• December 4, 2021

অপরাহ্নবেলা

 অপরাহ্নবেলা

অপরাহ্নবেলা

সৌমী গুপ্ত :

দিনশেষে সূর্যের আলো ম্রিয়মাণ। পাহাড়ের কোলে আঁধার নেমে আসছে ধীরে ধীরে। পক্ষীসকল বাড়ি ফেরার অভিমুখে।
কিয়ৎক্ষণ পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করেছেন দ্রৌপদী। পঞ্চভ্রাতার একটি মাত্র পত্নী । ভীম ,নকুল ,সহদেব অনেক পূর্বেই প্রাণত্যাগ করেছেন। মহাপ্রস্থানের পথে দীর্ঘ যাত্রায় প্রিয়জনের বিয়োগে হৃদয় ক্ষরিত।
দূরে সরস্বতীর কলধ্বনি কর্ণগোচর হয়। শীতল হাওয়া দিচ্ছে উপত্যকায় । অর্জুন এক গন্ডূষ জল শেষ সূর্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করল। যুধিষ্ঠির সম্মূখে এগিয়ে চলেছেন। এই মুহূর্তে অজস্র নিজুত বাক্য ,শব্দ হৃদয় স্ফুরিত করে জিহ্বার সম্মুখে আছাড় মারছে পার্থের । দোলাচলে দ্বিধাগ্রস্ত অর্জুন – তৃতীয় পান্ডব ।
মেঘহীন আকাশ পড়ন্ত আলোয় গোধূলিবর্ন। এই সুযোগ। জীবনের অন্তিম সময় সন্নিকটস্থ। বুকের উপর করজোড় করে যুধিষ্ঠিরের উদ্দেশ্যে বলল, ” বড় ভ্রাতা ,যদি অনুমতি দেন তবে কিছু কথা বলতে পারি!’
ঈষৎ বিরক্ত হলেন ধর্মপুত্র। ভ্রুদ্বয় সকুঞ্চিত করে সপ্রশ্ন নয়নে তাকালেন অর্জূনের দিকে ।
চক্ষুদ্বয় অবনমন করে নমস্কার জানাল অর্জুন ,” ক্ষমা করবেন জ্যেষ্ঠ! মৃত্যুর পূর্বে এই কয়েকটি কথা না বললে হৃদয়ের ভার নামবে না কিছুতেই।”
যুধিষ্ঠির খানিকক্ষণ নীরব থেকে বললেন ,” অর্জুন যা বলার পূর্বে বলাই কী সমুচিত ছিল না ? মহাপ্রস্থানের পথে এ হেন বালখিল্য আচরণ তোমাকে শোভা পায় না। তুমি জানো সময় বেশি নেই তথাপি পিছুটান কেন সৃষ্টি করছ অযথা ? এমন কী কথা যা আগে কখনও প্রকাশ করার সুযোগ পাও নি ঠিক পূন্যলগ্নে বাধা সৃষ্টির প্রয়োজন হল?”
পিছন ফিরে একবার তাকাল অর্জুন । নাহ্ আঁধারী পাহাড়ে দ্রৌপদীর মৃতদেহ আর দেখার কোনও উপায় নেই। আর কোনও বাধাও নেই। যুধিষ্ঠিরের সম্মূখে নতজানু হয়ে বসল ,” অপরাধ মার্জনা করবেন । কিন্তু কতগুলো প্রশ্নের উত্তর আপনিই শুধু দিতে পারবেন । এর পূর্বে আমরা সকলে যুদ্ধ ,রাজ্য ,পুত্রশোক নিয়ে দিন অতিক্রম করেছি ঝড়ের ন্যায় । এসব ব্যতীত আর একটি কারণও আছে অবশ্য। সকলের সম্মূখে আমি কিছুতেই অপদস্থ করার সাহস বা স্পর্ধা কোনওটাই দেখাতে চাই নি!”
