• May 25, 2022

বুলডোজারের বিরুদ্ধে যে বিরোধিতার প্রাচীর উঠলো, সেই ছবি আরও বেশী করে সামনে আনা জরুরী

 বুলডোজারের বিরুদ্ধে যে বিরোধিতার প্রাচীর উঠলো, সেই ছবি আরও বেশী করে সামনে আনা জরুরী

সুমন সেনগুপ্ত

যে কোনও একটি দৃশ্য তৈরি করা এখন আজকের সামাজিক মাধ্যমের সময়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা দিয়ে সমাজে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। প্রথমে আওয়াজ উঠলো হরিয়ানাতে, যে খোলা জায়গায় নামাজ পড়া যাবে না, বাধা দেওয়া হলো মুসলমান মানুষদের। তারপর দক্ষিণের কর্ণাটকে কিছু মানুষ প্রশ্ন তুললেন, মহিলাদের হিজাব পরা নিয়ে। সেই বিতর্ক গেল কর্ণাটকের উচ্চ আদালতে, সেখান থেকে রায় দেওয়া হলো, হিজাব ইসলামের অপরিহার্য নয়, তাই স্কুল কলেজে, মুসলমান মেয়েরা হিজাব পরে আসতে পারবেন না। কিছু হিন্দুত্ববাদী গুন্ডার, একটি একলা হিজাব পরিহিতা মেয়েকে ঘিরে ধরে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিতে লাগার দৃশ্য সারা দেশ দেখলো, তারপর বলা হলো, মাংস খেতে হলে ‘হালাল’ মাংস খাওয়া যাবে না, যেহেতু সেই পদ্ধতিতে হিন্দু মানুষজন মাংস কাটেন না। এতেও থামল না এই খাওয়া না খাওয়ার বিতর্ক। নিদান দেওয়া হলো, কোনও মন্দিরের সামনে মুসলমান মানুষজন তাঁদের পসরা নিয়ে বসতে পারবেন না। তারপরে এলো, রামনবমীর সময়ে আমিষ খাওয়া বন্ধ করতে হবে, আবার শুরু হলো বিতর্ক। কোনও একটি দেশের, একটি অঙ্গরাজ্যে একটি পৌরসভা আদৌ এমন কোনও নিয়ম কি চালু করতে পারে?
যদি খেয়াল করা যায়, এই বিতর্কগুলো আসলে শুরুই হচ্ছে এক একটি দৃশ্যকল্প থেকে, যা আজকের আমাদের দেশের শাসকদলের ঘনিষ্ঠ মানুষজন তৈরী করতে চাইছেন। এই দৃশ্যগুলোই আসলে এক একটি ‘বিকল্প সত্যি’, যা নির্মান করা হচ্ছে খুব সচেতনভাবে, যা নিয়ে আমরা আলোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়ছি সামাজিক মাধ্যম থেকে পাড়ার আড্ডা বা অফিসের আলোচনায়। এর মধ্যে দিয়েই হিন্দুত্ববাদী আদর্শ নিয়ে আলোচনা চলছে, পক্ষে বিপক্ষে মত তৈরী হচ্ছে, আরও গভীরে প্রবেশ করছে ‘অপর’ মানুষদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ।
পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের পরে পরেই প্রধানমন্ত্রী গুজরাট সফর করেন, কারণ তিনি জানেন এরপর সেই রাজ্যে নির্বাচন। তারপরেই রাজকোট শহরের বিজেপির পক্ষ থেকে একটি কর্মসূচী নেওয়া হয়, সমস্ত সরকারী অফিস, বাচ্চাদের পার্কের দেওয়ালে তাঁদের নির্বাচনী চিহ্ন পদ্ম আঁকা হয়। বিরোধী কংগ্রেস যেহেতু অনেকটাই নিষ্ক্রিয়, আম আদমি পার্টি যাঁরা এই মূহুর্তে বিরোধী জায়গার দখল নিচ্ছে সারা দেশ সহ গুজরাটে, তাঁরা এই কর্মসূচীর বিরোধিতা করে। তাঁরা বলেছে যদি এই সরকারী অফিসে বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক আঁকা যায় এবং তার জন্য যদি কোনও সরকারী অনুমতি না নিতে হয়, তাহলে তাঁরাও তাঁদের নির্বাচনী চিহ্ন আঁকবেন অন্য বেশ কিছু দেওয়ালে। এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় জোরকদমে। যদিও রাজকোট পুরসভার যা আইন আছে, তাতে বলা আছে, কোনও সরকারী দেওয়ালে কোনওরকম বিজ্ঞাপন দিতে গেলে কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে তা করা সম্ভব নয়। বিজেপির কাছে এই প্রশ্ন নিয়ে যাওয়াতে তাঁরা বলে, নির্বাচন তো ঘোষণা হয়নি, তাই তাঁরা কোনও বাধা শুনবেন না। অর্থাৎ এই মূহুর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই নির্বাচনী চিহ্ন বা দৃশ্যকল্প যা নিয়ে একজন নির্বাচক কথা বলতে বাধ্য।


