• December 4, 2022

“রাষ্ট্রবাদ ও নৈরাষ্ট্র”

 “রাষ্ট্রবাদ ও নৈরাষ্ট্র”

পীযূষকান্তি মুখোপাধ্যায়

বাকুনিন দ্বারা ১৮৭৩ সালে লিখিত “রাষ্ট্রবাদ ও নৈরাষ্ট্র” (Statism and Anarchy) নামক গ্রন্থ থেকে কিছু উদ্ধৃত অংশ আমার হাতে আসে। পরিচিত কিছু বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীদের কথায় ওই লেখার অংশগুলি পড়ে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানাতে এই রচনা।
(সমস্ত অনুবাদ এই প্রবন্ধের লেখকের দ্বারা কৃত।)
প্রথমটি “রাষ্ট্রের মার্কসীয় তত্ত্বের সমালোচনা” (Critique of Marxian theory of the state) শীর্ষক রচনার উদ্ধৃতাংশ। এই সম্পূর্ণ রচনাটি পড়ার সুযোগ না থাকায়, শুধুমাত্র এর আমার পড়া অংশবিশেষের মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকছে।

বিপ্লবের পরবর্তী কালে সমাজতন্ত্র গঠনকালীন সময় উৎক্রমণকালীন রাষ্ট্র-এর অস্তিত্ব সম্বন্ধে মার্কস যা যা বলেছিলেন ১৮৭৩ সাল অবধি তার-ই পরিপ্রেক্ষিতে বাকুনিন মূলতঃ অত্যল্প সংখ্যার উচ্চচেতনাসম্পন্ন মানুষ যাঁরা সংগঠনের নেতৃত্ব, তাঁদের একনায়কতন্ত্র জনগণের নামে, – এই ধরনের সংখ্যালঘুর একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপত্তি ও সাবধানবাণী জানিয়েছেন।
এটা করতে তাঁকে কিছুটা বিস্তারে যেতে হয়েছে, যারফলে এই প্রবন্ধ লেখকের মতে কিছু কিছু সঠিক ও কিছু কিছু বেঠিক কথা তাঁকে বলতে হয়েছে।
সম্পূর্ণ মুক্তির দিকে জনগণের পথ বা নৈরাষ্ট্রবাদী সামাজিক বিপ্লবের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে, এই মুলভূত শক্তি জনগণের তরফ থেকে আসবে, সমস্ত বাধাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে এবং তারপরে জনগণের আত্মার গভীর গহন থেকে উদ্ভূত হবে সমাজ জীবনের সৃজণাত্মক নতুন রূপ। উনি একটা নতুন পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, ‘অধিবিদ্যক’ (Metaphysician) যা দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন হেগেলের শীষ্যসমূহকে প্রত্যক্ষবাদীদের (Positivists), এবং সাধারণভাবে বিজ্ঞানকে দেবীরূপে যারা পূজা করেন তাদের সকলকে।
এমনিতে ঠিকই আছে। জনমানুষকে এবং সমাজকে কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের দ্বারা যখনই সীমাবদ্ধ করে ফেলতে চাওয়া হয়েছে, তখন-ই সমাজ এবং গণমানুষ প্রমাণ করে দিয়েছে, যে তাকে তত্ত্ব দিয়ে সম্পূর্ণ জানা বোঝা যাবে না, বাঁধা যাবে না। সে তার বাইরেও আছে। কিন্তু যে রহস্যময় গভীর গহনের কথা বাকুনিন ভেবেছেন, বলেছেন, বাকুনিনের সওয়াশো বছর পর দাঁড়িয়ে, গত সওয়াশো বছরের ইতিহাসকে মনে রাখলে বলা যায়, তিনি একটু মোহ (Fetish)- এর চোখে জনমানসের গহন গভীরতা, ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।
