• December 9, 2021

অর্বাচীন চিন ও এককেন্দ্রিক বিশ্বের স্বপ্ন

 অর্বাচীন চিন ও এককেন্দ্রিক বিশ্বের স্বপ্ন

মুজিব স্বদেশী

প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিন আসলেই একটি অর্বাচীন রাষ্ট্র! বলা যায়, আনাড়ি! চিন সম্পর্কে, চিনের অধিবাসীদের সম্পর্কে তেমন কোনও তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্ববাসীর নজরে আসে না। চিনা কমিউনিস্ট পার্টি এমন একটি চক্রব্যুহ রচনা করে রেখেছে, যেখানে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির একান্ত কর্তব্যক্তিরা ছাড়া সে-দেশের হাঁড়ির খবর উদ্ধার করা রীতিমতো দুঃসাধ্য! চিন আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী নয়, বটে। সীমান্ত সমস্যা ছাড়া চিনের সাম্রাজ্য বিস্তারের তেমন কোনও নজির চোখে পড়ে না! গত কয়েক দশক জুড়ে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা হল, তাতেও চিন নিস্পৃহ ছিল। বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যে চিন এতো কাল নাক গলায়নি। কিন্তু ভারতের সীমান্তে চিনারা বরাবর পাড়ার মস্তানের মতো গুণ্ডামি করতে কসুর করছে না! সম্প্রতি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ অরুণাচলে ইসরাইলের মতো চিনের অবৈধ বসতি স্থাপনের খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে আমেরিকার একটি সংস্থার বরাত দিয়ে। পাকিস্তানকে ল্যাজে খেলাচ্ছে চিন! পাকিস্তান ও চিন দুটি-ই ভারতের প্রতি সহজাত বৈরীতা প্রদর্শন করে, সুযোগ পেলেই। ভারতের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে চিন ও পাকিস্তানের সীমানা। নতুন করে তাদের দোসর হয়েছে সদ্য আমেরিকার কবলমুক্ত হওয়া আফগানিস্তান! চিন ও পাকিস্তান কোনওভাবে ভারতকে আফগানিস্তানে নাক গলাতে দিতে রাজি নয়। ভারতের মাথাব্যথার প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে, চিন ও পাকিস্তান। যেন-তেন-প্রকারেণ ভারতকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে চিন সদা তৎপর! পাকিস্তান চিনকে অন্ধভাবে অনুসরণ না-করে সহজাত শত্রুতা ভুলে ভারতের সঙ্গে ‘ঐক্য’ স্থাপন করলে তা পাকিস্তান ও ভারত উভয় রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হত। ইদানীং বাংলাদেশের অবৈধ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাও চিনের দিকে ঝুঁকেছেন বলে বিভিন্ন লক্ষণ ফোটে ওঠেছে! প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর ভারতে শেখ হাসিনার মাথার উপর আগের মতো আর ছায়া নেই! তাই, ভারতের নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে নিঃশর্ত সমর্থন আদায় করা এখন শেখ হাসিনার পক্ষে কঠিন কাজ। তা ছাড়া, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার এক দলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম, সে তো চিনা কমিউনিস্ট পার্টির অন্ধ অনুকরণ বৈ কিছু নয়! বঙ্গবন্ধুও ১৯৭৫ সালে ‘বাকশাল’ গঠনপূর্বক স্বাধীন বাংলাদেশকে এক দলীয় শাসনব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন! কিন্তু ১৫ আগস্ট কালো রাতে তাঁকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর সেই পরিকল্পনা প্রায় তিন দশক কাল শীতল জলে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল! ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পিতার অসম্পূর্ণ কাজটি তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পাদন করেন। দিবালোকে অথচ সবার অলক্ষ্যে!

আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আগে এতদ্দেশে কখনও ঘটা করে, কখনও ছোটো পরিসরে সভা-মিছিল হতে দেখা যেত। এক বিশেষ মতাদর্শের লোকজনদের আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মিছিল-স্লোগান দিতে দেখা যেত! সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সমর্থনযোগ্য হলেও এখন সে-সকল বিশেষ মতাদর্শের লোকজন কিন্তু দারুণ নিস্পৃহ! চিন সম্পর্কে তাঁদের কোনও উষ্মা নেই! আমেরিকা অনেক অন্যায় যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নীরিহ লোকজনকে হত্যা করেছে! সে খবর কিন্তু ‘গোপন’ থাকেনি। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদও সাব্যস্থ হয়েছে। খোদ আমেরিকাতেও সেসব অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন নেটোর যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু চিনের ‘গোপন’ অপরাধগুলো জনসমক্ষে আসার সুযোগ খুব অপ্রতুল! দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী কাজ সংঘটিত করলেও দেশের বাইরে সেসব প্রকাশ পাচ্ছে খুব কম। মহামারি করোনার উৎস নিয়েও জনমনে চিনের প্রতি একটা সন্দেহ ও বিক্ষুব্ধ মনোভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার সংক্রমণের জন্য চিনকে দায়ী করে চিনা নাগরিকদের অপদস্থ করার কথাও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। চিনা কমিউনিস্ট পার্টি এতো বছর ধরে নিজ দেশে এক দলীয় শাসন কায়েম করে এবার বিশ্বকে এককেন্দ্রিক করার পাঁয়তারা করছে! অর্থাৎ বিশ্বকে তাদের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে ব্যাপক কসরৎ করছে। এতে বিশ্বের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ! আশ্চর্যজনক যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এ-দেশের বুদ্ধিজীবিরা নিতান্ত নির্বাক! নিস্পৃহ! কারও কারও আচরণে, কথায় বাংলাদেশের এই গণতন্ত্রহীনতার শংসাপত্র দিতে দেখা যায়! আগে ব্রিটিশরা একাংশ ভারতীয় বুদ্ধিজীবির মননে ও মগজে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। এখন অনেকের মননে ও মগজে চিনা উপনিবেশবাদ কায়েম হয়েছে! এক দলীয় তথা বিরোধীবিহীন শাসনব্যবস্থাকেই পক্ষান্তরে স্বাগত জানাচ্ছেন! গণতন্ত্রের জন্য যা অশনিসংকেত!

মুজিব স্বদেশী ঃ প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post