• July 3, 2022

হিন্দু ধর্মে সমকামীতা

 হিন্দু ধর্মে সমকামীতা

ঋত্বিকা দাস :- আর্যদের ভারতবর্ষে আগমনের পর সমাজ, ধর্মীয় জীবনে বিশেষ পরিবর্তন আসে, সৃষ্টি হয় হিন্দু সনাতন ধর্মের। আনুমানিক খ্রীঃ পূর্ব ১৫০০ – ৬০০ অব্দ পর্যন্ত বৈদিক যুগের স্থায়িত্ব। প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহাসিক উপাদানগুলি ধর্মের সাথে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। তাই তৎকালীন সমাজ বা সংস্কৃতি সম্পর্কিত আলোচনায় ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। হিন্দু সনাতন ধর্মে মানবিক ও নৈতিকতার বিচারে সমকামীতা একটি বিশেষ ধারনা। বৈদিক হিন্দুধর্ম অকপটেই সমকামীতার প্রতি উদারতা ও বহুক্ষেত্রে স্বীকৃতি প্রদান করেছে, যা বর্তমান যুগের সংস্কারবাদী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আলোকিত হয়েছে।
সনাতন হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমকামীতা সম্পর্কীত মতবাদ বিভিন্ন। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, বৈদিক হিন্দু ধর্ম ও সনাতন হিন্দু ধর্মের মধ্যে বহু পার্থক্য বিদ্যমান। তবে কোন হিন্দু ধর্মকেন্দ্রীক গ্রন্থে সমকামীতাকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। ‘সামবেদে’ বলা হয়েছে ‘যা বিকৃত বা অপ্রাকৃতিক তাও প্রকৃতির সৃষ্টি’। বৈদিক যুগ থেকেই সমাজে তৃতীয় লিঙ্গ স্বীকৃতি পেয়েছেন। ‘মনুস্মৃতি’ বা ‘সুশ্রুত সংহিতা’-য় সমকামীতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এবং এর অবস্থান সম্পর্কে সামাজিক প্রভাবের বর্ণনাও পাওয়া যায়। এই তত্ত্বগুলির কোনটাই সমকামীতাকে ভয়ঙ্কর নিন্দা বা তিরস্কার করেনি। খ্রীঃ পূর্ব ১৫০ অব্দের নিকট রচিত ‘বাৎসায়নের কামসূত্রে’ সমকামীতা বা সমকামী যৌন সম্পর্কের বর্ণনা আছে,এক্ষেত্রে বাৎসায়ন কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যক্তিবর্গকে ইহার অনুশীলনে নিষিদ্ধতা আরোপ করেছেন। কিন্তু কোথাও সমকামীতাকে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেননি।
খ্রীঃ পূর্ব ৪০০ অব্দ থেকে ৪০০ খ্রীঃ পর্যন্ত দীর্ঘ আট শতাব্দী ধরে শ্লোক সংযোজনের ফলে একলক্ষ শ্লোক সমন্বিত মহাভারতের সৃষ্টি হয়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের একটি অধ্যায়ে আরাবানের (যিনি অর্জুন ও উলুনির সন্তান)সহিত শ্রী কৃষ্ণের নারীরূপে বিবাহের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ে বেশ কিছু দেবদেবীরা আছেন যারা আন্তঃ আরক্ষ (উভয় পুরুষ ও মাহিলা)। দঃ ভারতে আইআপ্পাস্বামী শিব ও বিষ্ণুর মোহিনী (নারী) রূপের সন্তান হিসাবে পরিচিত। এছাড়া বৈদিক সাহিত্যে এমন বহু দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায় যাঁরা একক পুরুষ বা একক মহিলা থেকে জন্ম লাভ করেছেন, অথবা বিপরীত লিঙ্গকে উপেক্ষা করেছেন।
খাজুরাহো বা মধ্যযুগীয় হিন্দু মন্দিরগুলির স্থাপত্য ও ভাস্কর্য নিদর্শনগুলিতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমকামী সম্পর্ককে প্রকাশ্যে চিত্রিত করা হয়েছে। মনে রাখা দরকার শিল্প সর্বদাই সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনের প্রতিচ্ছবি। এই চিত্রগুলো থেকে অনুমান করা যায় হিন্দু সমাজ এবং ধর্মে বর্তমানের তুলনায় যৌনতার বিভিন্নতা ও সমকামী সম্পর্ক অনেক বেশি উন্মুক্ত ছিল। কালান্তরে ধর্মের ব্যাখ্যার পরিবর্তন হয়েছে। ধর্মের সাথে যুক্ত হয়েছে মৌলবাদ, কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতা, যা ধর্মের ব্যাখ্যাকে এক ভয়াবহ রূপ প্রদান করেছে। সামাজিক চেতনা ও মানবিক সমতার ওপর শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধ প্রাধান্য পেয়েছে। উদাহরন স্বরূপ বলা চলে -রবি বর্মার অভূতপূর্ব চিত্রশিল্প বয়কটের দাবি ওঠে আধুনিক ভারতবর্ষে।