বাকুনিনের সত্তর-আশি বছর পর সমাজমনস্তত্ত্ব, গণঅবচেতনা ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত কাজ করেছেন ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের এরিখ ফ্রম, হর্কহাইমার ও অপ্রত্যক্ষভাবে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলেরই আরো কয়েকজন। ওয়াকিবহালদের মত অনুসারে, তাঁদের কাজগুলি থেকে বোঝা যায় উৎপাদন ব্যবস্থার জটিলতার সঙ্গে সমাজমনস্তত্ত্বের জটিলতার স্তর সম্পর্কযুক্ত। এমনকি উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতা ও অন্যান্য বিচ্ছিন্নতার স্তর। যদিও এই নির্ভরতা সরলরৈখিক নয়। উৎপাদন ব্যবস্থা সমাজের চিন্তনপ্রণালী, চিন্তার বিষয়বস্তুকেও প্রভাবিত করে। ফলে সমাজমনস্তত্ত্বের গহন গভীরে খুব একটা রহস্যময় কিছু থাকে না। যা সে অভিজ্ঞতায় পেয়েছে, কল্পনায় পেয়েছে তাই দিয়েই তার ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী হয়।
যে সমস্যাগুলিতে সমাজ বর্তমানে ভুগতে বাধ্য হচ্ছে, ভবিষ্যতে সমাজে সেগুলি যেন না থাকে এই ভাবেই সে ভবিষ্যতকে সাজাতে চাইবে। ভবিষ্যতের সমাজের রূপও বর্তমান সমাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত-ই হবে। তার থেকে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ত হবে।
“রাষ্ট্রের মার্ক্সীয় তত্ত্বের সমালোচনা” শীর্ষক অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতাংশটি পড়ে দেখলে দেখা যাবে, এরইমধ্যে বাকুনিনেরর সমাজ বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গীর সীমাবদ্ধতা যেমন প্রকট হয়ে উঠেছে, তেমন এক প্রাচীন বিপ্লবীর অসীম সামাজিক অভিজ্ঞতাসঞ্জাম প্রজ্ঞাও বারে বারে ঝলসে উঠেছে। মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে বাকুনিনের ক্রান্তদর্শিতার অন্যতম প্রমাণ নিচে উদ্ধৃত অংশ –
” যদি কখনো সমাজকে পথ দেখানোর একমাত্র উপায় হিসাবে তাত্ত্বিক দূর-কল্পনা (Theoretical Speculation) উঠে আসে, যদি সমস্ত সমাজ চালনার একমাত্র দায়িত্ব বিজ্ঞানের হাতে চলে যায়, জীবন উবে যাবে (would wither) এবং মানবসমাজ পরিণত হবে একটা মূক, বংশদের পালে। বিজ্ঞানের দ্বারা জীবনের ওপর আধিপত্য করাতে মানবজাতিকে বর্বর করে তোলা ছাড়া আর কোনো ফল প্রদান করতে পারে না।”
বিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া, চীন ইত্যাদি দেশে সমাজতন্ত্রের যেসকল তথাকথিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছ, তাতে সেসব দেশের জনগণের যা পরিনত হয়েছে তা দেখলে বোঝা যায় মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে কি অসামান্য প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন বাকুনিন।
উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপ-আমেরিকার কুখ্যাত ‘বিজ্ঞানপুজো’র বিরোধিতা করলেও, বিপ্লবোত্তর সমাজের শিক্ষা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বিজ্ঞান শিক্ষার কথা বললেও আলাদা করে কলা ও মানবিকীবিদ্যা সম্বন্ধে বলেন নি। যদিও তাঁর উদ্দিষ্ট সমাজ গঠনে দর্শন, শিল্পকলা ও মানবিকীবিদ্যা খুবই সহায়ক হতে পারত।
বাকুনিন দ্বন্দ্ববাদ (Dialectics) কে কি চোখে দেখতেন তার প্রকাশ্য মন্তব্য না থাকলেও, তাঁর তত্ত্বের বয়ানে পাওয়া যাচ্ছে তিনি বিষয়গুলিকে দ্বন্দ্বমূলকভাবে দেখতেন না বা দেখতে পারতেন না।
