• December 4, 2021

কৃষকের এই বিজয় শক্তি জোগাক সম নাগরিকত্বের সংগ্রামকে

 কৃষকের এই বিজয় শক্তি জোগাক সম নাগরিকত্বের সংগ্রামকে

মলয় তেওয়ারি

জনবিরোধী তিনটি নতুন কৃষি আইন প্রত‍্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে আইনগুলি প্রত‍্যাহারের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এই ঘোষণা কৃষক আন্দোলনের এক বড় জয়। আগামী সপ্তাহে ২৬ নভেম্বর দিল্লি সীমান্তের কৃষক অবস্থানের এক বছর পূর্ণ হবে। এই এক বছর ধরে মোদি সরকারের নির্মম আক্রমণ ও বিভেদমূলক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে, প্রায় ৭০০ কষকের জান কুরবান করে, ধাপে ধাপে ক্রমবর্ধমান ঐক‍্য ও অগ্রণী চেতনার জন্ম দিয়ে কৃষকেরা মাটি আঁকড়ে লড়েছেন। দাম্ভিক ফ‍্যাসিস্ট মোদি সরকারকে শেষ পর্যন্ত পিছু হঠতে হয়েছে।

আইন প্রত‍্যাহারের ঘোষণার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী অবস্থানরত কৃষকদের বাড়ি ফিরে যেতেও বলেছেন। কিন্তু কৃষক আন্দোলনের মোর্চা ও বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে আইনগুলি প্রত‍্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এবং বাকি দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা অবস্থান চালিয়ে যাবেন এবং বর্ষপূর্তী উপলক্ষে পূর্বঘোষিত সমস্ত কর্মসূচী বহাল থাকছে। কোম্পানিরাজ কায়েমের এই তিনটি নতুন কৃষি আইন প্রত‍্যাহার ছাড়াও কৃষক-বিরোধী নতুন বিদ‍্যুৎ আইন প্রত‍্যাহার ও সবরকম ফসলের সহায়ক মূল‍্য নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন কৃষক আন্দোলনের অন‍্যতম দাবি হিসেবে প্রথম থেকেই আছে। বস্তুত মোদি সরকার নতুন তিনটি কৃষি আইন সামনে আনার এক বছর আগে থেকেই স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ি ফসলের সহায়ক মূল‍্যের দাবিতে কৃষক সংগঠনগুলি সমন্বয় সমিতি গড়ে জোরদার আন্দোলন শুরু করেছিল।

আইন প্রত‍্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও নরেন্দ্র মোদি আন্দোলনরত কৃষকদের কাছে ক্ষমা চায়নি। বরং ক্ষমা চেয়েছে আইনগুলির সমর্থকদের কাছে, অর্থাৎ আদানি আম্বানির মত কর্পোরেটদের কাছে। মোদি বলেছেন যে, আইনগুলির প্রয়োজনীয়তা কৃষকদেরকে বোঝাতে ব‍্যর্থ হওয়ার জন‍্য দু:খিত উনি। গুরু নানক জন্মজয়ন্তীতে গুরু নানকের নাম নিয়ে একদিকে আইন প্রত‍্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা ও অন‍্যদিকে এরকম “ফেক অ‍্যাপলজি”-র ভণ্ডামির মাধ‍্যমে আসলে গুরু নানককেও অপমান করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বছরভর লাগাতার মরণপণ আন্দোলনের মধ‍্যে দিয়ে পোড় খাওয়া কৃষকেরা এটুকু সহজেই বুঝতে পারছেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মোদি সরকার তথা বিজেপি-আরএসএসের লাগাতার কুৎসা, অ‍্যান্টি ন‍্যাশনাল তকমা, ষড়যন্ত্র, অসংখ‍্য মামলা এমনকি মোদির মন্ত্রীসভার মন্ত্রী ও মন্ত্রীপুত্র দ্বারা প্রকাশ‍্যে সরাসরি গাড়িচাপা দিয়ে হত‍্যা করা – এই সমস্ত অপরাধে অপরাধী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি ও আরএসএস। কৃষকদের ওপর চাপানো সমস্ত মামলা অবিলম্বে প্রত‍্যাহার ও খুনি মন্ত্রীর অপসারন ও শাস্তি চেয়েছে কৃষকের।

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার পিছু হঠতে হল মোদি সরকারকে। এর আগে প্রথম টার্মে জমি অধিগ্রহণ আইন প্রণয়ন থেকে পিছিয়ে আসতে হয়েছিল মোদিকে। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর সংসদীয় বিরোধিতার পরিসরকে কার্যত খতম করে দিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছিল নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি-আরএসএস। কিন্তু সংসদের বাইরে গণসংগ্রামের ময়দানেই গড়ে উঠেছে প্রকৃত বিরোধী পক্ষ। বিগত বছর ধরে কৃষকের আন্দোলন নিছক আশু দাবি আদায়ের পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। বিজেপি-আরএসএসের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান-শিখ ঐক‍্যের এক মহাপঞ্চায়েত হিসেবে দ্রুত বিকশিত হয়ে ওঠে কৃষক আন্দোলনের মঞ্চ। কৃষি সমাজের অভ‍্যন্তরের কৃষক ও গ্রামীণ মজদুরদের মধ‍্যে, জাতপাতের প্রাচীর ভেঙে, কোম্পানিরাজের বিরুদ্ধে নতুন ঐক‍্যের বাস্তবতা সামনে আসতে শুরু করে। কৃষক নেতারা রাজ‍্যে রাজ‍্যে নির্বাচনে বিজেপিকে পরাস্ত করার আহ্বান নিয়ে প্রচারাভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২০২২ এর ইউপি নির্বাচন ও ২০২৪ এর সাধারণ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে ধূর্ত আরএসএস-বিজেপি তাই বাধ‍্য হয়েছে আপাতত পিছু হটে জনতার এই অগ্রগতিকে প্রশমিত করতে। কিন্তু তাদের কদর্য চেহারা, তাদের সর্বনাশা নীতি অনেকখানিই উন্মোচিত হয়ে গেছে কৃষকসাধারণের কাছে।

ভারতের কৃষকের এই বীরত্বপূর্ণ অভূতপূর্ব লড়াই ও বিজয় দেশের অন‍্যান‍্য সমস্ত লড়াইকে শক্তি ও সাহস জোগাবে। দেশের শ্রমিকশ্রেণীর ওপর নেমে আসছে চারটি শ্রমকোড রূপে দাসত্বের নতুন ফরমান। নতুন উদ‍্যমে জোট বাঁধতে হবে শ্রমজীবি মানুষকে। সমান নাগরিকত্বের অধিকার রক্ষার লড়াই প্রথম পর্বের পর থমকে আছে নতুন আলোড়নের অপেক্ষায়। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ‍্যৎ বন্ধক রেখে নতুন করে দেশের সমস্ত রাস্তা-স্টেশন-বন্দর সহ জাতীয় সম্পদ কোম্পানিদের হাতে তুলে দেওয়ার ‘মানিটাইজেশন পলিসি’ এনেছে মোদি সরকার। কৃষক আন্দোলনের অভ‍্যন্তর থেকে উঠে আসা ঐক‍্য, অধ‍্যবসায় ও বীরত্বপূর্ণ বিজয়ের শক্তি সাথে নিয়ে এইসব প্রশ্নে নির্ধারক আন্দোলন গড়ে তোলার সময় এখন।


মলয় তেওয়ারি : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post