• December 2, 2022

পরিবর্তন : এক চলমান ধারা

 পরিবর্তন : এক চলমান ধারা

আমরা বর্তমানে ঘটে চলা ঘটনাগুলিকে খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে ভবিষ্যতে কী ঘটতে চলেছে তা হয়তো নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারব। একইরকমভাবে, বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করতে গেলে, এর কারণ খুঁজতে হলে, আমাদের অতীতের কথা ভাবতেই হবে। এখন মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক, সুবিধাবাদী, অবসাদগ্ৰস্ত হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তনের বীজ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে। সমাজের এই পরিবর্তন শুরু হয়েছিল মূলত 1760 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1840 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘটা শিল্পবিপ্লবের পর থেকে। একদল নতুন ধরনের মানুষ এরপর থেকে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে থাকে(Sapiens- Yuval Noa Harari)।আশ্চর্যের কথা এই যে, অতীতের প্রতিটি ঘটনার প্রভাব আজকের দিনেও রয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই নতুন সম্ভাবনার সূত্রপাত ঘটায়। শিল্পবিপ্লব থেকে আজকের আধুনিক সমাজ- অনেকগুলি সম্ভাবনার মধ্যে একটি, হয়তো সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাগুলির মধ্যে একটি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম কেন হল? যদি আমরা শুধু ভারতবর্ষের দিকে তাকাই, তবে দেখব, ভারতে শিল্পবিপ্লবের প্রভাব এসেছিল ব্রিটিশদের মাধ্যমে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেন-যা ছিল বাণিজ্যিক দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দেশগুলির মধ্যে একটি- বাণিজ্যের ছদ্মবেশে ভারতবর্ষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি বাজারের দরকার ছিল যেখানে ব্রিটেনে উৎপন্ন বিপুল পণ্যসামগ্রী বাধাহীনভাবে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিক্রি করা যাবে। ভারতের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ নেবার ফলে ভারতবর্ষ হয়ে ওঠে তাদের সেই বাজার। এর ফলে ভারতের মানুষদের এক বিরাট সামাজিক পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয়। ব্রিটিশ শাসনের আগে, ভারতের গ্ৰামগুলিতে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ অথনীতি চালু ছিল। গ্ৰামগুলিতে ৬৮.৫% পুরুষদের জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা, টাকাপয়সার ব্যবহার খুবই কম ছিল, বিনিময় প্রথা ভারতের গ্ৰামগুলিতে বহুলাংশে প্রচলিত ছিল এবং মনে রাখতে হবে ভারতের ৯০% মানুষ গ্ৰামেই থাকতেন(source: Indian economics in the Pre-British Period-Structure and organization of village,towns, industries and handicrafts)। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর ভারত পরিণত হয় ব্রিটেনের কাঁচামাল এবং পণ্য সরবরাহ কেন্দ্রে। ভারতের অথনীতি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত হতে থাকে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রশ্ন নয়, এখানে প্রশ্ন ক্ষমতার। সেই সময় ভারতে ব্রিটিশ বণিকেরা বিভিন্ন উপায়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। বণিকদের মূল লক্ষ্য ছিল বেশি মুনাফা অর্জন করা, মুনাফা অর্জনের জন্য তাদের দরকার উপযুক্ত বাজার, আর এই বাজার তৈরী করার উদ্দেশ্যেই তারা ভারতে উপনিবেশ স্থাপন করে। শিল্পবিপ্লব সারা পৃথিবীতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। যন্ত্র মানুষের কাজ অনেক সহজ করে দেয়। কুটির শিল্পের পরিবর্তে বড়ো বড়ো কারখানা তৈরী হতে থাকে এবং সমাজব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ‘alienation’ এসে পড়ে। এই সব বড়ো কারখানার শ্রমিকরা কখনো তাদের যথাথ মজুরি জানতে পারত না, কারণ তাদের কাছে সঠিক তথ্য থাকত না। পুঁজিবাদীদের কাছে এটা একটা খুব সুবিধার ব্যাপার। এদের কাছে শ্রমিক শ্রেণী সবচেয়ে নিরাপদ এবং দুর্বল জায়গা যেখানে তারা সহজেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তারা তাদের সুবিধার জন্য শ্রমিকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়। কীভাবে? মালিকরা কারখানায় শূন্য পদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। কাজের অভাব দেখা দিলে জীবিকার কারণেই শ্রমিকদের মধ্যে প্রতিযোগী মনোভাব তৈরি হতে থাকে। এই প্রতিযোগী মনোভাবই আমাদের এই বিধ্বস্ত, individualistic সমাজের মূল কারণ। এই পুরো ব্যাপারটায় সরকারের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। পুঁজিবাদীরা সরকারকে প্রভাবিত করে নিজেদের সুবিধামত নিয়ম প্রচলন করে, যা তাদের আরও ক্ষমতাশালী করে। এই ‘alienation’ আমাদের সমাজে এক মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে প্রচুর কর্মীকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। সম্প্রতি, NCRB(National Crime Record Bureau) যে তথ্য প্রকাশ করেছে তা দেখলে আমাদের চমকে উঠতে হয়। ২০২০ তে মোট 1.53 লাখ আত্মহত্যার খবর নথিভুক্ত হয়। অন্যদিকে, করোনা মহামারীর কারণে 1.49 লাখ মানুষ প্রাণ হারান। দেখা যাচ্ছে, ভারতে আত্মহত্যা, করোনার চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী। এক বছরের মধ্যে 37 হাজারেরও বেশি দিনমজুর শ্রমিক এবং 12 হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। গত 10 বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা 2020 তে ঘটেছে। কিন্তু এখনো সরকার শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিম, ধর্মীয় আচার-আচরণ, ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়েই ব্যস্ত। BJP, ভারতের ক্ষমতাসীন দল সাধারণ মানুষের থেকে এইসব তথ্য আড়ালে রাখতে চায়। তার জন্য এরা একের পর এক অলীক শত্রুর অবতারণা করে। কখনো সেই শত্রু পাকিস্তান, তো কখনো মুসলিমরা। কিন্তু আসলে এরা কিছু পুঁজিপতির হাতের পুতুল, পরোক্ষভাবে পুঁজিপতিরাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তাই যতদিন না প্রধান কারণ উচ্ছেদ না হয়, শাসনের নামে এই প্রহসন চলতেই থাকবে।

লেখক : স্বপ্ননীল মুখার্জি

অনুবাদ : সংঘোমিত্রা পাল,রাজীবুল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.