• May 25, 2022

সুপ্রিম কোর্টের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মীদের প্রতিক্রিয়া

 সুপ্রিম কোর্টের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মীদের প্রতিক্রিয়া

পূর্বাঞ্চলের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের থেকে প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়া নিম্নে দেওয়া হলো

সুজাত ভদ্র

সুপ্রিম কোর্টের ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এর (ক) সংক্রান্ত যে আদেশ দিয়েছে সেটা এক অর্থে ঐতিহাসিক এবং এক অর্থে যুগান্তকারী।কারণ ধারাবাহিকভাবে নাগরিক অধিকারের ওপর আক্রমণ এবং ধারাবাহিক ভাবে নানা ধরনের অগণতান্ত্রিক দমনমূলক আইন প্রণয়ন এবং কিছুদিন আগেও সংসদে অপরাধী শনাক্তকরণ আইন পাশ হয়ে যাওয়ার এই আবহে যেখানে গণতন্ত্র সংকুচিত হচ্ছে সেখানে এই ধরনের রায় নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এই আইন ব্রিটিশ আমলে ছিল এটা মনে রাখতে হবে, এবং ক সংযোজনটি ম্যাকলে করেননি, strachey করেছিলেন ১৮৭০ সালে। এবং অদ্ভুত কিছু ইংরেজি শর্ত দেন disloyality to the government this affection to the government মানে সরকারকে ভালো না বাসলে সরকারের প্রতি অনুগত না হলে তাহলে সেই ব্যাপারে যদি কোনো ভাষা কোনো শব্দ এমনকি কোনো সিম্বল দিয়েও যদি কোনো disaffection দেখানো হয় তাহলে তাকে সিডিশন বা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত করা হবে এবং এই প্রক্রিয়াতে ১৮৯১ সালে বা অবিভক্ত বাংলার যোগেশ বোস থেকে শুরু করে ব্রহ্মমাল্য উপাধ্যায়, মহাত্মা গান্ধী, বাল গঙ্গাধর তিলক সবাই কমবেশি এই আইনের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন।মহাত্মা গান্ধী অসাধারণ একটা কথা বলেছিলেন যে এটা হচ্ছে ‘prince section’. ভারতীয় দণ্ডবিধির সাজা দেওয়ার পদ্ধতিতে এটা হচ্ছে ‘যুবরাজ সেকশন’ এই অর্থে এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকের(প্রজা) মানুষের অধিকারকে খর্ব করার একটা মাধ্যম হিসেবে এটা ব্যবহার করা হয়, আইনটাই তাই।ওনার মতে ছিল সম্পূর্ণ অন্যায় এবং তিনি কোর্টে দাঁড়িয়ে এটা বলেছিলেন।পরবর্তীকালে কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলিতে এটা নিয়ে বিতর্ক হয়, এটা সংবিধানে থাকবে কি না তা নিয়ে।আপনারা জানেন যে সংবিধানের ২০ নং অনুচ্ছেদের ৪ নং উপধারায় বিবর্তন মূলক আইনের একটা বন্দোবস্ত আছে।সেটাও থাকবে কি না , সিডিশন এক্ট থাকবে কি না সেটা নিয়েও এখন বিতর্ক হচ্ছে।সরদার প্যাটেল এই ফান্ডামেন্টাল রাইটস সাব কমিটির পক্ষ থেকে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন তখন কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলিতে কিংবদন্তী বামপন্থী নেতা সোমনাথ লাহিড়ী অসাধারণ প্রশ্ন করেছিলেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।তিনি বলেছিলেন যে, বিদেশি সরকার, সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার তাদের যা ক্ষমতা ১২৪ (ক) এ দেওয়া ছিলো, তার থেকেও বেশি ক্ষমতা কেন স্বাধীন ভারতে নির্বাচিত সরকার চাইছেন এটা অস্বাভাবিক এবং সংবিধানের স্পীরিটের সঙ্গে সংজ্ঞতিপূন নয়?এই যুক্তির কোনো উত্তর প্যাটেল দিতে পারেননি এবং সংবিধানে তাই সিডিশেন সংক্রান্ত বিষয় যুক্ত হয়নি। । উপরন্তু আমাদের সংবিধানের ১৩ নং অনুচ্ছেদে আছে সে সমস্ত ঔপনিবেশিক আইন সংবিধানে আছে সঙ্গতিপূর্ণ নয় সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে কিন্তু বাস্তবে হয়নি।