যেমন অধিবিদ্যক ও বিজ্ঞানের পূজারীদের বিরোধিতায় বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন প্রাকৃতিক এবং সামাজিক জীবন সবসময়ই তত্ত্বের আগে আসে, যে তথ্য হচ্ছে প্রাকৃতিক ও সামাজিক জীবনের অভিব্যক্তিগুলির মধ্যে একটি, কিন্তু কখনোই প্রাকৃতিক ও সামাজিক জীবনের স্রষ্টা নয়। এখানে বাকুনিনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে মোহাবিষ্ট(Fetish) থাকার কারণে উনি বিষয়টিকে দ্বান্দ্বিকভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
প্রকৃতি এবং সমাজ তত্ত্বের স্রষ্টা- এই কথাটা যেমন প্রথমে সত্য ঠিক, তেমনই ঐতিহাসিকভাবে পরবর্তীকালে এটাও সত্য যে তত্ত্ব ও তত্ত্ববিজড়িত দৃষ্টিভঙ্গী ধীরে ধীরে সমাজ ও প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে, পরিবর্তিত করে ও পুনঃসৃষ্টি করে।
যেমন ধরুন, পৃথিবীর মানবকেন্দ্রীক তত্ত্ব (সবার ওপরে মানুষ সত্য) ও সেই তত্ত্ব বিজড়িত দৃষ্টিভঙ্গি পৃথিবীর বিভিন্ন মানবসমাজ গুলিতে গত আড়াই তিন হাজার বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে। তত্ত্বের উদ্ভব নিঃসন্দেহে প্রকৃতি ও তৎকালীন মানবসমাজের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত উপলব্ধি থেকেই হয়েছে। সেই সময়কার মানুষ বাস্তব জীবন থেকে উপলব্ধি করেছিল অন্যান্য সব পশুপাখির থেকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং প্রকৃতির ওপর মানুষের প্রজাতিগত সাম্প্রদায়িক কর্মপ্রচেষ্টা একধরনের আধিপত্য নিয়ে আসছে। কিন্তু আড়াই তিন হাজার বছর আগে সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মোট সংখ্যার অনুপাতে মানুষের মোট সংখ্যা কত ছিল তা না জানা গেলেও অন্যান্য সমস্ত ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে খুব নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে সামান্য কিছু শতাংশর(ধরুন দুই থেকে তিন শতাংশ) থেকে বেশি নয়। মানুষের পোশা গবাদি পশুর অনুপাত ছয় থেকে নয় শতাংশ ছিল সমস্ত স্তন্যপায়ীদের মোট সংখ্যার তুলনায়। তাহলে মানুষ ও তার পালিত গবাদি পশুর মোট সংখ্যা সমস্ত স্তন্যপায়ী জন্তুদের মোট সংখ্যার দশ বারো শতাংশের বেশি হচ্ছে না। আড়াই তিন হাজার বছর ধরে নরকেন্দ্রিক(Anthropocentric) মতাদর্শের প্রভাবে মানবসমাজ প্রকৃতির ওপর নিজের(মানবসমাজের)
মধ্যে বিপুল পরিবর্তন এনেছে। পাখিদের সংখ্যার মধ্যে মানুষের পোষা হাঁস-মুরগির সংখ্যা পাখিদের মোট সংখ্যার কত শতাংশ ছিল আড়াই তিন হাজার বছর আগে এবং বর্তমানে সেই শতকরা সংখ্যা কত, সেটা বিচার করলেও আমরা একই ছবি পাবো।

সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে আজকের পৃথিবীতে স্তন্যপায়ি প্রাণীদের ৬০% হলো মানুষের পোষা গবাদিপশু, ৩৬% হলো মানুষ নিজে এবং অন্যান্য সকল স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্রাণীর হল অবশিষ্ট ৪% (চার শতাংশ)। একইরকম ভাবে পাখিদের মোট সংখ্যার ৭০ শতাংশই হলো মানুষের পালিত হাঁস-মুরগীর সংখ্যা।
[সূত্র : 1. The Dominant Animal : Human Evolution and the Environment/ Paul, R. Ehrlich and Anne H. Ehrlich/ 2009/ Island Press, U.S.A.

  1. The Biomass Distribution on Earth Proceedings of National Academy, U.S.A./ Yinon M Bar-on, Rob Phillips and Ron Milo/ U.S.A/ 2018/ 115(25) : 6506-6511]

তাহলে দেখা যাচ্ছে তত্ত্ব এবং তত্ত্বের প্রভাবিত দৃষ্টিভঙ্গি পৃথিবীতে স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখিদের এবং মানুষদের সংখ্যার ওপর বিশাল বড় মাপের পরিবর্তন এনেছে। ওপরের আলোচনায় যা নিয়ে একটি কথাও বলা হয়নি, সেই উদ্ভিদের প্রজাতিগত সংখ্যা ও মোট সংখ্যা এবং তদনুপাতে মানুষের পোশা উদ্ভিদদের প্রজাতিদের সংখ্যা ও মোট সংখ্যা যদি বিচার করা যায়, তবে দেখা যাবে আড়াই তিন হাজার বছর আগে ভূপৃষ্ঠের বড় অংশই প্রাকৃতিক অরণ্যে আবৃত ছিল, বর্তমানে যা খুবই কমে গেছে। শুধু তাই নয়, যত সামান্য অংশে অরণ্য আছে তাও ভীষণ দ্রুত মানুষের লোভের আগ্রাসনে মিলিয়ে যাচ্ছে।
তাহলে তত্ত্ব যে প্রকৃতি এবং সমাজকে পরিবর্তিত করে প্রায় পুণঃসৃজন করে তা আশা করি বোঝা যাচ্ছে। দ্বান্দ্বিকতা এটাই শেখায় যে এই প্রভাব পারস্পরিক হয়। কোনো ঘটনাকে দেখতে গেলে তার গতিশীলতায় তাকে দেখতে হয় কারণ কোনো কিছু স্থানু বা স্থবির নয়। প্রকৃতিতে, সমাজে সবই সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনমান।
মানুষের জীবনের স্বতন্ত্রতা এবং বিশিষ্ট বিকাশের সম্বন্ধে বাকুনিনের ভাবনাচিন্তা ও মোহাবিষ্টের বা ফেটিশের স্তরেই রয়ে গেছিলো, যেটা তাঁর মত চিন্তাবিদের একটা দুর্বলতা।
তাঁর রচনায় এরপর বাকুনিন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সম্বন্ধে সমালোচনা করেছেন এবং বিপ্লবীদের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য বিস্তার করেছেন। তাঁর সমস্ত সমালোচনামূলক বয়ান জুড়ে বিরোধীপক্ষ অর্থাৎ মার্কস, এঙ্গেলস ও তাঁদের অনুরাগীদের সম্পর্কে তাঁর একটা সন্দেহ ফুটে বের হচ্ছে যেটা হলো তাঁরা নিজেদের একনায়কতন্ত্র কায়েম করার উদ্দেশ্যে যাবতীয় যুক্তি সাজাচ্ছেন। কিন্তু বিপরীতক্রমে তাঁরা কিন্তু কতগুলো বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থেকে তাঁদের যুক্তি বিস্তার করেছেন, যে বাস্তব সমস্যাগুলির মধ্যে কয়েকটিকে কোনো অজ্ঞাত কারণে বাকুনিন অভিভাষিত-ই করেননি। কিন্তু মার্কসের পরবর্তীকালে মার্কসের অনুগামীদের বেশিরভাগের সম্পর্কে বাকুনিনের আশঙ্কা কিন্তু সত্যি হয়েছিল।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে তখন অবধি প্যারিস কমিউন ছাড়া আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা সর্বহারার পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য হয়নি। রুশ বিপ্লব তখনও চুয়াল্লিশ (৪৪) বছর ভবিষ্যতের গর্ভে। রাশিয়ার ১৯০৫-এর ব্যর্থ বিপ্লব প্রচেষ্টাও তখনো একত্রিশ বত্রিশ বছর ভবিষ্যতের গর্ভে। সেইজন্য বিবাদমান দুই পক্ষেই অর্থাৎ বাকুনিন ও মার্কস অনেক শুকনো তর্ক-বিতর্ক করে করে সত্যিকারের বিপ্লবের সম্পর্কে নিজেদের মনের গভীরে থাকা ধারনা গুলিকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করে চলেছেন।
তাই বাকুনিন যখন চল্লিশ মিলিয়ন বা চার কোটি জার্মান সর্বহারার সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন, বাস্তবে সম্ভব কি না প্রশ্ন করছেন, মার্কস তাঁর Conspectus on Statism and Anarchy 1874 (রাষ্ট্রবাদ নৈরাষ্ট্রের ওপর সামগ্রিক নিরীক্ষণ, ১৮৭৪) গ্রন্থে জোর দিয়ে সমর্থন করেছেন ঐ সম্ভাবনার বাস্তবতায়।
কিন্তু বাকুনিন ভুলে গেছেন যে মার্কস-এঙ্গেলস দুজনেই শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র সম্পর্কে বাস্তব উদাহরণ হিসেবে প্যারিস কমিউনকেই সজোরে তুলে ধরেছেন। মার্কস তাঁর ইতিমধ্যেই প্রকাশিত লেখা ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ ১৮৭১-তে প্যারিস কমিউনকে প্রথমে নিঃশর্ত সমর্থন করে তারপর মার্কসের নিজের মতে তার ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। দুপক্ষই উত্তেজনার ঘোরে এরকম কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখতে পাচ্ছিলেন না।
বিপ্লবের পরে একসঙ্গে রাষ্ট্রকে তুলে দিতে বলেছেন বাকুনিন। সেটা করতে পারলে বেশ কিছু দিক থেকে ভালো হতো এবং ভাবাবেগগত দিক থেকে এরকম কাজের সম্পূর্ণ সমর্থন থাকলেও বাস্তবে এই মতটিকে সম্পূর্ণ সমর্থন করতে গেলে মনে কতগুলো প্রশ্ন জাগে। যে প্রশ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে মতটিকে সমর্থন করা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্নগুলি এরকম : রাষ্ট্র কি? রাষ্ট্রের উৎপত্তি কোথা থেকে হয়? রাষ্ট্র কি, এই প্রশ্নের উত্তরে মার্কস, এঙ্গেলস লেনিন তিনজন আলাদা আলাদা কথা বলেছেন। তিনজনের সংজ্ঞায় সাধারণ মিলের জায়গাটা হল, রাষ্ট্র পরস্পর বিরোধী দুটি শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংগ্রামের ফলে ইতিহাসের পথ বেয়ে উদ্ভূত হয়েছিল।রাষ্ট্র একটি শ্রেণীর দ্বারা বিপরীত শ্রেণীকে দমনের যন্ত্র, এবং ইত্যাদি।

রাষ্ট্র যদি শ্রেণীসংগ্রামের একটি বিশেষ স্তরে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত হয়, তাহলে যতদিন বিবাদমান শ্রেণীর মধ্যে বলপ্রয়োগ ছাড়া শুধু আলোচনার মধ্যস্থতায় বিরোধীকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা যাবে না, ততদিন রাষ্ট্র থাকবে। কারণ যাই বলা হোক না কেন রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বলপ্রয়োগের এবং দমনের যন্ত্র একটি শ্রেণীর হয়ে আরেকটি শ্রেণীকে। যদিও শুধু এটুকুই সব নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে বিপ্লবের অব্যবহিত পরে পরেই কি হেরে যাওয়া শ্রেণী বা পুঁজিপতি শ্রেণী অবলুপ্ত হয়ে যাবে? বিপ্লবের জ্যাকোবিয়ান কার্য্যকলাপ ঠিক কতখানি গনহত্যার অনুমতি দেয়? পুঁজিবাদের মতাদর্শ শুধু পুঁজিবাদীদের মধ্যেই তো নয়, অনেক খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যেও থাকে, দীর্ঘদিন থেকে যায়। প্রাক্-ধনতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রভাবও জনগণের একটা বিরাট অংশের মধ্যে বহুদিন থাকে, থেকে যায়। এত সংখ্যক সাধারণ মানুষ যাদের মধ্যে সামন্তী ও বুর্জোয়া মতধারা আছে তাদের বিপ্লবের পরপর-ই কি মেরে ফেলা যাবে? মেরে ফেলা কি উচিত হবে? বাস্তবে তা সম্ভব হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, শ্রেণীগুলো তৈরি হয় কোত্থেকে? যদি উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে উৎপাদন-সম্পর্ক ও শ্রেণীগুলি জন্ম নেয় তাহলে বিপ্লবের পরপর-ই উৎপাদন-ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে হবে যাতে বুর্জোয়া বা পাতিবুর্জোয়া কোনো উৎপাদন সম্পর্কই পুনরুৎপাদিত না হতে পারে। সাথে সাথে প্রাক্-ধনতান্ত্রিক উৎপাদন সূত্রও উচ্ছিন্ন হয়। এগুলো সব-ই করা সম্ভব। কিন্তু একদিনে নয়। তাহলে বিবাদমান শ্রেণী ও তাদের মধ্যে সংগ্রাম থাকছে। তাই যদি হয় তবে তার অভিব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্র বা তার মত কিছু একটা জিনিসও থাকছে। যতদিন শ্রেণীর অবলুপ্তি না হয়। তার মানে, বিপ্লবের পরেও কিছুদিন অন্ততঃ রাষ্ট্র থাকছে। বিপ্লবের নেতারা নিজেদের একনায়কতন্ত্র জনগণের নামে চালাতে চাইছে বলে নয়, সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির বাস্তব অবস্থার বাধ্যবাধকতায়।
কিন্তু এখানেই একটা মোড় আছে। রাষ্ট্র থাকে নেতারা চাইছে বলে নয়, রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজব্যবস্থার বাস্তব অবস্থার বাধ্যবাধকতায়, প্রথম প্রথম এটা সত্যিই। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়, থেকেই যায়, ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকে, হতেই থাকে। বিংশ শতাব্দীতে “বাস্তবের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র”-গুলি এই ঘটনাই দেখিয়েছে। কেন কিভাবে, তার কারণ উৎপাদন ব্যবস্থায় সেই পরিবর্তন আনা হয়নি যে পরিবর্তন উৎপাদন সম্পর্ককে বদলাতে পারবে। কেন আনা হয়নি? প্রশ্নের উত্তর হিসেবে যা পাই তাকে সর্বসমক্ষে স্বীকার করার যদি সৎসাহস থাকে তবে বলতেই হবে কারণগুলি বাকুনিন আগেই বলে গেছেন : কারণ সংখ্যালঘু নেতৃত্ব চাইছিলো না রাষ্ট্র উবে যাক। তারাই রাষ্ট্রের চালক ছিল তো!
বাস্তবে রাশিয়ার বিপ্লবের পর এমন কিছু একটা ঘটেছিল যা বাকুনিন আন্দাজ করতে পারেননি। একের পর এক ভেতর থেকে পূর্বতন শাসক শ্রেণী অর্থাৎ বুর্জোয়াদের ও সামন্তীদের সশস্ত্র অভিযান বলশেভিকদের উৎখাত করতে এবং পাঁচ-ছ’টি বুর্জোয়া রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাশিয়াকে ভেঙে দিতে চেষ্টা চালাচ্ছিল। এরকম অবস্থায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে বুর্জোয়া-সামন্তীদের দমন চালাতে একটি সর্বোৎকৃষ্ট দমন-যন্ত্র প্রয়োজনীয় ছিল বলে ভাবা হয়েছিল যেটা ছিল বলশেভিক সোভিয়েত রাষ্ট্র।
জনগণের সশস্ত্র মিলিশিয়া যদি সারা রাশিয়া জুড়ে থাকতো তাহলে নিয়মিত সেনাবাহিনী যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘লালফৌজ’-এর দরকার পড়তো না। কিন্তু তা ছিও না, করার উদ্দেশ্যও ছিল না নেতৃবৃন্দের। যেমন ইচ্ছা ছিলনা উৎপাদন-সম্পর্ক পরিবর্তিত করার। অজুহাত পরিস্থিতির দেওয়া হয়েছিল, যে অজুহাত আংশিক সত্যমাত্র।
মোটের ওপর বাকুনিনের ভবিষ্যৎবাণী মিলে গেছিল বিংশ শতাব্দীর বিপ্লবোত্তর দেশগুলিতে কারণ মানব-প্রকৃতি সম্বন্ধে তাঁর ধারনা অনেক বেশি সঠিক ছিল।
বাকুনিন যখন বলেন স্বাধীনতা সৃষ্টি হয় কেবলমাত্র স্বাধীনতার দ্বারাই। নিচে থেকে উঠে আসা স্বেচ্ছায় ঐক্যবদ্ধ সংগঠন জনগণের দ্বারা গড়ে উঠবে, তখন বোঝা যায় “বাস্তবের সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র” যে চেষ্টাটা কখনও করেনি, তিনি তাই করতে বলেছিলেন। যদিও তাতে শাসকশ্রেণীর নিয়মতান্ত্রিক নিয়মিত সেনাবাহিনীকে আটকানো যাবে কি না তার গ্যারান্টি নেই, কিন্তু যেটা নেই সেটা তৈরি করা-ই তো বিপ্লবের কাজ।
“রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ” যা লেনিন শুরু করেছিলেন তাতে বাকুনিন-কথিত পদক্ষেপগুলি নেওয়া আরও অসম্ভব হয়ে পড়তে লাগল যত বছর গড়াতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা রাষ্ট্রের এবং লেলিনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে “আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ”-এ পরিণত হল। লেনিন অনেক আক্ষেপ করলেন, রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ তার জবরদস্ত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করল ও সমাজতন্ত্র গড়ার সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেকগুলি ঠুকতে লাগল।
“সামাজিক বিপ্লবের কিছু পূর্বশর্ত” শীর্ষক রচনাংশটিতে বাকুনিন তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতা থেকে ইউরোপীয় সর্বহারাদের এক ধরনের বর্গীকরণ করেছেন। তাঁর মতে জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডের সর্বহারারা অনেক বুর্জোয়াকৃত। রোজগারটা কম, তা না হলে আর কিছুতেই তাদের সঙ্গে বুর্জোয়াদের পার্থক্য নেই। বিপরীত পক্ষে রাশিয়া ও ইতালির সর্বহারা অনেক বেশি শোষিত ও দরিদ্র, অক্ষরজ্ঞানহীন কিন্তু বিপ্লবী জোশে ভরপুর। এদের সম্পর্কে নাকি মার্কস লুম্পেন সর্বহারা বলেছেন। কিন্তু মার্কস লুম্পেন সর্বহারাদের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে দারিদ্রটা মোটেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ নয়। লুম্পেন সর্বহারা পরিভাষাটি প্রথম মার্কস ব্যবহার করেন “দ্য এইটিন্থ ব্রুমেয়ার অফ লুই বোনাপার্ত” রচনায় ১৮৫২ সালে। লেখাটিতে লুম্পেন সর্বহারার চরিত্র-বিশ্লেষণও ছিল প্রসঙ্গক্রমে।
