• December 2, 2022

জাহাঙ্গীরপুরী ও বুলডোজারঃ হিন্দু ভারতে আপনি স্বাগত

 জাহাঙ্গীরপুরী ও বুলডোজারঃ হিন্দু ভারতে আপনি স্বাগত

সুমন কল্যাণ মৌলিক

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ভড়ংবাজিকে পদাঘাত করে,সবচেয়ে ওজনদার সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে,ধর্মনিরপেক্ষতা, সমানাধিকার, আইনের শাসন প্রভৃতি বহু ব্যবহারে জীর্ণ শব্দমালাকে ডাস্টবিনে ফেলে উঠে দাঁড়াচ্ছে হিন্দু ভারত।মুন্ডাকা উপনিষদের সত্যমেব জয়তে মন্ত্রের মন্দ্র উচ্চারণ নয়,অশোক স্তম্ভের অমোঘ উপস্থিতি নয়,এই নতুন ভারতের অভিজ্ঞান বুলডোজার।২০১৪ সালে হিন্দু হৃদয় সম্রাট নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদি যখন দিল্লির মসনদে আসীন হয়েছিলেন তখন এক প্রবীণ বিজেপি নেতা মন্তব্য করেছিলেন পৃথ্বীরাজ চৌহানের পর আবার আজ এক হিন্দু দেশের শাসক হল,এরপর ভারত দেখবে প্রকৃত হিন্দু শাসন কি!আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি হিন্দুত্বের অপার মহিমা।গত আট বছরে দেশ অনেক চড়াই -উতরাই প্রত্যক্ষ করেছে কিন্ত দিল্লির সরকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের গণশত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা ও হিন্দি- হিন্দু – হিন্দুস্তানের মতাদর্শে জারিত এক পিতৃতান্ত্রিক, ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত তৈরির পরিকল্পনা থেকে এক চুল সরে আসে নি।এই হিন্দুত্ববাদী শক্তির মূল চালিকাশক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বিজেপি ও অন্যান্য শাখা সংগঠনগুলোর জন্য যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে সেই অনুযায়ী যাবতীয় ঘটনাগুলিকে সংগঠিত করা হচ্ছে। সংসদীয় বিধি ব্যবস্থা,প্রশাসন,আমলাতন্ত্র, বিচারবিভাগ,মিডিয়ার বৃহদংশ আজ হিন্দুত্বের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভকে প্রশ্নহীন আনুগত্যে মেনে নিয়েছে।এটাই নতুন ভারত।

আজ জাহাঙ্গীরপুরীতে যা ঘটেছে তা যত মর্মন্তুদ হোক না কেন,এটা নতুন কোন ঘটনা নয়।কদিন আগে মধ্যপ্রদেশেও এই একই ধরণের ঘটনা হয়েছে। অনেকেই এই ঘটনার মধ্যে একটা চেনা ছক( প্যাটার্ণ) লক্ষ্য করেছেন।রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীর মত চিরাচরিত অনুষ্ঠানগুলিকে এক উগ্র হিন্দুত্বের আদলে সাজিয়ে নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে সেই শোভাযাত্রাগুলিকে মুসলিম মহল্লায় নিয়ে গিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা,সংখ্যালঘুদের ধর্মস্থান গুলির সামনে বিভিন্ন পতাকা লাগানো,মাইক বাজানোর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানো সেই ছকের একটা অংশ মাত্র,একমাত্র নয়।আজকের জাহাঙ্গীরপুরীর ঘটনা সেই ছকের আরেকটি অংশ।গত কয়েকদিন ধরে প্রথমে রামনবমী ও পরে হনুমানজয়ন্তীকে ব্যবহার করে দিল্লির বিভিন্ন অংশে কি করে চলেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সহ বিভিন্ন উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলি তা সোসাল মিডিয়া ও মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে আলোচিত।এমনকি দিল্লি পুলিশও শোভাযাত্রার সংগঠকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।কিন্তু আসল রহস্য ফাঁস হল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দিল্লি শাখার হুমকির পর।পুলিশ বেশ কিছু মুসলিম যুবককে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে ন্যাশানাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা দিল।দিল্লি বিজেপি প্রধান আদেশ গুপ্তা বিজেপি পরিচালিত পৌরসভাকে নির্দেশ দিলেন জাহাঙ্গীরপুরীর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা গুলির ‘ বেআইনি’ কাঠামোগুলিকে ভেঙে দেওয়ার।আর চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ১২ কোম্পানি সিআরপিএফের ( তথ্যসূত্রঃইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস) উপস্থিতিতে এই ধ্বংস অভিযান।আজ প্রশাসন বা পুলিশ — গৈরিকীকরণ এতটাই সম্পূর্ণ হয়েছে যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ দেওয়ার পরও হাজার হাজার মিডিয়ার চোখের সামনে বুলডোজার অভিযান চালু থাকে।দিল্লি পৌরসভা যতই একে রুটিন কাজ বলে দাবি করুক না কেন এটা পরিষ্কার যে শুধু সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি, বাসস্থান, দোকান ধ্বংস করে তাদের আর্থিক ভাবে পঙ্গু করে ঐ এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা এই অভিযানের উদ্দেশ্য। তাই যে মানুষেরা গত পনেরো বছর ধরে ঐ এলাকায় বাস করছেন তাদের কোন রকম নোটিশ না দিয়ে বুলডোজার নামিয়ে দেওয়া হল।তাই আমাদের বুঝতে হবে শুধু উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলি এই ছক করছে না,বিষয়টা শুধু পেশিশক্তির ক্ষমতা প্রদর্শন নয়,একই সঙ্গে প্রশাসন এই ছকের অনিবার্য অংশ যাদের কাজ সমস্ত ঘটনাগুলোকে এক আইনি ন্যা্য্যতা দেওয়া।বিগত সময়ে উত্তর প্রদেশে যোগীর নেতৃত্বে এই বুলডোজার রাজনীতির সফল প্রয়োগ আমরা দেখেছি।

সম্প্রতি হরিদ্বার ধর্ম সংসদের ‘ সুবচনী ‘ সেই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের আরেকটি উপাদান।যতি নরসিংহানন্দ,স্বামী প্রবোধানন্দ গিরি,সাধ্বী অন্নপূর্ণা প্রমুখ হিন্দু ধর্মের স্বঘোষিত অভিভাবকরা তাদের কল্পিত হিন্দু রাষ্ট্রের বাস্তবায়নে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নিকেশ করার ফতোয়া দিয়েছেন। আর সেই ফতোয়ার মূল কথা হল অস্ত্রের বলে সংখ্যালঘু হত্যা।হয় মারার জন্য প্রস্তুত হও নয় মরতে– এই আহ্বান আজ তাদের ধর্মযুদ্ধের কেন্দ্রীয় শ্লোগান। কোন রকম ভনিতা না করেই তারা বলছেন পবিত্র হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করার জন্য সাফাই অভিযান চালানো বিশেষ জরুরি। সংখ্যাগুরুর মৌলবাদ আজ এদেশের চালিকাশক্তি ফলে প্রকাশ্যে গণহত্যা আজ ন্যায্যতা পেয়ে যায়।শুধু নিকেশ নয়,ইসলামোফোবিয়াতে আক্রান্ত দেশে প্রকাশ্যে নিয়মিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মহিলাদের ধর্ষণ ও গর্ভবতী করার হুমকি দেওয়া হয়।

কোন একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিকেশ করার জন্য বা তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন তাদের গণশত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা।তাদের ধর্ম,সংস্কৃতি, জীবনশৈলীকে নিরন্তর আক্রমণ। আর সেটা শুধু পেশী শক্তি বা অস্ত্র বলে সম্ভব নয়।কখনো লাভ জেহাদ,কখনো ইউপিএসসি জেহাদ,কখনো ক্রিকেটে পাকিস্তানকে সমর্থন আবার কখনো তবলিগি জামাতকে করোনা সংক্রমণের জন্য দায়ী করা– আদতে এক জনগোষ্ঠীর প্রতি দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের মনে এক বিরুদ্ধতার মনোভাব তৈরি। একই সঙ্গে তাদের জীবন জীবিকার উপর আক্রমণ হানাটাও জরুরি।তাই কর্নাটকে এক হিন্দু ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত মেলায় মুসলিম দোকানদারদের বসতে না দেওয়া,উত্তরাখণ্ডের চারধাম মন্দির ক্ষেত্রকে মুসলিম মুক্ত করার দাবি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই বিষয়ে আলোচনার আশ্বাসকে আমাদের উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিত সহ বিচার করতে হবে।রামনবমীর সময় মাংসের দোকান বন্ধ রাখার আদেশ,নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়া আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত একই নকশার অংশমাত্র।

তবে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল আমরা যারা অন্তত এই ঘৃণার সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে মানতে প্রস্তুত নই,তারাও ছকবন্দী।একটা ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলির কাগুজে বিবৃতি ও নিন্দা প্রস্তাব( দু একদিন আগে বিজেপি বিরোধী দলগুলির সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এক যৌথ বিবৃতি আমাদের নজরে এসেছে),মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ও সাধ্যমত প্রতিবাদ,বিকল্প মিডিয়ায় দু একটি প্রতিবাদী লেখা আর যাপিত জীবন ও রাজনীতিতে নরম হিন্দুত্বের জয় জয়াকার।সংসদ সর্বস্ব ভোট রাজনীতি ও নিয়মতান্ত্রিকতার গন্ডীবদ্ধতার ফলে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জমির লড়াই দানা বাঁধে না।ফলে মোহন ভাগবতদের চিন্তার কোন কারণ ঘটে না।আজ প্রতিবাদের চেনা ছককে ভেঙে রাস্তার লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়াটাই প্রতিস্পর্ধার স্বপ্ন দেখা মানুষদের কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।

সুমন কল্যাণ মৌলিক : বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post