• May 25, 2022

জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার ক্রমবিকাশ: এক সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

 জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার ক্রমবিকাশ: এক সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

বিজন পাল

মানুষ কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই নক্ষত্রের অবস্থান পরিমাপ করা শুরু করে ছিলেন অজানাকে জানার ও অদেখাকে দেখার দুর্দমনীয় বাসনা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মানুষের আকাশ পর্যবেক্ষণ, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দার্শনিকদের চিন্তা-কল্পনাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠলো জ্যোতির্বিদ্যা, যা পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মীয়, পৌরাণিক, মহাজাগতিক, ক্যালেন্ড্রিক্যাল, প্রাগৈতিহাসিক অনুশীলনে এর নিদর্শন পাওয়া যায়। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই মানুষ আকাশের নক্ষত্রদের নিরীক্ষণ করতেন অসীম আগ্রহ নিয়ে। আকাশের তারা ও গ্রহের গতি নিরীক্ষণ করা ছিল সময় বোঝার ও দিক নির্দেশনের সর্বোত্তম হাতিয়ার। কৃষি ও ধর্মীয় আচার এই নিয়মকে ধরেই চলতো।
পদ্ধতিগত জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণের প্রথম নথিভুক্ত রেকর্ডগুলি প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যাসিরো-ব্যাবিলনীয়নদের সময়কালের। মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় দোলনা থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশীয় বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন এবং তাদের পর্যায়ক্রমিক গতি রেকর্ড করেছিলেন। তখনও গ্রহ-নক্ষত্র গুলির দূরত্ব সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা ছিল না। কিন্তু নাবিকরা সমুদ্রযাত্রাকালে নক্ষত্রের অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করতেন। যাযাবর জাতিরাও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাত্রা করার সময় আকাশের নক্ষত্র দেখেই দিক নির্ণয় করতেন। যেমন ধ্রুবতারা আপাতভাবে স্থির, আসলে ধ্রুবতারাও ঘুরে চলেছে গতির নিয়ম মেনে। সহজ করে বলা যাক- একটি ছাতার ডান্ডিকে অক্ষ ধরে ছাতাকে বোঁ বোঁ করে ঘোরালে মাথাটি আপাতভাবে স্থির আছে বলেই মনে হয়। উল্লেখ্য-আগামী কয়েক হাজার বছর পর বর্তমান ধ্রুবতারার বদলে অন্য আর একটি তারা এই স্থান নেবে।
মানুষ বিভিন্ন নক্ষত্রের অবস্থান দেখে মাস, বছর নির্ণয় করতেন। যেমন বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ মাস, জেষ্ঠ্যা থেকে জৈষ্ঠ্য, ধনু রাশির নক্ষত্র পূর্বাষাঢ়াও উত্তরাষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবনা থেকে শ্রাবণ, ভদ্রা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, কালপুরুষের মাথার নক্ষত্র মৃগশিরা থেকে হয়েছে মার্গশীর্ষ বা অগ্রহায়ণ। কর্কট রাশিতে অবস্থিত পুষ্যা নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, পূর্ব ফাল্গুনী আর উত্তর ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ হলো।
প্রচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চোখ দিয়েই আকাশের সীমিত তদন্ত করতে পারতেন এবং আকার আকৃতি পর্যবেক্ষণ করে মোটামুটি ৮০ টি নক্ষত্রমন্ডলীর নামকরণ করেন, যেমন কালপুরুষ, সপ্তর্ষি মন্ডলী, বৃশ্চিক, স্কোয়ার অফ পেগেশাস, ইত্যাদি। শুধুমাত্র কৌতূহল থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনুপ্রাণিত হন নি, তাঁদের জ্যোতির্বিদ্যা এবং জ্যোতির্মিতিও ব্যবহারিক বিজ্ঞান ছিল। যে বিজ্ঞানে ভারতবর্ষ সহ মিশর ও গ্রীকদের পারদর্শীতা আজ সর্বজনগ্রাহ্য।

গ্রিক দর্শন ও জ্যোতির্বিজ্ঞান:

গ্রিক দার্শনিক থেলেস এর প্রাকৃতিক- দর্শন (Natural Philosophy) সর্বপ্রথম আমাদের গোচরে আসে আর এক দার্শনিক হেরোডটাস
( Herodotus) এর লেখাপত্র থেকে। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে যা জানা যায়– থেলেস জন্মগ্রহণ করেন গ্রিসের মিলেটাস শহরে ( 624- 546 BC)। একাধারে ইঞ্জিনিয়ার, জ্যোতির্বিদ এবং রাজনীতিবিদ থেলেস প্রায় ২৬০০ বছর পূর্বে রাজনীতির পরিক্রমা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতি ও মহাজগৎকে জানার অনুসন্ধিৎসা শুরু করেন। তিনিই সর্বপ্রথম ভগবান বা ঈশ্বরের আশ্রয়স্থল ও মিথ থেকে বেরিয়ে জগৎবাসীর কাছে ঘোষণা করেন– প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনার পিছনে কাজ করে এক বৈজ্ঞানিক যুক্তি শৃংখল, যেখানে মিথোলজি বা কল্পনার কোনো স্থান নেই। বলা যায় যে, এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দর্শনের জগতে কার্য-কারণ সম্পর্ক (causer relation) এর সূত্রপাত। থেলেস বললেন– ভূমিকম্প, প্লাবন বা ঝড়-ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্বিপাক ভগবানের শাস্তি বা অভিশাপ নয়, এগুলোর পিছনে নির্দিষ্ট কারণ ঠিকই আছে। পরবর্তী ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার হাত ধরে এসবই স্পষ্ট হয়েছে। থেলেসই ঋতুচক্রের আবিষ্কর্তা। একটি ঋতুচক্রকে তিনি ৩৬৫ দিনে ভাগ করলেন। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতাকে থিয়েটার, শিল্প ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। এসবের সাথে সাথে থেলেসই প্রথম একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে আনেন– এক আশ্চর্য মায়াবী কল্পনার জগত, নাকি বস্তুর অস্তিত্ব এবং তার পিছনে তথ্যনিষ্ঠ যুক্তি কোন পথ ধরে আমরা এগোবো? আরিস্ততলের মতে প্রাকৃতিক দর্শনের আবিষ্কর্তা হলেন থেলেস। আর বিখ্যাত দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল’ র মতে পাশ্চাত্য দর্শনের সূচনা থেলেসের হাত ধরেই।
খেয়াল রাখা দরকার যে, তখনও কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে মহাজাগতিক সম্পর্কে দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভূকেন্দ্রিক (geocentric)। তখনও তাদের ধারণা ছিল পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং অন্য সবকিছুই পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে।

থেলেসের আবিষ্কারের ক্রমবিকাশে প্রায় চারশো বছর পর আনুমানিক ২৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী সামোসের অ্যারিস্টার্কাস প্রথম উল্লেখ করেন — পৃথিবী নিজের অক্ষ এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। তিনি একজন দক্ষ গনিতবিদও ছিলেন। তিনি পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদের আপেক্ষিক দূরত্ব পরিমাপ করার চেষ্টা করেছিলেন। ত্রিকোণমিতির সাহায্যে তিনি নির্ধারণ করেছিলেন যে, সূর্য পৃথিবীর থেকে চাঁদের চেয়ে ১৮ থেকে ২০ গুন বেশি দূরত্বে রয়েছে। কিন্তু তাঁর ধারণা সঠিক থাকলেও দূরত্বের পরিমাপ সুনির্দিষ্ট ছিল না। বর্তমানে আমরা জেনেছি, পৃথিবীর থেকে সূর্যের দূরত্ব চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০গুন বেশি। এরপর খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে খ্যাতনামা গ্রিক জ্যোতির্বিদ হিপারকাস প্রথম নাক্ষত্রিক ক্যাটালগ সংকলন করেছিলেন। আকাশে কোণ পরিমাপ করার জন্য তিনি একটি বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রীতে এবং প্রতিটি ডিগ্রীকে ৬০ আর্ক মিনিটে বিভক্ত করার প্রাচীন ব্যাবিলনীয় পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, যা আজও প্রচলিত। “হিপারকাস ক্যাটালগ” নামে পরিচিত এই ক্যাটালগে নির্ভুলতার সাথে মহাকাশে ৮৫০টি তারার অবস্থান উল্লেখিত আছে। তিনি খালি চোখেই আকাশ পর্যবেক্ষণ করেএবং সেই সময়ে উপলব্ধ কয়েকটি যন্ত্রের সাহায্যে এই নির্ভুলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেগুলি হল – জিনোমন, অ্যাস্ট্রোলেবস এবং আর্মিলারি গোলক। তিনি নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা বর্ণনা করার জন্য “ম্যাগনিটিউড সিস্টেম” তৈরি করেছিলেন, যা আজও ব্যবহৃত হয় এবং তিনি পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদের আপেক্ষিক দূরত্বকে পরিমাপ করে ছিলেন।

এশিয়া ও আরব দুনিয়ায় মহাকাশ চর্চা:

যে সময় ইউরোপ অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত ছিল, সেই সময়ই এশিয়া এবং ইসলামিক বিশ্বে জ্যোতির্বিদ্যা বিকাশ লাভ করেছিল। নাক্ষত্রিক ক্যাটালগগুলির সংকলনসহ চীনা এবং ভারতীয় সাম্রাজ্যে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। ইসলামিক বিশ্বে আকাশ পর্যবেক্ষণের সাথে প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানীদের লেখাপত্র অধ্যয়ন এবং অনুবাদ করা হয়েছিল। ইসলামিক পণ্ডিতরা আকাশে কোণ পরিমাপের জন্য চমৎকার জ্যোতির্বিদ্যার যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। তার মধ্যে একটি সেক্সট্যান্ট যা একটি বৃত্তের এক ষষ্ঠাংশের আকৃতির অনুরূপ একটি যন্ত্র। পঞ্চদশ শতাব্দীতে তিমুরিদ রাজবংশের উলুগ বেগ (১৩৯৪-১৪৪৯ খ্রীষ্টাব্দ) ৯৯৪ টি তারার একটি ক্যাটালগ তৈরি করেছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গনিতবিদ উলুগ বেগ বতর্মান উজবেকিস্তানে অবস্থিত সমরকন্দে ৩৬ মিটার ব্যাসার্ধের একটি বিশাল সেক্সট্যান্ট তৈরি করেছিলেন। উলুগ বেগের ক্যাটালগ কয়েক শতাব্দী আগে আবিষ্কৃত হিপারকাসের সংকলনের সাথে তুলনীয়। উলুগ বেগ এবং অন্যান্য অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যারা ইসলামী বিশ্বে সক্রিয় ছিলেন তারা জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতির্মিতির অনুশীলনকে জীবিত রেখেছেন এবং আধুনিক যুগে প্রবেশ করার পথ মসৃণ করেছিলেন।

ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান:

ভারতীয় সভ্যতার জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাবনা সমকালীন সময়ের সভ্যতাসমূহের থেকে কিছুটা এগিয়েই ছিল। প্রাচীন ভারতে পঞ্চম শতকের জ্যোতির্বিদ ছিলেন আর্যভট্ট। তিনিই ভারতে প্রথম সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের তত্ত্বের আবির্ভাব ঘটান। তাঁর মতে পৃথিবী সমতল নয়, পৃথিবী একটি গোলকের মতো। গ্যালিলিওর ১০০০ বছর আগেই তিনি বলেছিলেন যে, চাঁদের আলো আসে সূর্যের আলো চাঁদের পিঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে। তিনি একজন বিখ্যাত গণিতবিদও ছিলেন। তাঁর বই ‘আর্যভট্টিয়া’ সেইসময়ের একটি আকর গ্রন্থ। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের কারণও তাঁর কাছে অজানা ছিলনা। আপন কক্ষপথে পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য দিন ও রাত ছোটবড় হয় এই সত্যও তিনিই প্রথম সামনে আনেন। বৈদিক যুগ থেকেই ভারতের জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা শুরু হয়। ভারতের আর একজন প্রসিদ্ধ জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্ত সপ্তম শতকে পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই আবিষ্কার আধুনিক কম্পিউটারে পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়ের কাছাকাছি। অথচ রাজনীতির কি নির্মম পরিহাস–ভারতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে সামনে না এনে রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণ গ্রন্থেই টেস্ট টিউব বেবি ও প্লাস্টিক সার্জারির মতো বিজ্ঞানের সব আধুনিক বিকাশ হয়ে গিয়েছিল, এইসব অবিজ্ঞান-অপবিজ্ঞানের চাষ করা হচ্ছে। কারণটা জলের মতো পরিষ্কার। এই রাজনীতির সওদাগরেরা চান না যে, আমজনতা প্রকৃত বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুক, তারা বরং কুসংস্কার, অন্ধভক্তির পাঁকে নিমজ্জিত থাকুক।

কোপার্নিকাস ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান:

পোলিশ জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপাার্নিকাস
( ১৪৭৩-১৫৪৩) মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিলেন। টলেমির যুগ থেকে চলে আসা ভূকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব ভাবনায় বিপ্লব সাধন করলেন তিনি। তিনি যুক্তি সাজালেন– পৃথিবী স্থির নয়, বরং সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহেরা পাক খেয়ে চলেছে অবিরত। মহাবিশ্বের ভাবনায় চালু হলো সূর্যকেন্দ্রিক সিস্টেমের ( Heliocentric) তত্ত্ব। কোপাার্নিকাস
লিখলেন–সবকিছুর কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সূর্য। তাকে যথার্থভাবে বলা হয় প্রদীপ, মন, বিশ্বের অধিপতি। সূর্য সিংহাসনে বসে যেন শাসন করে চলেছে তার সন্তান গ্রহদের, যে সন্তানরা অনবরত ঘুরে চলেছে তাদের পিতা সূর্যকে ঘিরে। সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বকাঠামোর জনক কোপার্নিকসকে ‘কোপারনি বিপ্লবের’ জনক বলেও অভিহিত করা হয়। অবশ্য ধর্মের ব্যাপারীরা তাঁকে অপদস্থ করতেও পিছপা হন নি।
১৫৪৩ সালে প্রকাশিত হলো কোপার্নিকাসের বই ‘দ্য রেভেলিউশনিবাস’। এর একমাস পরেই তিনি প্রয়াত হন। তাঁর তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা হয়ে ওঠেন জিওদার্নো ব্রুনো। তিনি বলেন– তারাগুলো আসলে সূর্যের মত জিনিস, সেগুলোকে ঘিরে ঘুরছে অনেক অনেক গ্রহ। তিনি এক দেশ থেকে অন্যদেশে সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রচার করতে গিয়ে ধর্মের মাতব্বরদের রোষানলে পড়েন। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ইতালির ধর্মীয় বিচারসংস্থা তাঁর জিভে পেঁরেক ঘেঁথে ও সারা শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে ঐ অবস্থায় পুড়িয়ে মারে ব্রুনোকে। পুড়িয়ে মারার আগে তাঁকে অবশ্য শেষ সুযোগ দেওয়ার উদারতা(!) দেখিয়েছিলেন ধর্মযাজকেরা। ব্রুনোকে বলা হলো– ” তুমি যদি স্বীকার করো যে, কোপার্নিকাসের তত্ব ভুল তাহলে তোমাকে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা দেওয়া হবে”। কিন্তু ব্রুনো বললেন –” আমি যা প্রচার করেছি তা সঠিক বলেই সজ্ঞানে করেছি, জীবনের বিনিময়েও ভুল স্বীকার আমি করবো না”। মানবতার চরম অপমৃত্যু ঘটলেও সত্যের চাকা এভাবেই এগিয়ে চলে-” ধর্ম যখন বিজ্ঞানকে বলে রাস্তা ছাড়ো, বিজ্ঞান রাস্তা ছেড়ে দেয় না”।

ইয়োহানেস কেপলারের মহাজাগতিক রহস্য:

জার্মান জ্যোতির্বিদ কেপলার (১৫৭১-১৬৩০) টাইকো ব্রাহের পর্যবেক্ষণকে ভিত্তি করে সৃষ্টি করেন এক নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞান। কেপলারই গণিতের সাহায্যে কোপার্নিকাসের কাঠামোকে করে তোলেন সত্যিকারের সূর্যকেন্দ্রিক। তিনিই সবার আগে বুঝেছিলেন যে, সূর্যের পদার্থিক শক্তির সাহায্যে সূর্যই গ্রহগুলোকে ঘোরায় কক্ষপথে। ১৫৯৪ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম বই ‘ মিস্টিরিয়াম কসমোগ্রাফিকাম’ বা মহাজাগতিক রহস্য। ১৬০৬ সালে কেপলার নির্ভুলভাবে উদ্ঘাটন করেন মঙ্গলের গতির রহস্য। পরবর্তীতে তাঁর আরো দুইটি বই প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই ‘আস্ত্রোণমিয়া নোভা’। তাঁর আবিষ্কারগুলো এখন কেপলারের তিনটি সূত্র নামে পড়তে হয় বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের। এই হেন কেপলারই একসময়ে অবৈজ্ঞানিক জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা করতেন, যদিও পরে সে সব থেকে সরে এসে তিনি সত্যিকারের বিজ্ঞানী তথা জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে উঠলেন।

গ্যালিলিও গ্যালিলে- আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক:

১৬১০ সালের মধ্যে গ্যালিলিওর হাত ধরে সূচিত হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন কালের, নতুন যুগের। দূরবীনে চোখ রেখে ধর্মীয় ‘মহান সত্য’ এর মুখোশ খুলতে থাকেন তিনি। আরিস্ততল বলতেন– চাঁদ স্বর্গীয়, পবিত্র, চাঁদের ভূভাগ মসৃণ কিন্তু গ্যালিলিও বললেন– চাঁদ নিতান্তই একটি উপগ্রহ। যার ভূভাগ গর্ত, পাহাড় ও উপত্যকায় পূর্ণ। ছায়াপথের দিকে দূরবীন তাক করে গ্যালিলিও আবিষ্কার করলেন ছায়াপথের অসংখ্য তারা। যে তারাগুলো ছড়ানো রয়েছে মহাশূন্যের গভীর অন্ধকারে। এরপর তিনি আবিষ্কার করেন বৃহস্পতির চারটি উজ্জ্বল উপগ্রহ বা চাঁদ। এইসবের ধারাবাহিকতায় তিনি আবিষ্কার করলেন শুক্রগ্রহের কলা। এও প্রমান করলেন যে শুক্রগ্রহ সূর্যের চারদিকে ঘোরে। এরপর তিনি দিনের পর দিন দূরবীনে চোখ রেখে “সৌর কলঙ্ক” ( black spot) এর হদিস দিলেন, এটাও আরিস্ততলের মতের বিরুদ্ধে যায়। আরিস্ততল বলেছিলেন– বিশুদ্ধ আকাশমণ্ডলে কোন কলঙ্ক থাকতে পারে না । তৈরি হলো গ্যালিলিওর অনেক অনুরাগী, অন্যদিকে বাড়তে থাকলো তাঁর শত্রু সংখ্যাও। তিন বন্ধুর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে লেখা তাঁর বই ‘দায়ালোগো দেই দুয়ে মাসিমি সিস্তেমি’ বা দুটি প্রধান বিশ্বকাঠামো (টলেমি ও কোপার্নিকাসের মতবাদ) সম্পর্কে সংলাপ প্রকাশিত (১৬৩২) হওয়ার পর সারা বিশ্বে আড়োলন পড়ে গেল, শঙ্কিত হলেন ধর্মযাজকেরা। ১৬৩৩ সালে চার্চের বিচারে সারা জীবনের জন্য কারাদণ্ডিত হয়ে গৃহবন্দি গ্যালিলিও লেখেন গতি ও জাড‍্য সম্পর্কে আরেকটি অসাধারণ বই – ‘দুটি নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে সংলাপ’। দূরবীনে চোখ রেখে দিনের পর দিন সুর্যের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান পরবর্তীকালে। নিজের দৃষ্টিশক্তির বিনিময়ে বিশ্ববাসীর কাছে উপহার দিয়ে গেলেন সৌরকলঙ্ক সহ আরো নানান আবিষ্কার। বিজ্ঞান এভাবেই এগিয়ে চলে। বিজ্ঞান কখনো ধর্মকে পথ ছেড়ে দেয় না।

আইজ্যাক নিউটনের বিশ্ব ভাবনা:

চিরকালের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) কোপার্নিকাসের মহাবিশ্বের পদার্থিক ভিত্তি সৃষ্টি করলেন, পৃথিবীকে সোজা করে নিজের পায়ে দাঁড় করালেন। তিনি অভিকর্ষের এমন সূত্র রচনা করেন, যা ব্যাখ্যা করে পার্থিব ও মহাজাগতিক প্রপঞ্চ। মহাজাগতিক অভিকর্ষের নিউটনের সূত্র হচ্ছে– এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা আকর্ষণ করে অন্য প্রতিটি বস্তুকণাকে, অভিকর্ষ বলের পরিমাপের সূত্রও দিলেন তিনি। এই অভিকর্ষ বলই গ্রহগুলোকে ঘোরায় সূর্যের চারিদিকে। তাঁর এই সূত্র পৃথিবীতে, সৌরজগতে এবং মহাবিশ্বের অন্যান্য এলাকাতেও ক্রিয়াশীল। নিউটনের হাত ধরে আমরা পেলাম অত্যন্ত উন্নতমানের টেলিস্কোপ, যাকে বলা হয় নিউটোনিয়ান টেলিস্কোপ বা প্রতিফলনের দূরবীন। বর্তমানে দূর দুরান্তের ছায়াপথ, নক্ষত্রমন্ডলী সহ মহাজাগতিক বস্তুকে চোখের সামনে হাজির করা যায় বিভিন্ন মানমণ্ডল ও মহাকাশে বসানো অতি উন্নতমানের আধুনিক প্রতিফলিত দূরবীনের সাহায্যেই, সাথে ব্যবহার করা হয় “বর্ণালী বীক্ষন যন্ত্র এবং বিভিন্ন কৃত্রিম উপগ্রহে বসানো আধুনিক যন্ত্রপাতি।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের নতুন ভাবনা নতুন সূত্র:

নিউটনের অভিকর্ষজ সূত্র কতিপয় মহাজাগতিক ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পারছিলো না। আইনস্টাইন অভিকর্ষ সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে বিস্মিত হন আলোর স্বভাব দেখে। দুটি অসম্পর্কিত ব্যাপার– একটি অভিকর্ষ, আরেকটি আলো। এই দুটি ব্যাপার থেকে তিনি পৌঁছোন এক নতুন বিশ্বদৃষ্টিতে। তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বে অভিকর্ষ আর কোন বল নয়, বরং অভিকর্ষের জন্য তার চারপাশে তৈরি হয় এক ক্ষেত্র, যাকে বলা হয় গ্রেভিটেশন ফিল্ড। নিউটনের অভিকর্ষতত্ত্ব ও গতিসূত্র দিয়ে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি সৌরজগতকে। আর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাহায্যে পদার্থ বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে অনেক দ্রুতগতির ব্যাপারগুলোকে, বহুদূরকে, মহাবিশ্বের সব নক্ষত্রপুঞ্জকে, কৃষ্ণগহ্বরকে।
আইনস্টাইন সামনে আনলেন মহাবিশ্বের এক নতুন রূপ তাঁর ‘বিশেষ আপেক্ষিকতাতত্ত্ব’
( ১৯০৫) ও সাধারণ আপেক্ষিকতাতত্ত্ব’
( ১৯১৬) র মধ্য দিয়ে।
নিউটন ধরে নিয়েছিলেন মহাবিশ্ব সমতল। তাই মহাবিশ্বে দেখেছিলেন এক রহস্যপূর্ণ বল, একেই তিনি নাম দিয়েছিলেন অভিকর্ষজ বল। এর বিপরীতে আইনস্টাইন হাজির করলেন স্থান-কালের বক্রতা তত্ত্ব (space-time curvature)। তিনি বললেন– মহাবিশ্ব মোটেই সমতল নয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে কোন ভারী বস্তু তার চারপাশের স্থান ও কালকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে এক বক্রতলের সৃষ্টি করে। সূর্যের অভিকর্ষজ ক্ষেত্র বক্র বলেই তার চারিদিকে গ্রহগুলো অনবরত পাক খেয়ে চলেছে। সূর্যও পাক খেয়ে চলেছে আমাদের ছায়াপথের বক্রতলে। ফলে আইনস্টাইনের মহাবিশ্বে আর অভিকর্ষ বলের দরকার পড়লো না। একটি উদাহরণের সাহায্যে এই জটিল বিষয়টিকে সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক। টানটান করা একটি চাদরের মাঝখানে কোন ভারী বস্তুকে রেখে দিলে চাদরের মধ্যে টোল পড়ে– চাদরের মধ্যে তৈরি হয় এক বক্রতলের।

স্থান-কালের বক্রতার ফলে আলোকরশ্মিও সরলরেখায় চলতে পারেনা, বরং তা বেঁকে যায়। কৃষ্ণগহ্বরের ভর সূর্যের কয়েকগুণ হওয়ায় তার স্থান-কালের বক্রতা এতটাই বেশি যে, আলো সেখান থেকে আর বের হতে পারে না। এই তত্ত্বের হাত ধরেই কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলো। বিশ্ববিখ্যাত আইনস্টাইনের স্থান-কালের বক্রতা তত্ত্ব হাতে কলমে প্রমান করলেন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন ও তার সহকারীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে ( ১৯১৯ সালের ২৯ শে মে ) আফ্রিকার একটি ছোট দ্বীপে এক পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়। তাঁরা
হাজির হলেন স্পেকট্রোমিটার, ইনফ্রারেড স্ক্যানার সহ আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে। গ্রহণের সময় সূর্যের খুব কাছাকাছি দিয়ে আসবে হায়াডাস নামের তারকাপুঞ্জ আলো। এডিংটনরা গ্রহণের সময় ঐ তারকাপুঞ্জের ছবি নিলেন, কয়েক মাস পর আবার ঐ তারকাপুঞ্জেরছবি নিলেন। দুইবারের ছবি মিলিয়ে তারা সিদ্ধান্ত এলেন– আইনস্টাইনের গণনা মতোই আলোকরশ্মি সূর্যের দিকে নুয়ে পড়ছে একটি বৃত্তচাপের প্রায় ১.৭৫ সেকেন্ড পরিমাণ। ১৯১৯ সালের ৬ই নভেম্বর লন্ডনের রয়েল সোসাইটিতে বিজ্ঞানীদের সম্মেলন– ঘোষণা করা হবে আইনস্টাইনের স্থানকালের বক্রতা তত্ত্বটি ঠিক না ভুল। আইনস্টাইন নিজের কাজ / তত্ত্ব সম্পর্কে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি ঐ সম্মেলনে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন অনুভব করেননি। রয়েল সোসাইটি ঘোষণা করল আইনস্টাইনের তত্ত্ব নির্ভুল (যদিও অনেক বিজ্ঞানী বললেন যে, তাঁরা আপেক্ষিকতাবাদ ঠিক বুঝতে পারেননি)। ৭ ই নভেম্বর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির প্রথম বার্ষিকী দিবসে বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময় খবরের কাগজে বড়ো বড়ো হরফে ছাপা পড়লেন– “বিজ্ঞানে যুগান্তর, নিউটনীয় তত্ত্বের আমূল পরিবর্তন সাধন”। এডিংটনদের তোলা ছবিগুলো আইনস্টাইনের কাছে পৌঁছালে ( তখন তিনি ফ্রান্সে) ছবিগুলো দেখতে দেখতে তাঁর চোখ চিকচিক করে উঠলো, শান্তভাবে হেসে বলে উঠলেন– “আমার আপেক্ষিকতাবাদ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। জার্মানি এখন আমাকে জার্মান হিসেবে মানবে, আর ফ্রান্স বলবে যে আমি বিশ্বনাগরিক। কিন্তু আমার তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হলে ফ্রান্স বলতো আমি জার্মান, আর জার্মানী সদর্পে ঘোষণা করতো যে আমি ইহুদি এবং সুতরাং—–“।
আইনস্টাইনই সর্বপ্রথম প্রসারমান মহাবিশ্বের তত্ত্ব সামনে আনলেন। তারাদের জন্ম- বেড়ে ওঠা- মৃত্যুর সাথে সাথে তৈরি হয়ে চলেছে নতুন নতুন নক্ষত্র, আজও সৃষ্টি হয়ে চলেছে মহাবিশ্ব। আর এক বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিদ হাবেল অকাট্যভাবে এইসব তত্ত্ব প্রমান করলেন। আইনস্টাইনের আর একটি যুগান্তকারী তত্ব– অভিকর্ষজ তরঙ্গ ( gravitational wave) এর অস্তিত্বের ধারণা। এই তরঙ্গের শনাক্তকরণ সম্পর্কে তিনি সন্দিহান থাকলেও সম্প্রতি
( ২০১৭ সালে) তিন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ অভিকর্ষজ তরঙ্গকে চিহ্নিত ও শনাক্ত করলেন অভিকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের অতি উচ্চ সংবেদনশীল যন্ত্র LIGO ( Laser Interferometer Gravitational-wave Observatory) এর সহায়তায়। স্থান-কালের গন্ডি পেরিয়ে আইনস্টাইন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিলেন।

বর্তমান সময়ের ভাবনা:

ভারত-মিশর-গ্রীস-ব্যাবিলন-আরব সহ পৃথিবীর সব দেশেই জ্যোতিষশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞান একটা সময় পর্যন্ত মিলেমিশে কাজ করত। জ্যোতির্বিজ্ঞাণের সাথে মিলে ছিল ধর্মভাবনা- কল্পনা-রূপকথা। আস্তে আস্তে এই ধর্মই ধারণ করল জ্যোতিষশাস্ত্রকে। বুজরুকি ও অপবিজ্ঞানকে ভর করে জ্যোতিষশাস্ত্র মানুষ ঠকানোর এক ব্যবসায় পরিণত হলো, আর অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে জ্যোতির্বিজ্ঞান যথার্থ প্রকৃতিবিজ্ঞান হয়ে উঠল। ধর্মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা জ্যোতিষশাস্ত্রকে দূরে সরিয়ে প্রকৃত জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চাকে আজ দিক থেকে দিগন্তে, পৃথিবী থেকে সূর্যে, সূর্য থেকে মহাকাশে- মহাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ আর কোন একটি রাষ্ট্রের বিষয় নয়, তা আজ অনেক বেশি করে আন্তর্জাতিক। এখনো পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত মহাবিশ্বের নানান রহস্যের সমাধানে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে কাজ করছেন, বিজ্ঞান গবেষণায় নানান আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে উঠেছে। অভিকর্ষ-তরঙ্গ (gravitational wave)’র শনাক্তকরণ, কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলা, নাসার সৌরযান (Parker Solar Probe) পাঠানো, মহাকাশে অত্যন্ত উচ্চমানের ও উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন টেলিস্কোপ পাঠানো একবিংশ শতকে সম্ভব হচ্ছে সব দেশের সব বিজ্ঞানীর নানা আবিষ্কার ও তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির সমাহারে। এই জার্নি চলবে যতদিন থাকবে মানুষ, যতদিন থাকবে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা। তাই বাতিল হয়ে যাওয়া ধর্মীয় ভাবনা নয়, বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের বারেবারে তাকাতে হবে আকাশের পানে। চিনতে হবে গ্রহ-উপগ্রহ-নক্ষত্রমন্ডলী সহ পুরো মহাবিশ্বকে। বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ের দু’ মলাটে বন্দী করে না রেখে , কোন কিছুই অন্ধভাবে না মেনে প্রশ্ন করার অভ্যেস তৈরি করতে হবে। সমস্ত ঘটনায় তার কার্য-কারণ সম্পর্ককে সামনে আনতে হবে, একটা বিজ্ঞানমনস্ক মন তৈরি করতে হবে। বুঝতে হবে বিজ্ঞানের সাথে প্রকৃতির গভীর সম্পর্ককে। এটাই আজকের সময়ের দাবি।

আকাশে তারাদের দেখা মানে আমরা দেখতে পাব আমাদের অতীতকে। আমরা এই মুহূর্তে যে সূর্যকে দেখছি, সেই সূর্য আসলে প্রায় আট মিনিট আগের সূর্য। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটি নক্ষত্রকে রাতের আকাশে দেখা মানে– ঐ তারা থেকে কোটি কোটি বছর আগে জন্ম নেওয়া আলোকরশ্মি আমার চোখে এসে পৌঁছাচ্ছে ঠিক এই মুহূর্তে। মনে রাখতে হবে একটি মানুষের অবস্থান এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবের সমান। মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রাণ নক্ষত্রের ধূলো থেকে তৈরি–এই চরম সত্য বিস্মৃত হলে বিজ্ঞান-অর্থ-উন্নত মস্তিষ্কের গর্বে গরবী মানুষের সমূহ বিপদ। আমরা এসব ভুলে মেরে যতই টাকা, ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স ও ভোগ্যপণ্যের বাজারের দিকে ছুটি না কেন, সদা প্রসারমান এই বিপুল বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাতে কিছু যায় আসে না। বরং এই পৃথিবীতে মানবসভ্যতার অবলুপ্তি ঘটলেও অনন্তকাল ধরে বয়ে চলবে এই বিপুলা
ব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত গতি। তাই জ্যোতিষশাস্ত্র নয়, অন্ধবিস্বাস নয়, ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়–সভ্যতার চাকা, দুর্নিবার গতি এগিয়ে চলুক আধুনিক বিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই। তবেই আমাদের আকাশ দেখা, তারা চেনা এবং মহাকাশের সূত্রগুলোকে খোঁজার প্রচেষ্টা যথার্থ হয়ে উঠবে।

বিজন পাল : প্রাবন্ধিক।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • দারুণ লিখেছ বিজনভাই । তথ্য নির্ভর, কিন্তু গভীরতায় ভরা । সাবলীল ও সতেজ । আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই…

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post