কিন্তু বাকুনিন সর্বহারা প্রসঙ্গে ইউরোপীয় সর্বহারাকে উপরে বর্ণিত দুই ভাগে ভাগ করে অনেক কথা বললেও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা যেটা এই প্রসঙ্গে বলা দরকার ছিল সেইটা বলেন নি। সেটা হল : সর্বহারা বুর্জোয়াদের মত হোক বা লুম্পেন হোক্, যদি বিপ্লব চলাকালীন নিজেদের আমূল পরিবর্তন না করে, তবে তারা কোনো সত্যিকারের তাৎপর্যপূর্ণ বিপ্লব সম্পন্ন করতে পারবে না। নিজেকে বদলাতে বদলাতে দুনিয়াটা বদলাতে হবে।
এই লেখাটিতে বাকুনিন কি কি উপাদান থাকলে জনগণ সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটায়, সে সম্পর্কে তাঁর ধারণা বলেছেন। তাঁর মতে কৃষিক্ষেত্র এবং শিল্পকারখানার শ্রমিকরা কমিউনগুলি এবং প্রদেশগুলির সংঘের স্বাধীন অংশগ্রহণে গড়ে উঠবে সংগঠন।
এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বাকুনিন শাসকশ্রেণী যে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে শেষ উপায় হিসেবে সে কথাও বলেছেন। জনগনের পক্ষ থেকে শুধু সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কথাই বলেছেন কিন্তু একটি নিয়মতান্ত্রিক স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর দীর্ঘকালব্যাপী আক্রমণের মুখে জনগণ কিভাবে লড়বে সে কথা বলেননি। সে সম্ভাবনার কথা ওনার মাথায় ছিল না বলে মনে হয়। শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে আঁকাবাঁকা পথ ধরে গৃহযুদ্ধ ও গেরিলা যুদ্ধের ধারণা বাকুনিনের পরবর্তী (Protracted Civil War) শতাব্দীতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলেছিল।
শাসকশ্রেণীর অস্ত্র গুলির বর্ণনা করার সময় একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের কথা বলেননি, কারণ তিনি সেটাকে ধরতে পারেননি বোধহয়। অথবা অন্যত্র বলেছেন এমনও হতে পারে। সেই অস্ত্রটা হলো শাসকশ্রেণীর মতাদর্শ। যা সমাজে আধিপত্যকারী অবস্থানে থাকে। বিংশ শতাব্দীতে এই ব্যাপারে ইতালীর কমিউনিস্ট পার্টির আন্তোনিও গ্রামশী প্রথম বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।পরে এই বিষয়ে আরও কিছু বলেন ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির লুই আলথুজার। সেগুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাকুনিন তাঁর সময়কার রাষ্ট্রগুলির প্রসঙ্গে রাষ্ট্রগুলির ক্রমাগত বিস্তারে যাওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলেছেন ক্ষমতা ও সম্পদের ক্রমাগত কেন্দ্রীকরণের যে পুঁজিবাদী বাধ্যবাধকতা, তার আনুষাঙ্গিক হিসাবে। এরপর তিনি এমনকি শ্রেণি গুলির বিলুপ্তির কথাও বলেছেন কিন্তু কিভাবে সেটা সম্ভবপর হবে সে ব্যাপারে কোনো আলোকপাত করেন নি।
