• December 9, 2021

পিতৃতন্ত্র , নারীবাদ ও নারীদের ভূমিকা

 পিতৃতন্ত্র , নারীবাদ ও নারীদের ভূমিকা

দেবমিতা ব্যানার্জী

সমাজে পিতৃতন্ত্রের বিকাশ এবং ক্রমবিবর্তন :-
সমাজে পিতৃতন্ত্র বা patriarchy নামক বহুল প্রচলিত শব্দটির প্রাথমিক ভিত্তি হল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা, সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মাচরণের ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব এবং প্রাধান্য স্থাপন। ঐতিহাসিকভাবে patriarchy শব্দটির মাধ্যমে পুরুষ প্রধানের স্বৈরাচারী শাসনকে বোঝানো হলেও যুগের ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে তা বর্তমানে এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে সমস্তরকম সামাজিক ক্ষমতা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।।
মার্ক্সবাদের সূত্র ধরে বলা যায়, পিতৃতন্ত্র এসেছে নারী ও পুরুষের প্রাথমিক শ্রমবিভাগ থেকে,যেখানে মেয়েরা বাড়ির কাজের দায়িত্ব পালন করতেন এবং পুরুষেরা কৃষিকাজের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব পালন করতেন। পুঁজিবাদের বিকাশ এবং মুদ্রায়ন নারী ও পুরুষের কাজের ধরনের পার্থক্য সৃষ্টি করলে পিতৃতন্ত্র প্রাথমিকভাবে বিকাশ লাভ করে। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বা প্লেটোর পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বাসব্যবস্থা যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাহিত হয়েছে, এবং পরবর্তীতে সমাজে পিতৃতন্ত্রের ভিতকে আরো শক্ত করেছে । পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্ধ ( মনুসংহিতা) বা কোরান ইত্যাদিতে নারীদের ” পুরুষের অধস্তন এবং ভোগবাসনার সামগ্রী ” হিসাবে দেখানো হয়েছে। যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা সেই ধর্মবিশ্বাস পুরুষতন্ত্রের বিকাশের পথকে আরো সুগম করেছে।
পিতৃতন্ত্র কেবলমাত্র বিভিন্ন ব্যক্তির লিঙ্গবাদ নয়,প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের সাথে সমানভাবে সম্পর্কিত। যেখানে পুরুষেরা বাইরের জগতের সাথে পরিচিত হচ্ছে এবং মহিলাদের একরকমভাবে গৃহপালিত চরিত্র হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এই বৈষম্যমূলক অবস্থা থেকেই পরবর্তীতে মহিলাদের ওপর নির্যাতন, প্ররোচনা, নারীকে পণ্য হিসাবে গণ্য করা এবং যার অন্তিম ভয়ঙ্কর রূপ হিসাবে দেখা দিয়েছে ধর্ষণ। পিতৃতন্ত্রের বিকাশের সময় থেকে শুরু করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্রমবিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বর্তমানে একটি অন্যতম ব্যাধি হয়ে দাড়িয়েছে ।
পিতৃতন্ত্রের বাড়বাড়ন্তে মহিলাদের ভূমিকা কতখানি ?

মহিলারা পিতৃতন্ত্রের প্রধান শিকার হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মহিলারাই পিতৃতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়ে ওঠেন। বছরের পর বছর ধরে বাড়ির মহিলারা পুরুষতান্ত্রিক পরিবারে থাকতে থাকতে নিজেদের অজান্তেই পিতৃতান্ত্রিক নিয়মে আঁটকে পড়ে যান এবং নিয়মগুলি তাদের মনোজগতে এতটাই দৃঢ়ভাবে গেঁথে যায় যে, সাধারণ নিয়মবিচ্যুতিকেই তারা অস্বাভাবিক এবং পরিবারের প্রতি অমঙ্গলজনক হিসাবে মনে করতে থাকেন।
শিশুমনের বিকাশের প্রাথমিক ধাপই শুরু হয় বাড়ি থেকে, সেখানে দেখা যায় বাড়ির মায়েরা মেয়েদের একটু বড় হওয়া থেকেই তার চলাফেরা, পোশাক- আসাক, বা আচরণ বিষয়ে নানান বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকেন, পক্ষান্তরে পুরুষ সন্তানদের ক্ষেত্রে সেই একই নিয়ম লাগু করা হয় না । ফলে শৈশবকাল থেকেই পরিবারের মধ্যের এই লিঙ্গবৈষম্য ভবিষ্যতে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের মনোজগতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
পিতৃতন্ত্রের বিকাশে নারীদের ভূমিকা ঠিক কতখানি সেই প্রসঙ্গে বলা যায়, মহিলাদেরকেই, মহিলাদের বিরুদ্ধে চালিত করাই বতর্মান প্রবনতা। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় একটি ‘ Trend ‘ এখন দেখা যায় — অলিম্পিকে পদকধারী মহিলা ক্রীড়াবিদ বা সৈনিকদের ছবির পাশে ‘ইহা নারীবাদ’ এবং কোন স্বাধীনচেতা অভিনেত্রীর চারিত্রিক দোষ, বহুগামিতা ইত্যাদিকে হাতিয়ার করে তার সাফল্যকে খাটো করে ‘ ইহা নারীবাদ নয় ‘ এরূপ প্রচার চালানো হয়। বাস্তবিকে ওই উভয় নারীই যারা পিতৃতন্ত্রের বাঁধা কাটিয়ে সমাজে সাফল্যের মুখ দেখেছেন তারা প্রত্যেকেই সাফল্যের কান্ডারী।
নারী শিক্ষিত, স্বাবলম্বী, কমর্জীবী হলেও অনেকক্ষেত্রে তারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থাকে অস্বীকার করতে পারে না, বরং নারীর সামনে নারীই ক্ষেত্রবিশেষে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। অশিক্ষিত, পিছিয়ে পড়া নারীদের মতো তারাও পোশাক, চালচলনকে ধর্ষণের কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করতে থাকেন, বাড়িতে শাশুড়ীদের দ্বারা বধু নিযার্তিত হয় – বিভিন্ন বাংলা ‘সিরিয়ালে’ সারাদিন সেই দৃশ্য দেখানো হয় যা মহিলাদের মননের ওপর প্রভাব ফেলে , অফিসে মহিলা সহকর্মীর সাফল্যে তার সহকর্মীদেরই নোংরা ইঙ্গিত করতে দেখা যায়, কোন অভিনেত্রীর একবারের বেশি দুইবার বিয়ে ভাঙলে তার চারিত্রিক দোষ খুঁজতে এসে পড়ে সমাজের ‘ শিক্ষিত ‘ মহিলারা। এইরূপ আরো অজস্র দৃশ্যের সম্মুখীন আমাদের প্রতিনিয়ত হতে হয় ।
প্রকৃতপক্ষে এই উপসংহারে অনায়াসে আসা যায় যে নারীকে নারীদের বিরূদ্ধে চালিত করাই হল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র।
পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীবাদ:-

নারীবাদের ধারণার উৎস খুঁজতে হলে যেতে হবে উনিশ শতকের শুরুতে। ইউটোপীয় সমাজবাদী চার্লস ফুরিয়েকে ‘নারীবাদের’ প্রবক্তা বলে ধারণা করা হয়। উনিশ শতকের শুরুতে নারীবাদের প্রথম ঢেউ হিসাবে, সম্পত্তিতে সমান অধিকার, রাজনৈতিক ভোটাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয় হিসাবে উঠে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীতে বহু পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যুদ্ধের জন্য বাইরে যান বা যুদ্ধে নিহত হন। সেই পর্বে বাড়ির মহিলাদের ওপরই সংসার নিয়ন্ত্রণের ভার চলে আসে। বিশ শতকের শেষ এবং একুশ শতকের শুরুতে নারীবাদের তৃতীয় ঢেউ এর ছোঁয়া লাগে। আধুনিক নারীবাদ এই সময়ে জাতি ও সামাজিক স্তরভেদে সকল নারীর সমান অধিকার, যৌনতার স্বাধীনতা, সমকামী নারী এবং তৃতীয়লিঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে পরিণত হয়।
এবার আসা যাক নারীবাদের গুরুত্ব কতখানি। পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে শক্তি হিসাবে নারীবাদ কে ব্যাখ্যা করা যায়। যেখানে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বেশিরভাগ আসে নারীশ্রমশক্তির মাধ্যমে, সেখানে নারী স্বাধীনতা ও নারীমুক্তির প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতখানি তা সহজেই অনুমেয়। শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী নারীর সংখ্যা যত বাড়বে দেশ ও জাতির অর্থনীতিও তত চাঙ্গা হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাজে নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কন্যাভ্রুণ হত্যার হার এবং জনসংখ্যাবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে। নারীদের শিক্ষার আলোকে আনতে পারলে, যুগ যুগ ধরে তাদের মধ্যে পিতৃতন্ত্রের ফলে তৈরি হওয়া সংস্কার দূর হবে এবং এভাবেই নারীবাদের প্রকৃত জয় সম্ভব।
বর্তমানে ‘নারীবাদ’ মানেই প্রকাশ্যে ‘ধূমপান’, ‘ছোটো পোশাক’, ‘অবাধ যৌনতা’ এই কথাগুলি সমাজে এতটাই ছড়িয়েছে যে ‘নারীবাদের’ প্রকৃত উদ্দেশ্যের প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক – তা নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কিন্তু কোনো নারীকে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখলে সমাজে হইচই পড়ে যায়, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ‘ইগো’তে আঘাত লাগে। ছোটো পোশাক পরে যদি কোনো নারী তার স্বাধীনতা ব্যক্ত করতে চায় তা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ‘শাড়ি বা হিজাব’ পড়া মহিলারা প্রকৃত ‘নারীবাদী’ হলে ‘আধুনিক পোশাক পরিহিত’ স্বাধীনচেতা মহিলারাও ‘নারীবাদের’ অংশ। নারীবাদ প্রকৃতপক্ষে পুরুষের থেকে নারীর অগ্রাধিকার নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল লিঙ্গের মানুষের সমান মৌলিক অধিকার (Equalism) এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং নারীরাই সেই আন্দোলনের কান্ডারী। তাই পরস্পরের প্রতি বিরোধিতা নয়, সমাজের সকল স্তরের নারীর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই পিতৃতন্ত্রের এই বেড়াজাল ভাঙা সম্ভব। নারীবাদ ‘মাতৃতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে না, বলে সমাজের সকল মানুষের সমান অধিকারের কথা, তাই কোথাও কখনো নারীবাদের ভুল ব্যাখ্যার সম্মুখীন হলে তা মুখ বুজে মেনে না নিয়ে আমরা যেন তার প্রতিবাদ করি — এটাই কাম্য ।।

দেবমিতা ব্যানার্জী,স্নাতক তৃতীয় বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, শিক্ষাভবন, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *