• December 4, 2021

|| জাগিয়ে দাও ||

 || জাগিয়ে দাও ||

রঙ্গন রায়

কেউ যখন কোনো নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তখন লোকে সেটা চট করে গ্রহণ করেনা , হেসে উড়িয়ে দেয়। যখন দ্বিতীয়বার সে সেই কথা বলতে আসে তখন লোকে তাকে পাগল বলে। সে তৃতীয়বার বলতে চাইলে লোকে খুব রেগে যায় , তাকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। সঙ্গত ভাবেই পাগল কে তো এড়িয়েই চলতে হয়! এরপর চতুর্থবার যখন সে সেই নতুন মত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরোও উঠে পড়ে লাগে বা বলা যায় নতুন কথা বলাটাই তার অভ্যাস হয়ে যায় , সে সেই মত কে বিশ্বাস করে এবং চায় যুক্তি দিয়ে মানুষকে তা বিশ্বাস করাতে তখন লোকেরা প্রচন্ড রেগে যায়। তারা আর মুখে কিছু বলেনা , সরাসরি হাত চালিয়ে দেয় গায়ে। এরপর সেই নতুন কথা বলতে চাওয়া মানুষটির একদিন বয়স হয়ে যায়। সে মারাও যায়। তার ছবিতে মালা টাঙানো হয়। দুইবেলা নকুলদানা দেওয়া হয়। সেই নকুলদানায় পিঁপড়াও লাগে। তখন মানুষ সেই লোকটিকে আস্তে আস্তে বিশ্বাস করতে চায় , তার যুক্তিকে বুঝতে চায় , তার কাজ কে অনুধাবন করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে হইহই লাগিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে এখানে কোপারনিকাস কিংবা জীবনানন্দ দাশের কথাও বলা যেতে পারে। যদিও তাঁদের ছবির সামনে নকুলদানা দেওয়া হত কি না এবং সেই নকুলদানায় পিঁপড়া লাগতো কি না তা নিয়ে গবেষণা করা বাতুলতা।
এবার এই সময়ে দাঁড়িয়ে , আমাদের এই দেশে দাঁড়িয়ে আমি বা আপনি যদি নতুন একটা কথা বলতে চাই , একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তি সহকারে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই তাহলে লোকে অবশ্যই বলবে , “হাতি ঘোড়া গেলো তল , মশা বলে কত জল।” এখন আবার ডেঙ্গু মশা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সীমা সংখ্যা নেই , কাজেই এক কথায় আপনার কথা ব্রাত্য হয়ে যাবে।
তাহলে কোনো উপায়ই কি নেই? আছে। আপনি প্রথমে বলুন যে পৃথিবীতে “ভূতের’ অস্তিত্ব আছে। এবার লোকজন আপনাকে যে হারে তুলোধোনা করবে তাতে আপনি নিজেই ভূত হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারেন। কিছুদিন আগেই দূরদর্শনের একটা বিশেষ চ্যানেলের একটি বিখ্যাত অনুষ্ঠানে এই ঘটনা নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। গাধারা জল ঘোলা করে ঠিকই কিন্তু মানুষতো আর গাধা নয়! সেই ‘ভূতান্বেষী’ মেয়েটিকে যেভাবে ট্রোল করা হয়েছিল , আপনিও সেরকম ট্রোল হয়ে যাবেন। কিন্তু এইবার আপনি যদি এখনই একজন পাশ্চাত্য পন্ডিতের নাম উল্লেখ করে বলেন ‘স্যর অলিভার লজ’ বলেছেন যে বিশ্ব চরাচরের অজস্র মন্ডলের মধ্যে লক্ষ লক্ষ ভূতের অস্তিত্ব বিদ্যমান , আত্মার অস্তিত্ব বিদ্যমান ; তখন মানুষ একটু হলেও হকচকাবে। আপনার কথা বিশ্বাসও করে ফেলতে পারে। কারণ আপনি তো পাশ্চাত্য পন্ডিতের ব্যাখা সহকারে প্রমাণ করছেন! কাজেই এর থেকে ভূতের অস্তিত্ব প্রমাণিত না হলেও এটা অবশ্যই প্রমাণ হয় মানুষ আমাকে আপনাকে বিশ্বাস করেনা , কিন্তু পাশ্চাত্যকে করে।
ভূতের অস্তিত্ব যে নেই তা বস্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে ঠিকই কিন্তু মানুষের এই দ্বিচারি স্বভাবকে কে শুধরোবে? এখন আপনি বলবেন , কেন? শিক্ষা ব্যবস্থার এই অবস্থা বলেই না দেশের এই দশা! পাশ ফেল নেই , সিলেবাস থেকে ভালো ভালো বিষয়কে গাপ করে ধর্মের কথায় ভরিয়ে দিচ্ছে বলেই না এই হাল! আসল কথা সেটা তো বটেই তারচেয়েও বড় আমাদের নিজস্ব বোধ কমে যাওয়া।
পাশ্চাত্য প্রেমী প্রাচ্য মানুষেরা হয়তো এসবের জন্যই বিস্মৃত হয়েছেন আমাদের প্রাচ্য মানে ভারতবর্ষের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা এবং সাহিত্য , দর্শনের অপূর্ব সমাহার সম্পর্কে। আমি একেবারেই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর মত বলবোনা “মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ছিল” , কিন্তু এই কথাটা তো সত্যিই বেদ – উপনিষদে এমন অনেক কিছু আছে যা পাশ্চাত্য আমাদের থেকেই গ্রহণ করেছে। ভারতীয় চিকিৎসা শাস্ত্রে চরক – শুশ্রুতদের যে অবদান তা অস্বীকার করা চলেনা। গণিতশাস্ত্রে সত্যি সত্যি ভারতের যে সমৃদ্ধ চিন্তাভাবনা তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। শূন্য ও দশমিক তো বটেই এমনকি অ্যালজেব্রা বা অ্যালগোরিদমও যে এখানকার তা নিয়ে ইদানিং কেউ কেউ গবেষণা করছেন। মূলত আরব থেকে আসা শাসকেরা এসব জ্ঞান বিজ্ঞান লুট করে আমাদের সকল পুঁথি পুড়িয়ে দিয়ে প্রমাণটাই নষ্ট করে দিয়ে গেছে। এছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানে আর্যভট্ট কতগুণ এগিয়ে ছিলেন তা পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরাও স্বীকার করেছেন। আর প্রাচীন ভারতের সাহিত্য চর্চার কথা ছেড়েই দিলাম। শুধু পদাবলী সাহিত্যের মত এত সমৃদ্ধ সাহিত্য গোটা বিশ্বে দ্বিতীয় আর নেই।
তো বিষয়টা হলো আমরা যদি সবেতেই গোঁড়া হয়ে যাই , ইতিহাসকে ভুলে যাই , নিজেদের ঐতিহ্যকে ভুলে যাই তাহলে সেটা আমাদের আর মধ্যযুগের মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ রেখা টানেনা।
দেশের এবং বিশ্বের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে আমরা আরোও গোঁড়া হতে থাকলে , ভোগবিলাসী হতে থাকলে , ব্যাক্তি স্বাধীনতার নামে যা খুশি এমনকি ধর্ষণ অবধি করতে থাকলে তরাই ডুয়ার্সের মেয়েরা পাচার হতেই থাকবে , মানুষ অন্ন কষ্ট পেতেই থাকবে , আমাজনের জঙ্গলে আগুন লেগে বিশ্বের ফুসফুসে ক্যানসার হতেই থাকবে এবং সর্বোপরি দেশের মাথায় মাথায় ডিক্টেটর তৈরি হবে , হবেই।