আসলে শ্রেণীগুলির উৎপত্তি হয় উৎপাদন-সম্পর্ক থেকে যা এক-একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সেইটা সম্ভবতঃ উনি বুঝতেন না। বা বলা যায় এই লেখাটি যখন লিখছেন তখনও অবধি বুঝতেন না। কিন্তু বোঝার কথা। কারণ ততদিনে মার্কসের ‘পুঁজি’ গ্রন্থের প্রথম খন্ড বেরিয়ে গেছে। হয়তো তিনি পড়তে সময়-সুযোগ পাননি।
আর শ্রেণী-সম্পর্ক থেকে শ্রেণিগুলির উৎপত্তি এবং শ্রেণিগুলির মধ্যে আন্তঃসংগ্রামের ফলস্বরুপ যে রাষ্ট্রের উৎপত্তি সে বিষয়ে ধ্রুপদী কাজটি অর্থাৎ ফ্রেডরীক এঙ্গেলসের “পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং রাষ্ট্রের উৎপত্তি” শীর্ষক গ্রন্থটিও তখনও উনিশ হাজার বছর ভবিষ্যতের গর্ভে।
কিন্তু এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যেটুকু উনি করেছেন এই গ্রন্থে তা খুবই অন্তর্দৃষ্টিতে সমৃদ্ধ এবং যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মানবপ্রজাতিকে বিশেষ করে ইউরোপের ও রাশিয়ার মানুষদের প্রকৃতিকে যে উনি কত ভালোভাবে বুঝতেন তা ওঁর এই লেখাটির সঙ্গে পরবর্তী এক শতাব্দীর ইউরোপের ও সারা পৃথিবীর ইতিহাস যদি মিলানো যায় তাহলে দেখা যাবে ওনার বেশিরভাগ কথাই অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। এই মহান বিপ্লবী ও তাত্ত্বিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। কমিউনিস্ট পার্টিগুলিতে তাঁর সম্পর্কে ও নৈরাষ্ট্রবাদ সম্পর্কে যে ভুল মনোভঙ্গী গড়ে তোলা হয়, যেন নৈরাষ্ট্রবাদ খুব খারাপ ও বিপ্লবীআনার ভন্ডামীর আড়ালে তারা বুর্জোয়াদের অনুচর, সেই ন্যক্কারজনক চরিত্রহননের প্রতি নেতী জানাচ্ছি।
কিন্তু আজকের পৃথিবীর সমস্যার সাপেক্ষে বাকুনিন ও মার্কসের উপরে আলোচিত মতামতগুলির প্রাসঙ্গিকতা কি ও কতখানি? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, আজকের পৃথিবীর সবথেকে প্রকট সমস্যা (বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটির লেখকের মতে) ভূ-উষ্ণায়ন, পরিবেশ-বিপর্যয় ও প্রজাতিগুলির গণ-অবলুপ্তি যা শুরু হয়েছে সাড়ে ছয় কোটি বছর পরে ষষ্ঠবার।
এই ভয়ঙ্কর সমস্যার কারণে বুঝতে মার্কসের বিভিন্ন লেখাপত্র বিশেষ করে ‘প্রকৃতির বিপাকীয় ফাটল’ বা ‘Metabolical Rift’ -এর বিষয়ে উনি যা যা লিখেছেন তা সাহায্য করবে। মার্কসের অনন্বয় বা বিচ্ছিন্নতা (Alienation) বিষয়ে ধারণাও এই সমস্যাকে বুঝতে অত্যাবশ্যক। সেরকম কোনো তাত্ত্বিক পর্যালোচনা আছে বলে ঠিক জানা নেই। তবে পুঁজিবাদকে থামিয়ে নতুন সমাজ গড়তে, নতুন উৎপাদন-সম্পর্ক গড়তে যা বিপাকীয়-ফাটলকে বোজাতে পারবে, বাকুনিনের মনোভঙ্গি ও অত্যন্তঃ প্রবল রাষ্ট্রবিরোধী মানসিকতা না থাকলে সেরকম সমাজ গড়ে তোলা কোনোদিন যাবেনা, রাষ্ট্রকে নিপাত্তা করা যাবে না।
দু’জনে দুজনার পরিপূরক। প্রকৃতি পরিবেশের সাথে সুস্থায়ী সঠিক সম্পর্ক গড়ে সাম্যবাদী সমাজ গড়তে কার্ল-মার্কস, ফ্রেডরীক এঙ্গেলস যদি হন মস্তিষ্ক, তবে বাকুনিন ও নৈরাষ্ট্রবাদ অবশ্যই সে কাজের হৃদয়।
[এবং সম্ভবতঃ গান্ধী ও তলস্তয়ের এ কাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। ভোগবাদ বিরোধী গ্রাম-স্বরাজ, তলস্তয়ের ব্রেড-লেবার তত্ত্ব প্রভৃতির।]

পীযূষকান্তি মুখোপাধ্যায় : পরিবেশ আন্দোলন কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post