• January 17, 2022

বিবি জুলিয়ানা

 বিবি জুলিয়ানা

সহেলি চক্রবর্তী
মধ্যযুগীয় ইতিহাসে সে যুগের বহু খ্যাতিসম্পন্না নারীর গল্প ও উপাখ্যান আমরা দেখতে পাই। তাঁদের মধ্যে রাজিয়া সুলতান, নূরজাহান, মুমতাজ মহল, জাহানআরা বেগমকে নিয়ে বহু কিস্যা কাহিনী প্রচলিত।কিন্তু এর বাইরেও বহু নারী ছিলেন সেযুগে যাঁদের নিয়ে কোথাও সেইভাবে কিছু বলাই হয়নি।এরকমই এক নারী হলেন জুলিয়ানা।এই পর্তুগিজ নারী মুঘল কোর্টে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সাক্ষী ছিলেন বহু রহস্যময় আলোচনা ও বন্ধ দরজার পিছনের গুপ্ত কথোপকথনের।
ডোনা জুলিয়ানা ডি কোস্টা ছিলেন মুয়াজ্জমের প্রিয় ভালোবাসার পাত্রী।মুয়াজ্জম পরে বাহাদুর শাহ প্রথম রূপে মুঘল তখ্তে বসেন ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে একজন বিতর্কিত সম্রাট রূপে। জুলিয়ানার ছিল মনোহরণকারী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ফলে খুব সহজেই তিনি বাহাদুর শাহ প্রথমের খুব কাছের মানুষ হতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন মুঘল ও ইউরোপীয় সম্পর্কে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন তার জন্য ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন।কিন্তু দুঃখের বিষয় তা করা হয়নি।


মুঘল কোর্টে জুলিয়ানা চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর দৌলতেই সেইসময় মুঘল ও ইউরোপীয়দের মধ্যে বিশেষ করে পর্তুগিজদের ভিতর উষ্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জুলিয়ানার বৈষয়িক বুদ্ধির ফলে দুই দেশের যাবতীয় নিয়মনীতিকে মাথায় রেখে মুঘলরা সুরাটকে পর্তুগিজদের জন্য করমুক্ত বন্দর হিসেবে ঘোষণা করে। যার ফলে দুই দিক থেকেই জুলিয়ানা বহু উপহারে সমৃদ্ধ হন। দিল্লির সঙ্গে জুলিয়ানার আত্মীয়তা তর্কাতীত ছিল। যার ফল স্বরূপ বাহাদুর শাহ প্রথম তাঁকে দারা শিকোহ নির্মিত প্রাসাদ উপহার দেন। যেখানে তিনি বহু বছর বাস করেছেন। এর সাথে সাথেই তাঁকে দিল্লির বেশ কিছু গ্রামও দেওয়া হয়। জুলিয়ানা মোট ৯৭বিঘা জমি লাভ করেছিলেন ওখলা গ্রামের কাছে।তিনি নিজের সেই জাগিরে একটি সরাই নির্মাণ করেছিলেন যা জুলিয়ানা সরাই নামে খ্যাত।আজ সেই সরাই এর কোন চিহ্নই অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে সেখানে আকাশচুম্বী বহুতল গড়ে উঠেছে।
জুলিয়ানা নিয়ম করে মাসিহগড়ের চার্চে যেতেন বিশেষ প্রার্থনার জন্য। এই চার্চের জমি জুলিয়ানা নিজে দান করেছিলেন যাতে তিনি কিছু পূণ্য লাভ করতে পারেন। চার্চটি বর্তমানেও টিঁকে আছে ওখলায় তাঁর জাগিরের জমির কাছেই। জুলিয়ানা তাঁর অসাধারণ কার্যকলাপের জন্য পর্তুগিজ সরকারের থেকে সর্বোচ্চ পুরস্কার পান।ঠিক একই
ভাবে মুঘলদের থেকেও তিনি সম্মান ও খ্যাতি দুইই লাভ করেন।


জুলিয়ানা তাঁর জীবনে মুঘল কোর্টের বহু ষড়যন্ত্র চোখের সামনে দেখেছেন। একদিকে তিনি মুয়াজ্জমের সিংহাসন লাভের জন্য বহু যুদ্ধ যেমন দেখেছেন। ঠিক তেমনই জাহান্দার শাহ,ফারুকশিয়ারের রাজত্বকাল,সৈয়দ ভাতৃদ্বয়ের ঘৃণ্য কাজকর্ম, নিজেদের রাজার নির্মাতা হিসেবে একের পর এক মুঘল শাসককে সিংহাসনে বসানো সবই জুলিয়ানার চোখের সামনেই ঘটেছে।
জুলিয়ানা বিবি জুলিয়ানা নামেই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। মুঘলদের কাছে তিনি ছিলেন বেগম শাহজাদীদের শিক্ষাগুরু,রাজপরিবারের মহিলাদের ডাক্তার। হারেমের কাজ ঠিক মতো হচ্ছে কিনা তার খোঁজখবরও তিনিই রাখতেন। তার সাথে সাথে মুঘল কোর্ট ও রাজকীয় গহনার ব্যাপারেও তাঁর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন একদিকে জায়গিরদার,মনসবদার, একজন রাজকর্মচারী, কূটনীতিবিদ এবং পর্তুগিজ রাজদূত। তাঁর সাথে সাথেই জুলিয়ানা ছিলেন অনাথ শিশুদের পৃষ্ঠপোষক। তিনি আগ্রাতে কলেজ ও জেসুইট মিশন নির্মাণ করেন। খ্রীষ্ট ধর্মের ধর্মগুরুও তাঁর কাজের প্রশংসা করছিলেন।


তাঁর বহুমুখী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও বহুভাষাবিদ হওয়ার গুণাবলীর পরিচয় আরও বেশি পরিচয় পাওয়া যায় যখন ডাচ দূতকে তিনি রাজকীয় শিষ্ঠাচার, নিয়ম মেনে অভিবাদন করেন।শুধু তাই নয় তিনি মুঘল সম্রাট, বেগম ও শাহজাদাদের জন্য ডাচ সঙ্গীতকার ও যন্ত্রানুসঙ্গীতের একটি মনোরম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তিনি মুঘলদের সামনে পশ্চিমী সভ্যতার সুন্দর দিকটি তুলে ধরেন এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এখানেই থেমে না থেকে জুলিয়ানা সৈন্যবাহিনীকে উদীপ্ত করেন ভারী বন্দুক ও কামানের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধের সময়। যা চলেছিল মুয়াজ্জমের সাথে তাঁর অন্যান্য ভাইদের মধ্যে। একটা সময় মুয়াজ্জম হয়তো হেরেই যেতেন যদি না জুলিয়ানা তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতেন এবং সাহায্য করতেন।
জুলিয়ানার প্রভাব মহম্মদ শাহর আমলেও ছিল। মহম্মদ শাহ ছিলেন মুয়াজ্জমের নাতি। জুলিয়ানা ছিলেন মহম্মদ শাহর মায়ের অন্যতম বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি।তিনি জুলিয়ানার সঙ্গে যাবতীয় রাজকীয় ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতেন। জুলিয়ানা ১৭৩৪এর জুলাই -আগস্ট মাসে বার্ধক্যকালে উপনীত হয়ে মারা যান। তারিখ -ই-মুহম্মদি তে জুলিয়ানা সম্পর্কে উল্লেখ আছে “ফিরিঙ্গী জুলিয়া, তিনি ছিলেন মহিলা ডাক্তার এবং শাহ আলম(মুয়াজ্জম)থেকে মহাম্মদ শাহর আমল পর্যন্ত সকল সম্রাটদের কাছের মানুষ। ১৭৩৪সালের আগস্ট মাসে তিনি মারা যান। ” দুঃখের বিষয় এতটা সময় মুঘল শাসকদের ও সাম্রাজ্যকে দিলেও জুলিয়ানার নাম সেভাবে কোথাও উল্লেখই করা হয়না।একমাত্র মাসিহগড়ে তাঁর নির্মিত চার্চটি আজও জুলিয়ানার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

সহেলি চক্রবর্তী : ঐতিহাসিক নিবন্ধ লেখিকা,সম্পাদিকা প্রত্নচিহ্ন ই ম্যাগাজিন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post