বিপরীতে এটা রাজনৈতিক বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য ব্যবহার হয় আসছে। বিহারের কেদার নাথ সিং নামে সরকারের বিরুদ্ধে খুব অসহিষ্ণু মূলক লেখা লিখে ছিলেন এবং সিডিশন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন,সেই মামলা সুপ্রিম কোর্টে যান এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রথম আইনের ওপর কিছু গাইডলাইন দেয়।প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ১৯৫০ সালে দুটো মামলায় ব্রীজ নায়ারণ এবং রমেশ থাপার মামলায় বিচারপতিরা এই ধারাকে অসাংবিধানিক বলেন , জজেরা বলেন ১২৪ এর (ক) সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় অসাংবিধানিক।তখন কংগ্রেস সরকার ‘security of the state’ শব্দটি বদলে দিয়ে ‘in the interest of the public’ এই শব্দবন্ধ টি যোগ করে দেয়।এবার এটা আরো ব্যাপক ,অসচ্ছ ,অস্পষ্ট করে দিলো।সেই ১৯৬২ সালের মামলায় যে গাইডলাইন ছিল শুধুমাত্র প্রত্যক্ষ ভাবে হিংসায় মদত দেওয়া কোনো বক্তব্য বা অন্য কিছু হলে তখন শুধুমাত্র ১২৪ এর (ক) এ অভিযুক্ত করা যাবে।এটা কেউ মান্যতা দিলনা।বরং দেখা যাচ্ছে ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৩৩০০ এর ওপর সিডিশন মামলা (আর্টিকে ফোর্টিন এর রিপোর্ট অনুসারে) দেওয়া হয়েছে এবং বিজেপি সরকারের আমলে ২০১৪ সাল থেকে ৬৩% মামলা বৃদ্ধি হয়েছে।কার্টুন, একটা সাংবাদিকের লেখা, মণিপুরের একজন সাংবাদিক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে লিখেছেন তাকে, অসীম ত্রিবেদির মতন একজন কার্টুনিস্ট থেকে শুরু করে উমর খালিদের মতন পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্ট প্রত্যেকে আছে।এমনকি তৃণমূল সরকারের আমলে কদিন আগে মাওবাদী বলে যাদের গ্রেপ্তার করা হলো তাদেরও ১২৪ এর (ক) ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে।রাজা সরখেল দের আগে দেওয়া হয়েছিল।লালগড় সহ অধিকাংশ আন্দোলনে ১২৪ এর (ক) ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে।এবং এই সরকারও ১২৪ এর (ক) এ মামলা দিচ্ছে।এটার সাথে ইউএপিএ এবং অন্যান্য আইনের একটা ফারাক আছে।ইউএপিএ হলো ‘অ্যান্টি টেরর ল’।এটা একটা বিশেষ আইন।এগুলো প্রয়োগ করতে গেলে নোটিফিকেশন ইত্যাদি দিতে হয়।যদিও আইনগুলো খুবই খারাপ,তবুও একটা নোটিফিকেশন দিতে হয়।কিন্তু সিডিশন তো নরমাল ল।পুলিশ আমাকে ধরলো, আপনাকে ধরলো, টুক করে ১২৪ এর (ক) ধারায় মামলা দিয়ে দিল।এবং ম্যাজিস্ট্রেটও কোনো তার মাইন্ড অ্যাপ্লাই করে না।ফলে হাজার হাজার লোক এর দ্বারা আক্রান্ত।ফলে এটার উপর যখন সুপ্রিম কোর্ট একটা চেক দিয়েছেন এবং রিড দিয়েছে যে জামিনের আবেদনও করতে পারবে ইত্যাদি ইত্যাদি।এটা নিঃসন্দেহে যুগান্তরকারী বলে মনে হয়।আমরা সহ সমস্ত মানবাধিকার সংগঠন এটা বাতিলের পক্ষে।পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদ্রোহিতার আইন উঠে গেছে।স্বয়ং ইংল্যান্ডে এই আইন উঠে গেছে।সেখানে ভারতে এটা রীতিমত বিদ্যমান।এবং সেটা পুলিশ যথেচ্ছ ব্যবহার করে যাচ্ছে এবং শাসক দল রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে একেবারে মজার সঙ্গে এটা ব্যবহার করে যাচ্ছে।অনেকগুলো মারাত্মক আইন আছে।একটা মারাত্মক আইন কমে গেলে গণতন্ত্র একটুখানি এগোলো,একটুখানি সুরক্ষিত হলো,একটুখানি প্রটেকশন পেলো।সেই অর্থে এটা ঐতিহাসিক বলেই মনে হয়।

আশিস গুপ্ত

অধিকার রক্ষা আন্দোলনের প্রাথমিক জয়। দশকের পর দশক ধরে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে মানুষের বাক স্বাধীনতা , আন্দোলনের অধিকার কেড়ে নিতে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে নানা রঙের শাসকদলগুলি। দেশের, অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা প্রতিটি সংগঠন ব্রিটিশ দাসত্বের পরম্পরা রাষ্ট্রদ্রোহ আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে এসেছে। দেশের শীর্ষ আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ অধিকার রক্ষা আন্দোলনের দাবিকে ন্যায্যতা প্রদান করেছে। তবে এখনো লড়াই অনেক বাকি। ব্রিটিশ দাসত্বের পরম্পরা বহন করার দায় নিয়ে যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসীন, তারা এতো সহজে পরাজয় মেনে নেবেনা। তারা নানাভাবে চেষ্টা চালাবে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ ধারা যদি নাও থাকে , ওই আইনের নির্যাসটুকু যেন ধরে রাখা যায় ভারতীয় দণ্ডবিধিতে অন্য কোনো নামে অথবা নম্বরে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ দেশের বিচার ব্যবস্থা টক,ঝাল, মিষ্টির সংমিশ্রণ। বিজ্ঞান, অ-বিজ্ঞান দুটোই আছে এই ব্যবস্থায়। পৌরাণিক কাহিনীর আধারে কথিত চরিত্রের জন্মভূমি চিহ্নিত করে তার মালিকানা স্বত্বের আইনগত স্বীকৃতি দেবার বিচারপতিও যেমন আছেন, তেমনই দেশের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও লুঠেরা ব্রিটিশদের তৈরী কুখ্যাত আইনের বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা বিচারপতিও আছেন। তাই আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, চূড়ান্ত রায় ঘোষণা পর্যন্ত। বিচারপতির পরিবর্তনে যেন অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ চূড়ান্ত রায়দান কালে বিপরীতমুখী লক্ষ্যে ধাবমান না হয়।

সুমন কল্যাণ মৌলিক

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক কিন্তু অধিকার আন্দোলনের দাবি এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট। আমরা সিডিশন ল,ইউএপিএ,আফম্পার মত দানবীয় আইনগুলির বাতিল চাই।কোন গণতান্ত্রিক দেশে এই ধরণের চূড়ান্ত দমনমূলক,অগণতান্ত্রিক আইনের অস্তিত্ব থাকতে পারে না।অথচ ইতিহাস সাক্ষী স্বাধীনোত্তর ভারতে সমস্ত সরকার,তাদের পতাকার রঙ যাই হোক না কেন,এই ঔপনিবেশিক আইনটিকে যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করেছে এবং করে চলেছে। কাগজে দেখলাম কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআই( এম) সর্বোচ্চ আদালতের রায় কে স্বাগত জানিয়েছে। এখন আমার মনে হয় তাদের স্বাগত জানানো যদি আন্তরিক হয় তবে তাদের ঘোষণা করা উচিত তারা যেখানে যেখানে সরকার পরিচালন করছে সেই সব রাজ্যে কোনভাবেই এই আইনের প্রয়োগ হবে না।সেই সঙ্গে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে যারা এই আইনে বন্দী আছে তাদের জরুরি ভিত্তিতে মুক্তির ব্যবস্থা করা।তবে আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে সর্বোচ্চ আদালতের এই অবস্থান চূড়ান্ত নয়।অনেক লড়াই এখনো বাকি।তবে অন্তত এটা প্রমাণিত যে যুক্তি পরম্পরা মেনে আমরা এই আইনগুলো রদের দাবি করেছি তার সত্যতা আজ প্রতিষ্ঠিত।