আমরা বাঁচার জন্য সমাজবদ্ধ হয়েছিলাম , দলবদ্ধ হইনি। আমাদের বস্তুগত চিন্তা এবং ভাবগত চিন্তার উন্মেষ হয়েছিল বলেই সাধারণ জ্ঞান বইয়ে “শ্রেষ্ঠ প্রাণী কাকে বলে” প্রশ্নের উত্তর “মানুষ” লিখতে পারি। সুতরাং মানুষ হিসেবে এখন নতুন কিছুই বলতে হবে। হ্যাঁ নতুন। মানুষকে গত ছ – সাত বছর ধরে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে দিতে সাধারণ সংখ্যা গরিষ্ঠের মস্তিষ্ক এমন তৈরি করে দিয়েছে যে এখন সরকারের পতন ঘটিয়ে নতুন বিপ্লব আনার প্রয়োজন সেটিও মানুষ বিস্মৃত হয়েছে। পাশ্চাত্য প্রিয় মানুষেরা শুধু তত্ত্বেই পাশ্চাত্য প্রিয়তা দেখান। তাদের আদর্শকে যে নিজের দেশে অ্যাপ্লাই করা যায় সেদিকে তারা অন্ধ। বলিভিয়ায় , আর্জেন্টিনায় যেভাবে বিপ্লব হচ্ছে , রাশিয়া যেভাবে জারের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে সমাজতন্ত্র ও স্বাধীনতা এনেছে , হিটলার ও মুসোলিনির যেভাবে পতন ঘটানো হয়েছে সেগুলো জেনে শুনেও আমরা সেই পুরোনো মদ নতুন বোতলে ঢালতে পারছিনা।
নতুনভাবে বিপ্লবের কথা বললে প্রথমে কেউ শুনবেনা। ধর্ষণ বন্ধ করো বললে কেউ শুনবেনা। গাছ কেটোনা , গাছ লাগাও পরিবেশ বাঁচাও বল্লেও কেউ শুনবেনা। কিন্তু একদিন তো শুনবেই। শুনতে বাধ্য মানুষ। এবং বিপ্লব হবেই। কিন্তু একজনকে গলা ফাঁটিয়ে কথাগুলো বলতে হবে। ইমারতের প্রথম ইঁটটা গাঁথতে হবে। হয়তো তখন আপনার আমার ছবিতে মালা টাঙানো থাকলো , সামনে নকুলদানা। তাতে একটাও পিঁপড়া লাগছেনা।

রঙ্গন রায় ,

আনন্দচন্দ্র কলেজ, জলপাইগুড়ির ছাত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post