প্রধান আঠারোটি পুরাণের মধ্যেও সমকামীতার নিদর্শন পাওয়া যায়। (প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য খলজী বংশের অন্যতম সুলতান মুবারক খলজীর সঙ্গে হাসান শাহ অর্থাৎ খসরু খানের সমকামী সম্পর্ক তৎকালীন ঐতিহাসিক দ্বারা স্বীকৃত।)বেশকিছু হিন্দু পুরোহিত সমকামী বিবাহ করেছিলেন,এই বিবাহগুলি ছিল আত্মিক চেতনার মিলন হিসাবে লিঙ্গ বহির্ভূত ধারনা। এছাড়া হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলিতে রূপান্তরিত লিঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। নারী পুরুষের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত এই শ্রেণীকে তৃতীয় প্রকৃতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ধরনের মানুষকে পৃথক ব্যক্তি হিসাবে সমাজে গণ্য করা হত না। তাদের কাছে সাধারন মানুষের মত আচরন ছিল কাম্য। দঃ ভারতের বেশ কিছু মন্দিরে এদের দৈবিক নৃত্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিল।
মহাভারতে অর্জুনের বৃহন্নলার রূপ শিখণ্ডিনীর পরিচয় তৃতীয় লিঙ্গের আধার স্বরূপ। প্রাচীন সনাতন ধর্মে সমকামীতা নিষিদ্ধ না হলেও মনুস্মৃতির ৮/৩৬৯ ও ৮/৩৭০ নম্বর শ্লোকে–সমকামী যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান উল্লেখ আছে। তারপরও প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহাসিক উপাদান তথা সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উভয় ক্ষেত্রেই সমাজে সমকামীতার অবস্থান স্পষ্ট। পদ্মপুরাণে অর্জুন ও শ্রী কৃষ্ণের বৈষ্ণব ভাবধারার প্রেমকে বহু পণ্ডিতগন সমকামীতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। বাল্মিকীর রামায়ণে সুন্দর কান্ডে হনুমানের রাবনের কক্ষে প্রবেশের প্রাক্কালে হনুমানের মনভাবে সমকামীতার আভাস মেলে। নবম শতাব্দীতে জৈন দার্শনিক শাকটায়ন জীবনের ব্যাখ্যায় সমকামীতার উল্লেখ করেছেন। হিন্দু দেবতা অগ্নির জন্মদাত্রী ছিলেন দুই নারী, পুরুষ নন। তথাকথিত ভাগীরথ রাজার জন্ম হয় দুই নারীর মিলনে। ‘গদাধরা’, ‘হরিহর’ প্রভৃতি দেব-দেবী নারী-পুরুষের মিলিতরূপ। দেবী ‘চণ্ডী – চামুন্ডি’ দুই দেবীর মিলনে নির্মিত সমকামী রূপ ।‘বহুচারী দেবী’- কে পুরানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে উভলিঙ্গ এবং সমকামী দেবী রূপে। হিন্দু ধর্মে যজ্ঞে অগ্নি ও সোমের ভুমিকা কে সমকামী ক্রিয়া রূপে মান্যতা প্রদান করা হয়।
অর্থাৎ বৈদিক ও সনাতন হিন্দু ধর্মে সমকামিতা প্রাধান্য পেয়েছিল। হিন্দু ঐতিহ্যে একটি সময়ে সমকামিতা-কে সাগ্রহে গ্রহন করা হয়েছিল। ‘অগাস্ট কোমতের’ ধারনা অনুসরন করে বলা চলে আমরা বর্তমানে Metaphysical এবং Age of Science and Technology –র মধ্যে অবস্থিত এক দ্বন্দ্বময় সময় চক্রে বসবাস করছি। ধর্মের ওপর মৌলবাদের আক্রমন সমাজ, সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান গতিকে স্থবির করেছে। সমকামিতার অবৈধতা এক ঔপনিবেশিক ধারনা। যার প্রতিফলন ঘটেছিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭৭ নম্বর অনুচ্ছেদে। এই ‘হোমোফোবিয়া’র অবসান ঘটে জাতীয়তাবাদী ও উত্তর আধুনিক গনমতের মাধ্যমে। সুপ্রিম কোর্ট বাধ্য হয়ে সমকামীতাকে বৈধ ঘোষণা করেন। মানব অধিকারের নবযুগের সূচনা হয়। পরিশেষে বলা যায়, সমকামিতা উত্তর আধুনিকতা বা সমাজতন্ত্রের প্রাধান্য প্রাপ্ত কোন নতুন ধারনা নয়, ভারতীয় ঐতিহ্য ও হিন্দু সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত অতীতের একটি অনন্য বৈচিত্রময় চিন্তাধারা মাত্র।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • মহাকাব্যের নারী, কবিতায় থাকো / বেদবতী সযত্নে লালিত যৌবন আগুনে ভষ্ম করেছে তবুও দেয়নি এক লম্পটের হাতে তুলে। ভগবতী প্রেমিকের তরে তুলে রাখা সতিত্ব সমুদ্রে বিসর্জন দেয় তবু সারা দেয়নি এক চরিত্রহীনের চটুল চাহনিতে। আর এদেরই আর এক রুপ সীতা গহীন অন্ধকার অশোকবনে বন্দী পাখির মতো পাখা ঝাপটিয়ে কেঁদেছে তবু হৃদয় সপে দিয়ে রেখেছিলো স্বামীর হৃদয়ে। রাবন সীতাকে কোলে তুলে নিয়ে অপহরণ করেছিলো বলে তাকে সতিত্বের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিলো। অগ্নিপরীক্ষা দিয়েও সন্দেহের তীর তাকে বিদ্ধ করে রেখেছিলো সারাক্ষণ। গর্ভবতি সীতাকে রাম ত্যাগ করেছিলেন এবং জমজ পুত্র লব ও কুশকে দেখেন তাদের জন্মের ১২ বছর পরে। অন্তঃসত্তা হয়েও আশ্রয় হয়নি সেই স্বামীর ঘরে । বারটি বছর কাটাতে হয়েছে স্বামীবিহনে নির্জনবাসে জঙ্গলের কুঠিরে । মিথিলার রাজা জনক এর পালিত কন্যা সীতার ৪৫ বছর জীবনকালের ৬ বছর রাজকন্যা, ১২ বছর অযোধ্যায় রামের পত্নিরুপে, বনবাসে ১৩ বছর, রাবনের কারাগারে ১ বছর, আবার অযোধ্যায় ১ বছর এবং অবশিষ্ট ১২ বছর বাল্মিকীর আশ্রম তপোবনে । সীতার আবির্ভাব ও তিরোধান দুইই অলৌকিক ও রহস্যাবৃত । রাজা জনকের হলাগ্র কর্ষনে আবির্ভূত সীতা মাত্র ৪৫ বছরের জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়ে আবার ধরিত্রীমাতার ক্রোড়েই ফিরে যায় । বাল্মিকী নিজেও রামায়নের গুরুত্বপূর্ন চরিত্র । তিনি স্বয়ং প্রজাপতি ব্রক্ষ্মার নির্দেশে ও বাকদেবীর সহায়তায় রচনা করেন রামায়ন । এর পাঁচ হাজার বছর পরে সংঘটিত হয় মহাভারতের ঘটনাবলী । ব্যাসদেব মহাভারতের কাহিনীগুলো লিখেছেন আগে ঘটেছে পরে । এরও অনেক পরে গ্রন্হাকারে রচিত হয় বেদ । বেদ মূলতঃ বিভিন্ন আদি কবির কাব্য । মনুর আগে কোন মানুষের কথা জানা ছিলো না কবিদের । ন্যাচারাল সিলেকশন, মিউটেশন আর জেনেটিক ড্রিফট এর ক্রিয়েশনাইজম তত্ব জেনেও নিশ্চুপ থাকেন আজকের বিজ্ঞানী সুধিজনেরা ধর্মবিরোধীতার ভয়ে। হোকনা প্রাচীন কবিদের কল্পকাহিনী – কিছুই কি রেখে যায়না লক্ষ প্রাণের অন্তরে ? পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য রামায়ন ও মহাভারতের পাঁচ নারী অহল্যা, দ্রোপদী, কুন্তি, তারা ও মন্দোদরী সবাইতো ছিলেন নির্যাতিতা । সুদর্শন ইন্দ্রের আহ্বান ফিরিয়ে দিতে পারেনি সুন্দরী অহল্যা। মুনির ঘরসংসারে অতিষ্ঠ সুন্দরী যুবতী অহল্যা হাজার বছরের শাস্তি মেনে নিয়েছিলো ক্ষণিকের ভালোলাগার মূল্য দিতে। বনবাসরত স্বামীর স্মৃতি বুকে ধারন করে অনিচ্ছা আর লজ্জার কষ্ট লালন করে শয্যা বদল করে গেছে দ্রোপদী, অর্জুনকে ফিরে পাবার এক সুদিনের আশায়। দেবতাদের ভোগের বলি কুন্তি কত কষ্ট নিয়ে নিজ সন্তান কর্ণকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলো লোকলজ্জার ভয়ে। নিজ স্বামী বালীর অপরাধ মেনে নিয়েছিলো তারা কিন্তু মেনে নেয়নি রামচন্দ্র, হত্যা করেছিলো বালীকে। আর মন্দোদরী মুখবুজে নিরবে ঘর করে গেছে এক লম্পট রাবনের। মহাকাব্যের এ নারীরা আজও আছে আমাদের এইসব দিনরাত্রীর সমাজে সংসারে। রেজাউল করিম মুকুল, ঢাকা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post