কিরীটি রায়

ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এর ক উপ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহ বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপাতত স্থগিত করেছেন। মানবাধিকার কর্মী হিসেবে তাকে স্বাগত জানাচ্ছি । অনেক পূর্বেই এই উপধারা বাতিল হওয়া উচিত ছিল, যা এখনো হয়নি। ঔপনিবেশিক আমলের শাসন ও শোষণের বেশকিছু কলঙ্কজনক এবং অগণতান্ত্রিক ধারা আমাদের ফৌজদারী কার্যবিধি / দণ্ডবিধিতে আছে; যেমন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা। ন্যায় বিচারের স্বার্থে এইসব একুশে আইন অবিলম্বে বাতিল হওয়া উচিত।

তাপস চক্রবর্তী

সারা ভারতবর্ষের নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রপরিচালনা ব্যবস্থা সম্পর্কে যখন ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিল তখন এই সামগ্রিক আঁধারের মধ্যে শীর্ষ আদালতের রাষ্ট্রদ্রোহিতা ধারার(১২৪ এ)নির্বিচার প্রয়োগ সম্পর্কে এই রায় ,সামগ্রিক আঁধারের মধ্যে একটি রুপোলী রেখার মতন দেখা দিল।নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক দিক হিসাবে চিহ্নিত হবে। এপিডিআর তার জন্ম থেকেই উপনিবেশিক আইনের ধারা টি বাতিলের পক্ষে সওয়াল করে গেছে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে।১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে ভারতীয় দণ্ডবিধি লাগু করে। এর প্রায় এক দশক বাদে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে 124 A ধারাটি যুক্ত করা হয়। মূলত ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে এই ধারাটি প্রয়োগের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এই ধারা প্রথম প্রয়োগ হয় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মুখ বালগঙ্গাধর তিলক এর বিরুদ্ধে।মহাত্মা গান্ধীর বিরুদ্ধে এই ধারাটি প্রয়োগ করা হয়েছিল।গান্ধীজী ধারাটিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রিন্স হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন ১৯৫২ সালে । ভারতবর্ষের প্রথম নির্বাচিত পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন- ভারতীয় দণ্ডবিধির এই ধারাটি ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ও সংবিধানের মূল সুরের পরিপন্থী সুতরাং এই ধারাটি যত তাড়াতাড়ি বিদায় করা যায় সেটাই দেখতে হবে।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত‍্য কোন সরকারই এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।ধারাবাহিকভাবে এই আইনের প্রয়োগ ঘটেছে- বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে,শ্রমিক আন্দোলন কে বন্ধ করতে,কৃষক আন্দোলন কে শেষ করতে,নির্ভীক সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক ,কবি গণ-আন্দোলনের ও নারীবাদী আন্দোলনের কর্মীদের উপর । সম্প্রতিককালে জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রনেতা কানাইয়া কুমার,ওমর খালিদ,অনির্বাণ ভট্টাচার্য,শরজি্ল ইসলাম, কাশ্মীর উপত্যকার মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী পারভেজ ইমরোজ,উত্তরপ্রদেশের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান ,ভীমা কোরেগাঁও মামলার কবি ভারভারা রাও,সোমা সেন, সুধা ভরদ্বাজ সুরেন্দ্র গ‍্যাডলিং, গৌতম নওলাখা রোনা উইলসন সহ একাধিক বিশিষ্ট মানুষদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয়েছে এই রাষ্ট্রদ্রোহীতার এই ধারা । ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযোগ আনার সুবিধা এটাই যে অভিযোগ আনতে বিশেষ কোনো তথ্য-প্রমাণ লাগেনা। সরকারের উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যতদিন না পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে ততদিন এই আইন প্রয়োগ স্থগিত থাকবে।এই আইনে নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না,যে মামলাগুলো চলছে সেগুলি মুলতুবি থাকবে। যারা বন্দিদশা কাটাচ্ছেন এই আইনের ফলে তারা জামিনের আবেদন করতে পারবেন । দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা এই আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে যে যে কথাগুলো ধারাবাহিকভাবে বলে আসছিলেন এবং এই আইন তুলে নেয়ার স্বপক্ষে সওয়াল করেছিলেন শীর্ষ আদালতের এই রায় তাদের দাবির পক্ষে একটি সিলমোহর দিলেন।শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশিকা কে সামনে রেখে মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের এপিডি আরের কর্মীদের এই ধারা বাতিল ও ভারতবর্ষে দানবীয় নিবর্তনমূলক আইন যেমন ইউএপিএ,আর্ম ফর্সেস স্পেশল পাওয়ার্স অ্যাক্ট,নিয়া সহ একাধিক আইন বাতিলের দাবিতে নিরলসভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া । সাথে সাথে এ কথাটিও আমাদের মনে রাখা দরকার বেশ কিছুদিন ধরে বিশ্বজুড়ে এবং মানবাধিকার কাউন্সিলের তরফে নিন্দিত হচ্ছিল ভারতের রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা। ভারতরাষ্ট্র তার হিংস্র চেহারা টাকে মুখোশের আড়ালে লুকোতে চাইছেন সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশিকা কে সামনে রেখে।আসলে আমরা ঘর পোড়া গরু তাই সন্ধারাগকেও ভয় পায়।