প্রমাদ গুনলেন যুধিষ্ঠির। কেন অর্জুনের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছেন না তিনি ? অকারণে শীতল হাওয়ায় কিয়ৎ বেশিই ঠান্ডা অনুভূতি হচ্ছেই বা কেন?
ধর্মপুত্রকে নিশ্চুপ দেখে অর্জুন শুরু করলেন ,” নীরবতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়েই আমি শুরু করছি ভ্রাতা।
আমরা পঞ্চভ্রাতা। আপনি জ্যেষ্ঠ। কখনও তো আপনার কথার অমান্য হই নি আমরা কেউ , এমনকি আমাদের মাতাও আপনার কথাকেই বেদবাক্য হিসেবে মেনে এসেছে। আপনি জানতেন যাজ্ঞসেনী আমার একান্তই নিজের পছন্দের ,ভালবাসার , মাতা কুন্তী ভুলবশত, অজ্ঞাত অবস্থায় সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারার মত আমার একমাত্র স্ত্রী যখন ভাগ করলেন তদাপি আপনি নীরব থেকে মেনে নিলেন কেন? আপনি জানেন তারপর কখনো দ্রৌপদীর মুখোমুখি চোখ তুলে দাঁড়াতে পারিনি আমি?যেন প্রশ্নের অগ্নিশল্কা আমার দিকে ধাবিত করেছে সে প্রতিমুহূর্তে!”
ক্রোধে অগ্নিশর্মা হলেন পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ, ” দুঃসাহস দেখিও না অর্জুন। জগৎ সংসারে সামান্য নারীর জন্য ভ্রাতৃকলহে অভিরুচি হল কী করে তোমার। তোমার অধ্বঃগামীতা দেখে আমি বিস্মিত!”
করুণ হাসল অর্জুন ,” তাই কী? নাকি সত্যের কঠিন ও উলঙ্গ প্রতিবিম্বে নিজেকে অবলোকন করে ভীত হয়ে পড়ছেন আপনি ? সামান্য নারী ? সেই সামান্য নারীকেই যুদ্ধে বাজি রাখা যায় তবে ? সেই সামান্য নারীর জন্যই নিজের ভ্রাতাকে ঈর্ষা করা যায় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে? পাশা খেলায় পরাজয়ের পর দুর্যোধন যখন দ্রৌপদীর সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছিল তখনও আপনি মজা দেখছিলেন। আসলে প্রতিশোধস্পৃহায় আনন্দিত হচ্ছিলেন আমার অসহায় অবস্থা দেখে। কী যে সুখ স্ফুরিত হয়েছিল আপনার । যেন অঘোষিত অদৃশ্য যুদ্ধে হাতিয়ার ছাড়াই পরাজিত করলেন নিজের সহোদরকে! অথচ আপনি বিলক্ষণ জানতেন আপনার একটি মাত্র অঙ্গুলিহেলনে দুর্যোধনের ধড় আর মস্তক আলাদা করে দিতে পারি আমি !’
তীব্র চীৎকারে অনুরনিত হল রাতের আকাশ,পাহাড় , ” পার্থ!স্পর্ধা সংবরণ করো! নিজের স্ত্রীর অববামনার প্রতিকার কেন তুমি নিজেই করোনি ? এই শেষ বেলায় আমার পাপের হিসেব নিকেষ করতে বসেছ তুমি?”
