• September 27, 2022

ভীমা-কোঁরেগাও মামলায় জামিনপ্রাপ্ত সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারঃ শেষ পর্ব

 ভীমা-কোঁরেগাও মামলায় জামিনপ্রাপ্ত সমাজকর্মী সুধা ভরদ্বাজের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারঃ শেষ পর্ব

[ সুধা ভরদ্বাজ নামটা অধিকার আন্দোলনের জগতপ বহু আলোচিত। বিশিষ্ট আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টিভিস্ট,সমাজকর্মী সুধা ভীমা-কোঁরেগাও মামলায় অভিযুক্ত হয়ে এতদিন কারান্তরালে ছিলেন।বর্তমানে তিনি শর্তাধীন জামিনে জেলের বাইরে।ছত্তিসগড় নিবাসী সুধাকে জামিনের শর্ত মেনে মুম্বাইতে তার জীবন নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। সম্প্রতি rediff.com এ তার এক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নীতা কোলহাতকর।সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ রইল পূর্বাঞ্চলের পাঠকদের জন্য। অনুবাদ করেছেন সুমন কল্যাণ মৌলিক ]

জেলে কোন কাজটা করতে আপনার সবচেয়ে ভালো লাগত?

জেলে সহ বন্দী মহিলাদের দেখা ও তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা ছিল খুব আনন্দের। এরা দারুণ রঙ্গোলি ও মেহেন্দি আঁকত।পুরানো ম্যাক্সি থেকে টপ ( মেয়েদের পোশাক) বানাত।সামান্য উপকরণে বানাতে পারত কানের দুল।তাদের সৃজনশীলতা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।দুর্ভাগ্যজনক হল এই সৃজনশীলতার বিকাশে জেল কর্তৃপক্ষ কোন সাহায্যই করে না।তাদের সাহায্য শক্তি ছাড়াই বন্দীদের সৃজনী শক্তির বিকাশ হয়।প্রকৃত পক্ষে তাদের সামান্য সূচ রাখারও অধিকার নেই। তাহলে সেলাই হবে কি ভাবে? বন্দীরা বাধ্য হয় কোথাও সূচ সূতো লুকিয়ে রাখতে।

আপনি একথা আগেই বলেছেন, আপনার কাজের চাপের কারণে নিজের মেয়েকে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন নি।কিন্তু আপনি একথা কখনো ভেবেছিলেন যে ইচ্ছেমত নিজের মেয়ের সঙ্গে দেখা করার স্বাধীনতাটুকুও আপনার থাকবে না?

না।আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ট্র্যাজেডি হল যে আমি মেয়ের সঙ্গে আরো বেশি সময় কাটাবো বলে দিল্লি এসে ছিলাম,ভেবেছিলাম মেয়ের ছোটবেলায় ওকে যথেষ্ট সময় না দিতে পারার যন্ত্রনাটা এভাবে লাঘব করব।ঘটনা ঘটল ঠিক তার উল্টো। ছত্তিসগড়ে আমার জীবন শুরু হয় ১৯৮৬ সালে।মেয়ের জন্ম ১৯৯৬ সালে।আমরা যখন একসাথে ছিলাম তখন ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টিভিস্ট হওয়ার কারণে হাজার মানুষের সঙ্গে জীবনকে ভাগ করে নিতে হত।এরপর আইনজীবী হিসাবে ব্যস্ত জীবন শুরু হয়ে যায়।ফলে মেয়ের জন্য যথেষ্ট সময় আমি দিতে পারি নি।এ নিয়ে ওর বিরক্তির যথেষ্ট কারণ আছে।২০১৬-১৭ সালে আমি সচেতন সিদ্ধান্ত নিই মেয়ের সঙ্গে আরো বেশি সময় কাটানোর।সে তখন কলেজ জীবন শুরু করছে,আমার উপস্থিতির দরকার।জীবনে সে সময় আমি প্রথম টাকার প্রয়োজন অনুভব করি।দিল্লির ন্যাশানাল ল ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর কাজ নিই এবং ২০১৭-১৮ সালে কাজটার সময়সীমাও বাড়ে।যখন আমি ভাবছি মেয়ের সঙ্গে আরো বেশি সময় কাটাতে পারব তখনই গ্রেপ্তারি। রাষ্ট্র আমার ও মেয়ের — দুজনের জীবন থেকে তিনটে বছর ছিনিয়ে নিল।তত্ত্বগত ভাবে জেলে আমাদের সপ্তাহে একদিন করে বাড়ির লোকের সঙ্গে দেখা করার ( মোলাকাত) সুযোগ মেলে।বিশেষ করে আমরা যারা ইউএপিএ ধারায় বন্দী তাদের জেলের নিয়মটা কঠোরভাবে বলবৎ করা হয়।আমাদের ক্ষেত্রে শুধু রক্তের সম্পর্কের ‘ আত্মীয় ‘ ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে হয়।আইনজীবীদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে দুদিন। আর বন্ধুদের ক্ষেত্রে অনুমতি নেই।

আমার মেয়ে বহুদূরে থাকত এবং তিন মাসে একবার আসতে পারত।তাই এই তিন বছরে সে মাত্র চার- পাঁচবার দেখা করতে পেরেছে।একবার ওর জন্মদিনে সে আমার সঙ্গে দেখা করার প্রচন্ড চেষ্টা করে।সেবার মেয়ে শুক্রবার চলে আসে যাতে শনি ও সোমবার আমার সঙ্গে দেখা করতে পারে।কিন্তু অনুমতির জন্য পাগলের মত ঘোরাঘুরি করতে হয়।কখনো ওকে বলা হয় এনআইএর কাছে যেতে,কখনো অন্য কোন কর্তৃপক্ষের কাছে। শেষমেশ ওর সঙ্গে আমার দেখা হয় সোমবার।সবার জানা আমার মেয়ে বহু দূরে থাকে ও তিনমাসে একবার আসতে পারে।তাও তার জন্য রাষ্ট্র একের পর এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।এটাই ভারতের জেলের অবস্থা।

আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনে ছিলেন।আপনি ভারতে এলেন এবং প্রান্তিক মানুষদের সাহায্য করার জন্য জীবন উৎসর্গ করলেন। সম্প্রতি তিন বছর জেলে থাকার পর আপনি জামিনে মুক্ত।এরপরেও আপনি ভারতকে ভালোবাসেন?

( হাসি) আমি মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছিলাম নেহাৎই মার্কিন দেশে জন্মানোর কারণে।সেখানে মা- বাবা তখন পোস্ট ডক্টরেট করছিলেন।আজ যখন তাদের কেউই বেঁচে নেই তখন একটা গোপন কথা প্রকাশ্যে আনতে চাই।আমার জন্ম এক দুর্ঘটনা, তখনই বাচ্চা নেওয়ার কোন পরিকল্পনা বাবা- মায়ের ছিল না।আমার মনে হয় আমার জন্মের কারণে তাদের বাজেটে সমস্যা হয়( হাসি)।আমি একবছর বয়সে দেশে ফিরে আসি এবং ভারতে কিছু বছর থাকি।এরপর মায়ের সঙ্গে ব্রিটেনে যাই,বাবা- মায়ের তখন বিচ্ছেদ হয়ে গেছে।এগারো বছর পর্যন্ত সেখানেই থাকি।আমার প্রাথমিক শিক্ষা ব্রিটেনেই হয়।

আমার জাতীয়তাবাদ হল মানুষকে ভালোবাসা। ( হাসি)আমার কিছু করার নেই এ বিষয়ে যে দেশের সব লোক সব লোককে ভালোবাসে না।আমি শ্রমিকদের ভালোবাসি কিন্তু তাদের মালিকরা তাদের তেমন ভালোবাসে না।মালিকরা তাদের কাজ কেড়ে নিয়েছে, অতিমারীর সময় হেঁটে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করেছে, কখনো নিরাপত্তা রক্ষী দিয়ে তাদের উপর গুলি চালিয়েছে। আমি নিরুপায় হয়ে দেখি কিছু মানুষ সংখ্যালঘু,দলিত ও আদিবাসীদের ভালোবাসে না,আমি মনে করি তারা বাকি ভারতীয়দের মতই ভারতীয়।আমি যদি এই মানুষগুলোকে ভালোবাসি,তার অর্থ এই নয় যে আমি দেশকে ভালোবাসি না।এটা খুবই কৌতুকের যে সরকার আমার বিরুদ্ধে সাতটি দেশবিরোধী ধারায় মামলা দায়ের করেছে। যদি এই অভিযোগগুলোর চরিত্র এতটা গুরুতর না হত তাহলে আমি হয়তো হেসে ফেলতাম।এই ভাবনার অর্থ হল আমার উচিত ছিল আইআইটি পাশ করে মার্কিন দেশে যাওয়া,গ্রীন কার্ড জোগাড় করে নিজের জন্য একটা ভালো ক্যারিয়ার তৈরি করে মার্কিন দেশের বাসিন্দা হওয়া। তাহলে সবাই বলবে, ‘ আমরা সুধা ভরদ্বাজের জন্য গর্বিত, তিনি নিজের জন্য কত না নাম অর্জন করেছেন’।এই যে পথ ভাগ হয়ে যাওয়া এবং নিজের জন্য সেই পথ বেছে নেওয়া যাতে কম মানুষ চলে– এর উপর একটা সুন্দর কবিতা আছে(The Road not Taken by Robert Frost)।আমি আমার পছন্দ মত পথে চলে দারুণ আনন্দ পেয়েছি। এই দুটো পথের মধ্যে একটা পথ বেঁচে নেওয়ার প্রশ্ন যদি আবার ওঠে তাহলে আমি আবার এটা করব।আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার কোন অনুশোচনা নেই,খুব খুশি আমি।

মুম্বাইয়ে বাড়ি খোঁজা শুরু হল? আপনি কি এখানে আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করবেন?

আমি বাড়ি খুঁজছি, আশা করছি দ্রুত পেয়ে যাব।সমাজের কিছু নিয়ম আছে,পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রশ্ন আছে।আমার মত মানুষকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া কারো পক্ষেই শক্ত।তবে আমি ভাগ্যবান যে বহু সাহসী বন্ধু পেয়েছি যারা পাশে আছে।আসলে আমার মুম্বাই শহরটাকে ভালো লাগছে।এখানে কাজ দ্রুত হয়।মুম্বাই সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা হল এটা কাজের লোকেদের শহর।আমি আশাবাদী এখানে কাজ পাব।তবে এখানে বাড়ি ভাড়া বেশি, জীবন যাপনের খরচও অনেক বেশি।আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করার জন্য ন্যূনতম পরিকাঠামো দরকার — বই,অফিস, ইন্টারনেট কানেকশন। আমি ছোট আকারে ওকালতির কাজটা আবার শুরু করার কথা ভাবছি।আমার দক্ষতা আছে,আছে ইচ্ছে ও আগ্রহ বিচারাধীন বন্দীদের সাহায্য করার।জেল থেকে ছাড়া পাবার আগে এব্যাপারে আমি অসংখ্য অনুরোধ পেয়েছি।অবশ্য এজন্য আমার পড়াশোনা শুরু করতে হবে বিশেষ করে নতুন শ্রম আইন ও অন্যান্য নতুন আইনের উপর।আমাকে নিজের পথ খুঁজে নিতে হবে(হাসি)।

সুধা,আপনার এই ট্রেড মার্ক হাসি!

( হা হা)।চেশেয়ার বিড়ালটার মত( লুইস ক্যারেলের অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড) এই হাসিটা আমার মুখে লেগে থাকে।এটা নিয়ে আমার কিছু করার নেই। এই হাসি নিয়ে আমার এক বন্ধু একটা মিম দেখিয়েছিল– গ্রেপ্তার হওয়ার পর আট মিনিট ধরে অর্ণব গোস্বামীর ( রিপাবলিক টিভি) তর্জন – গর্জন, চিল- চিৎকার,অন্য দিকে তিন বছর জেলে কাটানোর পর আমার হাসি মুখ।কেস একদিন শেষ হবে কিন্তু হাসিটা থেকে যাবে।এছাড়া আমি আর কি করতে পারি! হাসিমুখে সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়ানো আর জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post