমার অপারেশন হয়েছে চেরাবান্ডারাজুর। দ্বিতীয়বার অপারেশন হবার পর তার ডান চোখের দৃষ্টি শক্তি প্রায় হারিয়ে গেছে। অন্যদিকে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে আকণ্ঠ দারিদ্রতায় ডুবে আছেন তার স্ত্রী। প্রতীক্ষা করে চলেছেন স্বামীর সুস্থ হয়ে ওঠার। কিন্তু চেরাবান্ডারাজু আর সুস্থ হয়ে উঠলেন না! ২ জুলাই ১৯৮২ তার মৃত্যুর কোলে ঢলে পরলেন। সাধারণ ভাবে তার মৃত্যু শারীরিক সমস্যার কারণে হলেও একটু গভীরে গিয়ে দেখলে দেখা যায় রাষ্ট্র তাঁকে খুন করে। তিলে তিলে খুন করেছে।

অন্ধ্রপ্রদেশের বিপ্লবী কবি চেরাবান্ডারাজু জন্মে ছিলেন হায়দ্রাবাদ থেকে ৩০ মাইল দূরে অঙ্কুশপুর নামক গ্রামে এক গরীব চাষির পরিবারে। জন্মসূত্রে তার নাম বি.ভাস্কর রেড্ডি। গ্রামের স্কুলে তার প্রথম শিক্ষা। তারপরে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি দেন হায়দ্রাবাদ শহরে। ‘প্রাচ্য ভাষা’ নিয়ে পড়াশুনা মধ্যমেধার চেরাবান্ডারাজুকে করে তোলে তেলেগু ভাষার এক সাবেকি কবি। এই সময় তার পরিচয় হয় যাদব রেড্ডির সাথে। যিনি অন্ধ্রের ‘দিগম্বর’ কবি গোষ্ঠীর এক কবি ছিলেন। ‘দিগম্বর’ পত্রিকায় যিনি নিখিলেশ্বর ছদ্ম নামে লিখতেন। ১৯৬৫ সালে ৫ জন কবি তৈরি করে ‘দিগম্বর’ গোষ্ঠী। মার্কিন ‘বিট’, ইংরেজ ‘রাগি ছোকরা’,বাংলার ‘ হাংরি’ ধাঁচা ও ভাবনা চিন্তায় কিছুটা এক ছিল ‘দিগম্বর’। এই ‘দিগম্বর’ গোষ্ঠীর লেখায় ছিল জীবন সম্পর্কে রাগ, বিরক্তি ও হতাশা। কিন্তু সুস্পষ্ট লক্ষ না থাকায় ও বিশ্লেষণমূলক মূল্যায়নের অভাবে পরবর্তী সময়ে এই গোষ্ঠী ক্রমে সংকীর্ণ হয়ে পরে। কিন্তু ‘দিগম্বর’ গোষ্ঠীর নতুন কবি চেরাবান্ডারাজু নিজের লেখার স্বাতন্ত্র্য পরিচয় নিয়ে সকলের কাছে পরিচিত হতে থাকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে ঘটে গেল ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ মহান নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলন। যার আগুন গিয়ে পড়লো অন্ধ্রপ্রদেশে। লেখকশিল্পীদের একটা বড় অংশ সাড়া দিলেন কমরেড চারু মাজুমদারের ডাকে। এক বিদ্রোহে নবজাগরণ ঘটলো ভারতীয় সাহিত্যে ও শিল্পকলায়। ১৯৭০ সালে তৈরি হল ‘বিপ্লব রচয়িতাল সংঘম’ যার সংক্ষিপ্ত নাম ‘বিরসম’। এই ‘বিরসম’ এ যুক্ত হলেন চেরাবান্ডারাজু। বদলে গেলো তার লেখার ধরন। ‘দিগম্বর’ ছেড়ে ‘বিরসম’এ যুক্ত হয় আর কয়েক জন কবি। তবে চেরাবান্ডারাজুর বিপ্লবী কবিতা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কবি কবিতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলে নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের মশাল। বিভিন্ন জনসমাবেশে তিনি আবৃত্তি করে শোনাতে থাকে তার রচিত কবিতা গুলো। তার কবিতা তরুণ বিপ্লবীদের মনে মুক্তির বীজ বপন করতে থাকে। লিখতে শুরু করে গান। পরবর্তী অংশে তিনি উপন্যাস ও লেখেন। যেহেতু তিনি সাধারণ এক লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মহান নাকশালবাড়ি আন্দোলনের যোদ্ধা তাই শুরু হয় তার উপর রাষ্ট্রব্যবস্থার অত্যাচার। ১৯৭১ সালে চেরাবান্ডারাজু, জ্বালামুখী, নিখিলেশ্বরকে (জ্বালামুখী, নিখিলেশ্বর দুজনে ‘দিগম্বর’ ছেড়ে ‘বিরসম’-এ যোগ দিয়েছিলেন) গ্রেপ্তার করে অন্ধ্র পুলিশ। তাদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তাদের সমস্থ বইপত্র নিয়ে চলে যায় পুলিশ। দুমাস হাজত বাসের পর হাইকোর্টের নির্দেশে মুক্তি পায় তারা। আবার ১৯৭৩ সালে ভারভারা রাও, এম.টি খান ও চেরাবান্ডারাজুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে তারা মুক্তি পাই। ১৯৭৪ সালে আবার ‘সেকেন্দ্রাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা’ রুজু করে ভারভারা রাও, এম. টি. খান, কে. ভি রমানা রেড্ডি, চেরাবান্ডারাজু, টি. মধুসূদন রাও, রঙ্গনাথমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই মামলার জন্য চেরাবান্ডারাজুকে সাময়িক ভাবে তার শিক্ষকতার কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে পরে জামিনে ছাড়া পাই তারা। কিন্তু তার শিক্ষকপদ ফিরে পাননি তিনি। ১৯৭২-৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘বিরসম’ পত্রিকার সম্পাদক তাই হয়তো তার শিক্ষকপদ হারিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু তার মুক্তি মেলেনি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত চলেছিল সেই মামলা। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় বিশ্ব তেলেগু সম্মেলনের সময় ‘বিরসম’ এর ৩৫ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার মধ্যে ছিলেন চেরাবান্ডারাজু। ১৯৭৭ সালে শিক্ষামন্ত্রক তার উপর থেকে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করলেও কিছুদিন পরে ডি.আই.জি-এর নির্দেশে শিক্ষকপদ থেকে সাময়িক ভাবে অপসারণ করে স্কুল কতৃপক্ষ। কিন্তু ২২শে মার্চ ১৯৭৭ অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল তার সাংবিধানিক বল প্রয়োগ করে স্থায়ী ভাবে শিক্ষকপদ থেকে অপসারণ করে চেরাবান্ডারাজুকে। তার সাথে সাথে স্থায়ী ভাবে অপসারণ করা হয় আর একজন বিপ্লবী কবি লোচন’কে। কিন্তু পরে অন্ধ্রের হাইকোর্টের নির্দেশে তাদের বরখাস্তের আদেশ নাকচ করা হয়।