গলার কাছে জমে থাকা যন্ত্রণাটা আজ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পাহাড়ের বুকে জমে থাকা আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়ে আসতে চাইছে চাপা ক্ষোভে। অর্জুন চোখ তুলে তাকাল, ” এই বেলা নিজের স্ত্রী? আপনার নয় ? নাকি শুধুমাত্র ভাগের সম্পত্তি ছিল অগ্নিকন্যা? নিজেকে প্রশ্ন করুন। আপনারই দেওয়া কথা অনুযায়ী আমরা অপেক্ষা করছিলাম একটি প্রতিবাদের জন্য । আপনি জানতেন আপনার আদেশ ছাড়া আমরা কোনও কাজ করিনা।
নারীকে নিয়ে হিংসার পরম্পরা আসলে পুরুষের রক্তে। ভীম অবশ্য বরাবরের বেপরোয়া , তাই সে তোয়াক্কা করে নি আদেশের । আমার মনে হয় ভীম ভালবাসতো দ্রৌপদীকে সবচেয়ে বেশী। বিশ্বাস করুন তাতে আমার বিন্দুমাত্র ঈর্ষা হয় না । হয় আফসোস। যদি আমিও ভীমের মত দ্রৌপদীকে…! পারি নি জ্যেষ্ঠ! তাই সবার সঙ্গে ভাগাভাগিতে রাজী হয়েছিলাম । নিজের স্ত্রীর লাঞ্চনার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য আপনার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়েছে! আর সামান্য নারীর ভাগ নিয়ে মানসিকতাকে যদি নিম্নেই প্রেরণ করেন তবে বলা বাহুল্য একমাত্র আমার স্ত্রীই এই যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছিল! আপনার আর কোনও স্ত্রী নয় !”
“অর্জুন!” কম্পিত গলায় ও বিস্ফারিত চোখে তাকালেন ধর্মপুত্র ।
বিশেষ অবলোকন করল না অর্জুন । ইচ্ছাকৃত ভাবেই। তেমনি শান্ত কন্ঠেই বলল ,” গাত্রদাহ ভ্রাতা ! আপনি জানতেন সমগ্র দিক থেকে আমি এগিয়ে । যুদ্ধে ,নিপুনতায় , বুদ্ধিতে ,শৌর্যে ,বীর্যে অগ্রে আছি আমি! কেমন করে মেনে নেবেন আপনি? তাই ঠান্ডা লড়াই। মিছরির ছুরির মত এফোঁড় ওফোঁড় করেছেন প্রতিনিয়ত ।’
প্রতিবাদ করলেন যুধিষ্ঠির , ” নিজের ঢাক নিজেই বাজানো মুর্খের কাজ। এতটা স্থবির ও মুর্খ যে তুমি হতে পারো কল্পনাতীত! তাছাড়া কৃষ্ণ ছাড়া তুমি অচল!”
“কিসের মুর্খামি ভ্রাতা ! যেমনটি আমি ব্যতীত আপনি নিতান্তই সাধারণ এক মানব মাত্র তেমনটা বোধহয় কৃষ্ণ ছাড়া আমি নই! কৃষ্ণ ব্যতীত আমি শূন্য হতে পারি কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বা গুরুত্বহীন নই ! শূন্যের গুরুত্ব আপনার জ্ঞাত। আর দ্বিতীয়ত আমরা চার ভাই ছাড়া আপনার একার পক্ষে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করা সম্ভবপর হয়ে উঠতো না ! আসলে আপনি এই ধ্রুবসত্যটি সঠিক ও নিদারুনভাবেই জানতেন । তাই নিজের দুর্বলতাকে আবরণ দিয়ে রাখতেন সত্যের স্রস্টা হিসেবে! অথচ কিসের সত্যতা ! আপনি কৌশলে দ্রৌপদীর সঙ্গে এমন স্থানে মিলিত হয়েছেন যেখানে মিলনের কোনও সম্ভাবনাই নেই । আসলে এটাও আপনার পূর্বপরিকল্পিত। এমন জায়গায় দ্রৌপদীকে ভোগ করলেন যেখানে আমার উপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী। আমি সেই দৃশ্যের সাক্ষী হওয়ার অপরাধে চোদ্দ বছরের বনবাস । বাহ্ ভ্রাতা বাহ্। আপনি কী ভেবেছিলেন এতটাই নির্বোধ আমি? আমি কী বুঝি নি কতটা হিংসে থেকে আপনি এই পরিকল্পনা করেছিলেন? তারই ফলশ্রুতি হিসেবে দ্রৌপদী আমার প্রাণপ্রিয় ভালবাসা থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন যাতে কিছুতেই আমরা আমাদের কাছাকাছি না আসতে পারি!”
