• September 27, 2022

ভারতবর্ষ ক্রমেই এক হিন্দু – ফ্যাসিবাদী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে

 ভারতবর্ষ ক্রমেই এক হিন্দু – ফ্যাসিবাদী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে

অরুন্ধতী রায়

বিগত কয়েক মাস ধরে ভারতবর্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পার্টি বিজেপির শাসনাধীন রাজ্যগুলিতে প্রশাসন শুধুমাত্র সরকার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের সন্দেহে মুসলিমদের বাড়ি,দোকান ও ব্যবসাকেন্দ্রগুলি বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দিচ্ছে। ঐসব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা সগর্বে তাদের নির্বাচনি প্রচারে এই নীতি ঘোষণা করছেন।

আমার কাছে এখন সেই সময় এসেছে যখন গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ ভঙ্গুর গণতন্ত্র খোলাখুলি ও নির্লজ্জ ভাবে এক অপরাধমূলক হিন্দু-ফ্যাসিস্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।মনে হয় হিন্দু অবতার রূপী গ্যাংস্টাররাই আমাদের শাসন করছে।তাদের কেতাবে মুসলিমরাই দেশের পয়লা নম্বর গণশত্রু।

অতীতে গণহত্যা, পিটিয়ে মারা,পরিকল্পিত হত্যা,হেফাজতে মৃত্যু, ভুয়ো পুলিশ এনকাউন্টার ও মিথ্যা অভিযোগে কারাবাস– এই ছিল মুসলিমদের শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতি। এই তালিকায় নতুন ও খুবই কার্যকরী সংযোজন হল বুলডোজার চালিয়ে বাড়িঘর ও ব্যবসাকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া।

এই ধ্বংস কার্যের প্রতিবেদন লেখার সময় বুলডোজারগুলিকে যেন এক দৈবী প্রতিশোধের অস্ত্র হিসাবে দেখানো হচ্ছে। শত্রুকে চূর্ণ করার এই ভয়ংকর ধাতু-নখ যুক্ত বিশাল যন্ত্রগুলিকে এমন ভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে যেন সেগুলি কোন দানব-দলনকারী পৌরাণিক দেবতার প্রতিরূপ। এগুলি এখন নতুন প্রতিশোধপরায়ণ হিন্দু জাতির রক্ষা কবচে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন( বর্তমানে প্রাক্তন) তাঁর সাম্প্রতিক ভারত সফরে এরকম একটি বুলডোজারের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছিলেন।তিনি ঠিক কী করছেন এবং তাঁর কাজের মাধ্যমে কাকে সমর্থন জানাচ্ছেন সেটা তাঁর অজানা ছিল তা বিশ্বাস করা কঠিন। অন্যথা কেনই বা কোনো রাষ্ট্রপ্রধান সরকারি সফরে এসে বুলডোজারের পাশে পোজ দেওয়ার মত অদ্ভুত কাজ করবেন?

সরকারি কর্তৃপক্ষ অবশ্য জোর গলায় বলছেন যে মুসলমানরা তাঁদের লক্ষ্য নন, তাঁরা শুধুমাত্র বেআইনিভাবে নির্মিত সম্পত্তিগুলিই ভাঙছেন।এযেন পৌরসভা পরিচালিত এক পরিষ্করণ কর্মসূচি। এই যুক্তি যে বিশ্বাস্য নয় তাঁরাও জানেন; এ এক চরম বিদ্রুপ,যার উদ্দেশ্য সন্ত্রাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করা।অধিকাংশ ভারতবাসীর সাথে সাথে কর্তৃপক্ষও জানেন যে প্রতিটি ভারতীয় শহরের বেশিরভাগ নির্মাণ হয় বেআইনি,না হয় আধা- বেআইনি। কোনরকম নোটিশ ছাড়া,আপিল অথবা শুনানির সুযোগ না দিয়ে শুধুমাত্র শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাড়ি- ঘর- ব্যবসাকেন্দ্র বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফলে একসাথে বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য সাধিত হয়।

বুলডোজার যুগের আগে মুসলমানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হত উন্মত্ত জনতা ও পুলিশকে — যারা হয় নিজেরাই শাস্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিত অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে নজর ঘুরিয়ে রাখত।বুলডোজার দিয়ে সম্পত্তি ভেঙে দেওয়ার জন্য কেবল পুলিশ নয়,কাজে লাগানো হল পৌর কর্তৃপক্ষকে,সংবাদমাধ্যমকে– যারা অকুস্থলে উপস্থিত থেকে অসুর- দলনের মত দৃশ্যকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করবে এবং আদালতকে যারা অকারণ হস্তক্ষেপ না করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকবে।এর মাধ্যমে মুসলিমদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হল,’তোমাদের পাশে দাঁড়াবার মত কেউ নেই। কোন বিচার ব্যবস্থার কাছে তোমরা আবেদন জানাতে পারবে না।এই গণতন্ত্রের প্রতিটি নিয়ন্ত্রণকারী ও ভারসাম্যরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানই এখন থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হবে।

‘অন্য কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত সরকার বিরোধীদের সম্প্রতি প্রায় কখনোই এভাবে ধ্বংসের নিশানা হয়ে ওঠেনি।উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়,জুন মাসের ষোলো তারিখে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ তরুণ- যুবক সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য বিজেপি সরকারের নতুন নীতির প্রতিবাদে সারা উত্তর ভারত জুড়ে সহিংস তান্ডব চালিয়েছিল। সেই বিক্ষোভে ট্রেন ও অন্যান্য যানবাহন পোড়ানো হয়েছিল, রাস্তা অবরোধ করা হয়েছিল এবং একটি শহরে তারা বিজেপির অফিসেও আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুসলমান ছিল না।তাই তাদের বাড়ি- ঘর ও পরিবারের নিরাপত্তা অটুট ছিল।

২০১৪ এবং ২০১৯- এর সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি সুনিশ্চিত ভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে ভোটে জিতে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য তাদের দেশের কুড়ি কোটি সংখ্যা বিশিষ্ট মুসলমান সম্প্রদায়ের ভোটের কোন প্রয়োজন নেই।তাই আমরা প্রকৃত পক্ষে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এক প্রক্রিয়া লক্ষ্য করছি। এর পরিণাম হবে খুবই বিপজ্জনক।কারণ নাগরিক অধিকার না থাকলে আপনার কোন গুরুত্বই থাকে না।আপনি তুচ্ছাতিতুচ্ছ, অকিঞ্চিতকর হয়ে পড়েন; এবং তখন আপনাকে ইচ্ছেমত ব্যবহার বা অপব্যবহার করা ঢ়ায়।বর্তমানে এই প্রক্রিয়াই আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলেছে।বিজেপির ওপরের সারির নেতারা লাগাতার মুসলিমদের কাছে যা কিছু পবিত্র তাকে জনসমক্ষে হেয় করে চলেছে।তা সত্বেও তাদের মূল ভিত্তি যে সংগঠন তার পক্ষ থেকে কোন রকম অর্থপূর্ণ সমালোচনা শোনা যায় নি,বা পার্টিকে সমর্থনেও কোন ঘাটতি পড়েনি।

মুসলিমরা এই অপমানের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ সংগঠিত করেছে।তাদের বিক্ষোভের হেতু বোঝা শক্ত নয় কারণ এই অপমানের ঘটনা ঘটেছে ধারাবাহিক হিংসা ও নিষ্ঠুরতার পেছনে পেছনে।অবধারিত বিক্ষোভ আন্দোলনের সাথে সাথে,প্রতিবাদীদের এক অংশ দেশে ধর্মনিন্দা বন্ধ করার উপযুক্ত আইন (Blasphemy law) প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে। এই দাবি মেনে নেওয়া বিজেপির পক্ষেও সুবিধাজনক, কারণ এর দ্বারা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরোধী যে কোন বক্তব্যকে অপরাধ বলে সাব্যস্ত করা যাবে।ভারতবর্ষ আজ রাজনৈতিক ও আদর্শগত ভাবে যে চোরাবালিতে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে সমস্ত বৌদ্ধিক ধারাভাষ্যকে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে এই আইনের সাহায্যে।কিছু প্রতিবাদকারী,যার মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া মজলিস -ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের সদস্য, শাস্তি হিসাবে ফাঁসি,বা অন্যরা মুণ্ডচ্ছেদের দাবি জানিয়েছে — যা দক্ষিণপন্থী হিন্দুরা দীর্ঘকাল ধরে মুসলমানদের সম্পর্কে যে নেতিবাচক ছবি প্রচার করে তাতেই ইন্ধন যোগাচ্ছে।উভয় পক্ষ থেকেই অপমান ও হত্যার হুমকির মধ্যে কোনো অর্থপূর্ণ সংলাপ সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।

মুসলমানদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পরে দেশে তৈরি হওয়া মেরুকরণ বিজেপির সমর্থন বাড়িয়ে তুলেছে। যিনি ঐ অপমানজনক কথাগুলি বলছিলেন, বিজেপির সেই মুখপাত্র মহিলাকে পার্টি থেকে সাসপেন্ড করা হলেও ক্যাডারদের মধ্যে তাঁকে সাদরে বরণ করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল।

আজকের ভারতবর্ষে আমরা “পোড়ামাটি নীতি” -র সমতুল্য পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছি।বহু বছর ধরে গড়ে তোলা সব প্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসের মুখে,যা আমাদের স্তম্ভিত করে দিচ্ছে। এক নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে উঠছে যাদের ভাবনাচিন্তাকে পুরোপুরি এক ছাঁচে ঢেলে গড়ে তোলা হচ্ছে, দেশের ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতা সম্বন্ধে যাদের কোন ধারণাই নেই। প্রায় ৪০০ টি টিভি চ্যানেল,অসংখ্য ওয়েবসাইট এবং সংবাদপত্রের সমন্বয়ে তৈরি গণমাধ্যমের সাহায্যে বর্তমান শাসকরা নিরন্তর ধর্মান্ধতা ও ঘৃণার পরিমন্ডল তৈরি করছে,এবং এতে ইন্ধন যোগাচ্ছে হিন্দু- মুসলমান উভয়পক্ষের ঘৃণার কারবারীরা।

হিন্দু মৌলবাদী ক্যাডারদের মধ্যেও এক নতুন জঙ্গি অতি-দক্ষিণপন্থী অংশ উপস্থিত, যাদের নিয়ন্ত্রণ করা মোদি সরকারের পক্ষেও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে কারণ এরাই বিজেপির সমর্থনের মূল ভিত্তি। সোশ্যাল মিডিয়াতে এখন নিয়মিত ভাবেই মুসলমানদের হত্যা করার আহ্বান দেখা যায়।এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছি আমরা যেখান থেকে ফেরার কোন রাস্তা নেই। আমরা যারা এর বিরোধী, বিশেষ করে ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়, তাদের ভাবতে হবে এই পরিস্থিতিতে কিভাবে টিকে থাকা যায়। কীভাবে আমরা এর প্রতিরোধ করবো? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন কারণ আজকের ভারতবর্ষে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধের কথা বলাটাও ঘৃণ্য অপরাধ, প্রায় সন্ত্রাসমূলক কাজকর্মের সমতুল্য।

অরুন্ধতী রায়ের লেখা অনুবাদ করেছেন ডঃ স্বাতী ঘোষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post