কোয়েল সাহা :- বাদল সরকার, কোলজ কবিতা নাটক টাউন প্ল্যানার এই প্রত্যেকটি উপাদান তাঁর ব্যক্তি স্বত্তার শামিয়ানা। প্রথাগত মানচিত্রের কাঁটাতার তাঁর জানা বোঝার আকাক্ষাকে কোন ভাবে কোন অবস্থাতেই পাঁচিল তুলতে পারেনি। বরং অনায়াস ছিল তামিলনাড়ুর অজোগ্রাম থেকে ফ্রান্সের অলিগলি সুন্দরবনের লোনা জল বাঘ মানুষের টিঁকে থাকার যুদ্ধে মুখের মাংস খুবলে যাওয়া গর্ত। কিংবা আমেরিকার বোহেমিয়ান হিপি জীবনযাপন। একমুখী গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক পাঠশালার বাইরে জীবনের পাঠকে গুরুত্ব দিয়ে সমান্তরাল এক রাস্তা ধরে হাঁটার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ পরবর্তী তৃতীয় ধারার নাটকে সমাজ ও সময়ের বহু স্তরের চলন বিশেষ ভাবে ধরা দিয়েছে।
জাতীয় আন্তর্জাতিক আঞ্চলিক রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি সবটাই যে একক সুতোর টানে বাঁধা। সবটাই ছেঁড়াছেঁড়া ঘটনার জোরাতালি দেওয়া আস্ত কোলাজ। কোন বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা প্রবাহের খেলা নয়। সচেতন ভাবে গড়ে তোলা ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। একটা নিটোল গল্প ও তার চরিত্রের আঁধারে সময়কে না ধরে। প্রথা ভাঙার ছন্দ তৈরী করেছেন। তাতে তর্ক বিতর্ক সবটাই যেন চেতনার জমাট বারুদকে উসকে দেওয়ার সচেতন পরিণাম।


সচেতন এই পরিণামের এক উল্লেখ যোগ্য নাটক ‘ভোমা’। যে ‘ভোমা’ গ্রাম শহরের ব্যবধানকে সরাসরি আঙ্গুল তুলেই দায় সারতে চায় না। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই ব্যবধান টিঁকিয়ে রাখা হয় নিদিষ্ট স্বার্থকে চরিতার্থ করার স্বার্থে। পক্ষপাত দুষ্ট শ্রেনী ব্যবস্থাকে টিঁকিয়ে রেখে, অর্থনীতিকে একমুখী করে তোলার চক্রান্তে।
স্বাধীনতার ৭৪ বছর পরেও তাই বঙ্গোপসাগরে নিন্মচাপ তৈরী হলে সুন্দরবনের মানুষ শরীর দিয়ে বাঁধ আগলাতে একবুক লোনা জলে নেমে পড়েন। ঝড়জলে তোলপাড় মানুষ গুলো বুকে আগলানো জান নিয়ে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকেন। শহর থেকে ৮০-১০০ কিমি দূরত্বের গোছান শহর জীবনে লোনা জলের সেই ঝাপটা কাচের জানলার ওপারে বিন্দু বাস্প কণা হয়ে ঝাপসা হয়ে যায়।
‘ভোমা’ বাঁচার কারণে শহরের শেষ প্রান্তে এসে মাথা গোঁজেন বস্তির অনাচে কানাচে। নিজের দেশ নিজের ভুখন্ডে ভোমা আবার উদ্বাস্তু হন। শহরের সাজানো জীবনে একরাশ বিরক্তি আর কোঁচকানো ভুরুর ভিতরে মাথাচাড়া দেয় দয়া-করুণা-ভিক্ষা।

ক্ষমতার রাজনীতি গিলে খেতে চায় পরিবেশ ও মানবিক গুণাবলীকে। চলে নিধন যজ্ঞ। শহর জীবনের আরাম স্বাচ্ছন্দকে নিশ্চিন্ত করতে ভোগবাদের দম্ভ গেড়ে বসতে চায়। গ্রাম সংস্কৃতি শহরের হাওয়া বদলের সংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যাওয়া ম্যানগ্রোভের টিঁকে থাকার মতো। মরতে জানা না বলে আবার ও ঝড়জল টপকে বাঁধের উপর সাপ কুমির বাঘ মানুষের খেলা চলে।
১৯৭৬ সালের সুন্দরবন তার অর্থনীতি-রাজনীতি-সমাজ-জীবন মিলেমিশে আজকের ২০২১ কে জুড়ে দিচ্ছে। ভোগবাদ বনাম সর্বহারা উদ্বাস্তু শিবিরের সমীকরণ একই সমুদ্রের ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে। বাদল বাবু চেতনাকে উসকে দেওয়া ‘ভোমা’ যেন এই প্রজন্ম এই সময়কে প্রশ্ন করছেন উন্নয়ন কতটা এগোল? ব্যবধান কতটা? ইতিহাস আর বর্তমানের সমীকরণে ‘ভোমা’ এক জাতায় পাক খাচ্ছে।