” থামো! মস্তিষ্কের ক্ষমতা অবলুপ্ত হয়েছে তোমার!” কেঁপে গেল যুধিষ্ঠিরের কন্ঠ!
” ভয় পেলেন জ্যেষ্ঠ? নিজের আর একটা রূপ চোখের সামনে ভেসে উঠছে বলে স্বর্গলাভের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে মনে হচ্ছে। এমন স্বর্গলাভের প্রয়োজন কী? আপনি তো চিরকাল দ্রৌপদীকে করায়ত্ত করতে চেয়েছেন জোর করে। অথচ একটি কথা যাবার আগে জানিয়ে যাই আপনাকে দ্রৌপদী কিন্তু শুধুমাত্র আমাকেই ভালবেসেছিল। আর আমিও দ্রৌপদীকেই। এই যে ক্ষনিককাল পূর্বে প্রাণত্যাগ করল সে যাবার সময় স্পষ্ট দেখতে পেলাম জন্মান্তরে আমাকেই কামনা ও প্রার্থনা করে গেল । আপনি বুঝেছিলেন ওঁর হৃদয়ের কথা? বোঝেননি ! নয়তো প্রথমদিন যেদিন ভ্রাতার বিবাহ করে নিয়ে আসা স্ত্রীর রুপের আগুনের প্রলোভন সম্বরণ করতে না পেরে পৌরুষত্বের আস্ফালন করছিলেন তখন দ্রৌপদী অশ্রুজলে ভেসে যাচ্ছিল। এ ও কি ধর্ষণ নয় ? তবে সত্য কী জানেন? দ্রৌপদী আপনাকে করুণা ছাড়া আর কিচ্ছু করে নি। এত করুণা বোধহয় আর কাউকে সে করে নি। একজন নারীর নিকট পুরুষের এমন স্খলন সর্বাধিক অপমানজনক। আর মাতা কুন্তী ! তিনিও জানতেন আমি ছাড়া আমরা ছাড়া তুমি অস্তিত্বহীন! এও কি করুনা নয়!”
হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ধর্মপুত্র। মুখ ঢাকলেন হাতে। ক্ষীণ স্বরে বললেন,” কী করতে বলো অর্জুন ,ভ্রাতা ,আমি কী তাহলে ক্ষমার অযোগ্য!”
বিজয়ের হাসি হাসল যেন অর্জুন , ” সমস্ত হার মেনেও ভুল করেও স্বর্গলাভ করা যায় যদি ভুলের উপলব্ধি হয় ! আমার সময় আগত জ্যেষ্ঠ । ভুল আমারও ছিল অশেষ ক্ষমাহীন। স্বর্গলাভ না করলে যদি সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করা যায় তা আমি মাথা পেতে নেব!…আসি ভ্রাতা।আপনাকে ছোট করার বা অপমান করার অভিপ্রায় ছিল না আমার। শুধু আপনার সম্মূখে একটিবার আয়না ধরার প্রয়োজন ছিল! আশা করি আপনার অভীষ্ট লক্ষ্যে আপনি এবার নির্দ্বিধায় পৌঁছতে পারবেন! আর আমি মিলিত হব পঞ্চভূতে। স্পর্ধা ক্ষমা করবেন ! “
অর্জুন রাতের অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেল। সরস্বতীর কলধ্বনি কর্ণগোচর হচ্ছে এখনও। যুধিষ্ঠির অন্ধকারে তাকিয়ে থাকে। রথ আসতে কী খুব দেরী? স্বর্গলাভ করলে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার উপায় আছে তো…!

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *