• December 4, 2021

কামরুন নাহারের কবিতা

 কামরুন নাহারের কবিতা

১.কালো মেয়ের কাব্যকথা

আমার যেদিন জন্ম!
সেদিন সকালে চারিদিক সুমধুর আযানের আওয়াজে ভরে গিয়েছিল।
কিন্তু আমার কানে কেউ আযান দেয়নি।
কারন আমি মেয়ে!
এ সমাজ ব্যবস্থায় আমি অবাঞ্ছিত!

আমি জন্মেছিলাম খুব ছোট,
দেহে লাল রঙের লালিমা নিয়ে
সবাই বুঝে নিয়েছিল মেয়ে কালো।
একেতো মেয়ে!
তার উপর কালো মেয়ে!
কেউই তেমন আর খুশি হতে পারেনি।

হ্যা, আমি কালো মেয়ে!
ছোটখাটো মুখ, মিষ্টি চেহারা
যে দেখে সেই বলে।
কিন্তু তাই বলে কেউ কখনো সুন্দরী সম্বোধন করেনি।

এই প্রাচ্যের দেশে আমরা জানি,
সুন্দর হলো দুধে আলতা রং,
ছিপছিপে গায়ের গঠন,
ঠিকঠাক লম্বা, ঘন চুল,
পটলচেরা চোখ, পান পাতার ঠোঁট
আরও কতো কিছু!

এ সবের কোনটাই আমার নেই
তাই মিষ্টি মেয়ে হলেও সুন্দরী হয়ে ওঠা হয়নি।

আমি কালো
ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।
আমার মা, কাকিমা, দাদিমা সবাই বলতো
মেয়ে কালো!
সবারই এক চিন্তা!
এ কালো মেয়েকে কে বিয়ে করবে?
এই একবিংশ শতাব্দীতে ও
বিয়েটা বড় গুরুত্বপূর্ণই বটে!

আমার বুদ্ধিমত্তা, লেখা-পড়া, আমার জানার পরিধি সবাইকে মুগ্ধ করলেও
কালো মেয়ের তকমাটা
এ দেহ থেকে কখনোই মুছে যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে
বেশ ভালো চাকুরী করে
বাবা মা, ভাই বোন সবার মুখই উজ্জ্বল করেছি।
কিন্তু চিন্তার ছায়া মুছে দিতে পারিনি।

যাই হোক বিয়ে আমার হয়েছে।
ভালোই হয়েছে।
বেশ ভালো বেতনে চাকুরী করি
সংসারে তাই কদরও বেশ ভালো।
তবুও শাশুড়ি, ননদ
এমনকি নিজের বরও তার সমাজ জীবনে
এই কালো বউকে পরিচয় করিয়ে দিতে
কিছুটা কুন্ঠা বোধ করেন।

যদিও এ অভিজ্ঞতা নতুন
কেননা মায়ের বাড়িতে
অন্তত এ সমস্যা অনুভব করতে হয়নি।
কিন্তু জীবন ভারি অদ্ভুত সে তার চটুলতা দিয়ে গুরুত্বের গুরুত্বটা বুঝিয়ে দিয়ে যায় বারেবার।

কালো মেয়েরা
এ সমাজে বসবাসরত নাগরিকের
নানা চিত্র এবং চরিত্র
এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা
খুব গভীরভাবে অবলোকন করে বেড়ে ওঠে।
তাই তারা অনেক কিছুই উপলব্ধি করতে পারে।
তারা দেখে এবং হাসে!

কখনো নিজের ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে,
কখনো অন্যের অবান্তর কৌতূহলে।
কিন্তু এখন আর এসব গায়ে মাখেনা,
সয়ে গেছে সব।
এসবকে এখন আর ধর্তব্যের মধ্যে গণনা করাই ছেড়ে দিয়েছে।
পরিহাসকে পরিহাস ভেবেই উড়িয়ে দেয়।

কালো মেয়েদের কাব্যগুলো কিছুটা একই ছকে বাঁধা।
প্রাচ্যের এ সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েই যেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত
সেখানে একটি কালো মেয়ে কেনইবা অভিশপ্ত হবে না!
নিয়তির এ নির্মম পরিহাস কেনই বা তাকে কটাক্ষ করবে না!
এটাই তো স্বাভাবিক!

কিন্তু আমরা একবিংশ শতাব্দীর নাগরিক
এটাও হয়তো কিঞ্চিৎ মাথায় রাখা প্রয়োজন।
এই পাষবিক সমাজ ব্যবস্থা,
এ বর্বর মানসিকতা,
রুচিহীন পঙ্কিল বাক্যবাণ বাক্সবন্দী হোক।

কালো মেয়ের কাব্যকথাই হয়ে উঠুক রূপকথা।
একবিংশ শতাব্দী হোক নারীর প্রতি পরিবর্তনশীল দৃষ্টভঙ্গির এক নতুন ধরা।

২. জীবনের গল্প

নাগরিক সভ্যতা তার অধিকতরো বিলাসিতা নিয়ে একটু একটু করে পা বাড়ায় প্রতিদিন।

রাতের আঁধারে চাকচিক্যের অন্তরালে ঢাকা পড়ে যায় হাজারো ভাসমান মানুষের গল্প।

বাদাম, ফুল, বা চা বিক্রেতারা হয়ে ওঠেন এনজিওর প্রজেক্ট।
টোকাই, মুটে, ভিক্ষার গান গাওয়া ছোট্ট ছেলেটি হয়ে ওঠে সদ্য ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রদের গিনিপিগের চরিত্র।

পলিথিন, ঝাঁকা কিংবা গোলাকার সিমেন্ট এর পাইপে বসবাসকারী পরিবারগুলো আদৌ ভাসমান কিনা তা নিয়ে আবাসন ও প্রকল্প মন্ত্রনালয়ে বৈঠক চলে দিনের পর দিন।

তা নিয়ে চায়ের দোকানে তুমুল ঝড় ওঠে।
কিন্তু এই খেঁটে খাওয়া মানুষগুলো তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণেই রীতিমতো ব্যস্ত।
এসবে সময় নিয়ে ভাববার সময় তাদের নেই।

জীবনের গল্পগুলো এতোটাই বাস্তব যার দৃশ্যপট যেন স্বপ্নের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায় নিষ্পলকে।

এখানে পরিস্থিতি পরিহাস হয়ে যেন নিজেকেই নিজে ব্যঙ্গ করে।
আর চরিত্রগুলো নায়ক না হয়ে ভিলেন হয়ে যায় প্রকাশ্যেই।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post