শৈলেন মিশ্র

অতি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এর ক ধারার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। এতে আমাদের দেশের যারা গনতন্ত্র প্রিয় মানুষ, তারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে, পুরোটা নয়। পুরোটা নয় কেন? কারণ এই আদেশ অন্তর্বর্তীকালীন। যখন সত্যি সত্যিই এই আইন বাতিল হয়ে যাবে তখন মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। কিন্তু বিপদ আছে। বিপদ আছে এই কারণেই, যে ৪৭ পরবর্তী ভারতে বিভিন্ন নামে একের পর এক কালা কানুন প্রযোজ্য হয়েছে। সেটা ইউএপিএ হতে পারে, মিসা হতে পারে, ডিআইআর(defence of indian rule act) হতে পারে, পোটা হতে পারে, বা আফস্পা হতে পারে। এইসব আইন হল কালাকানুন বা বলা যায় দানবীয় আইন। মুখে বলা হচ্ছে একটা সভ্য দেশ কিন্তু এই সভ্য দেশে অসভ্য আইন এখনও পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। যদি তর্কের খাতিরে বা যুক্তির খাতিরেই আমরা ধরে নিই যে ১২৪ এর ক ধারা খারিজ হলো এবং এই ধারায় ৯০ দিনের মাথায় জামিন পাওয়া যায়। কিন্তু যেটায় জামিন পাওয়া যায় না, যা সত্যিকারের অর্থেই নিবর্তন মূলক আইন তা হলো ইউএপিএ, আফস্পা।
যেমন ৭০-৭১ এ আমরা দেখেছি পিভি অ্যাক্ট বা মিসা বা তার পরবর্তীকালে পোটা, এনএসএ (National Security Act) বা তার আগেও ছিল বেশ কিছু কালাকানুন। এই কালাকানুন গুলোর কোনো সময়সীমা থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে তার সময়সীমা ১বছর, কোনোটা আবার ৩বছর (অতীতে ছিল)। বর্তমানে তৈরী হওয়া কালাকানুন গুলির কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই, তা লাগু থাকতে পারে অনির্দিষ্টকালের জন্য। সেই কারণে এই আইনগুলি প্রত্যাহার না হলে, গনতন্ত্র বিকশিত হবে না। শাসকবর্গ অর্থাৎ যে ব্রিটিশ শাসকেরা এই উদ্দেশ্যে এই আইনগুলি করেছিল (রাওলাট আইন জাতীয়) বা পরবর্তীকালে যারা ভারতের ক্ষমতাশীল হয়েছে, শাসক শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়েছে, শাসকদল হয়েছে তারা শুধুমাত্র বিরোধীদের কন্ঠরোধ করবার জন্য এই আইনের প্রবর্তন করেছে। আমরা এই আইনগুলি তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। যদি দেখা যায় আজকের দিনে ইউএপিএ খারিজ হয়ে গেল, আফস্পা বাতিল হয়ে গেল তাহলে সত্যিই মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • মানবধিকার আন্দোলনে র জয় স্বাধীন ভাতের সংবিধান কলংক মোচনের একটা প্রক্রিয়া বটে কিন্তু দেশে এখন অনেক আইন রয়েছে যা মানবাধিকার হরণ সেসব বাতিল না করার দাবিতে অনড় থাকতে হবে ও সরকার কি ধরনের নতুন আইন এনে নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢেলে কি না নজর রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post