গরীব চাষা ঘরের কবি দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকার ফলে ভুগতে থাকে অর্থহীনতায় তার সাথে সাথে কবিকে গ্রাস করে তার শারীরিক অসুস্থতা। তার কর্মহীন জীবন তৈরি করেছিলো এই রাষ্ট্র যা ঠেলে দিয়েছিলো কবিকে দারিদ্রতার দিকে। আর সেই দারিদ্রতা ফলে ঠিকমত চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলেন কবি। কিন্তু তবু এক মুহূর্তের জন্য আপোষ করেনি রাষ্ট্রের সাথে। দারিদ্রতায় ও রোগে আছন্ন কবির মুখ থেকে কখনো ফ্যকাসে হয়ে যায়নি হাসি ও আনন্দ। রাষ্ট্র তিলে তিলে হত্যা করেছে কবি চেরাবান্ডারাজুকে। কিন্তু বিল্পবের বীজ তার কবিতার শব্দে শব্দে বপন করা আছে যা আজও হাজার হাজার তরুণ-তরুণীদের মুক্তির পথে যোদ্ধা হয়ে উঠতে তালিম দিয়ে চলেছে।

কবির চিকিৎসার জন্য ১৯৮০ সালে কলকাতার কিছু কবি তার কবিতা বাংলাতে অনুবাদ করে ‘ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলোয়ার’ বলে একখানা বই প্রকাশ করেন। যা দুমাসে প্রায় ২০০০ কপি বিক্রি হয় এবং তার অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয় কবির চিকিৎসার কাজে। সেই সময় কবির চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নাটক করে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন ‘চারণদল’, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও তার ‘মাস সিঙ্গার্স’ গান ও গেয়েছিলেন কবির চিকিৎসার খরচ সংগ্রহের জন্য। তবুও রাষ্ট্রীয় হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে লড়াকু বিপ্লবী কবিকে বাঁচানো যায়নি। তবে কবির কবিতা বেঁচে থাকবে যতদিন পৃথিবীতে শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতের লড়াই জারি থাকবে।

লেখক পরিচিতি – লেখক ও গণআন্দোলন কর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *