• December 2, 2022

“বড়ো বেসামাল আজ পড়ে আসা আলোর অবস্থা”

 “বড়ো বেসামাল আজ পড়ে আসা আলোর অবস্থা”

অনীক রুদ্র ও কুন্তল ভট্টাচার্য

আরো কতটা খারাপ প্রমাণ হলে
আসল সুমন চেনা যায়
প্রশ্নগুলো কঠিন তাই উত্তর অজানা..

যদিও ভাষার শালীনতা নিয়ে সংস্কৃতির রক্ষক হয়ে বিভেদ-উস্কানি-দাঙ্গা কিংবা শুদ্ধ ধর্ষণ আর খুনে যে সুশীল বাঙালি বিশুদ্ধতার গুণ খুঁজে বেড়ান তাঁদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর জলের মতো সহজ।

সুমনের কথায় সমর সেন মহাশয়কে তিনি দেখেছেন একজন সিধে বাঙালি হিসেবে আর আমরা আমাদের জীবদ্দশায় সুমনকে দেখেছি একজন সিধে বাঙালি হিসেবে। এখন দেখলাম আরো ধারালো, আরো সিধে বাঙালি হিসেবে।

বাঙালি চিরকাল চেয়ে এসেছেন customized সুমনকে, অর্থাৎ উৎকৃষ্ট কাব্যগুণ, ছন্দের দোলা ও বিপ্লবী মুন্সিয়ানা তাঁর রচনায় থাকতেও হবে কিন্তু কিন্তু বাস্তবে তাঁকে হয়ে উঠতে হবে পন্ডিতশ্রী-ওস্তাদভূষণ মহাশয়দের মতো অরাজনৈতিক কাঁচের ঘরের মানবতার । অর্থাৎ সব মিলিয়ে অসাধারণত্বের এইসবের গুরুগম্ভীর ধ্রুপদী ওজন যেন স্বাভাবিকত্বকে অদৃশ্য করে দেয় – মানে আমাদের মতন স্বাভাবিক মানুষ যে রাগ করি, যন্ত্রনা পাই , রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে হৃদয় ঝরে যায়, প্রতিবাদ করি, অসন্তোষ হয় , রাস্তায় খিস্তি করি, ভালোবাসি, যৌনতা করি, আঁকড়ে ধরি, ছুঁড়ে ফেলি এইসব।

আর এখানেই সংঘাত । তবে এখানে বাঙালির প্রাপ্তিযোগ পুরোটাই – দিনে দিনে ভাঁড়ার সজ্জিত হয়েছে সুমনকে নিয়ে নানান সব আকর্ষণীয় মুচমুচে ক্লিপ- তাঁর ছকভাঙা জীবনে অতিবিবাহ থেকে ধর্ম পরিবর্তন , রাজনীতির গল্প বাঙালির মন খারাপের দিনগুলোই দিয়েছে কমিয়ে। জ্ঞান হবার পর থেকে শুনে আসছি সুমন ভালোই শিল্পী কিন্তু লোকটা খারাপ। কতবার কতো রকমভাবে সেইসব প্রমাণের জ্বলন্ত নুড়ি তেনারা কুড়িয়ে এনেছেন ‘বনবাদাড় ডিঙিয়ে, কাঁটাতার পেড়িয়ে, ব্যারিকেড পেরিয়ে’। তাও যেন প্রমানের খনি খননে খামতি রয়ে গেছে বিস্তর। তাই চাই আরো প্রমাণ। প্রমাণের সমস্ত পরমান্ন পান করে এইসব মান্যবরেরাই আবার সুমনের গানের youtube পেজের তলায় অবলীলায় লিখে দিচ্ছেন “মোল্লা তোর মাকে…” , অর্থাৎ শ্রোতাকুলের ‘সাধারণ’ মানুষ হয়ে ওঠার লাইসেন্স ওনারা আগেভাগেই নিয়ে রেখেছেন কিন্তু শিল্পীকে ‘সাধারণ’ মানুষ হয়ে ওঠার লাইসেন্স ওনারা কোনোদিন দেবেন না। শিল্পীকে ওনারা একটাই লাইসেন্স দিয়ে রেখেছেন সেটা হলো একজন রেজিস্টার্ড পবিত্রতাবাদী পুণ্যবান হয়ে ওঠার লাইসেন্স।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে সময়ের কশাঘাতের মোকাবিলায় সুমন সংগীতকে প্রজ্বলিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন । এই গানগুলোর সুর শুধুই যে লিরিককে আষ্ঠেপিষ্ঠে অমোঘ ভাবে জড়িয়ে আছে তা তো নয়ই বরং অনেকক্ষেত্রেই সুর কথাকে অতিক্রম করছে , লিবারেট করছে। সংগীতকার সুমন হয়ে উঠছেন রাজনৈতিক সুমন। তাঁর এহেন সৃষ্টির মেরুদণ্ডে রয়েছে সময়ের ওঠা-পড়া, একটা বিপদবোধ এবং একটা নাছোড় নাগরিক দায় । যেখান থেকে তিনি কেবল আর্টিকেলে মুক্তির কথা লেখেন না বরং জনসমক্ষে চোখে চোখ রেখে তাঁর স্বতন্ত্র, জোরালো এবং সিধে ভাষ্য রাখতে পারেন । সংগীতি হুঁশিয়ার থেকে নাগরিক হুঁশে হুঁশিয়ার- এই অতিক্রম্যতাই সুমন। যদি ধরেওনি আপনাদের বিচারে তা কুৎসিততম তাও আমাদের কাছে এটাই বিশ্বস্ত সুমন। কারণ এটাই একজন ‘গণ’শিল্পীর সহজাত চলন।তাই এটাই সমকালীন সুমন। তকমার বাইরে এসে আমরা কখনোই নাগরিক সুমনকে দেখতে চাইনি, বার বার এই সেলিব্রিটি তকমা ভেঙে তাঁর এই সাহসী, রাজনীতি সচেতন নিতান্ত একজন আয়কর দেওয়া আমার-আপনার মতন সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠার সুমনোচিত উত্তরণকে আমরা ধরতেই পারিনি। উল্টে আমরা চমকে গেছি বারবার, যেন একটা অপরিজ্ঞাত, অবিশ্বস্ত কিছু যা ক্রমাগত হয়ে উঠেছে স্রেফ বিদ্রুপ, তাচ্ছিল্য আর খিল্লির রসদ। প্রথমে আমরা নিবিড় সুমন শ্রোতা-অনুগামী হিসেবে সংস্কৃতি মনস্কতার ডিগ্রী অর্জন করি তারপর ‘সুমন-কড়চায়’ গবেষণা করে Phd অর্জন – এই করতে করতে সুমনের শ্রোতা থেকে কখন যেন হয়ে উঠি সুমনের পিতা, রইলো বাকি postdoctoral experience, সেখানে চলে পিতার কর্তব্য অর্থাৎ সুমনের ঠিক-ভুল, উচিত-অনুচিত নির্ধারণের অনুশীলন ।

কোনো সাজানো শিল্পের সময়হীন অমোঘ বন্দিত্বে, বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীতার বিশুদ্ধতাবাদের বাগানে নিতান্তই এক লাজুক দুমুখো চারা হয়ে অথবা কোনো সুশীল X-বাদী, Y-বিপ্লবী (Y = প্রতি, অতি, অ) লাল পার্টির আজ্ঞাবহ নতমস্তক, ক্লারিক্যাল সৈনিক হিসেবে পিছনে খুচরো কাঠি করা যায় , সুমনানুসন্ধান করা যায় না । আসলে শতাব্দী প্রাচীন শুকনো সুশীল ঔচিত্য আর শুকনো সুধী সৌজন্যে মোড়া এই ‘সু’ মার্কা বৃদ্ধ বঙ্গ জাহাজটা খুব বেশিদূর সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে পারেনা, ঘুরেফিরে সেই ৫টা বিয়ে, ৪টা রিপাব্লিকান খিস্তি , আর চাটুজ্জে থেকে মোল্লা এই হিঁদু-মোছলমান বন্দরে তাকে বারবার অসহায় নোঙ্গর করতেই হয়।

অনীক রুদ্র :
Mandelstam Institute for Theoretical Physics, WITS, Johannesburg, South Africa.
কুন্তল ভট্টাচার্য :
School of Physics, Hyderabad Central University, India.

2 Comments

  • লেখাটি অনবদ্য। পড়ে চোখে জল এলো। আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম। অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন।

  • লেখাটি অনবদ্য। পড়ে চোখে জল এলো। আপনাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম। অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post