স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক, আরও কিছু এইরকম দৃশ্যকল্প, যা নিয়ে কথা হয়, আলোচনা হয় এবং যা আমাদের রাজনীতিকে শুধু নয় সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করে।  গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু দেওয়াল জুড়ে আঁকা হয়েছিল, তীর ধনুক হাতে রামের ছবি, নীচে লেখা হয়েছিল ‘জয় শ্রী রাম’। নির্বাচন কমিশনের কাছে অন্য রাজনৈতিক দলেরা অভিযোগ জানিয়েছিল, যে এই ছবির মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলেছিল, এই বিষয়ে যেহেতু তাঁদের কোনও নির্দেশিকা নেই, এবং এই ছবির সঙ্গে সরাসরি যেহেতু কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী চিহ্নের কোনও যোগ নেই, তাই তাঁরা এই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নিতে অপারগ। আবার ধরা যাক, এই সময়ে নানান গাড়ি বা বাইকে, বা কোনও কোনও বাড়ির মাথায় একটি রাগী হনুমানের মুখ, নীচে ‘জয় শ্রী রাম’ লেখা দেখতে পাওয়া যায়। এমনিতে কোনও সমস্যা না থাকলেও, উত্তর ভারতে যখনই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মিছিল হয় তখন সেখানেও এই পতাকা এবং মুখ দেখা যায়। এই দুই দৃশ্যকল্পই যে কোনও মানুষকে এই বিষয়ে কথা বলতে বাধ্য করে। গত উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের আগে প্রচার করার সময়ে একদিন প্রধানমন্ত্রী বললেন, যাঁরা সরকারের নুন খেয়েছে, অর্থাৎ রেশন পেয়ে থাকেন, তাঁরা কোনোদিন সরকারের বিপক্ষে ভোট দেবেন না। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হলো, সরকার তো আর নিজের পকেটের পয়সা থেকে মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিচ্ছে না, এতো মানুষের করের টাকা থেকেই মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে, তাহলে এই ‘নুন খাওয়া আর গুণ গাওয়া’র প্রসঙ্গ আসছে কেন? প্রধানমন্ত্রী তার পরে অন্য একটি সভায় এই বক্তব্য শুধরে নিলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কিন্তু রয়ে গেল ঐ শব্দবন্ধটি। আবার ধরা যাক, উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বেশ কিছু বুলডোজার সহ একটি ছবি দিয়ে বললেন, উনি বুলডোজারের নীচে সমস্ত অনৈতিক বেআইনি গুণ্ডা বদমায়েশ শায়েস্তা করেছেন গত পাঁচ বছরে, তাই তাঁর নাম হওয়া উচিৎ ‘বুলডোজার মুখ্যমন্ত্রী’। আবারও তা নিয়ে হইচই, বিতর্ক। তিনি কিভাবে নিজের নামে ওঠা সমস্ত অভিযোগ নিজেই সরিয়েছেন, কিভাবে উনি ভুয়ো সংঘর্ষের নামে মানবাধিকার ধ্বংস করেছেন, আলোচনা চলে আর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় সেই ‘বিকল্প সত্যি’টি, যে বুলডোজার হচ্ছে শক্তির প্রতীক, তা দিয়ে যেকোনও কিছু ধ্বংস করা যায়। প্রমাণ করে দেওয়া যায়, জোরের সঙ্গে, যে কোনও কিছু যা সরকারের অপছন্দের তালিকায় আছে, তা জোরের সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় বুলডোজার দিয়ে।
তাই সারা দেশ যখন দেখলো কিভাবে রামের জন্মদিন পালন বা রামনবমীকে কেন্দ্র করে খুব সচেতন পদ্ধতিতে মুসলমান মহল্লায় ঢুকে অস্ত্র নিয়ে আস্ফালন করা হচ্ছে, কিভাবে মসজিদের মধ্যে ঢুকে গেরুয়া পতাকা লাগানো হচ্ছে, তখন দেশের বহু মানুষ আর আশ্চর্য হলেন না, কারণ তাঁদের কাছে ঐ বিকল্প সত্যিটাই আসল সত্যি মনে হতে শুরু করেছে ততদিনে। ভীড়ের মধ্যে থেকে সেই মিছিলে পাথর ছোঁড়ানো হল, বা উত্যক্ত হয়ে মুসলমান মানুষজন হয়তো বা পাথর ছুঁড়েছেন এই সত্যিকেও জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করা হলো। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সেই মুসলমান মহল্লাগুলোতেই এবার বুলডোজার চালানো হলো। তারপরে এলো হনুমান জয়ন্তী, সেখানেও একই প্রক্রিয়া নেওয়া হলো। শুধুমাত্র স্থান কাল বদলে গেল। মধ্যপ্রদেশের বদলে এবার দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরি। তৈরী করা হলো আবারও একটি দৃশ্য, বলা হলো যাঁরা ঐ হনুমান জয়ন্তীর মিছিলে পাথর ছুঁড়েছেন, তাঁরা সবাই বাংলাদেশী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী। তাঁরা অবৈধভাবে দখল করে আছেন দিল্লির ঐ অঞ্চল। অথচ তাঁরা যে বাংলার নানান প্রান্ত থেকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক, সেই সত্যিটা মানুষ যাতে জানতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে আবারও তৈরী হলো ‘বিকল্প সত্যি’। আবার সেই অঞ্চলগুলোতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশকে উলঙ্ঘন করে পৌঁছে গেল সেই ‘বুলডোজার’। আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল সেই ‘বুলডোজার’। অথচ তাঁকে ঠেকাতে যে বামপন্থী বেশ কিছু মানুষ এক অদম্য ‘প্রাচীর’ গড়ে তুললেন, তা কিন্তু আলোচনায় থাকলো না, বুলডোজারই থাকলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু্তে।
একজন নির্বাচক দীর্ঘ সময় ধরে যদি কোনও একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী চিহ্ন দেখে এবং তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে আলোচনা শোনে, তখন তাঁর মনে হতে বাধ্য যে এই রাজনৈতিক দলটি যথেষ্ট শক্তিশালী এবং তাঁরাই আইন। বুলডোজারের তলায় যে কোনও কিছুই পিষে ফেলতে পারে যে দল, সেই পরাক্রমশালী ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে চান বেশীরভাগ নির্বাচক। এটাই সেই বিকল্প সত্যি যা নানান ভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে বেশ কিছু বছর ধরে। কখনো গুজরাট মডেলকে তুলে ধরা, কখনো প্রবল শক্তিশালী একজন প্রধানমন্ত্রী আছেন বলেই প্রতিবেশী দেশের আক্রমণের সমুচিত জবাব দেওয়া গেছে, কখনো ধর্মীয় ভাবাবেগ এবং রাজনৈতিক দলকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়া এই সমস্ত কিছুই আসলে একজন সাধারণ নির্বাচককে প্রভাবিত করে। একটা সময়ে নির্বাচনের সময়তেই এই সব নিয়ে আলোচনা হতো, কিন্তু আজকের সময়ে সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে সারা বছর ধরে এই আলোচনা হয়, সারা বছর ধরেই একজন নির্বাচকের আচরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়। আজকে ‘কাশ্মীর ফাইলস’ নামক ছবির মধ্যে দিয়ে যে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, তাও ঐ বিকল্প সত্যি নির্মাণের অঙ্গ। তাই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দুর্দশাকে, কাশ্মীরি মুসলমান মানুষদের গণতন্ত্রকে যে হত্যা করা হচ্ছে, তার চেয়েও বড় করে দেখানো হয়। যাঁরা ভোট কুশলী বলে পরিচিত, তাঁদের কাজটাই হচ্ছে কিভাবে একজন নির্বাচককে তাঁর বিরোধী অবস্থান থেকে সরিয়ে অন্ততপক্ষে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা যায়। আগে যাঁরা বিজ্ঞাপন দিতেন, তাঁরা কোনও একটি দ্রব্যের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করে বিজ্ঞাপন করতেন, ইদানিং কোন মানুষ কি পছন্দ করেন সেই বুঝে সংস্থারা বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক দলও নিজেদের বিজ্ঞাপন করেন, কোন মানুষ কোন আদর্শ, কোন নেতার কথায় প্রভাবিত হন, সেটাও যেহেতু আজকের সামাজিক মাধ্যমের সময়ে ভোটকুশলীদের করায়ত্ব, তাই তাঁরা ভালোই জানেন কি করে একজন নির্বাচকের কাছে তাঁর পছন্দমতো দৃশ্যকল্প উপস্থাপিত করতে হয়। 
বিকল্প সত্যিটাই কখন যেন সত্যি হয়ে যায়, মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, অথচ বিরোধিতার ‘প্রাচীর’ ও যে একটি দৃশ্য, যার মধ্যে দিয়ে লড়াইয়ের ছবি তুলে ধরা যায়, তা কি আমরা সামনে আনতে পারলাম? আমাদের উচিৎ ছিল না কি, এই রকম আরও বহু বহু প্রাচীর এই হিন্দুত্ববাদীদের সামনে তুলে ধরার? বামেদের যৌথ লড়াই, বা এই প্রতিরোধের প্রাচীরই যে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার অন্যতম সত্যি, তা দেশের আরও নানান স্থানে যদি তুলে ধরা যেত, তাহলে সংখ্যালঘু মানুষও ভরসা পেতেন, লাল পতাকার তলায় সমাবেশিত হতে উৎসাহিত হতেন। ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাস্ত করার জন্য, রাস্তায় বিরোধিতার প্রাচীর গড়ে তোলাই যে একমাত্র রাস্তা, তা আরও বেশী বেশী করে প্রয়োগে নিয়ে যাওয়াই কি আজকের সময়ের অন্যতম কাজ নয়?
 
সুমন সেনগুপ্ত : বাস্তুকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post