• January 17, 2022

করোনা মহামারীতে সমাজের মেয়েরা

 করোনা মহামারীতে সমাজের মেয়েরা

মধুরিমা সাহা

একুশ শতকে পৌঁছেও ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিক গোঁড়ামি সুউজ্জ্বলভাবে বহাল রয়েছে। তাই আজও পুরুষের সমান হওয়ার প্রমাণ দিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক যে কোনো ক্ষেত্রেই মেয়েদের শিকল কেটে উপরে উঠতে হয়। করোনা মহামারীর জেরে গত দেড় বছরে গোটা দেশের সামাজিক চিত্রটা অনেক বদলে গেছে। সেই পরিবর্তনের আঁচে আজকের দিনে মেয়েদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান নিয়েই এই আলোচনা।
‘রাইট টু এডুকেশন ফোরাম পলিসি’-র তথ্য অনুযায়ী বর্তমান করোনাকালে গোটা দেশে বিদ্যালয় ছেড়ে পড়াশুনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে প্রায় ১০ মিলিয়ন মেয়ে। ইতিমধ্যেই ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ১•৬ মিলিয়ন মেয়ে বিদ্যালয় ছেড়েছে (জানুয়ারি,২০২১)। দেশের উল্লেখযোগ্য রাজ্য মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের ‘শিক্ষায় লিঙ্গবৈষম্যের হার’ আন্তর্জাতিক গড় ৭০•৩ শতাংশের নীচে নেমে গেছে। করোনাকালে ভয়াবহ আক্রান্ত SC, ST ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েদের পড়াশুনা। প্রাথমিক পর্যায়ে SC-র অন্তর্গত মেয়েদের বিদ্যালয় প্রবেশের হার ছিল ১৯•৩৪ শতাংশ, যা মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছতো ১৮•৬ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ১৭•৩ শতাংশ। বর্তমানে এই সংখ্যায় এক ভয়াবহ পরিবর্তন এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০•৩৫ শতাংশ, মাধ্যমিক স্তরে তা আরও কমে ৮•৬ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৬•৮ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতবর্ষের অধিক সংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা লিঙ্গবৈষম্যকে আরও দৃঢ় করে। তারওপর করোনার থাবা সব হিসেবে গোলমাল করে দিয়েছে, আবার বেড়েছে বাল্যবিবাহ। আর্থিক সংকটে পরিবারের চাপে অনলাইন পড়াশুনা ছেড়ে মেয়েরা যুক্ত হচ্ছে ঘরের কিম্বা বাইরের কাজে,বাড়ছে শিশু শ্রমও। লকডাউনে দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন বহু পরিবার, তাই দু-বেলা খাবার জোটানো দুঃসহ হয়ে পরেছে যেখানে, সেখানে অনলাইন পড়াশুনার বাড়তি খরচ বিলাসিতার সমান। উচ্চশিক্ষায় যুক্ত মেয়েদের পড়াশুনাও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত এই সময়। অনলাইন পড়াশুনার খরচ, পড়াশুনায় নিম্নমান, চাকরির অনিশ্চয়তা, দীর্ঘদিন ধরে কলেজ-ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় পড়াশুনার উপযুক্ত পরিবেশের অভাব এবং সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের উপর থাকা পারিবারিক চাপ ও মানসিক অত্যাচার বৃদ্ধি।
অতিমারীর দিনগুলিতে বাড়ির মহিলাদের ওপর বেড়েছে কাজের দায়িত্ব। ঘর পরিষ্কার, রান্না, কাপড় ধোঁয়া, ছেলে-মেয়েদের অনলাইন পড়াশুনার দেখাশোনা এবং করোনার কবল থেকে বাঁচতে বিভিন্ন সর্তকতা অবলম্বন, এছাড়াও রয়েছে ঘরের অসুস্থ মানুষের দেখাশুনা। এই সব কাজই বিনা বেতনে অবিশ্রান্তভাবে করে চলেছেন ঘরের মেয়েরা, লকডাউনে বিশ্রাম নয় তাদের কাজ বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। MGI, Power Of Parity-র তথ্য বলছে অতিমারীর সময়ে ভারতে মেয়েদের ওপর পরিবারের দায়িত্ব বেড়েছে ৩০ শতাংশ। যেহেতু Unpaid Care Work-এ মেয়েদের অংশগ্রহণের হার-এর সাথে Female Labour Force-এ অংশগ্রহণের হার ঋণাত্মক সম্পর্কযুক্ত, তাই স্বাভাবিকভাবেই একটা বড় অংশের মেয়েরা কাজ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়াও ঘরবন্দী দশায় অর্থনৈতিক সমস্যা, অত্যাধিক দুশ্চিন্তা, দ্রুতহারে সব বদলে অনলাইন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের চাপ এবং অবসাদগ্রস্ততার ফলে বেড়েছে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স। National Commission For Women (NCW)-র তথ্য অনুযায়ী মেয়েদের বিরুদ্ধে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অভিযোগ ২০১৯ এর ২,৯৬০ থেকে বেড়ে ২০২০ তে ৫,২৯৭ এ দাঁড়িয়েছে। তথ্য বলছে ২০২১ এর জানুয়ারি থেকে ২৫ শে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১,৪৬৩ টি অভিযোগ জমা পরেছে। অভিযোগের বাইরে মেয়েদের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের হিসাবটা গণনার বাইরেই থেকে যায়।
মেয়েদের ওপর অতিমারির এই অসামঞ্জস্য প্রভাব দেশের অর্থনীতির বিকাশকে উল্টো পথ দেখাচ্ছে। সমাজে লিঙ্গবৈষম্যতা এবং কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। প্রথমটি ঠিক না করা গেলে দ্বিতীয়টির থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে না। করোনার সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইনফরমাল সেক্টর এবং এই সেক্টরেই কর্মরত মহিলাদের বেশি অংশটা রয়েছে। ফলে কাজ হারিয়েছেন অনেকেই। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিভাগেই নারী-পুরুষের বেতনের বৈষম্য থাকায় সেখানেও ভুক্তভুগী নারীরা। রিপোর্ট বলছে লকডাউনের সময় ৬•৭ মিলিয়ন মহিলা শ্রমিক বিচ্যুত হয়েছেন কাজ থেকে, যার মধ্যে ২•৩ মিলিয়ন গ্রামের এবং ৪•৪ মিলিয়ন শহরের মহিলা শ্রমিক। বহু মহিলাই লকডাউনের পরবর্তীতে পুনরায় কাজে যোগদান করছেন না। এছাড়াও এই সময় কাজের হাহাকার চারিদিকে, এমত অবস্থায় আমাদের দেশে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের কাজের গুরুত্বই বেশি দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া সহ আরও ৬ টি উন্নত দেশ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছে। তবে মহামারীতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পক্ত করার প্রয়োজনে কিছু স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ হয়েছে, যেখানে মেয়েদের সংখ্যাটাই বেশি। যদিও তাদের বেতন খুবই কম। এছাড়াও এই সময়ের সুযোগ নিয়ে মেডিকেল নার্স, মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বেড়েছে যৌন হেনস্থা এবং শ্লীলতাহানীর মতো ঘটনা।
করোনাকালে ভারতে মেয়েরা বিভিন্নভাবে বিপর্যস্ত, তার মধ্যে আরও একটি দিক হলো চিকিৎসাব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা। গত দেড় বছরে ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেঙে পরা রূপটা স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে সব মানুষের কাছে। এই দীর্ঘ সময়ে করোনায় আক্রান্ত রোগী ছাড়া বাকি অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসায় দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মহিলাদের। বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলি কোভিড মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকায় এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে গর্ভাবস্থায় মেয়েরা সমস্যায় পড়ছেন। এছাড়াও ডেলিভারি, অ্যবোরশন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যজনিত অসুস্থতার চিকিৎসায় সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে মহিলাদের। সর্বশেষে বলা যেতে পারে গত দেড় বছরে অতিমারীকে কেন্দ্র করে ভারতে মেয়েদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এই মুহূর্তে এক সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে।

তথ্য সূত্র–
১। FRONTLINE, ২৫.০১.২০২১
২। McKinsey & Company, ১৫.০৭.২০২০
। Business Standard, ১৫.১২.২০২০

মধুরিমা সাহা,ছাত্রী
অর্থনীতি বিভাগ, বিশ্বভারতী

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post