• December 4, 2021

নিয়মগিরির প্রতিরোধ

 নিয়মগিরির প্রতিরোধ

স্বপ্ননীল মুখার্জী :- ইতিহাসের গতিপথে এমন কিছু ঘটনা চিরকালই বিরাজ করে যা ইতিহাসের ধারাকে কিছুটা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। আদিম সাম্যবাদ থেকে আজ অবধি এরকম বহু ঘটনার সাক্ষী মানবজাতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।আর একথা বলাই বাহুল্য যে এই প্রতিটি ঘটনা আরেকটি নতুন চেতনার জন্ম দেয় যা আরেকটি ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই যেমন ধরুন মানুষ যবে থেকে খাদ্য সংগ্রাহক থেকে উৎপাদকের দিকে গেল তবে থেকে উদ্বৃত্তের মত আরেকটি নতুন চেতনা মানুষের মনে এবং মগজে নিজের স্থান করে নিল।আবার সেই উদ্বৃত্ত কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলো আরো নতুন চেতনা।তবে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় একদমই উদ্বৃত্ত বা কৃষি কাজের উদ্বভ নয়,উদাহরণ দেওয়ার তাগিদে কিছুটা বলা হলো।আমরা আলোচনা করব ভারতবর্ষের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একটি গ্রাম নিয়ে যা খুব পুরাতন এমনটাও নয়।পূর্ব ভারতের একটি জীব-বৈচিত্র যুক্ত অঞ্চলের নাম হলো নিয়মগিরি, যেখানে প্রায় ৩০০ প্রজাতির গাছপালা ও তার মধ্যে ৫০ প্রজাতির ঔষধি গাছ এর দেখা মেলে।শুধু তাই নয় সাম্বার, চিতা, হাতি,পাঙ্গলিন সহ আরও বিভিন্ন প্রাণীদের বাসস্থান হলো এই নিয়মগিরি জঙ্গল।এছাড়াও বিভিন্ন আদিম উপজাতির আশ্রয়স্থল হলো এই অঞ্চল।দনগীরিয়া কন্ধ নামক এক আদিম অধিবাসীর কথা জানা যায় যারা সংখ্যায় ৮০০০ এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করে যাচ্ছে,যাদের জীবন ও জীবিকা চলে শুধুমাত্র এই জঙ্গলকে কেন্দ্র করে। প্রায় ৩০ টি ছোট নদী ও দুটি বড়ো নদী,নাহহাভালি এবং ভামসাধারের জল নির্ভর করে এই নিয়মগিরির ওপর। ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে বেদান্ত নামের একটি ব্রিটিশ সংস্থার সাথে ওড়িশা সরকার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং সেখানে বলা হয় যে ওড়িশা সরকার চালিত খনন সংস্থা বেদান্ত সাথে মিলে সেই অঞ্চলে বক্সাইট উত্তোলনের কাজ চালাবে।বেদান্ত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, বাজারে যাদের পরিচয় মোটেই ভালো নয়।বিভিন্ন মানবাধিকার ও পরিবেশ বাঁচাও সংস্থাগুলোর মতে বেদান্তর কার্যকলাপ মোটেই পরিবেশ তথা মানুষের পক্ষে সুখকর নয়,নরওয়ের সরকারের মতে বেদান্ত এমন কিছু বিপদ ডেকে আনে যার নিরাময় করা অসাধ্য হয়ে। তা সত্ত্বেও ওড়িশা সরকার এই সংস্থাটির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে ও খননকার্য শুরু করার কথা বলে।এতটা বিপদ থাকা সত্ত্বেও বেদান্তর সাথে যুক্ত হয় ওড়িশা সরকারের এগিয়ে যাওয়া মোটেই আশ্চর্যের নয়,এটি আদতে পুঁজিবাদী অর্থনীতির যে নয়া উদারনৈতিক কৌশল তারই একটা নমুনা মাত্র,যেখানে সরকারের কাজ শুধুমাত্র ধনী ব্যবসায়ী সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের পথকে সুগম করে দেওয়া, এতে পরিবেশের উপর কি প্রভাব পড়লো বা মানুষের উপর কি প্রভাব পড়লো তাতে তাদের কোনো যায় আসেনা।যদি বেদান্ত তাদের উদ্দেশ্যকে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়ে যেত তাহলে কোন ভাবেই আর নিয়মগিরি কে বাঁচানো সম্ভব হবে না,বিভিন্ন এনজিওর এরকম বলার সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট ২০০৮ সালে এই প্রকল্পকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়।এই বিচার আসার পরপরই শুরু হয়ে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন, সময়ের পাতায় যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।১৭ই জানুয়ারি ২০০৯ সাল,প্রায় ৭ হাজার আদিবাসীদের বিক্ষোভ দেখা যায় বেদান্ত রেফিনারি অফিস গেটের সামনে।২৭ শে জানুয়ারি প্রায় ১০ হাজার মানুষ একটি শৃঙখল বানায় নিয়মগিরি কে কেন্দ্র করে যেখানে দাবি ছিলো একটাই,বেদান্তের উচ্ছেদ। সঙ্গবদ্ধ মানুষের প্রতিবাদ কখনো বিফলে যায় না,এবারও যায়নি।মানুষের প্রতিরোধের চাপে এই প্রকল্প বন্ধ করতে বাধ্য হয় সরকার। জল-জঙ্গল-জমিনের লড়াই আজকের নয়,নিয়মগিরি একটি সংযোজন মাত্র।নিয়মগিরির এই লড়াই একটি উদাহরণ যা প্রমাণ করে দেয় যে শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিক,কৃষক, আদিম জনজাতির হারানোর কিছুই নেই।এই শৃঙ্খলই মানুষের প্রধান অস্ত্র যা এই পুঁজিবাদী শাসনযন্ত্রের ওপর সমাজতন্ত্রের খুঁটি গেঁড়ে দিতে সক্ষম হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post