• December 9, 2021

নব্যহিন্দুত্ব ও ভারতীয় মিডিয়া: একটি আন্তর্জালিক আঁতাত,পর্ব-২

 নব্যহিন্দুত্ব ও ভারতীয় মিডিয়া: একটি আন্তর্জালিক আঁতাত,পর্ব-২

অত্রি ভট্টাচার্য

ফেসবুক এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে- ঠিক সেভাবেই কখনো প্যামফ্লেট থেকে রেডিও শো, দেওয়াল-লিখন থেকে গুজবের আড়ালে বক্তব্যের প্রসার; বিশেষত সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল -সংখ্যালঘুকে নেশন-স্টেটের শত্রু অথবা অপর হিসাবে চিহ্নিত করা, এই কাজেই এর আগেও ব্যবহৃত হয়েছে। এর ভুরিভুরি ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে, যেমন রোয়ান্ডায় ১৯৯৪-এ হুটু জনগোষ্ঠী দ্বারা টুটসিদের গণহত্যা, ভারতে ১৯৮৪-র শিখ গণহত্যা অথবা নাৎসি শাসনকালে পোল্যান্ড ও জার্মানিতে ইহুদি নিধনযজ্ঞ।

আগ্রাসী ও জঙ্গি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির প্রকাশ্য হিংসার প্রতি নরম মনোভাব এগুলোই বর্তমান ভারতীয় টেলিভিশনে প্রাইমটাইম সাংবাদিকতার উপজীব্য বিষয়। একটুও অত্যুক্তি হবেনা যদি বলা হয় যে, এই সংবাদসংস্থা গুলি কার্যত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ভারতীয় রাজনীতিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে হেলিয়ে দেওয়ার এবং ভারতরাষ্ট্রের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিপ্রতীপে হিন্দুরাষ্ট্র-প্রকল্পের জমি তৈরী করে দিচ্ছে।

মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলির রুটিন প্রবণতা হল- মোদী সরকারের যে কোনো সমালোচককেই নির্দ্বিধায় ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘হিন্দুবিরোধী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়া। যা বর্তমান ভারতীয়দের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও উগ্র -‘পপুলার সেন্টিমেন্ট’-র সঙ্গে খাপ খায়। এবং এক অদ্ভুত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় বিজেপির ট্রল – আর্মি, নেতা ও সমর্থকেরা নিজেদের কংগ্রেস, ভারতীয় লিবারাল ও মিডিয়ার ভিতরে লুকিয়ে থাকা ‘নকশাল’ সমর্থকদের যৌথ ষড়যন্ত্রের ভুক্তভোগী হিসেবে বর্ণনা করেন। এই একইরকম প্রবণতা, খুব সহজ ভাবে বললে ‘আমাদের নামে সবাই মিথ্যা বলছে’, ‘সমস্তটাই অপপ্রচার’ -এসব কথা নাৎসি-জার্মানিতেও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। নাৎসিদের এই পাল্টা ‘ফেক নিউজ’ কৌশলকে বলা হত ‘লুজেনপ্রেসে’ অথবা ‘লাইং প্রেস’। ইদানীং অনেকেই নেহাত কৌতুকের ভঙ্গিতেই বলছেন, ভারতীয় মিডিয়ার অবস্থা হয়েছে কিছু কর্তাভজা নর্থ-কোরিয়ান নিউজ চ্যানেলের মতন।

এখন বোঝা দরকার, এই মিডিয়াপ্রসূত জাতীয়তাবাদ আজ কেবল আর গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকার, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচন ব্যবস্থার গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই – সংকীর্ণ রাজনীতির গলি ছেড়ে সে ডানা মেলেছে সমাজের প্রতিটি স্তরে ও বর্গবিভাজনে। বিভিন্ন সংগঠন ও ক্ষুদ্র গ্রুপগুলিকে এখন হিন্দুত্ববাদীরা সক্রিয় করেছে এই মিডিয়াকে ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজের তথাকথিত ‘অরাজনৈতিক’ পরিসরকে করায়ত্ত করে নিজেদের আদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করার কাজে। নাৎসি- ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের মতই মোদীরাজ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক হল বিজ্ঞাপনের জগৎ। এই বিজ্ঞাপনের সম্প্রসারণ-ভূমি হল সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল উপস্থিতি। যেখানে পণ্যের মত করে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক তত্ত্বকে কখনো গা গরম করা ইনস্টাগ্রাম রিল, কখনো ‘অল্টারনেটিভ ফ্যাক্ট’ সমৃদ্ধ ইউটিউব ভিডিওর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাই একথা শুনে বিস্মিত হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, মোদী সরকার নিজের প্রথম টার্মে (২০১৪-২০১৮) বিজ্ঞাপনের জন্য খরচ করেছে প্রায় ৪৮০০ কোটি টাকা।

সামাজিক প্রথা এবং প্রতিদিনের জীবন আমাদের অভ্যাসের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক আসলে চুক্তিবদ্ধ দাস-মালিকের সম্পর্ক। রাষ্ট্র আমাদের শরীরের কোন অদৃশ্য অঙ্গ হিসাবেই নীরবে কাজ করে, এবং নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের সমস্ত কার্যক্রম,গতিবিধি। গণতন্ত্র সম্পর্কে কোনো গভীর বোধ সে মস্তিষ্কে অনুমোদিত হতে দেয়না। শেষমেশ নাগরিকের কাছে ‘দেশপ্রেম’, ‘জাতীয়তাবাদ’- এই শব্দগুলো কেবলমাত্র কয়েকটি সাংস্কৃতিক চিহ্ন ও প্রতীকে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এবং রাষ্ট্র সুচারুভাবে মিডিয়ার সাহায্যে এই ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ চালাতে থাকে।

১৯৮৭’র জানুয়ারি মাসে দূরদর্শনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে একটি দ্রুত রূপান্তরের মুহূর্ত উপস্থিত হয়। টেলিভিশনে দেখানো শুরু হয় রামানন্দ সাগর পরিচালিত ‘রামায়ণ’ সিরিয়ালটি। অরবিন্দ রাজাগোপালের মত বহু বরিষ্ঠ সমাজতত্ত্ববিদরা পরে দেখিয়েছেন, কিভাবে এই জনপ্রিয় টেলিসিরিয়ালটি পরবর্তীকালে রাজনৈতিকভাবে বিজেপির উত্থান ও বাবরি মসজিদ ধংব্বসের পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। ৭৮টি এপিসোডের এই টিভি শো ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছিল। এরপর থেকেই ভারতীয় জনমানসে হিন্দু-ধর্মের পুরাণগাথার ভিজ্যুয়াল-রুপ দেখবার চাহিদা বাড়তে থাকে। বাজারের যোগান বজায় রাখতে পরের বছরই ১৯৮৮’তে রামানন্দ সাগরের পরিচালনায় বানানো হল আরেক মহাকাব্য ‘মহাভারত’। আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষ ক্রমশ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সহায়ক-যন্ত্র হিসাবে উত্থান প্রত্যক্ষ করছিল। বোঝা যাচ্ছিল, ভবিষ্যতে উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলির রাজনীতির ফলিত প্রয়োগ ঘটাবে টেলিভিশনই।

অত্রি ভট্টাচার্য ঃ প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post